গড়গড়ার মা’লো দ্বাদশ পরিচ্ছেদ: শিক্ষিতা স্ত্রী অথবা পাস করা মাগ

 

স্ত্রী শিক্ষা বনাম স্ত্রীর শিক্ষা

তাত্ত্বিক যুক্তি deductive logic এবং আনুপাতিক অনুমান deductive  inference। ‘পতিতগণ যদি  বই লিখিতে বা পত্রিকা সম্পাদনা করিতে পারেন , তবে পতিতাগণ পারিবে না কেন?’ ‘পতিতারা যদি একত্র মিলিত হইয়া সমিতি গঠন করে  তবে দেশের চোর ডাকাতরাও সমিতি গঠন করিবে ।” মানদার তাত্ত্বিক যুক্তি এবং মহাত্মা গান্ধীর আনুপাতিক অনুমান থেকে আমরা একটি পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাই, বিশেষ এই সমিতি গঠনের বায়ুটি উনিশ শতকে  বঙ্গদেশ শিখেছিল  সায়েবদের অনুকরণে এবং শেলি বায়রন শেক্সপীয়র আদি বায়বীয় অসুখ অন্তঃপুরে ঢুকেছিলো  স্ত্রী শিক্ষার  হুজুগে।  আমরা এও জানি মানদা এই সকল পড়েছিলেন I এবং কুতর্কের শিক্ষা এবং আরও কিছু অসৎ প্রবৃত্তি যে  ইন্দ্রিয়পরায়ণা কলহপ্রিয়া স্ত্রীজাতি শিখেছিলেন দুই পাতা ইংরাজি পড়ে তাতে সন্দেহ নেই।

পাঠক, যদি জিজ্ঞাসা করি স্ত্রী শিক্ষা আর স্ত্রীর শিক্ষার মধ্যে পার্থক্য কি? সাদৃশ্যই বা কোথায়?  তবে এই হেঁয়ালিটির সঠিক উত্তর হবে , প্রথমটি হলো সায়েবদের দেওয়া কুমন্ত্রণায় বাঙালি বাবুদের ঘরের মেয়েদের দুই পাতা পড়ানোর ঐতিহাসিক অভিযান (এটি ঢাক ঢোল পিটিয়ে শুরু হয় ১৮৪৯ সালে) ।  দ্বিতীয়টি হলো সংসারে  খাল কেটে কুমির ডেকে আনার এক  নব্যবাবুসুলভ আহাম্মকি। প্রথম আর দ্বিতীয়টির মধ্যে একটি কার্য কারণ সম্পর্ক আছে বটে । স্ত্রী শিক্ষা নিয়ে দুচার কথা বলা হয়েছে মেয়েমানুষের বুদ্ধি পরিচ্ছেদে এবং নারী জাতির আত্মিক উন্নতি নিয়ে যে আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল, সেই বামা বোধিনী আন্দোলন আমরা খানিক খানিক নেড়ে চেড়ে দেখলাম ।  স্ত্রী শিক্ষা আর স্ত্রীর শিক্ষা বিপর্যয় নিয়ে যে ডামাডোল  শুরু হলো, সেটি এইবার দেখার সময় হয়েছে।
প্রথমেই  স্মরণ করি সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রাচীনা ও নবীনা’ প্রবন্ধটি। তিনি বলছেন:

“(…) দিনকতক ধূম পড়িল, স্ত্রীলোকদিগের অবস্থার সংস্কার কর, স্ত্রীশিক্ষা দাও, বিধবাবিবাহ দাও, স্ত্রীলোককে গৃহপিঞ্জর হইতে বাহির করিয়া উড়াইয়া দাও, বহুবিবাহ নিবারণ কর; এবং অন্যান্য প্রকারে পাঁচী রামী মাধীকে বিলাতি মেম করিয়া তুলা। ইহা করিতে পারিলে যে ভাল, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই; কিন্তু পাঁচী যদি কখন বিলাতি মেম হইতে পারে, তবে আমাদিগের শালতরুও একদিন ওক্‌বৃক্ষে পরিণত হইবে, এমন ভরসা করা যাইতে পারে। যে রীতিগুলির চলন, আপাততঃ অসম্ভব, সেগুলি চলিত হইল না; স্ত্রীশিক্ষা সম্ভব, এ জন্য তাহা এক প্রকার প্রচলিত হইয়া উঠিতেছে। পুস্তক হইতে এক্ষণে বাঙ্গালি স্ত্রীগণ যে শিক্ষা প্রাপ্ত হয়, তাহা অতি সামান্য; পরিবর্ত্তনশীল সমাজে অবস্থিতি জন্য অর্থাৎ শিক্ষিত এবং ইংরেজের অনুকরণকারী পিতা ভ্রাতা স্বামী প্রভৃতির সংসর্গে থাকায় তাহারা যে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়, তাহা প্রবলতর। এই দ্বিবিধ শিক্ষার ফল কিরূপ দাঁড়াইতেছে? বাঙ্গালি যুবকের চরিত্রে যেরূপ পরিবর্ত্তন দেখা যাইতেছে, বাঙ্গালি যুবতীগণের চরিত্রে সেরূপ লক্ষণ দেখা যাইতেছে কি না? যদি দেখা যাইতেছে, সেগুলি ভাল, না মন্দ?”

বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশ্নোবোধক অলঙ্কার সংযোন টি দ্যোতক।  অলঙ্কার শাস্ত্র বলে উত্তর হবে  নেতিবাচক ।যাই হোক, পাঁচী রামি, মাধিকে বিলাতি মেম করার প্রকল্পটি শুরু   হয় ১৮৪০ সালে।

 James Stuart Mill অথবা বাবু হেমেন্দ্রপ্রসাদের ক্ষেদোক্তি

জেমস স্টুয়ার্ট মিল এর হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া (১৮৪০) এক মহান গ্রন্থ। বাবু স্টুয়ার্ট মিল এতদ্বারাএই বুঝয়েছিলেন যে নেটিভ দের সার্বিক বোধোদয়ের অন্যতম উপায় হলো তাহাদের সম্ভাব্য সহধর্মিণীদের শিক্ষিত করে তোলা। এ বাবদ তিনি লিখছেন:

“The condition of women is one of the most remarkable circumstances in the manners of nation… As society refines upon its enjoyments, and advances into the state of civilization, …in which the qualities of the mind are ranked above the qualities of the body, the condition of the weaker sex is gradually improved, till they associate on equal terms with men and occupy the place of voluntary and useful conjugators.”

অর্থাৎ বাবুকুলের সর্বাঙ্গীন শ্রীবৃদ্ধির তরে তাঁদের  উপযুক্ত  শিক্ষিতা বিবি  সহধর্মিনী প্রয়োজন  যাতে তাঁরা ইংরেজ সরকারের স্বাস্থ্য সমৃদ্ধিতে আরও ইন্ধন জোগাতে পারেন. উনিশ শতকের বাংলা ভাষায় ‘বাবু’ শব্দটি বহুবর্ণ. একাধারে কর্তা, স্বামী, মনিব, আবার কেরানীও বটে. এই বহুমাত্রিক বাবুর  মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় স্ত্রী নামক সেবাদাসীর পরিবর্তে শিক্ষিত বিবি বিধেয় হলো ।  অতএব বেথুন  স্কুল । অতএব নারী জাগরণ।

১৮৯৩ সালে উনিশ বৎসর বয়স্ক বাবু হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ মনোরমা নাম্নী এক ত্রয়োদশ বর্ষীয়া  বালিকার সঙ্গে তাঁর বিবাহ উপলক্ষে লিখছেন:

“I must be either a fool or a rogue to sermonize on such a subject […] personally, I have very little faith in the sex –rightly termed the weaker sex. I have very little faith in their feelings and emotions in their brains, in their capacity for love and affection.”

এবং তাঁর  ঘাড়ে যাঁরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাঁকে  নবীনা করার গুরু দায়িত্ব সম্পর্কে বলছেন:

“I shudder as I look before me and probe into the stupendous task—the task of forming a character —the task of making another my own, the task of making another human being my partner in life… the stupendous task that lies before me.”

এই stupendous task  এই নব্য বাবুটি কিভাবে কার্যকরী করেছিলেন বা আদৌ করেছিলেন কিনা বলা যায় না তবে  প্রাচীনা কে নবীনা করার রঙ্গে যে নব্যবঙ্গদেশ মেতে উঠেছিল তা হিন্দুয়ানির ধ্বজাধারীরা ভালো চোখে দেখেন নি । পাঁচী রামী মাধীদের মন্দ কপাল : দেশি পুতুল হতে মেম পুতুল, নব্য বাবুদের গবেষণাগারের বিষয়বস্তু, আবার অন্যদিকে সনাতন পন্থীদের হাসির খোরাক, বটতলায় ছাপা শস্তা প্রহসনের সং।

GARGARA XII PREM

চুলটানা বিবিয়ানা ও বঙ্গীয় কর্মশালা

স্ত্রীজাতি এক নিষ্ক্রিয় উপাদান । কর্তৃপক্ষ যেমন সাজান  তেমনি সাজে, বাঁচালে বাঁচে, মারলে মরে। যখন তাকে বিবি সাজানো হলো, একদল বললে ‘বাহ্, বেড়ে  দেখাচ্ছে ‘ আর একদল বললে  নাঃ এ অচল।প্রথম দল Useful conjugator পন্থী, দ্বিতীয় দল সনাতনপন্থী হিঁদু ভাগ্যবিধাতা । দুই দলেরই সমান গোঁ।  ‘সমাজ দীপিকা’ পত্রিকায়, ১২৯২ ভাদ্র সংখ্যায়  ‘স্ত্রী শিক্ষা  ও স্ত্রী স্বাধীনতা’ প্রবন্ধে স্ত্রী শিক্ষায় উৎসাহীদের জিগেস করা হচ্ছে : “শিক্ষা দেওয়ার অর্থে  কি তাঁহারা বডি তে বডি ঢাকিয়া, মোজা জুতা পায় দিয়া, গাড়ি চড়িয়া, শিক্ষকের মুখে স্বরের অ স্বরের আ , হইতে সাইন্স এম.এ  পর্যন্ত এই বুঝেন?”

পাঠক, দেখুন  স্ত্রীরা কি বোঝেন তা জিগেস করা হচ্ছে না। মনোজ্ঞ বিষয় টি আলোচনা করছেন কর্তৃকারকেরা । স্ত্রীজাতি  কি ভাবছেন সে জানার প্রয়োজন কোথায়? বাস্তবিক, তাঁরা বোঝেন ই বা কি?  ‘বসন্তক’ পত্রিকায় ‘নসিরামের মেলা’ গল্পে পরীক্ষক ছাত্রীকে জিগেস করছেন , ” বিদ্যানুশীল কাকে বলে?” ছাত্রী উত্তর দিচ্ছে: “কেতাব পড়া, মাসিক পত্রিকা পড়া , কার্পেট বোনা”। এরপর শিক্ষক যখন জানতে চাইলেন “আহার করে কি করবে?” উত্তর পেলেন: “কার্পেট বুনবো”।

এসবের শোনার পর সাধারণ বুদ্ধি বলে এসকল অতি অচল পদার্থ, কার্পেট বোনা হতে পারে, মাসিক পত্রিকা পড়া হলেও হতে পারে কিন্তু শিক্ষা, বিশেষতঃ ইংরেজি শিক্ষা  নৈব নৈব চ. Useful conjugator পন্থীরা আশা বাদী… তারা গোঁ ধরে রইলেন এবং ক্রমেক্রমে দেখা গেল তাঁদের জয় হচ্ছে। স্ত্রীশিক্ষা বা স্ত্রীর শিক্ষা ধাপে ধাপে এগোচ্ছে এবং স্কুলের গাড়িতে কছু conjugtor রাও খাতাকলম নিয়ে সওয়ার হচ্ছেন। পাঠক, এমতাবস্থায় আমার একখানি গানের কলি মাথায় এলো; সেটি হলো:

জয় ক’রে তবু ভয় কেন তোর যায় না,…
আশার আলোয় তবুও ভরসা পায় না,

১৯১৫ সালে শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখছেন:
“বিধাতা একদিন পুরুষকে পুরুষ এবং মেয়েকে মেয়ে করিয়া সৃষ্টি করিলেন, এটা তাঁর একটা আশ্চর্য উদ্ভাবন, সে কথা কবি হইতে আরম্ভ করিয়া জীবতত্ত্ববিৎ সকলেই স্বীকার করেন। জীবলোকে এই যে একটা ভেদ ঘটিয়াছে এই ভেদের মুখ দিয়া একটা প্রবল শক্তি এবং পরম আানন্দের উৎস উৎসারিত হইয়া উঠিয়াছে। ইস্কুল-মাস্টার কিংবা টেক্‌স্‌বুক-কমিটি তাঁহাদের এক্সেসাইজের খাতা কিংবা পাঠ্য ও অপাঠ্য বইয়ের বোঝা দিয়া এই শক্তি এবং সৌন্দর্যপ্রবাহের মুখে বাঁধ বাঁধিয়া দিতে পারেন, এমন কথা আমি মানি না। মোটের উপর, বিধাতা এবং ইস্কুল-মাস্টার এই দুইয়ের মধ্যে আমি বিধাতাকে বেশি বিশ্বাস করি। সেইজন্য আমার ধারণা এই যে, মেয়েরা যদি বা কাণ্ট-হেগেল্‌ও পড়ে তবু শিশুদের স্নেহ করিবে এবং পুরুষদের নিতান্ত দূর-ছাই করিবে না।
কিন্তু তাই বলিয়া শিক্ষাপ্রণালীতে মেয়ে পুরুষ কোথাও কোনো ভেদ থাকিবে না, এ কথা বলিলে বিধাতাকে অমান্য করা হয়। বিদ্যার দুটো বিভাগ আছে। একটা বিশুদ্ধ জ্ঞানের, একটা ব্যবহারের। যেখানে বিশুদ্ধ জ্ঞান সেখানে মেয়ে-পুরুষের পার্থক্য নাই, কিন্তু যেখানে ব্যবহার সেখানে পার্থক্য আছেই। মেয়েদের মানুষ হইতে শিখাইবার জন্য বিশুদ্ধ জ্ঞানের শিক্ষা চাই, কিন্তু তার উপরে মেয়েদের মেয়ে হইতে শিখাইবার জন্য যে ব্যবহারিক শিক্ষা তার একটা বিশেষত্ব আছে, এ কথা মানিতে দোষ কী?”
(সংযোজন স্ত্রীশিক্ষা ভাদ্র-আশ্বিন, ১৩২২)

 

অর্থাৎ , হে স্ত্রীজাতি, ভুলিয়ো না, কামানের গোলা হেন জার্মান দর্শন  হজম করার পরও তোমার আসল কার্য সন্তান প্রতিপালন এবং আপনাপন পুরুষ গণের সমাদর ও সর্বসময় হিতসাধন । এবং, যতই বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ ডিঙ্গাও, তোমাদের  পাঠ্য এবং পুরুষদিগের পাঠ্য ভিন্ন হইবেক তাহা অনস্বীকার্য। Usefulness এর সংজ্ঞার বাকিটা পাঠকরা পড়ে বুঝে নেবেন এই আশায় রইলাম। স্ত্রীজাতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই  দ্বিধাজড়িত  অনুনয়ে বোঝা যায় “পুরুষদের নিতান্ত দূর-ছাই” সম্ভাবনাটি  যে আছে, সে কথা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায়না। ইতিহাস বাচনভঙ্গি বোঝায়। ১৮৮৭ তে বঙ্কিমবাবু আরো নির্দ্বিধায় আসল গান টি গেয়ে রেখেছিলেন। রবিবাবুর বাচন ভঙ্গিতে যা কৌশলে ঢাকা পড়লো, বঙ্কিমী বাংলায় তা সূর্যের ন্যায় আলোকিত:

 

“স্ত্রীলোকের প্রথম ধর্ম্ম পাতিব্রত্য। অদ্যাপি বঙ্গমহিলাগণ পৃথিবীতলে পাতিব্রত্য-ধর্ম্মে তুলনারহিতা। কিন্তু যাহা ছিল তাহা কি আর আছে? এ প্রশ্নের উত্তর শীঘ্র দেওয়া যায় না। প্রাচীনাগণের পাতিব্রত্য যেরূপ দৃঢ়গ্রন্থির দ্বারা হৃদয়ে নিবদ্ধ ছিল, পাতিব্রত্য যেরূপ তাহাদিগের অস্থি মজ্জা শোণিতে প্রবিষ্ট ছিল; নবীনাদিগেরও কি তাই? অনেকের বটে, কিন্তু অধিকাংশের কি তাই? নবীনাগণ পতিব্রতা বটে, কিন্তু যত লোকনিন্দাভয়ে, তত ধর্ম্মভয়ে নহে। ”   (‘প্রাচীনা ও নবীনা’)

 

বঙ্কিমবাবুর  প্রতিবেদনে প্রশ্নবোধক  অলংকারের ব্যবহার অর্থবহ। প্রশ্নটির যে প্রয়োজন নেই এবং উত্তর টি স্বতঃসিদ্ধ, তা বোঝানোর এর চেয়ে উৎকৃষ্ট  অলংকরণ পাওয়া ভার। সাহিত্যসম্রাট কে আমার প্রণাম।

এখন দেখা গেল রবিবাবু আর বঙ্কিম বাবুর বাগধারা দুই খাতে বইলেও, যে সত্যটি বেশ পরিষ্কার তা হলো স্ত্রী জাতির চরিত্র জনিত উদ্বেগ ।  শিথিলস্বভাবা বলে কিছু খ্যাতি আমরা মেয়েমানুষেরা সেই  আদি পিতার সময় থেকে বহন করে চলেছি , এ নিয়ে কিছু কথা আগেও বলেছি ; সতেরোশো শতকের ইংল্যান্ডেও এ জাতীয় নারীস্তুতি প্রচলিত হয়েছিল, যদি কখনো সুযোগ  পাই সে নিয়েও বলবো। তবে সায়েবরা এসে যে বঙ্গদেশের নিড়বিড়ে বাবুদের এই উৎকণ্ঠা আরও উস্কে দিলে সেটা পরিষ্কার ।তাঁরা যা নিয়ে এলেন তা হলো ব্যাটাছেলেদের সঙ্গে স্ত্রীজাতির মেলামেশা নামক কন্টামিনেশন। পাঠক, মীর মোশারফ হোসেনের উদাসীন পথিকের মনের কথায় (১৮৯০) একটি সহজ সরল ইঙ্গিত দেখুন। এই পর্বে ‘জকি’ নামক চরিত্র তার বৌ ‘মাখন’ কে বকা ঝকা করছে সে পরপুরুষদের সামনে বেরোত না বলে। এইবার কথোপকথনটি শুনুন:

 

আমি সাহেবের কুঠিতে থাকিয়া দেখিতেছি, নুতন কোন সাহেব আসিলে মেমসাহেব নিজে যাইয়া আগু বাড়াইয়া আনেন। দুইজনে চুমা খাওয়া হয়, গলায় গলায় মিশিয়া হাত ধরাধরি হয় । তোরা কোন কার্য্যের নহিস। কেবল ঘোমটা—তোদের কেবলই ঘোমটা ।”
“আমি গরিব, দুঃখী বাঙালীর মেয়ে। বাঙ্গালা আমাদের দেশ । আমার দেশের চাল-চলন যাহা আছে তাহাই করিব। সাহেব বড়লোক, দেশের রাজা । তাহরা যাহা করেন, আমার সে সকল দেখিয়া দরকার কি ? আমি গরিব মানুষ, মেমসাহেবের মত ব্যবহার করিতে আমার ক্ষমতা নাই। হইবেও না।”

 

এখন কথা হচ্ছে চুমা খাওয়া,গলায় গলায় মিশিয়া হাত ধরা, এ সকল সামাজিক সম্ভাষণ যদি useful conjugator রা রপ্ত করেন, তাহলে সর্বনাশ। কারণ, বিবিরা ‘ইংরেজি কেতাব যে পড়বেন, সে তো খালি পিঁপড়েরে সারি  ইংরেজি অক্ষর নয়? সে হলো  কথা বলার ঢং, আদব কায়দা, সামাজিক রীতি নীতি, এবংসর্বোপোরি পরপুরুষের সহিত গলাগলি ঢলাঢলির প্রথা, সায়েবরা যারে ক’ন etiquette। এই contamination-এর ভয়ে সকল বাবুই অল্পবিস্তর শিহরিত হচ্ছেন; কেউ জোরে কাশছেন, কেউ মুখে রুমাল চাপা দিয়ে।

 

bongo0001

১৮৮১ তে বান্ধব পত্রিকায় ‘ বিবিয়ানা চলন ‘:

“বাবুরা বুট পড়েন , বিবিরাও স্লিপার বা লেডিস সূজ পরেন । উভয়েই রং বিরঙ্গের মোজা পরেন । বাবুরা ধুতির ওপর গলা খোলা কোট পরেন, বিবিরাও শাড়ির ওপর জ্যাকেট পরেন …বাবুরা ব্র্যান্ডি খান বিবিরা পোর্ট সেবন করেন …মূল কথা এই, আমাদের দেশে বিকৃত ইংরেজি সভ্যতার অনুকরণ হইতেছে… আমাদের স্ত্রীলোকদিগকেও  তাহার অনুকরণ করিতে প্রবৃত্তি দিতেছি । তাহার ফল এই হইবে যে, ফিরিঙ্গি সমাজ যে সকল দোষে দুষ্ট , আমাদের সমাজেও  সেই সকল , বরং তাহার অপেক্ষা শোচনীয়  দোষ প্রবেশ করিবে , বাঙালি বধূ বিবি হউন তাহাতে আমরা আপত্তি করিনা ; চন্দ্রপুলি ত্যাগ করিয়া হট কেক দিয়া জলযোগ করুন , তাহাতে আমাদের আপত্তি নাই, …কিন্তু তাঁহারা যেন পৃথিবীর প্রধান কর্তব্য  না ভুলেন…এক্ষণে আমাদের বধূমহলে বিবিয়ানা চলনের দিকে  যে ঝোঁক পড়িয়াছে , সাবধান না হইলে বড় বিপদ ঘটিবে”।
জ্যাকেট এ আপত্তি নাই, হট কেক এ আপত্তি নাই, তাহা হইলে  আপত্তিটা কিসে?  বিপদই বা কোন পথে আসিবে? এই অংশটি বড় দীর্ঘ হয়ে পড়ছে কিন্তু আর দুই একটি কথা না বললে সত্য প্রতিভাত হইবে না । পন্ডিতপ্রবর ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ‘লজ্জাশীলতা’ ( ১৮৯২) প্রবন্ধটি শেষ হয়েছে এই ভাবে:

 

“আজিকার নিমন্ত্রনে যে স্ত্রীলোকেরা আসিয়াছিলেন তাহাদিগের মধ্যে একজনের শব্দ অনেক বার বাহির বাটি পর্যন্ত শোনা গিয়েছিলো… কে বলো দেখি।  “কেমন করিয়া জানিব”। ” ও সেই সুকুমারী, যে চলিলে পায়ের শব্দ হইত না –মুখ তুলিয়া কথা কইতো না –যাহার মুখের হাসি মুখেই মিলিয়ে থাকিত –আহা বাছার দোষ কি? স্বামী উহাকে ইংরাজদের সহিত কথা কহাইয়াছে–তাহাদের সামনে গান করাইয়াছে–আপনার সঙ্গে মদ পর্যন্ত খাওয়াইয়াছে –আর কি ওর লজ্জা রাখিয়াছে ? তাই অত গলা হইয়াছে , ধরণ ধারণ সব বদল হইয়া গিয়াছে ।”

 

অর্থাৎ কিনা সুকুমারীর ফিরিঙ্গি  সংসর্গে স্পর্শদোষ ঘটিয়াছে  এবং সে একটি বেহায়া মেয়েমানুষে পরিণত হইয়াছে ।

বাবুদের উভয় সংকট । প্রাচীন বাবু বলেন  “গৃহপিঞ্জরের বিহঙ্গিনী”দের  (শব্দটি বঙ্কিমী, আমার পছন্দ) শিকলি দিয়ে বাঁধো। ইংরেজি দোষ হতে দিয়ো না । কিন্তু এধারে পালিশ ষষ্ঠী বাবুটি পড়লেন আতান্তরে।অন্তরের প্রাচীন বাবু স্বীকার করলেন বিপদ আছে বটে, কিন্তু  বিবি যদি ইংরিজি না পড়লো আর পালিশ সংসর্গ না করলো তাহলে সে সহধর্মিনী হয় কি প্রকারে এবং বাবুরই বা মোক্ষপ্রাপ্তি হয় কিসে?

অতএব…

শিক্ষিতা স্ত্রী

১৮৮৫ থেকে ১৯০০র গোড়ার দিক পর্যন্ত পুরুষ জাতি ভয়ে ভয়ে রইলেন। শিক্ষিতা বিবি বিষয়ক প্রহসন ও নভেলে বটতলা জমজমাট। বলা বাহুল্য, লেখক সকলই পুুরুষ।  এই সকল জ্যাকেট এবং ইষ্টাকিন  (stocking)  পরিহিতা, পার্শি শাড়ি  বেষ্টিতা স্ত্রীকুলকে কি করে সৎ শিক্ষা দিতে হয় তার একটি  বার্নিং এক্সাম্পল সেট করা হলো ১৮৮৮ সালে লিখিত পাস করা মাগ  প্রহসনে। পাঠক, এটি একটি হাস্যরসসমৃদ্ধ  allegory ।  বর্ণনায় বলা হয়েছে:

স্ত্রী স্বাধীনের এই ফল
পতি হয় পায়ের তল ।।

এই প্রহসনের  নায়িকা কিরণ শশীর প্রথম অঙ্ক প্রথম দৃশ্যে  তাঁর ভগিনী চাতকিনীকে বলছেন:

“আমি কেয়ার করি না। ড্যাম ন্যাস্টি নেটিভগণ , মেয়েমানুষের অনার বোঝে না । ভাতার বলে যে একটা পদার্থ আছে –কি জানোয়ার আছে –তা আমার আইডিয়াতেই আসেনা;– তা আমি কি ইস্টুপিট  নেটিভ পুরুষের  অধীনতা স্বীকার করে –ব্রুট অসভ্য পরাধীন বাঙালির মতো থাকবো? তা কখনোই নয়! যদিও আমি বাঙালির মেয়ে –কিন্তু এখনকার বাঙালির মেয়ের মতো মূর্খ নই। আমি বেথুনে স্কুলে হাই প্রাইজ  পেয়েছি, যেদিন তোমার বিয়ে হয় সেদিন তোমার পতি আমার মুখে ইংলিশ স্পিচ শুনে থান্ডারস্টক হয়েছিল । তোমার বিবাহের আচার ব্যবহার দেখে  যদিও আমি দুঃখিত হয়েছিলাম , কিন্তু তোমার ব্রাইডগ্রুমকে শিক্ষিত নেটিভ এর ন্যায় সভ্য দেখে সে দুঃখ ডিশ্চার্য্য  করেছি।”
তৃতীয় দৃশ্যে তিনি গান গাইছেন:

ও প্রাণ ডিয়ার
ভ্রাতা সব কাম হিয়ার!
লেকচার দিব গার্ডেনে
হাত ধরে পুরুষ সনে
বেড়াইবো নির্জনে ,
দিবানিশি হৃদয় চিয়ার ।
হাজব্যান্ডে করে ডিসমিস , হয়েছি প্রাণ নিউ মিস ,
দিই আমি সুইট কিস,
ফ্রি লভ্ নেভার ফিয়ার ।
এই নায়িকাকে শেষ অংকে শেষ দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে  ইডেন গার্ডেন এ  ছিন্ন গাউন  ও ছিন্ন সাজে । তিনি তাঁর নেটিভ ভাতার কে বলছেন:

 

“তুমি আমার বুকে ছুরি মারো , তুমি আমাকে হত্যা করো । আমি এ পাপ প্রাণ তোমার হাতে নষ্ট করবো..আমার প্রাণে বড় যাতনা হয়েছে –আমি তোমাকে করতো কষ্ট দিয়েছি –তুমি আমার সোনার স্বামী–তুমি আমার হৃদয়ের ধন;আমার পেপার শাস্তি হয়েছে,– এখনো হৃদয় যাতনা নিবারণ হয় নাই। তুমি আমাকে বোধ করো।”

পাঠক, প্রহসনটি বিয়োগান্তক এরে কয় poetic justice. যবনিকা পতনের আগে বিজয়ী স্বামী শ্রী শশীভূষণ ঘোষ বলছেন:

“তুই আমার বড় আদরের স্ত্রী ছিলি। তুই এখন বেশ্যা হয়েছিস । না! আমি হত্যা করতে পারবো না । তোর এখনো অনেক যাতনা আছে , তুই আমার সেই আদরের কিরণশশী,– তুই আজ ভিখারিনী, ম্লেচ্ছ রমণী ! ওঃ! আমি বড় আশা করেছিলাম; আমার– পাসকরা মাগ।”

উপসংহার

এইরকম ইংরেজি জানা মাগে বটতলা এই পর্যায়ে সরগরম। প্রহসন, নভেল সবেতেই তাঁদের ব্যাভিচারিতার উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে তাঁদের বিদায় করা হচ্ছে। “পাশ করা পেত্নী” বই তো নয় ।

একটি আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সকল সাহিত্য চর্চায় ইংরেজি জানা বাবুর মদ খাওয়া এবংবেশ্যা বাজি নিয়ে খানিক রগড়  হলো বটে কিন্তু  কিরণশশীর মত যথোচিত সাজা তেমন কাউকে পেতে দেখলাম না ;  স্ত্রীজাতি স্বভাবতই শিথিলস্বভাবা কিনা, শাসন তর্জন তথা পোয়েটিক  জাস্টিস তাঁদেরই প্রাপ্য ।

একটি অন্য ভাবও খুঁজে পেলাম । সেই  উদ্ধৃিতিটি দিয়ে শেষ করি। শ্রীযুক্ত তারকনাথ বিশ্বাস  ‘বঙ্গীয় মহিলা অর্থাৎ নারীজাতির শিক্ষাবিষয়ক প্রস্তাবে’ (১৮৮৫) লিখছেন:

পুরুষ অধঃপাতে যাইতেছে বলিয়া কি রমনীগণকেও যাইতে হইবে? রমণী ভিন্ন এ সংসারে আমাদের আর কে আছে? তাঁহাদের কোমল সুন্দর প্রকৃতি  অবিকৃত না থাকিলে  পুরুষের তাপ দগ্ধ হৃদয়  কিসে জুড়াইব?

 

এ  আকুল প্রশ্নর যোগ্য জবাব একটি মনে এলো বটে, কিন্তু সে ভদ্রসমাজে মুখ ফুটে বলা অবিবেচনার কাজ হবে বোধে ক্ষ্যান্ত দিলেম।

 

Featured Image: http://www.sothebys.com/en/auctions/ecatalogue/2014/modern-and-contemporary-south-asian-art

Advertisements
Posted in বাংলা, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, History, Uncategorized, Women | 1 Comment

গড়গড়ার মা’লো একাদশ পরিচ্ছেদ: শিক্ষিতা পতিতা ও স্বদেশী বাবু বিচার

GARGARA WOMAN

১ রমেশদার কথা

“অধুনা নিন্দিতা পল্লীবাসিনী (তথাকথিত নিষিদ্ধ পল্লী বা বেশ্যা পাড়া) পাথুরিয়াঘাটা বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের কন্যা কমলা দেবী , ইতালির (এন্টালি ) মুখার্জী পরিবারের কন্যা জুনিয়র  কেমব্রিজ পরীক্ষোত্তীর্ণা অতুলনীয়া সুন্দরী সুকৃতি দেবী , খড়দহের গোস্বামী পরিবারের কন্যা সরযূ দেবী, বরিশা চৌধুরী পরিবারের বধূ  সরলা দেবী, বেহালার হালদার পরিবারের কন্যা দেববালা , অনিলা ও সুনীল দেবী , শ্যাম বাজারে সেনশর্মা পরিবারের কন্যা কুমারী গৌরী দেবী , বাগবাজারের সাহিত্যিক পন্ডিতের স্ত্রী মনোরমা ও কন্যা পরিমল , তারকেশ্বরের বালবিধবা কৃষ্ণভামিনী, ভবানীপুরের ব্যারিস্টার ঘোষ বর্মা পরিবারের কন্যা প্রভৃতি বহু সম্ভ্রান্ত মহিলাদের কুলের বাহির করিয়াও যাহারা অর্থের জোরে সম্মান আদায় করিতেছে তাহাদের পরিচয় গ্রহণ করিয়া পাষণ্ডদিগকে সমাজ হইতে তাড়াইয়া দিবার জন্য বদ্ধপরিকর হওয়া যে অবশ্য কর্তব্য , সমাজহিতৈষীগণকে তাহা হৃদয়ঙ্গম করাইবার জন্যই এই গ্রন্থ প্রকাশ করিতে সাহসী হইলাম ।

বইটিতে পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর  পরিবারের কন্যার একটি ছবি আছে.  চেয়ার উপবিষ্ট বাবু টির শ্রীমুখ সম্পর্কে পরিচিতি তে বলা আছে “পুরুষটির পরিচয় দিতে অসমর্থ বলিয়া মুখে চুন কালী লেপন করিয়া দেওয়া হইলো, ইনি কে তাহা পাঠক বুঝিতে পারিবেন।“

এই পূর্বাভাস দিয়ে যে লেখাটি শুরু, তার লেখক শ্রী রমেশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নাম: রমেশদার চাপান উতোর.বইটি প্রকাশিত হয় শিক্ষিত পতিতার আত্মচরিত (১৯২৯) প্রকাশের কিছু পরেই এবং পরবর্তী কালে দুটি বই একই সঙ্গে  একই বৃন্তে দুটি ফলের ন্যায় সম্পাদিত হয়ে প্রকাশিত হয় ; মূল্য একটাকা বারো আনা। আমি হাতে পেয়েছি পঞ্চম সংস্করণ , ফলে এই  বই যে সাতিশয় সমাদৃত হয়েছিল সে বলার অপেক্ষা রাখে না। আখ্যানর‘রমেশ দা’ এক candid ভদ্র বাবু, যিনি পরিষ্কার বলেই দিচ্ছেন যে তিনি মাস্টার অফ আর্টস ছাড়াও, মাস্টার অফ এডাল্টারী হিসেবেও বেশ কৃতকার্য। । রমেশ দা নামটি লেখক কে অনুপ্রাণিত করে মানদা দেবীর আত্মচরিত পড়ার পর, সেকথা উনি পরিষ্কার বলছেন।

উপরোক্ত যে সামাজিক ছবিখানি তিনি দিলেন তারই নানা নিধি ব্যাখ্যান তাঁর এই লেখা, যার কেন্দ্র চরিত্র রমেশ দা। কৈশোর কাল থেকে প্রতি পর্যায়েই  তিনি নান মেয়ের সর্বনাশ করতে প্রবৃত্ত হয়েছেন এবং রতি সুখ অনুভব করেছেন। যৌবনাবস্থায় লীলাময়ী নাম্নী কোনো অধ্যাপক কন্যা কে সিডিউস করার প্রয়াস পান। মাছ যখন চার খাবার জন্যে একেবারে  বঁড়শির নিকটে এসে পড়েছে তখন বাবুটি ভুলক্রমে তারে রবিবুর ‘মানসসুন্দরী’  থেকে দুই চার কলি আবৃত্তি কর প্রেম নিবেদন করেন এবং খ্যাদা খান। সপ্তদশী প্রেমিকাটি, যে কিনা তার পায়ে সর্বস্ব দিতে রাজি ছিল তিনি কবিতাটি শ্রবণ করে যারপরনাই ক্রোধ প্রকাশ করেন এবং রমেশদা কে শাসান যে তিনি বাবাকে বলে দেবেন।  যেহেতু রবিবাবুর কবিতা অসংখ্য , একটি নাম পাতে ফেললেই পাঠকরা তা ধরে ফেলবেন, সে আশা না করাই ভালো তাই যেটুকু রমেশ লীলাময়ীকে শুনিয়েছিলেন, সেটুকু তুলে দিলাম:

বীণা ফেলে দিয়ে এসো, মানসসুন্দরী–
দুটি রিক্ত হস্ত শুধু আলিঙ্গনে ভরি
কণ্ঠে জড়াইয়া দাও…
অয়ি প্রিয়া,
চুম্বন মাগিব যবে, ঈষৎ হাসিয়া
বাঁকায়ো না গ্রীবাখানি, ফিরায়ো না মুখ,
উজ্জ্বল রক্তিমবর্ণ সুধাপূর্ণ সুখ
রেখো ওষ্ঠাধরপুটে, ভক্ত ভৃঙ্গ তরে
সম্পূর্ণ চুম্বন এক(…)

এইরকম প্রকাশ্যে চুম্বন কামনা  ব্রাহ্ম বালাটি সর্প জ্ঞান করেন  এবং সকাল সকাল  এই চুম্বন লালায়িত আপদ বিদায় করে নিজের এবং পরিবারের  মুখে চুন-কালি লেপনের পথ টি বন্ধ করেন. দেখা যাচ্ছে এই প্রতিনায়কটি রবি বাবুর কবিতা ও গান এ সমান দক্ষ কারণ dishonorably dismissed হওয়ার কিছু আগে লীলাময়ীর জন্মদিনের পার্টিতে তাঁকে দেখা যাচ্ছে লীলাময়ীকে অর্গান বাজিয়ে এই গান টি শোনাতে:

“তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা
মম শূণ্য গগন বিহারী
আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা-
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম অসীমগগন বিহারী।।

এর  কিছু পরেই উষা দেবী নাম্নী লীলাময়ীর এক সখী ওই একই অনুষ্ঠানে অর্গান বাজিয়ে রবিবাবুর এই গানটি গাচ্ছেন:

তোমার প্রণয় যুগে যুগে মোর লাগিয়া
জগতে জগতে ফিরিতেছিল কি জাগিয়া,
এ কি সত্য?

আমার বচনে নয়নে অধরে অলকে
চির জনমের বিরাম লভিলে পলকে
এ কি সত্য?

মোর সুকুমার ললাটফলকে লেখা অসীমের তত্ত্ব
হে আমার চিরভক্ত
এ কি সত্য?

পতিত চরিতে রবীন্দ্র কাব্যের স্থান বিষয়ে  থীসিস রচনা আমাদের লক্ষ্য নয়, তবে একটি বিশেষ কারণে এই তিনখানি রাবীন্দ্রিক বাচন তুলে ধরা হ’লো। পাঠক, দুটি বিবেচ্য বিষয় আছে: রুচি ও কাল দুইই  বদলাচ্ছে এবং খেমটা টপ্পার বদলে রবিবাবুর গান  বিনোদনের উপায় হিসেবে নির্ধারিত হচ্ছে ; বাবুরা উচ্চাশিক্ষিত, ইংরেজি ও বাংলায় সমান পারদর্শী এবং সবচেয়ে বড় কথা  সাতিশয় আলোকপ্রাপ্ত যেহেতু রবিবাবুকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা যোগ্যতর মনে করেন। আর একটি বিবেচ্য বিষয় হলো, তাঁরা ‘থেটার’ বা হাড়কাটা গলির প্রতি নজর না দিয়ে  সচ্ছল ভদ্রমহলে  শিক্ষিতা রমণীর খোঁজে আসেন এবং অর্গান বাজিয়ে  মনোরঞ্জন পর্ব সারা হলে যা বিধেয়  তাই করেন। লীলাময়ীরা বিপদ বুঝে নিজেদের সংবরণ করেন, উষা দেবীরা ব’য়ে যান। এই উষা দেবীদের সামাজিক পরিচয় রমেশ বাবু দিয়েছেন, বস্তুতঃ তাঁদের ছবিও আছেই এই বইয়ে । এই হতভাগিনীরা ছিলেন আলোকপ্রাপ্তা শিক্ষিতা বেশ্যা ।

২ সন্দীপের কথা

rabindranath_tagore

“আমি কিছুদিন আগে আজকালকার দিনের একখানি ইংরেজি বই পড়ছিলুম, তাতে স্ত্রীপুরুষের মিলননীতি সম্বন্ধে খুব স্পষ্ট-স্পষ্ট বাস্তব কথা আছে। সেইটে আমি ওদের বৈঠকখানায় ফেলে গিয়েছিলুম। একদিন দুপুরবেলায় আমি কী জন্যে সেই ঘরে ঢুকেই দেখি মক্ষীরানী সেই বইটা হাতে করে নিয়ে পড়ছে, পায়ের শব্দ পেয়েই তাড়াতাড়ি সেটার উপর আর-একটা বই চাপা দিয়ে উঠে পড়ল। যে বইটা চাপা দিল সেটা লংফেলোর কবিতা।

আমি বললুম, দেখুন আপনারা কবিতার বই পড়তে লজ্জা পান কেন আমি কিছুই বুঝতে পারি নে। লজ্জা পাবার কথা পুরুষের; কেননা, আমরা কেউ বা অ্যাটর্নি, কেউ বা এঞ্জিনিয়ার। আমাদের যদি কবিতা পড়তেই হয় তা হলে অর্ধেকরাত্রে দরজা বন্ধ করে পড়া উচিত। কবিতার সঙ্গেই তো আপনাদের আগাগোড়া মিল। যে বিধাতা আপনাদের সৃষ্টি করেছেন তিনি যে গীতিকবি, জয়দেব তাঁরই পায়ের কাছে বসে “ললিতলবঙ্গলতা’য় হাত পাকিয়েছেন।

মক্ষীরানী কোনো জবাব না দিয়ে হেসে লাল হয়ে চলে যাবার উদ্‌যোগ করতেই আমি বললুম, না, সে হবে না, আপনি বসে বসে পড়ুন। আমি একখানা বই ফেলে গিয়েছিলুম, সেটা নিয়েই দৌড় দিচ্ছি।

আমার বইখানা টেবিল থেকে তুলে নিলুম। বললুম, ভাগ্যে এ বই আপনার হাতে পড়ে নি, তা হলে আপনি হয়তো আমাকে মারতে আসতেন।

মক্ষী বললে, কেন?

আমি বললুম, কেননা এ কবিতার বই নয়। এতে যা আছে সে একেবারে মানুষের মোটা কথা, খুব মোটা করেই বলা, কোনোরকম চাতুরী নেই।”

রমেশ বাবুর পরে ঘরে বাইরের সন্দীপ বাবু ।  দুজনেই “মাস্টার ইন এডাল্টারী”।  দুই বাবুই  সদ্বংশজাত  এবং  উচ্চশিক্ষিত মেয়ে ভোলানোর শিল্পী। বিভিন্ন পর্যায়ে এই শিল্পকলার অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়: যথার্থ অভিসন্ধিতে আসার আগে পূর্বরাগের আবহ সৃষ্টি , কিছু উচ্চমার্গর আলোচনা ( শিকার যে আলোকপ্রাপ্তা সেকথা ভুললে চলবে না), কিছু মধুর বাক্যর সংমিশ্রন, কিছু সঙ্গীতাদি পরিবেশন এব শ্রবণ। কিছু অর্ধব্যক্ত ভীরু প্রণয় সম্ভাষণের সুফলও এই পর্যায়ে দৃষ্ট হয়।  নায়িকারা আধচোখে অস্ফুট ওষ্ঠে পেশাদারি প্রণয়ীর সঙ্গ উপভোগ করেন, তাঁদের হাত পা খুলে খুলে আসে। এরপর সম্ভাষণে কিছু আদর্শ ভিত্তিক বাণী যদি গুঁজে দেওয়া যায় তাহলে শিক্ষিতা নারী পপাত চ মমার চ। এ সকল অধ্যায় শেষ হলে শিকারী বেড়াল ধীরে ধীরে অগ্রসর হ’ন এবং শিকারকে অধিকার করেন। পাঠক,সন্দীপবাবুর  আর্টটি  উপরোক্ত কথোপকথনে ভালো করে লক্ষ্য করুন। বলাই বাহুল্য, এই হলো শিকার ধরার সেই পরম ক্ষণ।

মক্ষী লংফেলোর আড়ালে যা পড়ছেন তা একটি স্ত্রীপুরুষের যৌন বিধি প্রাইমার ,এবং সেটি সন্দীপ বাবু ইচ্ছাকৃত ভাবেই বৈঠক খানায় ফেলে রেখে গেছেন কারণ বারুদে আগুন লাগার লগ্ন এসেছে তা তিনি বিলক্ষণ বুঝেছেন;  আগুনের পূর্বাভাস উপন্যাসেই আছে । যৌন প্রসঙ্গের বই ফেলে যাওয়া সুতরাং  প্রাক্ অন্তিম পর্যায়।  এরপর আর কোনো রাখ ঢাক ছলাকলার প্রয়োজন নেই, সকলই জলবত্তরলম। যেটুকু  বাকি রইলো সেটুকু সন্দীপ বাবু গীত গোবিন্দর আভাস দিয়ে সারলেন

“ললিতলবঙ্গলতায় হাত পাকানো” কথাটি খুবই অর্থবহ, কারণ মক্ষী তা শুনে লজ্জায় লাল হ’ন।

এটি জয়দেবের গীতগোবিন্দর প্রথম সর্গর শ্লোকের অন্তর্গত।এ স্তবকটির বাংলা সংস্করণ:

আজ শ্ৰীরাধিকে বনে বনে কত প্রকারেই না শ্ৰীমাধবের অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইতেছেন। কন্দৰ্প-জ্বর-জনিত চিন্তা অত্যন্ত আকুল করিয়া তুলিয়াছে আর মিলন পিপাসা অতিশয় প্ৰবল হইয়াছে। এই অবস্থায় শ্ৰীরাধিকাকে তাহার  কোন সখী সরস বাক্যে বলিতে লাগিলেন, সখি! দেখ দেখ মৃদু মন্দ মলয় সমীরণ ললিত লবঙ্গলতা সংসর্গে কতই সৌগন্ধ বিস্তার করিতেছে। ফুলে ফুলে কুঞ্জ কুটীর ভরিয়া উঠিয়াছে। গুঞ্জন্মত্ত মধুৱতের ঝঙ্কার ধ্বনির সহিত মিলিত হইয়া কোকিল কাকলী চারিদিক মুখরিত করিয়া তুলিয়াছে। বিরহীর পক্ষে অতি দুরন্ত এই সরস বসন্তে হরি বুঝি কোন যুবতী জনের সঙ্গে বিহার করিতেছেন।

এ হলো গীতগোবিন্দর প্রথম সর্গের অন্তর্গত একটি  চার্জড্ এরোটিক মোমেন্ট বা রসঘন মূহুর্ত, যার মধ্যে ‘ললিত লবঙ্গলতা’র গন্ধ রাধার কামোত্তেজনার এক অনুষঙ্গ মাত্র। মক্ষী লাল হবেন বৈকি। যিনি ললিত লবঙ্গলতায়  ‘হাত পাকিয়েছেন’, তিনিও জানেন বিমলা ইঙ্গিতটি ভালোই বুঝেছেন, শিক্ষিতা কিনা। জয়দেব পড়েছেন। এবং তাঁরও সেই একই রাধা ভাব। সুতরাং নিরীহ ‘লবঙ্গলতা’ শব্দটি লক্ষ্য ভেদ করলো। আমরা একে বলি the art of seduction । এ স্তরটি সাফল্যমণ্ডিত হলে ‘মোটা কথা মোটা করে’  বললে কোনো ক্ষতি নেই। রমেশ বাবুর কপাল মন্দ, মোটা কথায় পৌঁছনোর আগেই ‘চুম্বন’ শব্দটি রবিবাবুর বকলমে বলে ফেললেন এবং তাঁর মানস সুন্দরী তাঁরে ঘাড় ধাক্কা দিলেন। তবে তাতে তাঁর যে পরবর্তীকালে কিছু এলো গেল তা বলা যাবে না।সন্দীপ বাবুও ঘাড় ধাক্কার উপান্তে পৌঁছেছিলেন এবং সে জোগাড়টি করেছিলেন মেজো বৌঠান। ‘হাতবিধবা’ পরিচ্ছেদে এনাকে নিয়ে দুই একটি কথা বলেছিলাম, পাঠক সে কথা স্মরণ করুন। রাইয়ের যে ‘চিটে চিনি জ্ঞান নেই’ সে কথা বুঝেই তিনি নানকু বেহারাকে দিয়ে সন্দীপ বাবুর অন্দরে আসা ঠেকানোর ব্যবস্থা করেছিলেন ; তাঁর অতি আলাভোলা দেওরের কারণে সে বন্দোবস্ত কার্যকরী হয়নি।

একটি  ক্লাসিক, বাংলা সাহিত্যের আকরগ্রন্থ, অন্যটি  অতি অখদ্যে অবদ্যে সামাজিক খেউড়, কিন্তু দুটিতেই দুই বাবুর মধ্যে আমরা কিছু সামঞ্জস্য খুঁজে পেলাম। তার মধ্যে যে সামঞ্জস্যটি আলোচনা হয়নি, সেটি হ’লো দুজনেই স্বদেশী আন্দোলনে সামিল ছিলেন।

৩ মানদার কথা

Chittaranjan-Das-Lawyer-a (2)

মানদার উদ্ধারাশ্রম পর্বের কথা বলেছি । সেই পর্বে রাজবালার কথাও উঠেছিল । এইবার তাঁর গল্পটি মানদার বয়ানে শোনাই:

“রাজবালা সোনার বেনের মেয়ে.  বাপের বাড়ি কলকাতায়, অল্পবয়সে তার বিবাহ হইয়াছিল । পিতা ও শ্বশুর উভয়েই সংগতিপন্ন  কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ  বিবাহের এক বৎসর পরেই হতভাগিনী  বিধবা হয় ।  তৎপরে পিতার প্রতিবেশী  এক পূর্ববঙ্গবাসী কায়স্থ যুবকের সহিত তাহার গুপ্ত প্রণয়  জন্মে। রাজবালার এক জ্যেষ্ঠা ভ্রাতৃবধূ  এই ব্যাপারে তাহাকে গোপনে সাহায্য করিত।  যুবকটি স্বদেশী আন্দোলনের সময় খুব ‘বন্দেমাতরম’ করিয়া বেড়াইত ।তিন বৎসর ধরিয়া এই গুপ্ত প্রেমলীলা চলিতে থাকে। অবশেষে  রাজবালার সন্তান সম্ভাবনা  হওয়ায় প্রেমিক যুবক পলায়ন করে । রাজবালা  ঝিয়ের সহিত  গঙ্গাস্নানের  অছিলায় বাড়ির বাহির হইয়া আসে , আর সে ফিরিয়া যায় নাই । তারপর নানা দুর্দশার আবর্তে ঘুরপাক খাইতে খাইতে  এই উদ্ধার আশ্রমে উপস্থিত হইয়াছে”।

পাঠক কে কি মনে করিয়ে দিতে হবে যে রবিবাবুর ঘরে বাইরে (১৯১৬) স্বদেশী আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক দলিল ? মানদার বইয়ে এই  বন্দেমাতরম বাবু প্রজাতির ছড়াছড়ি। কাব্য দর্শন সাহিত্য ছাড়াও এঁদের তূনীরে আছে ‘দেশাত্মবোধ’ নামক শব্দভেদী বাণ।  গৃহস্থ অন্দরমহলে তাঁদের জন্য অবারিত দ্বার, গরানহাটা সোনাগাছিতে তাঁরা ঈশ্বরের নামান্তর।  অন্য ইতিহাসে এঁদের ঘোরাফেরা দেখি ১৯০৫ থেকে ১৯২০র  আশ পাশ পর্যন্ত:

“আমি জানি কয়েকটি ভদ্র গৃহস্থের বধূ অসহযোগ আন্দোলনে প্রচারের কার্য করতে আসিয়াছিলেন, তাঁহারা আর তাঁহাদের স্বামীদের নিকট ফিরিয়া যান নাই । কেহ কোনো কার্য আরম্ভ করিয়াছেন, কেহ বা কোনো দেশকর্মীর সহিত অবৈধ প্রণয়ে আসক্ত হইয়াছেন , কেহ কেহ বা স্বামী স্ত্রী  ভাবে বাস করিতেছেন।  এইসকল দেশকর্মীর আচরণ সকলেই জানে , অথচ তাহারা ভোট দিয়া  এইপ্রকার সাধুবেশী  লম্পটস্বভাব  ব্যক্তিদিগেই  কর্পোরেশন, কাউন্সিল এ  প্রেরণ করে । সমাজের অন্ধতা এতদূর গভীর”।

রমেশদা’র চাপান উতোরে  যারে বলা হয়েছে  “ছাইকোলোজি”, পতিতা মেয়েদের ক্ষেত্রে সে বড় অদ্ভুত, তা এই আত্মচরিত পরে বুঝলাম । দেখলাম কি নিপুণ ভাবে বাবু দের ‘কন্টামিনেশন তত্ত্ব’ টি তাঁরা আপন করে নেন।  এই যে দেশপ্রেমী যুবকদের কথা তিনি বললেন,তাঁদের অধঃপতনের  জন্যে যে পতিতারা, সে শিক্ষিতাই হোক বা অশিক্ষিতাই হোক, দায়ী ,সে বিষয়ে তাঁর কোনও সন্দেহ দেখলাম না :

“যে সকল কর্মী যুবকের চরিত্রবল এমন ছিল যে একটা সিগারেট পর্যন্ত কখনো খায় নাই ,তাহারা  কেহ কেহ এই অসহযোগ আন্দোলনের  কর্মক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে মিশিয়া  মদ্যপান পর্যন্ত শিখিয়াছে । যে সকল যুবক এমন পবিত্র চিত্ত ছিল  যে স্ত্রীলোকের সহিত কথা কহিবার সময় মাথা তুলিত না –তাহারা আমাদের সংসর্গে আসিয়া  এখন বেশ্যা দূরে থাক, কুলবধূর সহিত  নির্লজ্জের মতো কুৎসিত হাস্য পরিহাস  করতে অনেকে লজ্জিত হয় না । পতিতা নারীদের  একটা প্রধান স্বভাব এই যে  তাহারা সচ্চরিত্র ও সংযমী পুরুষ দেখিলে  তাহাকে হস্তগত  করিতে বিশেষ চেষ্টা করে  এবং তাহার সংযম ও পবিত্রতাকে  বিনষ্ট করা  একটা বীরত্বের কার্য বলিয়া মনে করে”।

পবিত্র পতনশীল খোকাবাবুদের কথা থাক, আমরা পতিতায় ফিরি । পবিত্রতার নেশা বড় ভয়ানক। যে বস্তুটি চিরতরে গেছে, তারই কুহকে মেতে তাঁরা নাটকের  সতী সাবিত্রী দময়ন্তী সেজে ধন্য হয়েছেন আর সেই একই নেশায় মেতে জাতীয়তাবাদের প্রথম ধাপে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন: রামবাগান, সোনাগাছি, চাঁপাতলা ,আহিরীটোলা জোড়াসাঁকো, সিমলা, কেরানিবাগান,ফুলবাগানের এনারা যাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, তিনি জনৈক মিঃ সি আর দাস। যে টাকা তোলার অভিযান টি এরপর বর্ণিত হবে  তা  ঘটে ১৯২০ তে পূর্ববঙ্গ এবং উত্তরবঙ্গে ঝড় এবং বন্যার সময়ে ।এ হ’লো ইস্ট বেঙ্গল সাইক্লোন ফান্ডের  বিবরণ। মানদা লিখছেন:

“জনসাধারণের কাজে এই আমার প্রথম যোগদান। এই সুযোগে আমি মিঃ সি আর দাশকে প্রথম স্পর্শ করিয়াছিলাম. আমরা যখন প্রণাম করিয়া তাঁহার পায়ে টাকার তোড়া রাখিলাম, তখন আনন্দাশ্রুতে  তাঁহার বক্ষ প্লাবিত হইলো। তিনি আমাদের মস্তক স্পর্শ করিয়া আশীর্বাদ করিলেন। বুঝিলাম তিনি সত্যিই  দেশবন্ধু।“

পাঠক: আগের পরিচ্ছেদে  বলেছি এই  সিগারেট খাওয়া ইংরিজি জানা বেশ্যাটি আমাদের ‘অন্য’ ইতিহাসের বায়োস্কোপ আসুন, তাঁর চোখ দিয়ে সেই চাঁদা তোলার একটি দৃশ্য দেখি:

“সে এক অপূর্ব দৃশ্য! কলিকাতার অধিবাসীগণ স্তম্ভিত হইয়া গেল  এক এক দলে প্রায়  ৫০-৬০ জন পতিতা নারী –তাহাদের পরিধানে গেরুয়া রঙের লালপাড় শাড়ি –এলোচুল পিঠের ওপর ছড়ানো, কপালে সিঁদুরের ফোঁটা , কণ্ঠে মধুর সংগীত , মনোহর চলনভঙ্গি   […] অগ্রে অগ্রে দুইটি নারী একখানি কাপড় ধরিয়াছে  তাহাতে দাতাগণ  টাকা পয়সা নোট প্রভৃতি ফেলিয়া দিতেছে  আর দুইজন স্ত্রীলোক পুরাতন বস্ত্র সংগ্রহ করিতেছে ।”

দৃশ্যটি প্রতীকধর্মী । গেরুয়া শাড়ি লাল পাড়  জাতীয়তাবাদের মূলস্রোতে মিশে যাওয়ার খেয়ালি পোলাও  কি? কোনো কারণে  অবনীন্দ্রনাথের ভারত মাতার  ছবিটি চোখে ভেসে উঠলো। যদিও,  অবনীন্দ্রনাথের সে ছবিতে  শাড়ির লাল পাড় নেই । আর সিঁথির সিঁদুরের বদলে কপালের সিঁদুরের টিপ  শুধুই মাঙ্গলিক না অন্য কিছুর প্রতীক এই প্রশ্ন সেদিন যাঁরা দৃশ্যটি দেখেছিলেন তাঁদের মনে জেগেছিলো কিনা কে বলবে। মানদা শুধু জানিয়েছেন পথে লোকের ভীড় ছিল।

আর অল্পই বলা বাকি রইলো । অসহযোগ আন্দোলনের যিনি হোতা এবং অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ আদি মহান কর্মকান্ডে যিনি ব্যাপৃত ছিলেন, তাঁর অস্পৃশ্যতা-শ্রেণীবিন্যাসে  মুচি মেথর চণ্ডাল দুলে বাগদি সকলেরই জায়গা হয়েছিল, হয়নি শুধু এই অস্পৃশ্য  মেয়েগুলোর ।  ১৯২০ থেকে ১৯২৫ এর মধ্যে মহাত্মা গান্ধী (তিনি ততদিনে  ওই উপাধিটি পেয়ে গেছেন)  যখন বরিশালে  যান তখন   সেখানকার পতিতা নারী সমিতি তাঁর দর্শন প্রার্থী হয়েছিল। বাকিটুকু মানদার বয়ানে:

“মহাত্মা গান্ধী যখন বঙ্গদেশ পরিভ্রমণ করেন , তখন বরিশাল গমন করিলে  সেখানকার পতিতা -নারী-সমিতি  তাঁহাকে নিমন্ত্রণ করে. কিন্তু মহাত্মা গান্ধী সেই সভাতে যান নাই। তিনি বলেন, ‘পতিতারা যদি একত্র মিলিত হইয়া সমিতি গঠন করে  তবে দেশের চোর ডাকাতরাও সমিতি গঠন করিবে ।”

এবং যে দার্শনিক দেশকর্মী এই নিমন্ত্রণটি বয়ে নিয়ে গেছিলেন, জাতির জনক তাঁকেও সমুচিত তিরস্কার করেন বলে মানদা জানিয়েছেন।
এতে বঙ্গীয় তথা দেশীয় পতিতারা যে নীতিশিক্ষাটি পেলেন, তা হ’লো: যতই, দেশসেবা করো আর অসহযোগ আন্দোলনে গা ঢেলে  দাও, বেশ্যা পাড়ার বাইরে তোমাদের আবাহন নৈব নৈব চ।

বটেই তো। যেকালে দেশকে মা জ্ঞানে পুজো করা শুরু হয়েছে, এবং দেশমাতৃকার মডেল হচ্ছেন সতী সাবিত্রীরা,  সেকালে  যাদের গর্ভাধান নিষিদ্ধ, তাদের জায়গা কোথায়?

Abanindranath-Tagore-Bharat-Mata

পরিশিষ্ট:

পতিতার আত্মচরিতের  নানা সমালোচনা হওয়া সত্ত্বেও, রমেশদার চাপান উতোর’এর মতো এই বইটিরও গুটিকতক সংস্করণ হয়।  বইয়ের পরবর্তী একটি সংস্করণে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্মিলনীর সভাপতি  প্রভুপাদ শ্রীযুক্ত অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী  লিখেছিলেন, ” পতিতার আত্মচরিত পাঠ করিলাম […] এই আত্মচরিত হইতেও  নিতে পারিলে  লইবার মতো অনেক জিনিস আছে ; কিন্তু তাহা কি সকলে পারিবে?

গোস্বামী মহাশয়ের দ্বিধাজড়িত প্রশ্নটি যথার্থ । অন্য ইতিহাসের ঝাঁঝটি  একটু বেশি । উহা সকলের পরিপাক নাও হইতে পারে।

(মানদা পর্ব সমাপ্ত)

Featured Image: B engali Women Google.
Chittaranjan Das: http://www.phila-art.com/product/india-1965-deshbandhu-chittaranjan-das-c-r-das-1v-stamps/

Bharatmata: Abanindranath Tagore, coutesy Oilpainting Factory.com

Posted in বাংলা, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, History, Uncategorized, Women | Leave a comment

গড়গড়ার মা’লো দশম পরিচ্ছেদ: অন্য ইতিহাস অথবা শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত।

Desh-Patrika-February-2012

১  আভাস

অনেক তত্ত্বকথা হলো. এইবার একটি গল্প শোনাই । পাঠক, যদি কোনো গল্প এইভাবে শুরু হয় তাহলে গল্পের চরিত্রটি কি হবে ?

“আইন কলেজে পরিবার সময় আমার পিতার বিবাহ হইয়াছিল । তখন আমার পিতামহ  জীবিত।আমার মাতুল পরিবার কলিকাতায় বাস করিতেন .তাঁহারা বিশেষ অর্থশালী ছিলেন না কিন্তু  বংশ মর্যাদায় উচ্চ এবং রূপে অতুলনীয় সুন্দরী  বলিয়া আমার মাতাকে পুত্রবধূ করিবার জন্য পিতামহ  বিশেষ আগ্রহান্বিত হইয়াছিলেন । আমার জন্মের দুই বৎসর পর  আমার পিতামহের মৃত্যু হয়। ঠাকুরদাদার কোলে যে সুখ লাভ আমার ভাগ্যে ঘটিয়াছিল –কেবলমাত্র কল্পনাতেই সেই স্মৃতি জাগিয়া আছে।

কন্যা বলিয়া শিশুকালে অনাদৃত হয় নাই. পিতার বন্ধুগণ কেহ কেহ বলিলেন , ‘প্রথম কন্যাসন্তান সৌভাগ্যের লক্ষণ’। কথাটা হাস্য পরিহাসের সহিত বলা হইলেও, তাহার মধ্যে সত্য রহিয়াছে বোধ হইলো। আমার জন্মের কয়েক মাস পূর্বে পিতা আইন ব্যবসায় আরম্ভ করিয়াছিলেন। দিন দিন তাঁহার উন্নতি দেখা গেল। কিছুকালমধ্যেই আমার পিতা কোনো সুযোগে  বার্ষিক দশ হাজার টাকা আয়ের একটা ছোট জমিদারি নীলামে ক্রয় করিলেন।”

যেহেতু আমরা সাহিত্য প্রেমী বাঙালি এবং বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ , শরৎচন্দ্রের শাঁসে জলে এতো বড়টি হয়েছি, আমরা নাক কুঁচকে বলবো এ তো বোঝাই যাচ্ছে এটা হলো গে Exposition । এর থেকে দুইটি সম্ভাবনা আশু দেখিতে পাওয়া যাইতেছে : ইহা একটি রোম্যান্স বা রোমান্টিক ট্রাজেডি তে পর্যবসিত হইবে, কারণ উপরোক্ত বাবুরা আমাদের তাই শিখিয়েছেন। এরপর আমরা ভুরি ভুরি  উদাহরণ দিতে থাকবো এবং আমাদের ইনফারেন্স টি প্রমাণ করে ছাড়বো।

আদতে এটি একটি বেথুনে স্কুলে পড়া শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত ।নাম মানদা। পদবী অজ্ঞাত। সম্ভ্রান্ত বংশীয়া ব্রাহ্মণকন্যা। এবং সেই কারণেই “পাপী কলঙ্কিনী” হওয়া সত্ত্বেও ‘দেবী’ । ১৯০০ সালে এনার জন্ম। কবে গতাসু হয়েছিলেন জানা নেই, তবে এই জীবন টি দিয়ে বেশ মনের মতন একটু রোমান্টিক ট্রাজেডি যে লেখা হতে পারতো সে বেশ বোঝা যায়, বিশেষ করে একটি প্রভূত সম্ভাবনাময় নায়ক চরিত্র যখন ছিল:

“প্রথম যেদিন তিনি পড়াইতে আসিলেন , সেইদিনই তাঁহার আকৃতি প্রকৃতি এবং পরিচ্ছদে আমি একটু আকৃষ্ট হইলাম । তাঁহার লম্বা লম্বা চুল  কপাল হিতে উল্টা  দিকে আঁচড়ানো  ও ঘাড়ের কাছেই ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া বাবরি পাকানো — তাঁহার বয়স আন্দাজ বাইশ তেইশ –দাড়ি গোঁফ উঠে নাই, না পরিষ্কার কামানো, তাহা বুঝিতে পারিলাম না। কাপড় ঢিলা মালকোঁচা দিয়া পরিয়েছেন, মনে হয় কাবুলিদের পাজামা । গায়ে একটা পরিষ্কার ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি জামা –তখন খদ্দরের চলন হয় নাই । তাঁহার সূক্ষ্মাগ্র  উন্নত নাসিকা , চোখ দুটি  সুন্দর কিন্তু একজোড়া সোনার ফ্রেমে বাঁধানো চশমা সেই সৌন্দর্যকে অন্য রূপ দিয়াছে। পায়ে নকল জরির কাজ করা নাগরা জুতা। তাঁহার বর্ণ উজ্জ্বল শ্যাম , দেহ অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ , তাঁহার কথায় জানি বাঁশি বাজে । তিনি সম্প্রতি  বি.এ  পাশ করিয়া কোনো স্কুলে শিক্ষকের কার্য করিতেছেন ।মাস্টার মশায় অবিবাহিত ।”

এই ‘মুকুল দাদা’ কে দেখে বোধ হয় যেন রবি বাবুর কোনও  নভেলের পাতা থেকে উঠে আসা এক ধীর ললিত নায়ক। মানদার কপাল। মুকুল দাদা তাঁকে  কাব্য শেখালেন, শেলি, বায়রন,  শেক্সপীয়ার, বিদ্যাপতি ভারতচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র ,বঙ্কিম, দীনবন্ধু,  গিরিশচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ  সব পড়ালেন, কিন্তু নায়ক হয়ে উঠতে পারলেন না। সে তাঁর   সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য বলতে পারবো না ।  পতিতার আত্মচরিতে তিনি এক পার্শ্ব চরিত্রই হয়ে রইলেন , কারণ মানদার জীবনের নায়ক বা খলনায়ক হয়ে পড়লো এক ‘রমেশ-দা’  যিনি নাকি আবার, ঘটনা চক্রে বেরিয়ে পড়লো, কলেজে মুকুল দাদার সহপাঠীও  ছিলেন ।

এই রমেশ দাদা যে কোনো   সৎ সাহিত্যে  খলনায়কের ভূমিকাটি বিনা চেষ্টায় পেতে পারেন । কারণ  ইনি বিবাহিত হইয়াও পঞ্চদশ বর্ষীয়া বালিকা প্রণয়িনীকে গর্ভিণী করেন এবং গর্ভসঞ্চারের আভাস পেয়েই তাকে গৃহ ছাড়া করেন।  এরপর কি কি ঘটতে পারে সে না বোঝার কোনো কারণ নেই, তাও একটু বলে রাখা ভালো। ইনি  তাঁর অফিসের তহবিল তছরুপ করে তিন হাজার টাকা, একটি নাবালিকা প্রেমিকা কে নিয়ে তিনি দিল্লি,  লাহোর,  শ্রীনগর,  বোম্বাই  এই সকল শহরে খানিক বিচরণ করে শেষ মেশ কাশি ধামে এসে উপস্থিত হ’ন। পাঠক, কাশীধামে বেশ্যাগমন শুনে হাসবেন না । রমেশদা মানদা কে বোঝাচ্ছেন:

“জানিস এই কাশীতে যত বাঙালি আছে তার অধিকাংশই তোর রমেশদার দলের,কেহ বা কারো ঘরের বৌ বের করে এনেছেন , কেউবা বিধবা পোয়াতি খালাস করতে এসেছেন , কেহ আপন রক্ষিতা নারীর হাওয়া বদলাচ্ছেন — আবার এমন কেহ আছেন যাঁহারা নিজের আত্মীয়া দ্বারা  পাপ ব্যবসায় করাচ্ছেন। বাঙালির কলঙ্কের এই তিনটি স্থান: নবদ্বীপ, কাশী বৃন্দাবন. ভয় দেখাচ্ছিস কাকে?”

বস্তুতঃ ‘সৎসঙ্গে কাশীবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’-এর এই বিপরীত ধর্মী ভাষণ দেখে তাবৎ আশ্চর্য হওয়ার কোনো কারণ নেই । নির্ভীক রমেশদার কাশীবাসের এই প্রাঞ্জল বর্ণনাটি সুকুমারী দত্তর ‘অপূর্ব সতী’ নাটকেও দেখা গেছে। বাবু চন্দ্রকেতু ঘোষ নলিনীকে নিয়ে কাশী ধামেই পৌঁছেছিলেন এবং সেই পবিত্র স্থান হতেই তাঁর  পিতা গোরা পুলিশের সাহায্যে তাঁকে উদ্ধার করে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। নলিনী কাশীধামেই মরে বাঁচে। সুতরাং আলোচ্য লেখায় রমেশদার কথায় অতিরঞ্জন  থাকতে পারে, কিন্তু অসত্য নেই বলেই বোধ হয়।  যাহা হউক এক্ষণে ‘অপূর্ব সতী’ অথবা কাশীধামের মাহাত্ম্য  কোনটিই আমাদিগের বিবেচ্য বিষয় নহে।

আত্মচরিতে ফেরা যাক।বলাই বাহুল্য, রমেশদা  যথাসময়ে উধাও হলেন এবং চরিতের গতি কিছু শ্লথ হলেও প্রভূত সম্ভাবনাময় হয়ে পড়লো।  কাশির ঘাট থেকে মোহান্তর মঠ; তথায় মৃত সন্তান প্রসব ; তৎপর কলকাতার উদ্ধারাশ্রম, হাড়কাটার গলি , রামবাগান এবং তৎপরবর্তী কালে ডাবল প্রমোশন পেয়ে ভবানীপুর।  মানি  বা মানু থেকে ফিরোজা বিবি এবং শেষ পর্যায়ে মিস মুখার্জি । এই কাহিনির মাঝে নানা বাবু , প্রফেসর, সমাজসেবী, ডাক্তার, মোক্তার, ব্যারিস্টার ছড়িয়ে আছেন দাঁড়ি,কমা, সেমি কোলনের মতো।

এইবার আসল কথায় এসে পড়া যাক।

তার আগে একটি কথা সবিনয়ে মনে করিয়ে দিই । লেখাটি একটি বেশ্যার এবং ইঁহাদিগের লজ্জা বোধ সচরাচর কিছু কম হইয়া থাকে । এরপর যদি তাঁহারা হ’ন শিক্ষিতা বেশ্যা, তাহা হইলে সমাজের সমূহ বিপদ, কারণ এঁদের স্পষ্ট বিবৃতিতে ইতিহাসের  নির্মল উদার ভাবমূর্তি কিছু কলঙ্কিত হইয়া পড়ে।

Ramananda-Chatterjee-thumb-320x327
শ্রী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়

২ পতিতোদ্ধারিণী প্রকল্প এবং মানদা সংবাদ

মহারানীর আমলটি ইংলন্ড এর ‘Woman Question’ এর যুগ। নারীদের কি রূপে আমরা দেখতে চাই অথবা চাইনা সে নিয়ে তত্ত্বের ঘনঘটা এবং তৎপ্রসূত সমাজ সংস্কার এবং সমাজ উন্নয়ন প্রচেষ্টা । এই সৎ প্রচেষ্টা উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা করজোড়ে গ্রহণ করি । এই গুরুদায়িত্ব চিন্তায় অনেক বড় বড় মাথা ঘুরে গেছিলো সে আমরা জানি। তবে সমস্ত তত্ত্বই  গৃহস্থ অবলা প্রসঙ্গে। বেশ্যা কল্যাণ প্রকল্পটি  খুব সোচ্চারে জাহির হয়নি। তাতে সমাজপ্রেমী ভদ্রলোকদের কিছু নৈতিক অসুবিধা ছিল। অবশ্য কিছু সদাশয় মানুষ পতিতাদের নিয়ে যে একেবারে ভাবেন নি তা নয়। মানদা দেবীর আত্মচরিতে উদ্ধারাশ্রমের উল্লেখ আছে, সেরকম  কিছু নারী উদ্ধার সঙ্ঘর কর্মকাণ্ড ১৯০০ সালের বছর তিন চার আগেই শুরু হয়েছে। তবে তার অন্দরের আসল কথা টি যে কি ছিল তা সঠিক জানা যায় না। তদ্রুপ আশ্রমের যে বর্ণনা পাওয়া গেল এই বইয়ে তা যে সম্পূর্ণ চিত্র নয় তা আমরা তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম, তবে মানদা যে তাঁর আর দুই সই রাজবালা আর হরিদাসীর অথবা কালিদাসীর সঙ্গে সে স্বর্গ থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলেন সে কথা তিনি বিশদ বলেছেন। পালিয়ে কোথায় গেছিলেন সে কথায় পরে  আসছি ।
কাগজপত্র বলছে ১৮৯২ সালে ব্র্রাহ্ম সমাজের  কিছু মানুষ ‘দাসাশ্রম’ বলে একটি অনাথালয় শুরু করেন। দাসাশ্রম ছিল গরীব মানুষের আশ্রয়, খাওয়া থাকার জায়গা। ঠিকানা ছিল ১৬৭/২/৩ নম্বর কর্নওয়ালিশ স্ট্রীট। ১৮৯১ সালে বসিরহাট মহকুমায় জালালপুর গ্রামের মৃগাঙ্কধর চৌধুরী ও ক্ষীরোদচন্দ্র দাস দাসাশ্রম স্থাপন করেছিলেন এবং পরে এটি কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। এই আশ্রমের  মুখপত্র ‘দাসী’ পত্রিকা কলকাতায় প্রকাশিত হতে থাকে ১৮৯২ সালের জুলাই মাস থেকে । ব্রাহ্ম সমাজের যে মানুষটি এই কাজের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন, তিনি শ্রী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। তিনি কে আমরা জানি তাই অধিক পরিচয় দিয়ে সময় নষ্ট না করাই স্থির করলাম। এই দাসী’ পত্রিকার পাতা ওল্টালে নানা আশ্চর্য  খবর চোখে পড়ে। একটি বলি। আশ্বিন ১২৯৯ সংখ্যায় আছে :

‘আমরা প্রথম সংখ্যা ‘দাসী’তে প্রকাশ করিয়াছি যে আমরা খুলনা হইতে একজন বিপথগামিনী অল্পবয়স্কা রমণীকে ফিরাইয়া সৎপথাবলম্বন করাইবার জন্য চেষ্টা করিতেছি। এই সংবাদ প্রকাশ হওয়াতে দেখা যাইতেছে যে বহু সংখ্যক হতভাগিনী রমণী আমাদের আশ্রয় পাইবার জন্য আমাদের নিকট সংবাদ পাঠাইতেছে।’

এইরকম আটটি রমণীর সংবাদ আছে এই সংখ্যায়। হতভাগিনী রমণীগণ সংবাদ পাঠাইতেছে ঠিকই, কিন্তু এই সকল বিপদ ঘাড়ে নেবে কে? তাই লেখকের আহ্বান:

‘হায় হায়, এই সকল হতভাগিনীদের উত্তপ্ত অশ্রুবিন্দু বঙ্গদেশকে পুড়াইয়া ছারখার করিবে। বঙ্গ মাতার কি কোনও উদারপ্রাণা, প্রেমময়ী কন্যা নাই, যে আপনার প্রেম পক্ষপুটের আচ্ছাদনের নিম্নে রাখিয়া এই হতভাগিনীগণকে পাপের হস্ত হইতে, অপার যন্ত্রণার হস্ত হইতে রক্ষা করেন? কেহ যদি থাক মা এস। অগ্রসর হও।’

উদারপ্রাণা, প্রেমময়ী কন্যা  কেউ এগিয়ে এসেছিলেন কিনা বলতে পারবো না তবে  উদারপ্রাণ, প্রেমময় পুরুষ যে বহু সাতিশয় উৎসাহিত হয়েছিলেন সে এই বইখানিতেই প্রমাণ।

রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের দুঃসাহসটি কিছু বেশি মাত্রায় ছিল, একথা স্বীকার করতেই হবে। অনিচ্ছাকৃত ভাবে যারা বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে তাদের উদ্ধারের জন্য রামানন্দ অনেক আইনের বই পড়াশুনা করে প্রবন্ধ লিখে পাঠক সমাজকে সচেতন করার চেষ্টায় ব্রতী হন– মাঘ ১২৯৯ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘স্ত্রী জাতির দুঃখ বিমোচন’ প্রবন্ধে তিনি লিখছেন:

‘এই কলিকাতা শহরে, বেশ্যাদের নিজের বাড়ী আর কয়টা আছে? সমুদয় বেশ্যাগৃহই কোন না কোন ‘ভদ্র’ বাড়ীওয়ালার সম্পত্তি। কি ঘৃণার কথা। জঘন্য পাপে হতভাগিনীগণ শরীর ও আত্মা কলুষিত করিতেছে। আর তাহাদের পাপার্জিত অর্থে এই ভদ্রলোকেরা স্ত্রী পুত্র কন্যার ভরণপোষণ করিতেছে? আমাদের বোধ হয়, এই কলিকাতা শহরের বেশ্যাগৃহ সকলের একটা তালিকা করিয়া কোন বাড়ীটা কোন্‌ ভদ্রলোকের তাহা স্থির করিতে পারিলে খুব ভাল হয়। তাহা হইলে ঐ সকল নীতিজ্ঞানশূন্য লোকদের নাম সহিত ঐ তালিকাটি সাধারণের গোচরার্থে প্রকাশ করা যাইতে পারে।’

রামানন্দ বাবুর দোষ ধরবো এ স্পর্ধা আমার নেই. তাঁর চরিত্র বা অভিসন্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলবো, তেমন কদর্য রুচিও আমার নয় ; ভাদ্র, ১২৯৯ সংখ্যায় ‘দাসী’ পত্রিকায় তাঁর ‘পতিত পুরুষগণের উদ্ধার’ প্রবন্ধটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:

‘সকল দেশেই দেখা যায় যে ব্যভিচার দোষে দোষী পুরুষগণের সামাজিক দণ্ড অতি লঘু, কিন্তু ব্যভিচারিণী রমণীর দণ্ড অতি কঠোর। পুরুষ রমণী উভয়েই সমাজ অপরাধী হইলেও রমণী কলঙ্কিতা নামে অভিহিতা এবং সমাজ কর্তৃক পরিত্যক্তা হন। তাহাতে ফল এই দাঁড়ায়, যে নারীর একবার অধঃপতন হইয়াছে, তিনি ক্রমেই গভীরতর পাপপঙ্কে নিমগ্ন হইতে থাকেন। অপরদিকে পুরুষ শত অপরাধে অপরাধী হইয়াও ভদ্রলোকের বেশে সমাজে সর্বত্র অবাধে গতিবিধি করিয়া থাকেন এবং সেই সুযোগে, আরও কত রমণীর সর্বনাশ করেন।’

সবই অত্যন্ত খাঁটি কথা । কিন্তু আদর্শ এবং বাস্তবের মধ্যে যে একটি মস্ত ব্যবধান আছে তা তাঁর মতো আদর্শবাদী মানুষরা দেখতে পান না। আমরাও পেতাম কিনা সন্দেহ যদি না একজন শিক্ষিত পতিতা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে না দিতেন। রামানন্দ বাবু যে বাবুদের  বেশ্যাদিগের বাড়ি ভাড়া দেওয়া নিয়ে একটি মরালিস্ট অ্যাঙ্গেল খাড়া করলেন, সেই প্রসঙ্গে বলি, বাড়িওলারা ভাড়া না দিলে  “প্রেম পক্ষপুটের আচ্ছাদনের নিম্নে”  এই সকল অনাথদের আশ্রয় দিতো কে, সেকথা উনি ভেবে দেখেছিলেন কি? উদ্ধার আশ্রমের পরম নিশ্চয়তার  চেয়ে  মানদা দেবী যে  হাড়কাটা গলির খোলার ঘর শ্রেয় মনে করেছিলেন, এই  কথা জানতে পারলে সম্ভবত এইসব উদার হৃদয় সমাজে বান্ধব  যারপরনাই আহত হতেন…

ভাবের ঘরে থাকার নানা সুবিধে । তাতে বাস্তবটিকে নস্যাৎ করে  একটি ভাবগম্ভীর বাতাবরণের মধ্যে নিশ্বাস প্রশ্বাস নেওয়া যায়।

খানিক আগেই বলেছি মানদা পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন। কোথায় এবং কিভাবে,  এইবার সেই আখ্যানটি শুরু করা গেল। গোড়াতেই বলে রাখি, লেখিকার ভাষা খুবই প্রাঞ্জল এবং চাঁচা ছোলা, ফলে কি বলার চেষ্টা করছেন সে বুঝতে অযথা সময় নষ্ট করতে হয় না। পাঠক এইবার এটি পড়ুন:

“একদিন আমি রাজবালা আর কালিদাসী  ও আর একটি মেয়ে  ( তাহার নাম এখন আমার মনে নাই– বোধয় খেঁদি বা এমন কিছু হইবে) এই  চারিজন একখানি ঘোড়া গাড়ি ভাড়া করিয়া টালিগঞ্জে আসিলাম. সেখান হইতে ট্রামে আমরা কর্নওয়ালিস   স্ট্রিট এ  সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা মন্দিরে  উপস্থিত হইলাম. […] আমাদের ব্রাহ্ম মহিলাদের মতো কাপড় পড়া ছিল! পায়ে জুতাও ছিল, আমরা অগ্রসর হইয়া গেলাম।

ব্রাহ্মসমাজে  আসিবার ষড়যন্ত্র  আমরা অনেকদিন হইতেই করিতেছিলাম . রাজবালাই ইহার মূল  কারণ. সে বলিয়াছিল ব্রাহ্ম সমাজ সকলকেই গ্রহণ করে , ব্রাহ্মধর্ম অবলম্বন করিলে  বিবাহ করা সহজ  হইবে, কিন্তু দেখিলাম  সেখানেও বাধা আছে।”

পাঠক কি খাবি খাচ্ছেন? ঘটনার বাকিটুকু শুনুন তাহলে:

“সম্মুখে একজন পক্ককেশশ্মশ্রুবিশিষ্ট দীর্ঘাকৃতি বলিষ্ঠ দেহ বৃদ্ধকে দেখিয়া  রাজবালা আমার কানে কানে বলিল,’এই বুঝি  কৃষ্ণকুমার মিত্র– প্রণাম করো.’.. আমরা চারিজন পাদস্পর্শ করিয়া প্রণাম করিলাম। তিনি স্নেহপূর্ণ স্বরে  আমাদের আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে  আমরা তাঁকে একপাশে ডাকিয়া নিয়া সকল কথা বলিলাম, এবং আমাদের রক্ষার উপায় করিতে অনুরোধ করিলাম.  উদ্ধার  আশ্রমের কর্তৃপক্ষদের দুর্ব্যবহার  ও আমাদের  ব্রাহ্ম ধর্ম  গ্রহণের অভিলাষ তাঁহাকে জানাইলাম।

তিনি বলিলেন, ‘আপনাদের রক্ষার উপায় একাকী আমার দ্বারা সম্ভবপর হয়না । সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিগণকে জিজ্ঞাসা করাও প্রয়োজন । তৎপরে তিনি একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক কে  নিকটে ডাকিলেন. তাঁহার নিকট সমস্ত ঘটনা বলা হইলে  তিনি বিশেষ ঘৃণার সহিত আপত্তি জানাইয়া কহিলেন,  “না, তাহা কিরূপে হয়? ইহাদের পূর্ব জীবন কলুষিত . ব্রাহ্মসমাজে কি পাপ প্রবেশ করিবে?”

পূর্ববর্তী পর্বে  গিরিশ চন্দ্রের স্মৃতিসভায় সুধাকন্ঠী সুশীলাবালার একটি প্রশ্ন দিয়ে শেষ করেছিলাম. আশা করছি  সেইটি কেউ বিস্মরণ হন নি ; পরবর্তী কোনো এক সন্ধিক্ষণে  ‘কলুষিত পূর্ব জীবন’ নিয়া দুই চার কথা বলা জরুরি হয়ে পড়বে  সেটিও আগে থেকেই জানিয়ে রাখা হলো।

‘চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে’ রোগটি নারীজাতির ক্রনিক এইলমেন্ট , সে শিক্ষিতই হোক, বা পতিতাই হোক। ফলে যা হবার তাই হলো :

” আমরা নিরাশ হইয়া চলিয়া আসিলাম. বিদায় লইবার সময়  পুনঃপ্রণাম করিতে গেলে শ্রীযুক্ত কৃষ্ণ কুমার মিত্র মহাশয় আমাদের প্রণাম গ্রহণ করিলেন ; কিন্তু অপর লোকটি ,পরে শুনিয়াছিলাম তাঁহার নাম হেরম্ব বাবু — ‘না–না–‘ করিয়া সরিয়া গেলেন ।”

রামানন্দ বাবুর মতো হেরম্ব চন্দ্র মৈত্রও  এক প্রাতঃস্মরণীয় মানুষ। তাঁর অধিক পরিচয় আর কি দেব।অধিকাংশ বাবুদের বড় কন্টামিনেশন -এর ভয় ।এ কথা আগেও বলেছি, এখনো বলছি। এই ব্যাপারটি  নাটুকে বাবুদের ক্ষেত্রে আমরা আগেই দেখেছি, এইবার দেখলাম সমাজসংস্কারক বাবুদের মধ্যে। এঁরা জ্ঞান ও আদর্শের জগতের লোক।  নারীর সঠিক কর্তব্য কি এবং কোথায়, কিভাবে এঁদের স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করা যায় এই নিয়ে নীতি গর্ভ বক্তৃতা দিতে পারেন, কিন্তু পতিতার ছোঁয়ায় বড়োই মর্মাহত হন এবং সেই  ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেই ‘না–না..’ বলে আর্তনাদ করতে থাকেন। তবে দুই একটি নিকষ সোনার কথাও উদ্ধ্বার হলো  শিক্ষিত পতিতার আত্মচরিত থেকে । তাঁদের একজন পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী। মানদা আমাদের একটি কাহিনী শোনান এই ছুঁৎ মার্গ প্রসঙ্গে। কাহিনীর নায়িকা বেশ্যাটি ছুতোরের মেয়ে, সাত বছুরে বিধবা।  বিদ্যাসাগর এবং শিবনাথ শাস্ত্রী তার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে ব্যাপার কোনও কারণে ঘটে ওঠেনি;  মেয়েটি শিবনাথ শাস্ত্রীর পূর্বপরিচিত এবং শিবনাথ শাস্ত্রীকে সে বালবিধবা ছোটবেলায় ‘দাদা’ ডাকতো।  অবশেষে  নানা  কার্যকারণে সে মেয়ে যখন খাতায় নাম লেখায়, শাস্ত্রী মশাই স্বয়ং যান তার বাড়ি তাকে সৎ পথে ফেরাতে…  সে হতভাগী ফিরতে পারেনি বটে কিন্তু ঘরে  শিবনাথ শাস্ত্রীর একটি ছবি বাঁধিয়ে রেখেছিলো। প্রতিদিন সে ছবিকে  সে ফুল  দিয়ে সাজাতো । মরবার সময় এলে আর এক কচি বেশ্যাকে ছবিখানা দিয়ে সে বলে যায় সে যতদিন বাঁচে ততদিন যেন ছবিখানি সে অমনি ফুল  দিয়ে সাজায়। মানদা এই গল্পটি শোনে সেই অল্পবয়েসী বেশ্যটির নিজের বয়ানে, তার  প্রৌঢ় কালে। এ কাহিনী থেকে এও জানলাম যে ঢাকার এক পতিতার কন্যা লক্ষীমণিকে উদ্ধার  করে এই অদভূত মানুষটি এক ব্রাহ্ম যুবকের সঙ্গে বিবাহ দিয়েছিলেন।  মানদার বৃত্তান্তে এইরকম দুই একটি  কন্টামিনেশন প্রুফ বাবুর দেখা পেলাম, কিন্তু তাঁরা লাখে এক। তাঁদের প্রণাম করি।

৩ বাবু বিচার

ফিরি মানদা ইতিবৃত্তে ।

সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের জুতোর ঠোকর খেয়ে তিনি নিজের পাকাপাকি বন্দোবস্ত করলেন । দেখলাম এই পর্যায় থেকে পোশাকি বাঙলা ছেড়ে তিনি  এক পরিভাষা ব্যবহার ঘোষণা করলেন এবং পাঠক কে তার জন্যে প্রস্তুত ও করলেন। বিদ্বানরা বলতে পারেন এ হলো এক ধরণের ভাষাগত সাবল্টার্ন বদমাইশি , ভদ্রজনের ভাষা কে ইতর করে তোলার এক ষড়যন্ত্র। সে হতে পারে। আমরা তার প্রতিবাদ করবো না।  কারণ কুসঙ্গে যে অধঃপতন হয় তা তিনি আগেই স্বীকার করে নিয়েছেন. গোড়াতেই বলেছি তিনি এক চাঁচা ছোলা ‘মেয়েমানুষ’ । সংজ্ঞা এবং উদাহরণ সহ তাঁর সামাজিক এবং মানসিক অবস্থানটি তিনি পাঠকদের পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন :

“লম্পট প্রণয়ীকে পতিতা সমাজে ‘বাবু’ বলা হয় । এখন হইতে এই শব্দটি আমি মাঝে মাঝে ব্যবহার করিব। এই ‘বাবু’ লইয়া খুব গোলযোগ হইতো । কোনো পতিতার প্রণয়ী অন্য নারীরই ঘরে প্রবেশ করিলে  তাহা লইয়া তুমুল ঝগড়া বিবাদ  বাধিয়া উঠিত ।  সকলেই তাহাতে যোগ দিতো  । আমি বাদ যাইতাম না। আর যতরকমের  অশ্লীল অশ্রাব্য কথা, শুনিতে শুনিতে  আমার  সহিয়া গিয়েছিলো। বুঝিলাম  স্কুলের  পড়া হইতে যে অল্পবিদ্যা পাইয়াছি  তাহা আমার অহংকার বাড়াইয়া সর্বনাশ করিয়াছে , কিন্তু আমাকে  পাপের আক্রমণ হইতে বাঁচাইতে পারে নাই।”

মান্নাদা প্রবাসীভারতী  নিয়মিত পড়তেন। শিবনাথ শাস্ত্রীর  কথা যখন প্রথম শোনেন  তখন তাঁর লেখা ‘নিমাই সন্ন্যাস’ কবিতাটি  মনে পড়েছিল:

আজ শচীমাতা কেনো চমকিলে,
ঘুমাতে ঘুমাতে উঠিয়া বসিলে?
লুন্ঠিত অঞ্চলে ‘নিমু’ ‘নিমু’ বলে
দ্বার খুলে মাতা কেনো বাহিরিলে?

অশ্রাব্য ভাষায় সাবলীল, যৌন প্রসঙ্গে মুখে কিছু বাধে না  আবার  ‘প্রবাসী’ ও ‘ভারতী’ পড়েন, কবিতা মনে রাখতে পারেন, এ কেমন পতিতা?  পাঠক, আমি বলবো, এই কলঙ্কিনী আমাদের ওপেন টি বায়োস্কোপ নানটেইন টেলিস্কোপ। ইনি আমাদের অন্য ইতিহাসের পাতা।

পরবর্তী পরিচ্ছেদ এ বিষয়ে আরো কিছু বলার আশা রাখলাম।

এখন শুধু এইটুকু বলি, প্রথম সংস্করণটি প্রকাশের পর, কিছু  সাহিত্য সমালোচক বাবু সাব্যস্ত করেছিলেন এ লেখা কোনো মহিলার লেখা হতে পারে না। তার জবাবে লেখিকা বলেছিলেন: ‘পতিতগণ যদি  বই লিখিতে বা পত্রিকা সম্পাদনা করিতে পারেন , তবে পতিতাগণ পারিবে না কেন?’

(ক্রমশঃ)

আলোচ্য বই: শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত ( Memoirs of Manada Devi)
প্রথম প্রকাশ: ১৯২৯

 

Featured Image: Courtesy Google

Posted in Uncategorized | Leave a comment

গড়গড়ার মা’লো নবম পরিচ্ছেদ : অথ গোলাপ বিনোদ কথা।

GARGARA BABU BIBI

গোলাপ বনাম সুকুমারী

“রঙ্গভূমি ভালবাসি
হৃদে সাধ রাশি রাশি
আশার নেশায় করি
জীবন যাপন।।”

–গিরীশ চন্দ্র ঘোষ।

 

 

সুকুমারী  দত্তর  অপূর্ব সতী  কোনো কালজয়ী নাটক নয়। হরমণি নাম্নী এক বেশ্যা  তার লেখা পড়া জানা মেয়ের জন্যে জাল ফেললে. তাতে ধরা পড়লো চন্দ্রকেতু ঘোষ নামক  এক জমিদার তনয়.  হরমনির মেয়ে নলিনী যখন সেই  কচি বাবুটির প্রেমে ভীষণ পড়লে, তখন হরমনি  লোভে পড়ে তাকে তরুবাবু নামক এক মক্কেলের কাছেই বেঁচে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং কৃতকার্য হয়না . নলিনী চন্দ্রকেতুর সঙ্গে কাশীধাম যায় এবং গন্ধে গন্ধে চন্দ্রকেতুর পিতৃদেনবা তথাত পৌঁছিয়ে ছিল কে বোলো পূর্বক কলকাতা আনয়ন করেন. নলিনী আত্মঘাতী হয়..ইত্যাদি.  পাঠক, এই নাটকটি দেখছি একটি বিশেষ কারণে. যদি বলি কুসুমকুমারী এই নাটকে তাঁর নিজের সত্ত্বা কে দুই টুকরো করে মা মেয়ের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন, তাহলে কি আপনারা বিভ্রান্ত হবেন? সূত্র হলো সেই হাড়ি চাঁচা আর সেতার বাদন। নলিনী যে ভাষায় কথা বলে সে হলো নাটকের ভাষা,  তাতে শব্দের ঝংকার  আছে , আবেগের ঘনঘটা  আছে, যা নেই তা হলো বাস্তবের ছোঁয়া। শুনলে মনে হয় যেন একটি নাটুকে মেয়েমানুষ ঘুরে ঘুরে রাধা সতীর অভিনয় করছে।  হরমণি  যে ভাষায় কথা কয়, সে হলো কথ্য ভাষা; সে ভাষায় পালিশ কিছু নেই, কিন্তু সে ভাষা যে অভিজ্ঞতার ভাষা তা বোঝাটা শক্ত  কিছু না ।

পাঠক,  মা মেয়ের এই কথোপকথন টি শুনুন:
নলিনী: তুমি আমার সতীত্ব নাশের জন্য নানাপ্রকার চেষ্টা কচ্ছ. তুমি তোমার নিজের সতীত্ব নষ্ট করেছো বলে কি আমাকেও সেই পথগামিনী করতে চাও?

হর : আ মর বেটি ! বেটি আমার কি সতীরে !– সতীপনা দেখছেন– আরে বেটি ! সতীত্ব নিয়ে করবি কি? –সতীত্ব নিয়ে কি ধুয়ে খাবি? –না সতীত্বে পেট ভরবে? সেই জোগাড় কর, তারপর তখন আর চেষ্টা দেখিস। বেটির অরগণ নেই ছাড়গুন আছে।
আরও একটি মজার ব্যাপার দেখলাম. ভাষা যে দুই জিভে কথা কইছে সে সুকুমারী দত্ত ভালোই জানেন, কারণ, হরমণি শুধু যে মেয়ের সতীপনাকে গাল পাড়ছে তা নয়. মেয়ের নাটুকে ভাষাকেও  ভ্যাঙ্গাচ্ছে:

মেয়ে মায়ের কাছে  চন্দ্রকেতুর প্রতি তার প্রেমের গভীরতা নিয়ে কাব্যপ্রবণ আক্ষেপ আর হরমণির প্রতিক্রিয়া:
নলিনী: সেইদিন তাঁকে প্রাণনাথ বলে হৃদয়রাজ্যের রাজা করেছি — সেই অবধি তাঁর অধিনী বলে তাঁর চরণ সেবা করেছি । মা! আর অধিক কি বলবো, সেই অবধি তাঁকে হর্তা কর্তা বিধাতা , আশ্রয় অবলম্বন বলে তাঁরই আশ্রিত হয়েছি।

হর: আহা ! বেটি আমার ভিক্ষা চেয়ে প্রাণটা শীতল কল্লে রে!  বেটি আমার কবিতা আওড়াতে লাগলেন (বিকৃত স্বরে) হত্তা কত্তা বিধাতা করেছি –কটাক্ষপাত করেছি — মুণ্ডুপাত করেছি, বেটি আমার রাজরাজেশ্বরী হয়েছেন।  (চতুর্থ অঙ্ক, প্রথম গর্ভাঙ্ক)
Verisimilitude, authenticity ইত্যাদি বড় বড় তত্ত্ব আমরা ব্যবহার করতে চাইনে, তবে হরমণির মধ্যে গোলাপের গল্প আর তার মাহেশের জীবনটি যেন কেউ তুলে বসিয়ে দিলো নাটকের পাতায় । আর নলিনীর প্রেমাবেগে একটি রং চং মাখা কথা বলা পুতুল বৈ আর কিছু পাওয়া গেল না।  যে চরিত্র কলের পুতুলের মতো সাজানো গোজানো ভাষায় কথা বলে, সে থেটারে বসে একপ্রকার সহ্য করা যায়, কিন্তু জীবনে সে মানানসই হয়না। ঐটি ই হলো  “জীবন ত্যাজিয়া ঝাঁপিয়ে জীবনে”র মূল ধরতাই । যে জীবন ঘেন্নার, সে জীবন ত্যাগ করলাম , কিন্তু যে সাজানো গোজানো জীবনে ঢোকার লোভ হলো, তাতে ঠিক প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলো না, সে রং চং-এ মাটির কাঠামো হয়ে রইলো এবং ভেঙেও গেল।  নলিনী সুকুমারী কিনা বলতে পারবো না, কিন্তু নলিনীর ভাব ভঙ্গি , কথার ধরণে কোথায় যেন এক aspiring মিসেস সুকুমারী দত্তকে দেখতে পেলাম। নাটকের কভার পৃষ্ঠায় যে ট্রাজেডি কথাটি তিন তিনবার লেখা হয়েছে , তার আসল ব্যঞ্জনা নাটক ছাপিয়ে সংলাপ ছাপিয়ে, এক বেশ্যার ‘ভদ্রমহিলা’ হয়ে ওঠার মর্মান্তিক চেষ্টার রূপক বর্ণনা  অর্থাৎ কিনা allegory হয়ে পড়েছে বলে বোধ হলো। সে ঠিক না ভুল তা পাঠকরা বিচার করবেন।

 

 

বিনোদিনী উবাচ…

 

Binodini

 

যাহারা বিনোদিনীর ন্যায় অভাগিনী , কুৎসিত পন্থা ভিন্ন  যাহাদের জীবনোপায় নাই, মধুর বাক্যে  যাহাদিগকে  ব্যাভিচারীরা প্রলোভিত করিতেছে , তাহারাও মনে মনে আশান্বিত হইবে যে, যদি বিনোদিনীর মতো কায়মনে রঙ্গালয়কে আশ্রয় করি, তাহা হইলে এই ঘৃণিত জন্ম  জনসমাজের কার্যে অতিবাহিত করিতে পারিবযাহারা অভিনেত্রী তাহারা বুঝিবে কিরূপ মনোনিবেশের সহিত  নিজ ভূমিকার প্রতি যত্ন করিলে জনসমাজে প্রশংসা ভাজন হইতে পারে
শ্রী গিরিশচন্দ্র ঘোষ

 

বিনোদিনী দাসী, যাঁরে তাবৎ বাঙালি  ‘নটি বিনোদিনী’ বলে থাকেন, আমার কথা  আর আমার অভিনেত্রী জীবনের  দৌলতে তিনি বাংলা  সাহিত্যে একেবারে জাজ্বল্য হয়ে আছেন।যদি খুব ভুল না করি, তাহলে ইনিই   এখনো পর্যন্ত একমাত্র মন্দ স্ত্রীলোক যাঁর জীবনী ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে।  এই যে ইনি বাঙালির সংস্কৃতিতে ফাইভ ষ্টার  পেলেন, সে যে  রামকৃষ্ণ পরমহংসের দৌলতে সে  বোঝা কঠিন নয়। মহাপুরুষের আশীর্বাদ ধন্যা হলে বেশ্যা জাতে  না উঠে  যায় কোথায়।  আমাদের বাসি খবরে প্রয়োজন নেই। কথার মধ্যেও যেমন কথা থাকে, সে রূপক ই হোক বা আভাস ই হোক, তা আমরা খুব জানি। তাই মন দিয়ে লেখাটি পড়ি। ভারী সুন্দর করে তিনি তাঁর রামকৃষ্ণ দর্শনের কথা বললেন:

“যখন তিনি অসুস্থ হইয়া শ্যামপুকুরের  বাটিতে বাস বাস করিতেছিলেন, আমি শ্রীচরণ দর্শন করিতে যাই  তখন সেই রোগক্লান্ত প্রসন্নবদনে  আমায় বললেন : “আয় মা বোস”, আহা কি স্নেহপূর্ণ ভাব ! এ নরকের কীটকে যেন ক্ষমার জন্য সতত আগুয়ান! কতদিন তাঁহার প্রধান শিষ্য নরেন্দ্রনাথের (পরে যিনি বিবেকানন্দ স্বামী বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন) ” সত্যম শিবম” মঙ্গলগীতি  মধুর কণ্ঠে থিয়েটার এ বসিয়া শ্রবণ করিয়াছি . আমার থিয়েটার কার্যকরী দেহকে এই  জন্য ধন্য মনে করিয়াছি।”

কিন্তু ওই অংশে আর একটি কথা উঁকি দিচ্ছে . আমি সেটির প’রেই মনোস্থাপন করলাম। তিনি বলছেন, “নরেন্দ্রনাথের সত্যম শিবম” মঙ্গলগীতি  মধুর কণ্ঠে থিয়েটার এ বসিয়া শ্রবণ করিয়াছি “। এইখানে একটু খটকা লাগলো.. নরেন দত্তর গান থেটারে,  এ কিরকম! তারপর ঝটকা লাগলো. ওই গান টি তাঁর মনের ভেতর রয়ে গেছিলো, সেই গান তিনি মনে মনে শুনতেন . পাঠক, এইবার গিরিশবাবু আর বিনোদিনীর কথা গুলো আবার বিবেচনা করুন:  “কুৎসিত পন্থা” “ ঘৃণিত জন্ম” আর  “থিয়েটার কার্যকরী দেহ” । এই হ’লো নাটুকে বেশ্যার ত্রহ স্পর্শ। এই স্পর্শ দোষ থেকে বাঁচার  মন্ত্র হলো ওই সত্যম শিবম জপমন্ত্র। ওই একরকম বেঁচে থাকার উপায় । পাঠক, বেশ্যার মন আর দেহ কি আলাদা?  নিশ্চই তাই।  থিয়েটার কার্যকরী দেহ রইলো বাবুদের আর দর্শকের জিম্মা; মন শুনে গেল সত্যম শিবম।  সেই  মন্ত্র ধরে রাখার উপায়টি বাতলে দিলেন গিরিশ বাবু :

“আমার অন্য কথা ভালো লাগিত না । গিরিশ বাবু মহাশয়  যে সকল বিলাতের বড় বড়  অভিনেতা বা অভিনেত্রীর  গল্প করিতেন, যে সকল বই  পড়িয়া শুনাইতেন , আমার তাহাই ভালো লাগিত.  মিসেস সিডনিস  যখন থিয়েটারের কার্য  ত্যাগ করিয়া . দশ বৎসর বিবাহিতা অবস্থায়  অতিবাহিত করিবার পর  পুনরায় যখন  রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হন,  তখন তাঁহার  অভিনয়ে কোন সমালোচক  কোন স্থানে  কিরূপ দোষ ধরিয়াছিল, কোন অংশে তাঁহার উৎকর্ষ বা  ত্রুটি  ইত্যাদি  পুস্তক হইতে পড়িয়া বুঝাইয়া দিতেন. […] বঙ্কিমবাবুর “দুর্গেশনন্দিনী”  কোন পুস্তকের ছায়াবলম্বনে লিখিত, “রজনী” কোন পুস্তকের  ভাব সংগ্রহে রচিত , এইরকম কত বলিব  গিরিশ বাবু মহাশয়ের ও অন্যান্য  স্নেহশীল বন্ধুগণের  যত্নে  ইংরাজি, গ্রীক, ফ্রেঞ্চ, জার্মানি  প্রভৃতি  বড় বড় অথরের কত গল্প যে আমি শুনিয়াছি  তাহা বলিতে পারিনা. শুধু শুনিতাম না , তাহা হইতে ভাব সংগ্রহ করিয়া  সতত সেই সকল চিন্তা করিতাম।”

এই গিরিশ বাবু মহাশয়ের কারণেই বিনোদিনীর মুখের ভাষা নাটুকে পালা হয়ে পড়লো না । সেই সদাশয় ব্যক্তি বিনোদিনীর কার্যকরী দেহের থেকে মনটিকে টেনে বার করে নিলেন; ধুলো ঝাড়লেন, ঘষলেন,মাজলেন, তারপর  সেই মন  যখন  কথা কইলো, তখন সে থিয়েটার কার্যকরী দেহর ছায়া চকিতের ন্যায়ও ভাষায় ছাপ ফেললো না।

মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েন  বড় বিচিত্র। বিনোদিনী বলছেন:

“গিরিশবাবুর সঙ্গে  আমার  জোর জবরদস্তি  মান অভিমান রাগ  প্রায়ই চলতো। তিনি আমায় অত্যধিক আদর দিতেন , প্রশ্রয় দিতেন। আমি তাই বড্ডো  বেড়ে উঠেছিলুম , মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে অন্যায় ব্যবহার করতুম , কিন্তু তার জন্য তিনি আমায় একটি দিনের জন্য ও তিরস্কার করেন নি, অনাদর অযত্ন তো করেনি নি . তবে আমি একটি দিনের জন্য এমন কোনো কাজ করিনি, জাতে তাঁর এতটুকু ক্ষতি হয়।”

বেড়ে ওঠার কারণ একটুখানি ছিল বৈকি। যে সময়ের কথা তিনি বলছেন তখন  গিরিশবাবুর হাতে গড়া এই বেশ্যাটি  Prima Dona of Bengali Theatre ; Flower of Native Theatre. বাঙালি বাবুরা কোন ছার, সায়েবরাও তখন তাঁর কদর করছেন। বিনোদিনী  মনে কি ভেবেছিলেন কে জানে । নাটুকে মেয়েছেলে  যে আসলে নাটুকে বাবুদের সম্পত্তি, হাতের পুতুল, তা বুঝতে খানিক সময় লেগেছিলো তাঁর। যে কথাটি তিনি তেমনভাবে পষ্টাপষ্টি বলে উঠতে পারলেন না তা হলো তাঁর বিনিময়ে গিরিশবাবুর ষ্টার থিয়েটার লাভ।  আমার কথায়  শুধু লেখা হলো:

“নানা কারণের  প্রধান কারণ যে আমায় অনেক রূপে প্রলোভিত করিয়া কার্য উদ্ধার করিয়া লইয়া  আমার সহিত যে সকল ছলনা করিয়াছিলেন তাহা আমার হৃদয়ে বড় লাগিয়াছিল. থিয়েটার বড় ভালোবাসিতাম তাই কার্য করিতাম । কিন্তু ছলনার আঘাত ভুলিতে পারি নাই। তাই অবসর বুঝিয়া অবসর লইলাম।”

১৮৮৭ র  পয়লা জানুয়ারী তাঁর জীবনের শেষ অভিনয়। সেই ষ্টার থিয়েটারেই । নল দময়ন্তী-র  দময়ন্তী, বেল্লিক বাজারএর রঙ্গিনী। দুটিই গিরীশ বাবুর লেখা।একই রাতে একটি  চরিত্রে  সতীর সতী , তস্য সতী, যারে কয়, sublime character; দময়ন্তী নলকে বলছেন:

প্রভু,  কি দিয়ে করিব  দেব-পূজা?
দেহ, প্রাণ,– কিছু আর নহে মোর ;
দেব গণে সাক্ষী করি’ কহি_-
সকলই হে দিয়েছি তোমায় ,
জানি, নাথ, তুমি  হে আমার
দানে তবে নাহি অধিকার ।
ধর্ম পত্নী আমি তব;
দেহ মোরে পতি-পূজা উপদেশ;
কহ, নাথ, স্বয়ম্বরে দিবে দেখা?

পরবর্তীটিতে এক মেথরানী, যে অশ্লীল নাচ গানে স্টেজ মাতায়। রঙ্গিনী গাইছে:

মায় বাপ জিসিকে রোয়ে,
জরু ছোড়ে কে কসবি ঘরমে শোয়ে,
হাম ওস্কে দেওয়ে; গঙ্গা কিরা ময় সাচি কহি ॥
যো না মানে দেওতা ভি না মানে পীর,
বে পয়জারসে যিসিকে না নোয়ে শির,
সরাব মে রহে যো মস্তাগীর,— যো
ছোড়া হ্যায় জাত,
ডেম (damn) ডেম বলে ছোড়হে লাথ,
উসিকে দেনে ময় খাড়া রহি ॥

Binodini RAY0001
দময়ন্তীর ভোল পাল্টে  রঙ্গিনীর নাচটি নাচতে নাচতে  ফ্লাওয়ার অফ নেটিভ থিয়েটার কি ভাবছিলেন কে জানে। এ নাটকও গিরিশ বাবুর লেখা কিনা। এবং প্রহসন। আগের কিস্তিতে গোলাপের প্রসঙ্গে বলেছিলাম কোথায় জীবনের শুরু কোথায় নাটকের শেষ কে জানে… এখনো সেই  একই কথা বললাম। নল দময়ন্তীতে বিনোদিনী দময়ন্তী, নল নাট্যকার গিরিশ বাবু স্বয়ং। তার আগে ১৮৮৩ সালেও এই ষ্টার থিয়েটারেই গিরিশ বাবুর সঙ্গে তাঁরই লেখা দক্ষ যজ্ঞ । সে নাটকেও বিনোদিনী সতী, গিরিশবাবু মহাদেব। সেটিই স্টার থিয়েটরে তাঁর প্রথম অভিনয়।

বিনোদিনীর জীবনে  গুর্মুখ রায় কে বাদ দিয়েও, পাঁচ পাঁচটি বাবু। রাধারমণ বাবু, ছোটবাবু , গিরিশ বাবু। গিরিশ বাবু ঈশ্বর। তিনি কাদার তাল আর পাঁকের ময়লা তুলে  প্রতিমা তৈয়ের করলেন। তারপর সে প্রতিমা সোনার দরে বেচলেন। আর এক বাবু রীতিমতো তলোয়ার নাচানো ‘সম্ভ্রান্ত যুবক বাবু’। তিনি নিজে বিয়ে শাদি করে থিতু হয়ে , বিনোদিনীর নতুন বাবুর খবর পেয়ে তলোয়ার বাগিয়ে তাঁর একদা বাঁধা মেয়েমানুষকে কাটতে গেলেন। আর একজন ‘রাঙা’ বাবু’ তাঁকে ছায়া দিলেন ১৮৮৭ থেকে  ১৯১২ পর্যন্ত। একটি মেয়েও হয়েছিল তাঁদের। মেয়েটির নাম ছিল শকুন্তলা । ১৯০২ এ সে মারা যায়। ১৯১২ তে মারা যান দুই বাবু  : গিরিশ বাবু আর ‘রাঙা’ বাবু। তলোয়ার বাবুটি আগেই গিয়েছিলেন।  বিনোদিনী সম্পর্কে পড়তে গিয়ে দেখলাম এই  ‘রাঙা’বাবুটিকে   কেউ বলেছেন ‘স্বামী’ , কেউ বলেছেন ‘বেনেফ্যাক্টর’। ‘স্বামী’ কথাটি কিন্তু বিনোদিনী একবারও উচ্চারণ করলেন না, কারণ মিথ্যা বলা তাঁর ধাতে ছিল না । গিরিশ বাবুর লেখা  ভূমিকা তিনি প্রথম সংস্করণে ছাপান নি কারণ,”তাহাতে অনেক সত্য ঘটনার উল্লেখ ছিল না”।  সুতরাং তাঁর একটি ‘প্রাণের দেবতা’ (রাঙা বাবু)  থাকলেও, তাঁর ‘মাথা মুণ্ড” জীবনীতে তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন যে তিনি বেশ্যাই ছিলেন, এবং বেশ্যার ব্যবহারই পেয়ে গেছেন, যতই সতী আর দময়ন্তী সাজুন না কেন,:

পতিপ্রেম সাধ আমাদের আছে, কিন্তু কোথায় পাইব? কে আমাদের হৃদয়ের পরিবর্তে হৃদয় দান করিবে? লালসায় আসিয়া প্রেমকথা কহিয়া মনোমুগ্ধ করিবার অভাব নাই , কিন্তু কে হৃদয় দিয়া পরীক্ষা করিতে চান যে আমাদের হৃদয় আছে ? আমরা প্রথমে প্রতারণা করিয়াছি , কি প্রতারিত হইয়া  প্রতারণা শিখিয়াছি , কেহ কি অনুসন্ধান করিয়াছেন? […] অনেক প্রদেশে জল জমিয়ে পাষাণ হয়. আমাদের তাহাই […] যাহা হউক, এখন ও কথা থাকুক।

গৌরবে বহুবচনের এমন সার্থক প্রয়োগ খুব কম দেখেছি।
  

১৯১২-র ৯ই ফেব্রুয়ারি গিরিশচন্দ্রের প্রয়াণ । কলকাতার টাউন হলে সর্বশ্রী সারদাচরণ মিত্র, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি প্রমুখ বিশিষ্টজনেরা বর্ধমানের রাজা বিজয়চাঁদ মহতাবের সভাপতিত্বে যে বিরাট শোকসভার ডাক দিলেন সেখানে নাট্যাচার্যের প্রতি সম্মান আর শুদ্ধতার অজুহাতে অভিনেত্রীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো ( একথা আগেও বলেছি)। প্রতিবাদে স্টার থিয়েটারের “সুধাকন্ঠী” সুশীলাবালার (১৮৮৪-১৯১৫) নেতৃত্বে অভিনেত্রীরা গিরিশচন্দ্রের উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যে শোক প্রকাশের অধিকার দাবি করেছিলেন। দাবি মঞ্জুর হয়নি।  শেষ পর্যন্ত ১৮ই সেপ্টেম্বর অভিনেত্রীদের তরফে একটি শোকসভা হয় স্টার রঙ্গমঞ্চে। সুশীলাবালার জিজ্ঞাস্য ছিল— ‘নারীকে বেশ্যা বানায় যাঁরা তাঁরা বেশ্যাকে ঘৃণা করে কোন মুখে?’ শোকসভায় সুশীলাবালা বলেছিলেন, ‘… পতিতা আমরা, সমাজ বর্জিতা বটে — কিন্তু আমরা মানুষ। … প্রিয়জন বিরহে যদি ক্রন্দনের অধিকার থাকে, … বুকফাটা হাহাকারে যদি দোষ না থাকে তবে আমাদের শোক দূষণীয় হইবে কেন?’

এই প্রশ্নটির সদুত্তর কোনও Reformist অবলাবান্ধব দিতে পারেন নি বলেই জানি। নাট্য ইতিহাসের রেজিস্টারি তাই বলে।

 

পরিশিষ্ট

বিনোদিনীর পর ‘নাট্যসম্রাজ্ঞী’ তারাসুন্দরী, ‘নটকুলমনি’ কুসুমকুমারী , ‘সুধাকন্ঠী’ সুশীলাবালা , ‘সংগীতনিপুণা’ নরীসুন্দরী, সারদামণির স্নেহ ধন্যা নীরদা সুন্দরী… এমন আরও কত পাপিষ্ঠার কথা  অ-বলা  রয়ে গেল। তাঁদের  সম্ভবত কোনো গিরিশ বাবু জোটে নি…তাঁরা তাই চকিতের ন্যায় মিলিয়ে গেলেন…  কত গুলো পোকায় কাটা আবছা ছবি শুধু রয়ে গেল, আর কোনো কোনো সুভাগিনীর ক্ষেত্রে, গুটি কতক নেহাতই কাঁচা, অপটু কবিতা।

গবেষকরা সে সকল আবেগমথিত কবিতা পড়িয়া এবং ছবি দেখিয়া যৎপরোনাস্তি উল্লসিত হইলেন এবং archival material বিবেচনা করিয়া তাহা লইয়া সংকলন বাহির করার প্রয়াস পাইলেন। অধম আমরা সেই জ্ঞানবৃক্ষের ফল লইয়া কোলাহল করিতে থাকিলাম।

 

Featured Image: Kalighat Pat Babu Bibi Google
বিনোদিনী :  https://alchetron.com/Binodini-Dasi-1207453-W

Posted in বাংলা, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, Uncategorized | Tagged | 1 Comment

গড়গড়ার মা’লো অষ্টম পরিচ্ছেদ: নাটুকে স্ত্রীলোক

GARGARA ABHINETRI

১৮৭৩ থেকে শুরু হ’লো আমোদের ছড়াছড়ি । বাবু গিরীশ চন্দ্র ঘোষ ‘ নোটো গিরীশ’ হতে প্রমোশন পেলেন। ‘মেঘনাদ বধে’  তাঁর অভিনয় দেখে ‘সাধারণী’র সম্পাদক শ্রীযুত অক্ষয় চন্দ্র সরকার তাঁকে ‘Garrick of Bengal’ শিরোপা দিলেন ।  সতীর true definition নিয়ে তিন তিনটে নাটক লেখা হলো আর ওরই মাঝে দু’ দশটি বেশ্যা জাতে উঠলেন। শেষ কথাটি আগের কিস্তিতে বলা হয়েছে। এই কিস্তি হলো প্রসঙ্গ উল্লেখ পূর্বক ব্যাখ্যা। সে আমরা খুব পারি। ঐ করেই চুল পাকলো কলম ক্ষয়ে গেলো ।

বেশ্যাকে জাতে উঠতে হলে কি করতে হয় ? না, নাচতে হয়, গাইতে হয়, সর্বোপরি ভদ্রলোকের ভাষায় কথা কইতে হয়। যাঁরা সেসব পারলেন তাঁরা নোটো বাবুদের নেক নজরে পড়ে তরে গেলেন। যাঁরা সরস্বতীর আশির্বাদ পেলেন না তাঁরা শুধু বাবুদের সঙ্গ করে মরলেন। ‘সধবার একাদশী’ র এক মা লক্ষ্মীর মুখের বুলি আগে বর্ণনা করেছি। সেই নাটকেরই বেশ্যার নাম কাঞ্চন। পাঠক, তাঁর মনোবেদনাটি পড়ে দেখুন:

কাঞ্চন: অটলবাবু আমার ওপর বড় নির্দয় . উনি সাতদিন ভাঁড়য়ে একদিন যান . উনি কত বড় মানুষ, আমরা গরিব, আমাদের বাড়িতে উনি গেলে ওনার মানের খর্ব হয়- আমরা নাচতে জানিনে, গাইতে জানিনে , কথা কইতে জানিনে , কিসে ওর মনোরঞ্জন করবো?

অটল:  আমি তো কাল গিচলেম।

কাঞ্চন: চকিতের ন্যায় ।

নিম:  শালী আমার সঙ্গে কথা কইলে যেন হাঁড়ি চাঁচা  ডাকতে লাগলো , এখন কথা কচ্ছে যেন সেতার বাজছে।
(প্রথম অঙ্ক প্রথম গর্ভাঙ্ক)

কাঞ্চনের অভিমানের  ফাঁক দিয়ে ” চকিতের ন্যায়” মনোরঞ্জনের যে বাসনা দেখা গেল, তা নাটুকে বুলি, সে ভাষা কাঞ্চনের নয়, কোনও মাতাল বাবুর কপচানো এস্টেজের  কথা তোতা পাখির মতো আউড়ে যাওয়া । এই সময়ে শহরের রাস্তায়, থিয়েটারে , বেশ্যার বাড়িতে মাতাল বাবুদের অভাব নেই। তাঁরা বোতল খালি করে শেক্সপীয়ার, মিল্টন, মধুসূদন, বিদ্যাসুন্দর একই দক্ষতায় কপচান এবং বেশ্যা পল্লীতে বা গঙ্গার ধারে বেশ্যা প্রতি ধাবিত হন । এ সব চরিত্র  সে সময়কার নাটকে বহু পাবেন, দুই একজনের কথা যেন মনে হচ্ছে আগে খানিক  বলেছি। ‘সধবার একাদশী’ র নিমচাঁদ ই হলো সেই গ্যালেরির এক যোগ্য উদাহরণ। তা এই মাতালবাবু যা বললেন তাও অনুধাবনযোগ্য। যিনি শুধু ‘সঙ্গ’ করার বাবু, তাঁর সঙ্গে কথা কওয়ার কালে বেশ্যার ভাষার রাখঢাক নেই ; সেখানে তার আসল  গলা, বুলি  বেরোয়, কিন্তু যে বাবু তাকে প্রমোশন  এর স্বপ্ন দেখান willy nilly, তাঁর সঙ্গে কথা কওয়ার সময় বেশ্যার গলায় সেতার বাজে , সে যে কত চেষ্টায় রপ্ত তা বিলক্ষণ বোঝা যায় যখন রাগের মাথায় “চকিতের ন্যায়” তার আসল ভাব ও ভাষা বেরিয়ে পড়ে : “অটল তুই কি পাগল হোলি নাকি! আমি তো আর তোর ঘরের মাগ নই যে বাগানে গিইচি বলে তোর মুখ হেঁট হবে।”

ফলকথা হ’লো এই যে নাচতে গাইতে এবং সর্বোপরি কথা কইতে জানলে ভদ্র বাবুদের পাশে চকিতের  ন্যায় হলেও বসা যায়  এইটেই হলো সার সত্য। এই স্বপ্ন খোলার ঘরে বসে কত বেশ্যা দেখেছিলো কে জানে! পাঠক জিগেস করতে পারেন, ঘন্টা দুইয়ের জন্যে পাশে বসলো, দুচার কথা কইলো, তাতে কোন মহাভারত  অশুদ্ধ হলো ? নাট্যশালার খোলামেলায় এই সকল মন্দ স্ত্রীলোক সরল সচ্চরিত্র ভদ্রসন্তানদের কতটাই বা বিপদ ঘটাতে পারেন?

এইবার আবার বাবু মনমোহন বসুর কথায় ফিরি কারণ এই বিষয়টি তিনি বিশদ বুঝিয়েছিলেন ন্যাশনাল থিয়েটার এর প্রথম বাৎসরিক অনুষ্ঠানে:

“কি আকৃতি , কি প্রকৃতি, কি স্বর, কিছুতেই কর্কশ ও রুক্ষ স্বভাবের পুরুষেরা কোমলাঙ্গী, কোমলহৃদয়া মধুরভাষিনী কামিনীগণের ন্যায় হইতে পারেনা. সত্যিকার রমণীকে রমণী সাজাইলে দেখিতে শুনিতে সর্বপ্রকারের ভালো হয় . কিন্তু এ বিষয়ে যেমন উত্তম হইলো , অন্যান্য বিষয়  যে আছে তাহাতেও উপেক্ষা করা উচিত নয়. দৃশ্য-মনোহারিত্ব. ও আমোদ সুখ প্রার্থনীয় বটে কিন্তু সমাজের ধর্ম নীতি অধিক প্রার্থনীয় কিনা তাহা কি আর বহু বাক্যে বুঝাইয়া দিতে হইবে ?  এ দেশে কুলজা কামিনীকে অভিনেত্রী রূপে প্রাপ্ত হওয়া  এক কালেই অসম্ভব , স্ত্রী অভিনেত্রী সংগ্রহ করিতে হইলে  কুলটা বেশ্যা পল্লী  হইতেই আনিতে হইবে. ভদ্রযুবকগণ আপনাদের মধ্যে বেশ্যা কে লইয়া আমোদ করিবেন , বেশ্যার সঙ্গে একত্র সাজিয়া  রঙ্গ ভূমিতে রঙ্গ করিবেন, বেশ্যার সঙ্গে নৃত্য করিবেন, ইহাও কি কর্ণে শুনা যায়?  ইহাও কি সহ্য হয়?  ইহাও যে রাজধানীতে — এত সুশিক্ষা  সদুপদেশ , ও সভ্যতার মধ্যে কোনো সম্প্রদায় কত্তিৃক অনায়াসে অনুষ্ঠিত হইতেছে , ইহার অপেক্ষা বিস্ময় ও আক্ষেপের বিষয় আর কি আছে?”

Contamination এর ভয় বড় ভয়। এবং সে রোধ করার কোনও উপায়ই নেই, ভদ্রসন্তানদের নাটকের এমনই ছিরি. যতই কেননা পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক নাটক লেখা হউক, তার মূল সুরটি ‘রঙ্গ’ আর ‘আমোদে’র। তাতে নট নটী এ ও’র গায়ে প্রায়শই ঢ’লে পড়ে, আদিরসাত্মক রসিকতা করে । এ সকল entertaining গলাগলি ঢলাঢলি ব্যাপার যদি একটি বেশ্যার সহিত অনুষ্ঠিত হয় তাহলে সে  মহামারী contamination  হতে  বাবুদের রক্ষা করেন কোন শ্রী হরি?  দর্শক বাবুদের দেখন সুখের লজ্জাই বা রক্ষা করেন কোন মধুসূদন? ‘প্রকাশ বিনষ্টা’দের নাহয় বাৎস্যায়ন অনুমোদন করেছেন, প্রকাশবিনষ্টদের তো কোনও বিধান নেই ! তাঁরা অটলবাবু বা নিমচাঁদ বাবুর অনুসরণে  আদাড়ে পাঁদাড়ে ঘুরুন , সে আমরা দেখতে যাচ্ছিনে, কিন্তু এক হলঘর বাবুর সামনে… ? প্রাণ থাকতে নয়।

গোড়ার দিকে তিন সতী-গন্ধী নাটকের কথা বলেছিলাম. তার মধ্যে একটি থেকে দুই একটি দৃশ্য পেশ করছি. পাঠক প্রথমে এইটি দেখুন:

( কুটীলার প্রবেশ । )
কুটীলা—দাদা, দাদা, দাদা,—

আয়ান—আরে কেন, কি হয়েচে–

কুটীলা-যা হয়েচে একবার দেখ্বে এসো—এই গে তোমার রাধা-সতী কালার সঙ্গে নিকুঞ্জবনে আমোদ প্রমোদ করচে-আর কিচু নয়—

আয়ান —  (যষ্টি হস্তে দণ্ডায়মান ) সত্য বলচিস্ রাধাকৃষ্ণ নিকুঞ্জ বনে একত্র রয়েচে ।

কুটীলা  — আমি বুঝি কেবল, তোমার কাছে মিথ্য কথাই বলে ব্যাড়াচ্চি-স্বচক্ষে দেখে এসেচি—এখন ইচ্ছে হয়, তো চল তোমার দেখুয়ে দি,—তার পর তোমার মনে যা থাকে তাই করো-বাবা বোয়ের এমন বুকের পাটা কখন দেখিনি—এই দুই প্রহর বেলা, পর পুরুষের সঙ্গে আমোদ-ওমা ছি, ছি, ছি, কুল বধূর কি এই কাম, কালা মিন্সের জালায় লোকের কাছে মুক দেখানো ভার-রাত দিন কৃষ্ণের সঙ্গে বনে বনে ফিরুবে, ঘরে এক দণ্ড থাকতে মন যায় না— ভাল কথা বলতে গেলে তেড়ে মারুতে আসে-কলঙ্কিনীর জন্যে যমুনায় ঝাপ দিয়ে মরতে ইচ্ছে হয়—এই তোমার আস্কারা পেয়েই তো এত দূর হয়েচে—তুমি দাবালে কি কখন এমন হতো–মা সাধ করে বলেন তুমি মেয়ে মানুষ, কাচা দিয়ে কাপড় পর না—

                                                                                 (সতী কি কলঙ্কিনী  নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়  ১৮৭৯)

এ হলো রাধা সতীর বৃত্তান্ত । এই নাটকে কৃষ্ণর কালী সেজে কুটিলা আর  আয়ান ঘোষকে ফাঁকি  দেওয়ার প্লট । এতে রাধা যমুনা  থেকে জল এনে কৃষ্ণের প্রাণ বাঁচালেন এবং বৃন্দাবনের শ্রেষ্ঠা  সতী সাব্যস্ত হলেন।

কিন্তু রাধা কৃষ্ণর লীলা যে ‘আমোদ’ এ পরিণত হলো , সেই কথাটি আমাদের ভাবায়।  দিব্য প্রেম হোক আর যাই হোক, নাট্যশালার bawdry নাহলে টিকিট বিকোবে কিসে? এ বস্তুটি বাবুদের শিখিয়েছিলেন মহাত্মা শেক্সপীয়ার,  এ আমার ঘোর সন্দেহ। Bawdry দীর্ঘজীবি হোক ।

পাঠক এইবার একই নাটকে এই দৃশ্যটি অবলোকন করুন। রাধা সতী জল আনতে চলেছেন আর  বিলাপ করছেন:

প্রথম গর্ভাঙ্ক । যমুনা তট । (রাধিক সখিগণ সমভিব্যাহারে উপস্থিত। )

রাধিকা। সখি ! পা যে আর চলে না—আমার মনের ভিতর যে কি হচ্চে তা অন্তর্যামী পরমেশ্বরই জানেন—প্ৰাণেশ্বর এ হতভাগিনীর অদৃষ্ট কি শেষ এই ছিল—কুল, মান, প্রাণ মন সকল সমর্পণ করে অবশেষে তোমার বিরহ যাতনা ভোগ কত্তে হলো—ওহ ! সখি, আমি কি জল এনে প্রাণনাথের জীবন রক্ষা কত্তে পাবে? ব্রজের সাধ্বী রমণীগণ বা পারেন না, আমা হতে সে কাৰ্য্য কি সম্ভব। নাথ! তুমিই তো বলেছিলে যে আমার কালাকলঙ্কিনী নাম খণ্ডন করবে— দীননাথ ! আমি অনন্ত-কাল এ কলঙ্ক রাশি ভোগ কর্ত্তে পারি, কিন্তু তোমার বিরহ যে এক মুহুৰ্ত্ত ও সহ্য করতে পারিনে-দয়াময়! দাসীকে এ ঘোর বিপদ সাগর হতে পরিত্রাণ কর নতুবা এ যমুনার জলে ছার প্রাণ পরিত্যাগ করবো।
                                                                               (সতী কি কলঙ্কিনী  নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়  ১৮৭৯)

এইবার আপনারা বিবেচনা করুন, এই whining pining রাধাটি যদি কোনো বেশ্যা হ’ন, এবং  নাটকের কোনো এক ব্রাহ্ম মুহূর্তে তিনি যদি গিয়ে কৃষ্ণ-রূপী young বাবুটির ঘাড়ে গিয়ে পড়েন, তা হইতে যা বিপত্তি হবে সে সামলাতে বাবুর চোদ্দ পুরুষ হদ্দ হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়, বিশেষ করে সে বেটির গলায় যদি সেতার বাজে। সুতরাং  মনমোহন বাবুর কথাটি   একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয় । বাঁচতে চাও তো  হুতোমের ভাষায় ‘খ্যাংরা গুঁপো’ মিনসেদের কামিয়ে জুমিয়ে রাধা ললিতা বিশাখা রোহিনী যা খুশি সাজাও । ধর্ম সংকটের ভয় নেই ।

মনমোহন বসু হলেন সনাতন পন্থীদের ধ্বজা ধারী এবং নাট্যরঙ্গ এবং পুরুষের সতীত্ব রক্ষার  যৌথ প্রকল্পে  নিবেদিত প্রাণ।  নাটকে নটী চরিত্রে তাঁর আপত্তি নেই, কিন্তু সেই  দুশ্চরিত্রা নটীর চরিত্র কোনও সুললিত বাবু করুন ; তাতে রঙ্গ কিছু কম পড়িবেক বটে, তবে জাত ধর্ম বিনাশের সম্ভাবনা কিছুমাত্র নাই।

GARGARA SATI II

 

এইবার তাঁরই রচিত ‘সতী-নাটক’ ( ১৮৭৩) থেকে খানিকটা পাঠ করি । এটি হলো সে যুগের আর এক ‘সতী’ নাটক । এই অংশটি তে নট-নটর কথোপকথনে আমরা যথার্থ সতীত্বের একটি সটীক  ব্যাখ্যা পাই।

এই লিস্টিতে চন্দ্রাকুলবধূ দ্রৌপদী নাকচ হয়ে যান একাম্রবনের  আম্রফলের কথাটি বলার সময়  পঞ্চপতির উপরেও  তাঁর যে আর একটি পতির (কর্ণ) ইচ্ছা জেগেছিলো, এই অপরাধে। “সতীকুলের ঈশ্বরী” ইন্দ্রানী পরীক্ষায় ফেল হলেন নিম্নোক্ত কারণে:

“বলপূর্বক যে এসে ইন্দ্রকে তাড়িয়ে দে স্বর্গের সিংহাসনখানি অধিকার করে (নহুষ) শচী ঠাকরুন অমনি হুট্ করে তারির বামে বসেন! এমন ঐশ্বর্য্যপ্রাণা ভোগবিলাসিনীকে পতিপ্রাণা না বলতে পারলে তোমার মন উঠবে কেন?”

যাঁকে এই অংশে তিরস্কার করা হচ্ছে তিনি হলেন এক নটী, অর্থাৎ আর এক ভোগবিলাসিনী, যাঁর সতীপনার কোনো কারেক্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং নেই । তারপর নট চরিত্রটি এই সাব্যস্ত করলে যে , “যে কন্যারত্ন দক্ষ প্রজাপতির কুল উজ্জ্বল করে , কৈলাশনাথের হৃদয়মণি হয়ে , সতীত্বের প্রভায়  ত্রিভুবন আলো করেছেন […] সেই সতীকূলের ঈশ্বরীর নিখুঁত চরিত্র কীর্তন করে  জীবন সার্থক করি।”

তাবৎ  আনন্দ পেলাম এই দেখে যে পূর্ণ চন্দ্রের মতো পূর্ণ সতীর ব্যাখ্যা চলতে লাগলো নাটকে এবং নটী চরিত্রটিকে বলে দেওয়া হলো সতীত্বর মর্মোদ্ধার তার কম্মো না । সামাজিক অনুশাসন নাটকের পাতায় ঢুকে প’ড়ে  তাবৎ নষ্ট মেয়েমানুষকে  চোখ রাঙাতে থাকলো । তারই মধ্যে কে এক ‘শান্তে পাগলা’  কোথ্থেকে এসে তিড়িং বিড়িং করে নেচে কুঁদে মোটা দাগের গান গেয়ে ইনফেরিওর দর্শকদের  আমোদ বর্ধন করলে। অর্থাৎ কিনা, যে নাট্যকার বাবু “কৈলাসনাথের  হৃদয়মণি” কে সতীত্বের সার্টিফিকেট দিয়ে নিজের noble সাত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিটি নাটকে জাহির করলেন, আদর্শ  নারীত্বের একটি বার্নিং এক্সাম্পল সেট করলেন এবং ব্যাড উওম্যানকে chastise করলেন,  তিনিই আবার স্থুল রসিকতা করে মঞ্চের ধারাটি এবং ‘পিট্’ এর চাহিদা টিতে  ইন্ধন যোগালেন। মোটা দাগের আমোদটি বজায় থাকুক,  তার খাতিরে দুই একটি বেশ্যা/নটী  গোছের চরিত্র-ও থাকুক,  কিন্তু তাতে যেন কার্যকাল সমুৎপন্নে বাবু কুলের  শরীর এবং মন কন্টামিনেটেড না হয়ে পড়ে । তাঁরই ঢঙে বলি, “ অতএব  নারীচরিত্রে  আন্ মিন্সেদের’। বেশ্যাসক্তি বিষম বিপত্তি। স্টেজ এবং জীবন মিলে গেলে গেলে মহা বিপদ।  ওই যে বলেছি আগেই, ‘সাধু সাবধান’!

একটি  মুখের মতো জবাব দেখলাম দিলেন জনৈক বাবু মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় । তিনি বললেন এইসকল ড্যামসেলরা স্টেজ-এ ওঠেন বলেই যত নিম্নবর্গের লোক পয়সা দিয়ে টিকেট কাটে, ড্যামসেল দের সাঙ্গ পাঙ্গরা চুপি চুপি নাটক দেখতে আসে ; দাড়ি-চাঁছা নায়িকাদের দেখতে তাঁদের কি  তদ্রুপ উৎসাহ হতো? এছাড়া তিনি এও বললেন যে যাঁরা সমালোচক, তাঁরা উচ্চ শিক্ষিত হিন্দু নারীদের মঞ্চে উপস্থিত করুন, immoral বাবুরা সব কয়টি বেশ্যা কে তাড়া দিয়ে একেবারে গঙ্গা পার করে ছাড়বেন ।

সে হবার নয় । তালেগোলে বেশ্যারা স্টেজ আলো করে থেকে গেলেন । সনাতনপন্থী বাবুরা  ঢাল তলোয়ার নিয়ে নাচতে থাকলেন ।  ১৯১২ ৮ই ফেব্রুয়ারি, গিরীশচন্দ্র যখন দেহ রাখলেন, তাঁর মৃতদেহে মালা দেওয়ার অধিকারটুকুও সনাতন বাবুরা তাদের দিলে না।

লেখাটি দীর্ঘ হয়ে পড়ছে জানি, কিন্তু এ ক’টি কথা বলা প্রয়োজন ছিল। এইবার আসল কথাটি পাড়ি।

২/ আমি সখের নারী সুকুমারী
     স্ত্রী পুরুষে এ্যাক্টো করি
     দুনিয়ার লোক দেখে যারে —!

sukumari dutta
যাদুমণি, আন্দি, এইসব নাম যাদের হয় তাদের ঠিকুজি কুলুজির খোঁজ থাকে না । গোলাপসুন্দরীরও  নেই। মাহেশ থেকে কি অবস্থায় তিনি কলকাতায়  এসে খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন সে কথা কেউ বলে যান নি। তবে হ্যাঁ, কপাল করে এসেছিলেন এই বেশ্যটি।  প্রথম চোটেই মধুসূদন দত্তর নাটকে  শর্মিষ্ঠা ; ১৮৭৪ বেঙ্গল থিয়েটারে  খোদ জ্যোতি ঠাকুরের পুরু বিক্রম নাটকে রাণী ঐলাবেলা । এরপর একটি মহা কান্ড ঘটলো তাঁর জীবনে. এল আলোকপ্রাপ্ত বাবুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলো. বাবুটি সমাজসেবী radical নাম উপেন্দ্রনাথ দাস . তিনি আবার নাট্যপ্রেমীও বটে। ১৮৭৫ সালে  ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়ানো সাঙ্গ  করে তিনি তাঁর বন্ধু  বাবু শিশিরকুমার ঘোষের সাহায্যে দি  গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার -এর ম্যানেজার হলেন।  এরপর ১৮৭৫ এ লিখলেন শরৎ সরোজিনী নাটক। সেই নাটকে অত্যাচারী সাহেবদের খুব একহাত নিলেন ,এবং যা হবার তা হলো:  সরকার সে নাটক বন্ধ করলে। কিন্তু সেই নাটকে ‘সুকুমারী’র ভূমিকায় অভিনয় ক’রে গোলাপসুন্দরী রাতারাতি নাটকের হ্যান্ড বিলে হয়ে উঠলেন সুকুমারী। রীতিমত যারে কয়, a star is born. গল্পটি এখানে শেষ হলে বলা যেত happy ending. কিন্তু সে হবার নয় । উপেন্দ্রনাথ দাস  একে বাবু তাই  radical,তাঁর মাথায় খেয়াল এলো যে  এক্ট্রেসদের ভদ্রসমাজের পাতে দেওয়া একান্ত প্রয়োজন, এবং সে হতে পারে একমাত্র বিবাহ  সূত্রে।

যেমন কথা তেমন কাজ. ঘটনাক্রমে উপেন্দ্রনাথ পেয়ে গেলেন আর এক নাটুকে বাবুরে। তিনি গোষ্ঠবেহারী দত্ত . তাঁর সঙ্গে  তাঁর ‘সুকুমারী’র বিয়ে দিয়ে তিনি  তাকে যাতে তুলবেন এইরকমই সাব্যস্ত করেছিলেন তিনি। ধন্য radical  বুদ্ধি । বেশ্যা যাতে তোলা কি সোজা?  ১৮৭৫ ১২ই ফেব্রুয়ারির  ‘এডুকেশন গেজেট’ এ দেখতে পাই :

সাপ্তাহিক সংবাদ: প্রতিধ্বনি বলেন, গ্রেট ন্যাশনাল  থিয়েটার এর  অভিনেত্রী  শ্রীমতি গোলাপ(মোহিনী)র সহিত উক্ত নাট্যশালার অন্যতম অভিনেতা শ্রীযুক্ত বাবু গোষ্ঠবেহারী দত্তর বিবাহ ১৮৭২ অব্দের তিন আইন অনুসারে  আগামী মঙ্গলবার নির্বাহ হইবে, এমত কথা আছে ।”

কতিপয় রগুড়ে বাঙালি যে বেশ্যার বিয়ে  রঙ্গ দেখে  আটখানা হ’লেন তা বোঝা যায় তাদের ছড়াকাটা শুনে । ছড়াটি দিয়েই  গোলাপ বৃত্তান্ত শুরু করেছি । চক্ষুপাত করুন। ছড়াখানি ওই বিবাহ উপলক্ষ্যে যে ঝড় উঠেছিল তারই এক বীরত্বব্যঞ্জক উদাহরণ।

পাঠক: বিবাহ গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তদপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ‘তিন আইনে বিয়ে’ কারণ এ হলো উনিশ শতকের নবতম বিবাহ প্রথা ।  এই বিড়ম্বনার শুরু আদি ব্রাহ্মসমাজের নতুন বিবাহ প্রথা প্রবর্তন (১৮৬১) এবং তারপরে, বাবু কেশবচন্দ্র সেনের ব্রাহ্ম বিবাহ রিফর্ম মনোবাঞ্ছায়  এবং দুই ব্রাহ্ম নেতার লাঠালাঠি  ব্যাপারে। এই ‘তুই থুলি না মুই থুলি’ দেখে ইংরেজ সরকার যে নেটিভ ম্যারেজ এ্যাক্টের পরিকল্পনা করছিলেন তা শিকেয় তুলে রাখেন এবং নামকরণ না করেই ১৮৭২ এ যে আইনটি বলবৎ হয় সেই হলো তিন আইন।  এই আইনের নানা প্যাঁচ পয়জার, সে সবে আমাদের দরকার নেই. এই বিবাহ আইনের মূল কথা তিনখানি হলো:  বিবাহ হয় একনিষ্ঠ, অর্থাৎ বিবাহিতেরা খামখেয়ালিতে একে অন্যকে  ছাড়িয়া নূতন বিবাহ করিতে পারেন না।  চতুর্দশ বর্ষ বালিকাদিগের সর্বনিন্ম বিবাহোপযুক্ত বয়স বলিয়া নির্দিষ্ট হইল। এই নুতন আইন তাহাদেরই জন্য  বিধিবদ্ধ ব্যবহৃত হইয়াছে যাহারা প্রচলিত হিন্দু, মুসলমান, খ্ৰীষ্টান, য়িহদী প্রভৃতি, কোনও ধৰ্ম্মে বিশ্বাস করে না, এবং ঐ সকল ধৰ্ম্মের,নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসারে বিবাহ করিতে অনিচ্ছুক।

এখন কথা হলো এইসব আইনি মারপ্যাঁচের  সঙ্গে গোলাপের বাবু গোষ্ঠবেহারীর সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক কি?

সম্পর্ক একটু আছে বৈকি।  একটি হিন্দু মেয়ে আর একটি হিন্দু বাবুর কেন  তিন  আইনে বিয়ে হওয়া প্রয়োজন তা একটু ভাবলেই বেরিয়ে পড়বে।  বেজাত বেশ্যার সঙ্গে  হিন্দু কুলোদ্ভবের বিবাহ দিতে কোনো টিকিধারী – ই  সম্মত হতেন কি? তাই এই তিন আইনের খুঁট ধরে গোলাপ, তিনি মোহিনী বা সুন্দরী যাই হ’ন, তার সঙ্গে দত্ত বাবুর বিয়েটি  শাস্ত্র সম্মত না হোক, আইনসম্মত করা গেল এবং যেহেতু এই বিয়ে রেজিস্টারি বিয়ে , দত্ত বাবুর কাঁছা কোঁচা তুলে পালানোর পথটিও বন্ধ করা হলো। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। একে বেশ্যা, তাই তিন আইনে অ-হিন্দু  বিয়ে । দত্ত বাবুর পরিবার তাঁরে ত্যাগ  দিলেন । খানিক অর্থকষ্ট সহ্য করে  দত্ত বাবু তাঁর মুরুব্বি উপেন্দ্রনাথ দাসের পথ ধরে বিলেত রওনা দিলেন এবং শোনা যায় একটি হোটেল এ চাকরি নিলেন। তার কিছু পরেই তাঁর দেহান্তর হয় । ‘মিসেস সুকুমারী দত্ত’ একটি সদ্যজাত কন্যা সন্তান  নিয়ে মোচার খোলার মতো সংসার সমুদ্রে ভাসতে লাগলেন । Radicalism এর জয়গানের এখানেই অন্ত হলো। গোলাপ কিছুদিন একটি নাচ গানের স্কুল খুলে জীবনধারণের চেষ্টা করলেন, এমনকি  নাটক লিখতে শুরু করলেন ।১৮৭৫ সালে ২৩ইএ  অগাস্ট, নাটকটি গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার  এ মঞ্চস্থ হলো কিন্তু তেমন দাগ কাটতে পারলো না।
নাটকটির নাম অপূর্ব সতী ।একটি বেশ্যার ভদ্রকুলবধূ হবার ইচ্ছার কাহিনী এবং বিয়োগান্ত।

নাটকটির কভার পৃষ্ঠায়  বল হয়েছে এটি হ’লো:

TRAGEDY!
TRAGEDY!
TRAGEDY!

এই হলো আমাদের গোড়ায় বলা তিন ‘সতী’ নাটকের তিন নম্বর এবং সর্বশেষ উল্লেখ । এই নাটকটি র কথা দুই ছত্রে সে কথা শেষ হবার নয় এবং বিষয়টি গভীর। সে পরবর্তী পরিচ্ছেদের জন্যে তোলা রইলো।
কোথায় জীবনের শেষ কোথায় নাটকের শুরু বোঝা শক্ত। নাচতে গাইতে , কথা কইতে জানা এই বেশ্যাটি  বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা নাট্যকার। সমাজ এক রঙ্গশালা বটে। তাঁর পরবর্তী জীবনের কথা প্রায় কিছুই লেখা নেই । মেয়েটিকে যথাসাধ্য শিক্ষিত করেছিলেন, প্রচুর টাকাপয়সা খরচ করে একটি সম্ভ্রান্ত ‘ব্রাহ্মণ’ পরিবারে বিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু মেয়ের শশুরবাড়িতে পা দেওয়ার অধিকার তাঁকে দেওয়া হয়নি।

অপূর্ব সতীর নায়িকা নলিনীর একটি গান বলে আজ উঠি:

যদি নাহি পাই প্রাণের কানাই প্রাণ না ভাসে
নাথের উদ্দেশে , এদেশে সেদেশে , সন্ন্যাসিনী   বেশে ,
ভ্রমিব গহনে
নীরবে কাঁদিব, সবে সুধাইব, জীবন ত্যাজি ঝাঁপিয়ে   জীবনে ।।

পাঠক, শেষ পংক্তিতে একটি paradox বা কূটাভাস আছে, লক্ষ্য করেছেন কি? “জীবন ত্যাজি ঝাঁপিয়ে   জীবনে” কথাটির অন্তর্নিহিত অর্থ বা অনর্থ নিয়ে একটু চিন্তা করে দেখবেন, ওটিই হলো গোলাপ ওরফে সুকুমারীর মনের কথা।

আজ এই পর্যন্তই।

***

Featured Image : https://www.pinterest.com/pin/471752129691928597/
Sati: https://www.pinterest.com/pin/471752129691928597/
Sukumari Dutta: Natya Shodh Sansthan.

Posted in Uncategorized | Leave a comment

গড়গড়ার মা’লো সপ্তম পরিচ্ছেদ: নাটুকে বাবু এবং মন্দ স্ত্রীলোক ( ১)

GARGARA BABU NATAK

 

১/ রাজারাম সম্বাদ

কদিন আগেই বাবুয়ানি নিয়ে দু চার কথা বলেছিলাম। তাতে  একজায়গায় লিখেছিলাম বাবুয়ানির তিন পুরুষ হলো কেনারাম রাজারাম, বেচারাম।  ১৮৫৭র আশ পাশ হলো রাজারামদের যুগ । তাঁরা বাপ পিতামহের দুই পয়সা পেলেন, হিন্দু কলেজে  গিয়ে বাবু হলেন । এরই মধ্যে যাঁরা  আলালের ঘরের দুলাল হয়ে উঠতে  পারলেন না তাঁরা নাট্যশালায় further  এনলাইটেনমেন্ট এর উপায় খুঁজে পেলেন । ১৮৫৭ সালে দেখা গেল তিন বাবু নাট্যশালায় মজলেন । ১৮৫৭ তে লখনৌয়ের বাদশাহ যখন তাড়া খাচ্ছেন তখন একই সঙ্গে তিন তিনটে  নাট্যশালা একসঙ্গে শুরু হতে দেখা গেল. সাতু বাবুর (আশুতোষ দেব) সিমলার বাড়িতে  বাবু নন্দকুমার রায়ের অভিজ্ঞান শকুন্তলের  অভিনয় ৩০সে জানুয়ারী।  মার্চ মাসে বাবু রামজয় বসাকের বাড়ি রামনারায়ণ তর্করত্নের  ‘কুলীন কুলসর্বস্ব’ , এবং বাবু কালীপ্রসন্ন সিংহের বিদ্যোৎসাহিনী সভার উদ্বোধনে ওই একই ‘নাটুকে রামনারায়ণ’এর ‘বেণী সংহার’ নামানো হয় ১১ই  এপ্রিলে. তার আট বছরের মধ্যেই  মধ্যেই দেখা যাচ্ছে মেট্রোপলিটন   থিয়েটার (১৮৫৯)  শোভাবাজার রাজাদের  প্রাইভেট থিয়েট্রিক্যাল সোসাইটি  (১৮ই জুলাই ১৮৬৫) বাবু যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের  পাথুরিয়াঘাটা  বঙ্গনাট্যালয় (৩০শে ডিসেম্বর ১৮৬৫)  এবং যারে কয় last but not least, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাবুদের  নাট্যশালা (জানুয়ারী ১৮৬৭) এবং বাবু বলদেব ধর ও চুনিলাল বসুর  বহুবাজার বঙ্গ নাট্যালয় (১৮৬৮)  ।

শুরুরও শুরু থকে। সর্বনাশের  গোড়াপত্তন যে Hindoo এনলাইটেনমেন্ট এ সে ব্যাপারটি পরিষ্কার। একটি পোকায় কাটা বইএর পাতা উল্টে দেখি ১৮৩৭ ২৯শে মার্চ গভর্নমেন্ট হাউসে  হিন্দু কলেজের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে  ছাত্র বাবু রা Shakespeareএর খানিক খানিক অভিনয় করেন ।  এরপর দেখছি ১৮৫১র ৭ ই অগাস্ট  বট তলায় ডেভিড হেয়ার  একাডেমী শুরু হয়  হাটখোলার বাবু গুরুচরণ দত্তর উদ্যোগে। , ১৮৫৩ তে সে একাডেমির হিন্দু ছাত্র রা শেক্সপিয়রের মার্চেন্ট অফ ভেনিসের Act  IV Scene One  এর আবৃত্তি করেন।সমাচার দর্পন তার actor দের তালিকা ছেপে বেশ ফলাও  করে খবরটি ছাপিয়েছিল. অভিনেতার আলীকে দেখলাম Portiar  ভূমিকায় Obhoychurn Bose. Nerissaর ভূমিক।য় Rajendranarain Mitter  আর Nelly Gray র ভূমিকায় Gobinchunder Dutt ।

আলোকপ্রাপ্ত  রাজা রামরা যে ঐ সময় থেকেই নাট্য রঙ্গে মজেছেন তা  জানা গেল । তবে কিনা নারী চরিত্রে অভিনয় করার জন্যে যে ব্যাটাছেলে ছাড়া গতি নেই তা জলবত্তরলম্ । নব্য বাবুরা  তাতেই খুশি। মেয়েমানুষ যে পাড়ায় গেলে পাওয়া যায় সে পাড়ায় যায়ই বা কে, তাদের  স্কুলের বাবুদের সঙ্গে অভিনয় করতে দেওয়ার মত নিঘিন্নে কাজই বা করে কে। অতএব, Obhoychurn বিনে গতি নেই। ছোটবেলায় শোনা মায়ের ছোটবেলার গল্প মনে পড়ে গেল, সেটা এই ফাঁকে  বলে নিই। মায়েদের ছোটবেলা তে  পাড়ায় পাড়ায় যাত্রার পালার চল ছিল  সেটা প্রাক স্বাধীনতা যুগ. মায়ের কাছেই শুনেছি দুর্গাবাড়ি তে যাত্রা হলে বড় দাদা কাকাদের সঙ্গে বাড়ির ছোট মেয়েদের যাত্রা দেখতে যাওয়ার অনুমতি মিলতো । যত না উৎসাহ ছিল যাত্রা দেখার, তার চেয়ে অনেক বেশি রোমাঞ্চ ছিল  চট দিয়ে ঢাকা গ্রীন রুম এ উঁকি দেওয়াতে। “ওই দ্যাখ, সীতা  বিড়ি খাচ্ছে” বলে অধিকারী মশাইয়ের তাড়া খাওয়ার গল্পও মায়ের মুখেই শোনা। পালার নাম ছিল ‘সীতার বনবাস’।যাকগে, কথাটা এই জন্যে বলা যে বালক নটীদের দেখে মায়ের দেখা ধূমপান রত সীতাকে মনে পড়ে গেছিলো। এবার আসল কথায় ফিরি।

সায়েবদের থেকে মদ ছাড়াও বাবুরা পেয়েছিলেন শেক্সপীয়ার । সে বেশ সকাল সকালই  পেয়েছিলেন দেখা যাচ্ছে ।  তাঁরা ইংরিজি নাটক দেখতে বেশ যেতেন, এমনকি অভিনয় ও যে করতেন এক আধটু সে ও  শুনলাম। দুই চার পত্রিকাতে সে সবের রিভিউ ও বেরোতো ।  কিন্তু আমার ওসব উচ্চ বিষয়ে মন নেই  আমি খালি বাজে জিনিস  খুঁজে বেড়াই । ১৮৪৮  সালে Sans Souci থিয়েটার এ  ‘ওথেলো’ র অভিনয় হয়। ২১ শে অগাস্ট ‘সংবাদ প্রভাকর’ লেখে:

“গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর সান্শশি  (Sans Souci) নামক থিয়েটারে বেশ সমারোহ হইয়াছিল , বহুদিবস হইলো ঐরূপ সমারোহ হয় নাই , কলিকাতা ও অন্যান্য স্থানের সাহেব ও বিবি এবং এতদ্দেশীয় বাবু  ও রাজাদিগের সমাগম  দ্বারা নৃত্যাগারের শোভা  অতি মনোরম হইয়াছিল […] এতদ্দেশীয় নর্তক বাবু বৈষ্ণবচাঁদ আঢ্য ওথেলোর ভঙ্গি  ও বক্তৃিতার দ্বারা সকলকে সন্তুষ্ট করিয়াছেন, তিনি  কোনো রূপে ভীত অথবা কোনো ভঙ্গির অবহেলন  করেন নাই, তিনি চতুর্দিগ হইতে ধন্য ২  শব্দ শ্রবণ করিয়াছেন এবং তাহার উৎসাহ ও সাহস বদ্ধমূল হইয়াছে , যে বিবি ডেসডিমোনা হইয়াছিলেন তিনিও বিলক্ষণ প্রতিষ্ঠিতা হইয়াছেন..” ।

এর পরে আরও খানিক নাট্য সমালোচনা আছে বৈষ্ণব চাঁদ আঢ্যর  অভিনয় নিয়ে , কিন্তু ওই যে বললাম আমি খালি বাজে খবর খুঁজে মরি, আমার নজর পড়লো ‘বিবি’ ডেসডিমোনার ওপর।  খানিক চিন্তা করলাম এই বিবি কোনও ইহুদি বিবি কিনা, কারণ তাঁদের সৌন্দর্য বিষয়ে দু চার কথা ‘সধবার একাদশী’ তে নিমচাঁদের মুখে শুনেছিলাম বটে । কিন্তু পরে দস্তুরমতো চিন্তা করে দেখলাম সেইসময় কিছু ইংরেজ বিবির কলকাতায় গতায়াত হয়েছিল । বামাবোধিনী বিবি শিক্ষয়িত্রী রেকমেন্ড করছে, সে কথা আগেই বলেছি।  নাট্যজগতেও দুই বিবির খোঁজ পেলাম ; মিস এলিস  আর মিসেস গ্রেগ । মিস এলিস এর খবরটি বেশ চমকপ্রদ । ১৮৫৩ ৬ই অগাস্ট ‘সংবাদ প্রভাকর’ বলছে:

 

অবগতি হইলো ওরিয়েন্টালি ছাত্ররা এক প্রকান্ড ভাণ্ড কান্ড ফাঁদিয়াছেন , এতদিন মেন্ Clinger সাহেব একাকী অধিকারী হইয়া বিলিতি যাত্রার উপদেশ দিতেছিলেন । এইক্ষণে এক শ্বেতাঙ্গি শ্ৰীমতী তাহার অধিকারিণী হইয়াছেন , ইহার নাম ইলিস, যিনি আসিয়া ভাব ভঙ্গির শিক্ষা প্রদান করিলে নাটকের আরো চটক পড়িবেক্ ।

(এই বিবি এলিসের গড়ের মাঠে ‘নৃত্যাগার’ ছিল এবং ১৮৫১র ২৬শে এপ্রিল  সংবাদ প্রভাকর জানাচ্ছে যে সেই নৃত্যাগার  ‘পবন ঠাকুরের কৃপায় পতিত হইয়াছে’।)

 

যাই হোক, চটক কতটা পড়িয়াছিল বলা যায় না  তবে বিলিতি বিবিদের যে প্রথম যুগের নাট্যশালায় যাতায়াত ছিল, তা দেখাই যাচ্ছে ।  ১৮৫৪ ১৭ই মার্চ  ওরিয়েন্টাল থিয়েটার, ২৬৮ গরানহাটা, চিৎপুরে রোড এ মার্চেন্ট অফ ভেনিস আবার পেশ করা হয় . এবার Portiar ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে মিসেস গ্রেগ কে। The Bengal Harkaru জানাচ্ছে “that will be her last performance and indeed the close of her last day’s  sojourn in Bengal.” এই সব বিবিদের সুখ দুঃখের কথা লিখবো কোনো একসময় । এনারা ছিলাম মহারানীর আমলের ‘Cargo ‘… জাহাজ ভর্তি হয়ে এঁরা এদেশে আসতেন, ভাগ্য খুঁজতে. কেউ বা গরিব বাপের মেয়ে, বর জোটেনি,তাই চলেছেন বিদেশে  বরের খোঁজে,  কারোর স্বামী ছেড়ে গেছে অথবা কোনো লম্পট বদমাইশের হাত থেকে পালিয়ে তাঁরা নতুন দেশে নতুন জীবন খুঁজছেন । যাঁদের ভাগ্যদেবী  নতুন দেশেও  মুখ ফিরিয়ে নিতেন, তাঁরা আবার ‘Returned Cargo হয়ে ফিরে যেতেন নিজেদের দেশে । মিসেস গ্রেগ তেমনি কেউ ছিলেন কিনা কে জানে…

***

বাবুদের নাট্যশালায় ফিরি। ১৮৫৭ জুলাই মাসে সাতুবাবুর প্রাসাদে  ‘অভিজ্ঞান শকুন্তল’ র অভিনয়ে নারীচরিত্রে তখনও বাবুদের রবরবা। Cast list টি দেখলাম ।

শকুন্তলার ভূমিকায় ছাতু বাবুর পৌত্র বাবু শরৎ চন্দ্র দেব ।

অনসূয়া: অবিনাশ চন্দ্র ঘোষ।

প্রিয়ম্বদা : ভুবনমোহন ঘোষ ।

অভিনয়ের পরে এক বাবু জানালেন: “যখন বিশ হাজার টাকার অলংকারে মন্ডিত হইয়া  শরৎবাবু দীপ্তিময়ী শকুন্তলার রানিবেশ দেখাইয়াছিলেন  তখন দর্শকবৃন্দ চমৎকৃত হইয়াছিলেন”।
মনে মনে ভাবলাম, হইবেনই ।  আশ্রম বাসিনী শকুন্তলার বিশ হাজারী ঠমক দেখে দর্শক কুল  ভিরমি যে খাননি সেটা শরৎবাবুর কপালগুণ ।এধারে আমি নিরন্তর কাস্ট লিস্ট  খুঁজে চলেছি আর বাবুদের অবলোকন করছি.. বাবু যতীন্দ্র মোহন ঠাকুরের পাথুরিয়া ঘাটা বঙ্গ নাট্যালয়ে  ১৮৬৬ তে  ‘বিদ্যাসুন্দর’ নাটকের অভিনয় হয়. তার কাস্ট লিস্টটিও দেখলাম:

বিদ্যা: মদনমোহন বর্মন (খোট্টা)

হিরে মালিনী:: শ্রী কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায়

সুলোচনা চপলা (রাজকন্যার দাসী ) : শ্রী  ষষ্ঠীদাস মুখোপাধ্যায় , শ্রী যদুনাথ ঘোষ, শ্রী হরকুমার গঙ্গোপাধ্যায়

বিমলা: শ্রী নারায়ণ চন্দ্র বসাক ।

 

২/ অভিনয়ে পূর্ণ হলো কলিকাতা ধাম

 

Michael

 

পিছিয়ে এলাম ১৮৫৯ এ । তার একটি বিশেষ কারণ আছে। ১৮৫৯ সালে বঙ্গরঙ্গমঞ্চ জমজমাট। জনৈক রামদাস সেন ১০ই মে সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়ে ছড়া কাটলেন:
নিত্য নিত্য শুনতে পাই অভিনয় নাম।

অভিনয়ে পূর্ণ হলো কলিকাতা ধাম ।।

হায় কি সুখের দিন হইলো প্রকাশ ।

দুঃখের হইলো অন্ত সুখ বারোমাস ।।

দিন  দিন বৃদ্ধি হয় সভ্যতা সোপান ।

দিন দিন বৃদ্ধি হইলো বাংলার মান ।।

হায় কি সুখের দিন  হইলো উদয় ।

এদেশে প্রচার হলো নাট্য অভিনয়।।

 

এবার পাইকপাড়ার রাজাদের কথা পৃথকভাবে না লিখলে অপরাধ হবে। তাঁদের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়ির নাট্যশালায় বড় বড় মানুষের পায়ের ধুলো পড়তো। রাজা গজারা ছাড়াও তাঁদের বেলগাছিয়া নাট্যশালায় যাঁরা যেতেন তাদের মধ্যে ছিলেন বাবু  প্যারীচাঁদ মিত্র , শ্রীযুত পন্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর , পন্ডিত রামনারায়ণ তর্করত্ন । বাংলাদেশের ছোট গবের্নের  শ্রীযুক্ত মান্যবর হেলিডে সায়েবেরও নাম পাওয়া গেল । কিন্তু আর একটি গুরুতর  কারণে এই নাট্যশালা বিশিষ্ট । এই মঞ্চে রামনারায়ণ তর্করত্নর ‘রত্নাবলী’ নামে যে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়, তা দেখে মোহিত হয়েছিলেন  মাইকেল মধুসূদন দত্ত  নামধারী একজন বিলেত ফেরত বয়ে যাওয়া বাবু ।  তিনি তখন সদ্য সদ্য মাদ্রাজ থেকে কলকাতা এসেছেন এবং কলকাতা পুলিশ আদালতে কেরাণীর চাকরি নিয়েছেন । তাঁর আর্থিক অবস্থা যে কি ছিল সে বাংলাদেশের তাবৎ মানুষ জানেন, ও নিয়ে বেশি বলার প্রয়োজন দেখিনা।  তা সেই অবস্থা থেকে তাঁর উদ্ধার পরিকল্পে  তাঁর বন্ধু বাবু গৌরমোহন বসাক তাঁর সঙ্গে এইসব বড়োমানুষদের পরিচয় করিয়ে দেন। রত্নাবলী নাটক দেখতে যে সব সায়েব সুবো আসতেন, তাঁদের জন্যে এক খানি ইংরিজি অনুবাদ  প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, পাইকপাড়ার রাজা শ্রীযুত প্রতাপ চন্দ্র সিংহ বাহাদুর সেই অনুবাদটির বরাত তাঁকেই দেন। পাওনা ধার্য্য হয়েছিল ৫০০ টাকা।

এই রত্নাবলী  নাটক দেখেই পুলিশ  কোর্টের কেরাণীর নাটক লিখতে সাধ গিয়েছিলো । ফলশ্রুতি স্বরূপ ‘শর্মিষ্ঠা’  এবং বঙ্গসাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দর তোলপাড় ।

কিন্তু আমরা এখানে মাইকেল গাথা রচনা করতে বসিনি । পাঠক যদি এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ চান তবে পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ বইটি পড়বেন. আরাম পাবেন. যাইহোক, শর্মিষ্ঠার অভিনয় হলো এবং কশ্চিৎ রাজা ঈশ্বর চন্দ্র সিংহ বন্ধু গৌরদাস বসাক কে যে Dramatis Personae খানি পাঠালেন তাতে দেখা গেল:

Debjani: Hemchunder Mookerjee
Sharmista: Krishtodhon Banerjea (a new comer)
Purnika: Kally Das Sandel    (formerly our dancing girl)
Dabika: Aghor Chunder Dhagria
Notee: Chunilal Bose  (as before)
Maid Servant: Kally Prasanna Mookerjee
Dancing Girls: Same as before plus Bankim chunder Mookerjee.

একটি ব্যাপার দেখে বড় আশ্চর্য্য হলাম. ১৮৫৯-১৮৬৬ নাক উঁচু উচ্চবর্ণের বাবুরা ‘মেড়ো আর ‘খোট্টা’দের সঙ্গে  অবলীলায়  নাট্য কর্ম করেছেন , কোথাও বাধেনি।  বোধ করি এই সব মেড়ো ও খোট্টা পথ ভুলে হিন্দু কলেজ বা সমগোত্রীয় কোনো কলেজে মনোভুলে ঢুকে পড়েছিলেন, তাতেই ভাগ্যক্রমে এঁদের  কুলীন সংসর্গ হয়েছিল… লিখতে লিখতে আমার দিদিমার কথা মনে পড়ে গেল । তিনি তাঁর এক বৈবাহিককে আজীবন ‘স্যান্ডেল মশাই’ বলে সম্বোধন করতেন, ছোটবেলায় এ নিয়ে তাবৎ মজা পেতাম । উটি যে আদতে বিলিতি লব্জ তা জেনেছিলাম বহু দিন পরে।

kalighat-patachitra-paintings-exhibition.JPG II

৩/ কুম্ভদাসী, পরিচারিকা, কুলটা, স্বৈরিণী, নটী, শিল্পকারিকা প্রকাশবিনষ্টা রূপাজীবা গণিকাচেতি বেশ্যাবিশেষাঃ
                                                                                                  কামসূত্র

 

এখন আমি যে কথাটি বলতে চাইছি তাহলো থিয়েটার এ ১৮৫৫-৫৭ র আগে স্ত্রীলোকের আমদানি হয়েছিল কিন্তু তাঁরা ধোপে টেকেন নি। দাড়ি-চাঁছাদের দিয়েই নাট্যমোদীদের সন্তুষ্ট রাখা হচ্ছিলো তার কারণ সুশীলরা দুষ্প্রাপ্য এবং দুঃশীলাদের ছোঁয়াচ বঙ্গ সমাজের ন্যায়বাগীশরা তেমন ভালো চোখে দেখেন নি।

বাবু নবীন চন্দ্র বসুর এমনি বুকের পাটা যে ১৮৩৫  তাঁর নাট্যশালার  বিদ্যাসুন্দর অভিনয়ে  চার চারটি মন্দ  স্ত্রীলোক  কে তিনি  মঞ্চে ঠেলে তুললেন. তাঁদের প্রমোশন হলো)  তাঁদের তিনজনের খবরের কাগজ পঞ্চমুখে  প্রশংসা করলো । আমরা অভিনেত্রীদের নাম জানলাম – রাধারাণী, জয়দুর্গা, রাজকুমারী ও বৌহরো ম্যাথরানী। আরও জানলাম যে, এঁদের সবাইকে পতিতালয় থেকেই অভিনয়ের জন্য আনা হয়েছিল।গুণীজন রাধারাণী, জয়দুর্গা, রাজকুমারীর গুণগান গাইলেন কিন্তু বৌহরো ম্যাথরানীর প্রসঙ্গ উঠতে দেখলাম না কোথাও । বোধ করি নাম খানি  তাঁদের জিভে বেঁধেছিলো । ম্যাথরানী তলিয়ে গেলেন ।  রক্ষণশীল সমাজ চুপ করে রইলো না। সুলভ সমাচার পত্রিকায় লেখা হল:

 

সিমলার কতগুলি ভদ্রসন্তান বেঙ্গল থিয়েটার নাম দিয়া আর একটি থিয়েটার খুলিতেছে। ….যে যে স্থানে পুরুষদের মেয়ে সাজাইয়া অভিনয় করতে হয়, সেই স্থানে আসল একেবারে সত্যিকারের মেয়ে মানুষ আনিয়া নাটক করিলে অনেক টাকা হবে – এই লোভে পড়িয়া তাঁহারা কতগুলি নটীর অনুসন্ধানে আছেন।….মেয়ে নটী আনিতে গেলে মন্দ স্ত্রীলোক আনিতেই হইবে, সুতরাং তাহা হইলে শ্রাদ্ধ অনেক দূর গড়াইবে। কিন্তু দেশের পক্ষে তাহা নিতান্ত অনিষ্টের হেতু হইবে।

 

বাবু নবীন চন্দ্র বসুর নাট্যশালা বেঙ্গল থিয়েটরের দরজা বন্ধ হলে কিছুদিন বঙ্গসমাজ ভরাডুবির হাত হতে রক্ষে পেলেন। এর পরবর্তী সময়ে Kally Prasanna Mookerjee, Chunilal Bose আদিরা দাড়ি কামিয়ে রং মেখে শাড়িটি পরে স্টেজ আলো করতে থাকলেন। সে বৃত্তান্ত প্রথম অনুচ্ছেদে বলেছি।

১৮৭৩ সালে ছাতুবাবুর নাতি তাঁর দালানের সামনে মাঠে  ন্যাশনাল থিয়েটার দিলেন। এই হল প্রথম পেশাদারি থিয়েটার। বাবুদের দালান থেকে নাট্যকলা পথে নামলে।  আর  ছাতুবাবুকে মাইকেল বাবু উজোতে লাগলেন : “তোমরা স্ত্রীলোক লইয়া থিয়েটার খোলো, স্ত্রীলোক না লইলে কছুতেই ভালো হইবে না“…so on and so forth ।  কথায় আছেই ‘সঙ্গদোষে শিলা ভাসে’ ।  তাঁর সঙ্গে তাল দিয়ে নাচতে লাগলেন শরৎবাবুর (ছাতুবাবুর নাতি)  ভগ্নিপতি Mr. O.C Dutt., বিহারীলাল চট্টোপাধ্যায় (এঁর কথা পূর্বে বলা হয়েছে)  ন্যাদাড়ু গিরিশ, অর্থাৎ বাবু শ্রীযুত গিরিশ চন্দ্র ঘোষ , বটুবাবু, বাবু প্রিয়নাথ বসু , ছাতুবাবু  স্বয়ং এবং আরও তিন চার  immoral ভদ্রসন্তান। এইবার ষোলো কলা পূর্ণ হলো । মাইকেলের ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক স্টেজে উঠলো, বাবুরা আবারো  জাতে তুললেন চার বেশ্যা কে । তাঁরা হলেন : গোলাপসুন্দরী, এলোকেশী, জগত্তারিণী,  শ্যামাসুন্দরী ।
খবরের পাতায় ইংরিজি বাংলায় সোরগোল পড়ে গল।। মহা হাঙ্গামা।  ১৮৭৩ ১৮ই অগাস্ট, হিন্দু প্যাট্রিয়ট  বললেন:

…Mr Michael Modhusudan Datta’s classic drama of Sarmistha was selected  for the first performance. The actors performed their parts verucreditably, the two actresses, who are professional women, we are informed, were most successful. W3e wish this dramatic corps had done without the actresses. It is true that professional women join the jattras and natches, but we had hoped that the managers of the Bengali Theatres would not bring themselves down to the level of Jattrawallas.

১২৮০ ১৪ই ভাদ্র ‘মধ্যস্থ’ পত্রিকায় মনমোহন বসু ব্যঙ্গ করে লিখলেন:

 

… বিলাতে রঙ্গভূমিতে স্ত্রীর প্রকৃতি স্ত্রীর দ্বারাই প্রদর্শিত হয়. বঙ্গদেশে দাড়ি গোঁপ ধারী (হাজার কামাক) জ্যেঠা ছেলেরা মেয়ে সাজিয়া  কর্কশ স্বরে  সুমধুর বামা স্বরের কার্য করিতেছে . ইহা কি তাঁহাদের ন্যায় সমাজ সংস্কারক সম্প্রদায়ের সহ্য হয়? […] অতএব ‘আন্ স্ত্রী!’ […] বাঁচিয়া থাকিলে আরও কত কি দেখিতে পাইবো । কিন্তু এত সভ্যতার তেজ সহ্য করিয়া বাঁচিয়া থাকা দায় ।

 

১৫ই জানুয়ারী ১৮৭৪ দেখলাম অমৃতবাজার  সমাজ পরিত্যক্ত ধর্ম বহির্ভূত স্ত্রীলোকদের নিয়ে নাটক করানোয় আশংকা প্রকাশ করছে যে এই করতে গিয়ে যদি সমাজের একজন লোককেও পরিহার করতে হয় তবে সে  বড় দুঃখের বিষয় হইবেক । অমৃতবাজারের আশঙ্কা একেবারে যে  ননসেন্স তা বলতে পারা গেল না।  শ্রীযুত পন্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর শর্মা প্রতিবাদে পাপ  থিয়েটার সংসর্গ  ত্যাগ করলেন। ১৮৭৩ ২৯শে জুন দত্তোকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন দেহ রাখলেন। Dear Vid এর কার্যকলাপ তাঁকে দেখে যেতে হলো না।

পাঠক, এইবার কামসূত্রের ৫৮ নম্বর সূত্র, যেটি এই অংশের  মাথায় লটকেছি , সেটি দেখুন। নটী এবং শিল্পকারিকা যে আদতে বেশ্যা যেহেতু তাঁরা নিজেদের expose করে থাকেন (প্রকাশ বিনষ্টা ) সে তো বাৎস্যায়ন কোন মান্ধাতার আমলে বলেই গেছেন ।  এঁদের দিয়ে কাম প্রশমন হয়। উচ্চ সংস্কৃতি হয় কি ? তার ওপর যখন তারা আসে খোদ বেশ্যা পাড়া থেকে তখন সোনায় সোহাগা। আদর্শ  হিন্দু বংশোদ্ভূতরা করেন কি? ১৮৭৪ এর জানুয়ারী মাসে যখন  মাইকেল এর হতভাগ্য ছেলেপুলেদের সাহায্যার্থে  আবার ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক মঞ্চস্থ   হয়,  দুটি  অসমসাহসিনী ব্রাহ্মিকা সেই বেশ্যাদোষ দুষ্ট নাটক দেখতে গেছিলেন ।  প্রকারান্তরে তাঁদের সাবধান করে দেওয়া হয়, এটুকু জানি । সেই অজানা দুই স্ত্রীলোকের দুঃসাহসের পায়ে আমি গড় করি।

 

Epilogue

 নাট্যজগতে বেশ্যা-দৌরাত্ম ঠেকিয়ে রাখা গেল না । ১৮৭৪ থেকে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার এর যুগ । সতী কি কলঙ্কিনী  নাটকে এলেন রাজকুমারী, হরিদাসী, যাদুমনি, কাদম্বিনী, বিনোদিনী,   পাঁচ পাঁচটি বেশ্যা।

এবার এইসব কূলভ্রষ্টাদের কথা বলার সময় হ’লো।
ক্রমশঃ

 

Featured Image: https://www.heartforartonline.com/products/man-with-sitar-kalighat-painting

Posted in Uncategorized | Leave a comment

গড়গড়ার মা’ লো ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: বাবু বৃত্তান্ত

BABU COVER

যদি প্রশ্ন করে যায় ‘Baboo’ কি ও কয়প্রকার? তাহলে সমস্যাটি এই দাঁড়াবে যে এই ডেফিনেশন এবং অ্যানালিসিস কোন পথে যাবে এই নিয়ে গোলমাল বাঁধবে। আমরা সহজ মতে দুইটি পথ বেছে নেবো : ইতিহাসের রাজপথ আর সাহিত্যের অলিগলি ।  দুটি পথ স্বতন্ত্র, কিন্তু চলনে খুব মিল। ঠিক যেমন মূল গায়েন আর তার দোহার।

ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখলাম বাবু ইতিহাস বড় বিচিত্র । কোম্পানির আমল শুরু হবার পর যে ধামা-ধরা শ্রেণীটি তৈরী হলো, তেনাদের মধ্যে খাজাঞ্চি দেওয়ানজী নায়েব, বানিয়ানরা আছেন প্রথম ধাপে । এঁরা আদতে দালাল। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোম্পানির সায়েবদের রফা করাতেন, দু পাঁচ টাকা নিজেরাও মারতেন। এছাড়াও কোম্পানির বড়  কর্তাদের  নায়েবগিরি করতেন, কোম্পানিকে এটাসেটা সরবরাহ করতেন। এঁদের মধ্যে পাথুরিয়া ঘাটার মল্লিক, ঘোষ  আর ঠাকুর ছাড়াও যাঁদের নাম একনিঃশ্বাসে করা হতো তেনারা হলেন, খিদিরপুরের ঘোষাল, জোড়াসাঁকোর সিংহ, নিমতলা আর কুমোরটুলির মিত্তির, রামবাগানের দত্ত, বাগবাজারের মুকের্জি, কুমোরটুলির সরকার… এঁরা সব  সায়েবদের  নথিপত্র আলো করে ছিলেন. এছাড়াও   ছিলেন অক্রুর দত্ত, হিদারাম বাঁড়ুজ্জে  এবং গোবিন্দ মিত্তিরের মতো কিছু ‘ব্ল্যাক ডেপুটি’ যাঁরা সায়েবদের হাড় ভাজা ভাজা করে ছেড়েছিলেন , অর্থাৎ  কিনা তাঁদের প্রাপ্য দেনা পাওনা বুঝিয়ে দেন নি । যে সময়ের নথি দেখলাম তাতে বাবু দ্বারাকানাথ Tagore হলেন ‘জুনিয়র ব্রান্চ ‘ যিনি নিমক মহলের দেওয়ান হিসাবে দু পয়সা কামিয়েছেন।
কিন্তু এঁদের নিচেও দুই একটি সারি আছে। তাতে পেলাম আরও দুটি উপশ্রেণী । এক নম্বরে সরকার। পাঠক, এঁদের বাজার সরকার বলে ভুল করবেন না ।

১৮৩৫ সালে Emma Roberts নামে এক মেমসায়েব বলছেন:
The Circars, who may be styled agents of all descriptions are for the most part tolerably well acquainted with the English language; but these men are notorious for their knavery: they live by the extravagance of their employees an the ruin of more than half of Company’s servants maybe traced in the facilities thrown in their way by the supple Circar, who in their zeal for ‘master’ has obtained for him money on credit to any amount.

It would be unjust and ungrateful to withhold the praise honestly earned by many of these men, who have shewn utmost gratitude to employers from whom their gains have been exceedingly trifling consisting of a small percentage upon the articles supplied.
আরো এগোনোর আগে বলে রাখি, আমার ঘোর সন্দেহ “হাত ঝাড়লেই পর্বত” প্রবচনটির উৎপত্তি এই সায়েব-সরকার গোছের সম্পর্ক থেকেই।

 

এর পরের ধাপে কেরাণীকূল। তাঁরা কাছা কোঁচা দুলিয়ে, গালে পানটি পুরে, in white muslin, flowng and graceful, হেলেদুলে আপিসে আসতেন। তাঁরা ইংরাজি বাংলা দুয়েতেই লিখতেন, কিন্তু  very slow in writing and they will not be pushed। এয়াঁরা ছিলেন পাখির ওঁচা পায়রা, কারণ যেকালে ইংরেজ কেরানীর মাইনে ছিল ৮০ তংখা, ফিরিঙ্গি করাণীর ৪০, এই থার্ড ক্লাস বাবুদের মাইনে ছিল ৪ থেকে ১০ তংখা। দু এক কলি ইংরাজি জানা থাকলে আরও ১০ টাকা বেতন বেশি।খুব সম্প্রতি আর একজাতের সন্ধান পেলাম। তাঁরা হলেন ‘ Bubbulias’। এনাদের চিনতাম না। এঁদের সম্পর্কে C.M নামক জনৈক attorney বলছেন:

Be it known that in almost all the attorneys’ offices they are retained,-a Baniyan, a Sircar, a Head Writer – their numerous attendants –a seat also of their dependant apprentices (who pretend to write without salaries ) and to close the pack, the Bringers of Business, the Law-Brokers, the Bubbulias (or promoters of domestic broils)…
(Observations, etc, Upon the State of the Practice in the Supreme Court of Judicature at Fort William in Bengal, Calcutta 1825)

এই বুব্বুলিয়া-রা হলেন শয়তানের বরপুত্র. বড়োমানুষদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে এঁরা খুড়োকে ভাইপো, অথবা ভাইকে ভাইয়ের  বিরুদ্ধে  ফুসলে মামলা বাঁধাতেন তারপর সেই মামলা অ্যাটর্নি আপিসে এনে ১০ শতাংশ দালালি জোগাড় করতেন ।  অনেক অনেক পয়সাওয়ালা  বড়োমানুষদের এনারা পথে বসিয়েছেন ; এইসব বড়োমানুষরা আপনাপন বুদ্ধির দোষে সর্বস্ব খুইয়ে নিজেরাই বুব্বুলিয়া হয়েছেন সে নজিরও আছে।

এসব হলো কোম্পানির আমলের কথা। দেওয়ানচি থেকে কেরাণী, বুব্বুলিয়া, নানা নিধি বাবুদের  যোগদানে যে সমাজটি তৈরী হলো ১৮ শো শতকে, মহারানীর আমলে তাঁদের শ্রেণী চরিত্র পাওয়া গেল বঙ্কিম-এর ‘লোকরহস্যে’:

“যাঁহার বাক্য মনোমধ্যে এক, কথনে দশ, লিখনে শত এবং কলহে সহস্র তিনিই বাবু। যাঁহার বল হস্তে একগুণ, মুখে দশগুণ, পৃষ্ঠে শতগুণ এবং কার্য্যকালে অদৃশ্য, তিনিই বাবু। যাঁহার বুদ্ধি বাল্যে পুস্তকমধ্যে, যৌবনে বোতলমধ্যে, বার্দ্ধক্যে গৃহিণীর অঞ্চলে, তিনিই বাবু। যাঁহার ইষ্টদেবতা ইংরাজ, গুরু ব্রাহ্মধর্ম্মবেত্তা, বেদ দেশী সম্বাদপত্র এবং তীর্থ “ন্যাশনাল থিয়েটার,” তিনিই বাবু। যিনি মিসনরির নিকট খ্রীষ্টিয়ান, কেশবচন্দ্রের নিকট ব্রাহ্ম, পিতার নিকট হিন্দু, এবং ভিক্ষুক ব্রাহ্মণের নিকট নাস্তিক, তিনিই বাবু। যিনি নিজগৃহে জল খান, বন্ধুগৃহে মদ খান, বেশ্যাগৃহে গালি খান, এবং মুনিব সাহেবের গৃহে গলাধাক্কা খান, তিনিই বাবু। যাঁহার স্নানকালে তৈলে ঘৃণা, আহারকালে আপন অঙ্গুলিকে ঘৃণা এবং কথোপকথনকালে মাতৃভাষাকে ঘৃণা, তিনিই বাবু। যাঁহার যত্ন কেবল পরিচ্ছদে, তৎপরতা কেবল উমেদারিতে, ভক্তি কেবল গৃহিণী বা উপগৃহিণীতে, এবং রাগ কেবল সদ্‌গ্রন্থের উপর, নিঃসন্দেহে তিনিই বাবু।“

এনারা নানা কর্মে সুদক্ষ । মদ মোহ মাৎসর্যে কল্কি অবতারের বরপুত্র। ১৮৬০ সালে বটতলায় ছাপা  হরিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘কলির  রাজ্যশাসন’ যে ছবি দেখেছি, তাতে মদ কোন পথে বাবুসমাজে ঘাঁটি  গাড়লো  তার একটা অতি মোটা দাগের ইঙ্গিত আছে: বলা হচ্ছে  , কলির আজ্ঞায় সুরাদবী কালাপানি পেরিয়ে  গোরাদের বশ করেন। তারপর  সেই নেশা এসে পড়ে টাউন কলকাতায়।

সুরা কন ক্ষমা কর           এ দাসের দোষ ধর
এ জন্মে সাধিব তবে কার্য   ।।
আনি দেহ ইস্টিমার            হইয়া সাগর পার
বশ করি আসি সেই রাজ্য ।।
শুনে কলি দেন  সায়            আজ্ঞা  পেয়ে মদ যায়
উপনীত বিলাত নগরে ।।
ছুটিল সৌরভ তার                   পেয়ে সেই সমাচার
জয়ধ্বনি প্রতি ঘরে ঘরে ।।
চোলে যেতে টলে পদ                 হয়ে ভাবে গদগদ
আধো আধো বচনে বচন ।।
মাতিল যতেক গোরা                 যেন নদিয়ার গোরা
নদে ছেড়ে বিলাত গমন ।।

পাইয়া সুরার তার             নানা নিধি নাম তার
রাখিলেন ইংরাজ সকল ।।
ব্র্যান্ডি আর ওয়াইন         সুধার শ্যাম্পেন  জিন
যার গন্ধে ক্ষিতি টলমল ।।

এই  কলির কেচ্ছায় কালাপানি পেরিয়ে যে মদের নেশা সাহেবদের মধ্যে গিয়ে ঢুকলো, সেই নেশা এবার  ফিরে এলো কলকাতার বাবুসমাজে । বাবু হরিপ্রসাদের নক্শাখানি খুব উচ্চ সাহিত্য না হলেও তার বক্তব্য  খুব ফেলে দেওয়ার মতও নয়।

রবার্ট ক্লাইভএর আমল থেকেই যে সব Punch  House কলকাতায় গজিয়েছিলো তার বিবরণ যা পাওয়া যায় তাতেই এর প্রমাণ । তবে কিনা এইসব গরিব রাইটার সাহেবদের অত বিয়ার শ্যাম্পেন খাওয়ার রেস্ত ছিল না তাই আরক সিরাজ এইসব সস্তার মদ মিলিয়ে জুলিয়ে তাঁদের কোনো মতে চলতো । যাঁরা সাহেবদের ধামা ধরলেন, সেই সব বাবুরা এই গুণটি ভালো মতো রপ্ত করলেন। গাঁজা ভাং আফিম তো ছিলই, তার ওপর জুটলো মদ । পাঠকরা যদি এ  বিষয়ে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করতে চান, তাহলে টেকচাঁদ ঠাকুরের ” মদ খাওয়া বড় দায় মদ খাওয়ার কি উপায়’ (১৮৫৯)  বইখানি জোগাড় করে পড়বেন। তাতে তিনি লিখছেন:  “কলকাতায় যেখানে যাওয়া যায় সেখানেই মদ খাইবার ঘটা। কি দুঃখী, কি বড় মানুষ, কি যুবা, কি বৃদ্ধ সকেলই মদ্য পাইলে অন্ন ত্যাগ করে”। আমোদের খোরাক এই বইয়ে আরও আছে কিন্তু দেখছি আমার এই লেখাটি একটি quote শাস্ত্র হয়ে পড়ছে তাই লোভ সংবরণ করলাম ।

শ্বেতচামরে ঘর ঝাড়িবে
নাচবে খ্যামটা স্বর্ণবাই৷৷

 

2013GL0450

এবার আবার বঙ্কিমে ফিরি। তিনি বাবুকে define করলেন বটে, কিন্তু তাঁর তত্ত্বে ছ্যাঁদা থেকে গেল। সমস্ত গুণাগুণ এক আধারে মিশে যে পাম্প শু পরা কালিঘাটের পটমার্কা  বাবুটির ছবি তিনি আঁকলেন,  তাতে মুড়ি মিছরি সব এক বর্ণ, এক জাত। উচ্চবর্ণ বাবু, অর্থাৎ কিনা খাজাঞ্চী, দেওয়ানজি স্থানীয় কুলীন বাবুদের lifestyle আর কেরানী মুহুরী বাবুদের lifestyle যে এক হবেনা, সে ভালো বোঝালেন না। পাঠক, এইবার এই ছবিখানি বিবেচনা করুন। এনারা হলেন বাবু সমাজের ব্রাহ্মণ:
উচ্চবর্ণ বাবুরা, অর্থাৎ নায়েব দেওয়ান জাতীয়রা, তাঁরা সকালবেলা শুদ্ধ হয়ে কিছু লোকজনের সঙ্গে মোলাকাৎ করেন, তাঁর পর তাঁরা যে সকল তৈল মর্দনে “সুখানুভব” হয়, তাহা দ্বারা স্নান সমাপন . তার পর হলো “পূজা হোমদান”। ভোজন করতঃ কিঞ্চিৎ বিশ্রাম ( সায়েবদের deshabillé  siesta)  অতঃপর “অপূর্ব পোষাক জামাজোড়া ইত্যাদি গায়ে ছড়িয়ে “পালকী বা “অপূর্ব শকট আরোহনে  কর্মস্থলে গমন.  কাজ কর্ম সারা হলে বাড়ি ফিরে গঙ্গা জল স্পর্শ করে শুদ্ধ হওন এবং তৎপরবর্তী কালে কিঞ্চিৎ জলযোগান্তে , সান্ধ্য মজলিশ  বা স্বজন বন্ধু অথবা সায়েবদের সাক্ষাৎকার হেতু গমন। এই গমনের অমিত সম্ভাবনা।
পাঠক,  মনে রাখবেন যে এই সময়টা থেকেই সায়েবদের তাড়া খাওয়া গুটি কতক নবাব সুলতান গোছের লোক কলকাতায় বাসা বেঁধেছিলেন. তাঁদের কল্যাণে যেমন অনেক খেমটাওয়ালী বেগম হয়েছিলেন , (হুতোম উবাচ) তেমনি পিল পিল করে  কিছু বাইজি  মুর্শিদাবাদ, বেনারস, লখনৌ, মহীশুর থেকে কলকাতার ঘাটে এসে ঠেকেছিলেন। শোনা যায়  মীরজাফরের আমলের শেষে এক বড়োমানুষ মুর্শিদাবাদের নিক্কি বাই কে এক হাজার টাকা মাস মাইনেতে বাঁধা রেখেছিলেন। এছাড়া ঐ একই সময়ে কোনো এক বাবু রূপলাল মল্লিক সারা রাত ব্যাপী মেহফিলে তাঁহা তাঁহা বাঈজী জড়ো করেছিলেন। সেই মেহেফিল এ মহামান্য সদাশয় সাহেবরাও যোগদান করেন। এ বাদে চিৎপুর আদি জায়গায় সান্ধ্যভ্রমণের জায়গার অভাবও তো ছিল না, যদি ট্যাঁকে দু পয়সা থাকে ।  এ সময়ে আবার দেবী বাই, হরিমতি বাইয়ের মতো  কিছু হিন্দু মেয়েও বাই হিসেবে নাম কিনেছিলেন । বিশ শতকের প্রথম দিকেও তাঁরা মুজরো করতেন। এছাড়া অধিকন্তু ন দোষায় রইলো  বাড়ির নিকট এবং লতায় পাতায়, নিরাশ্রয় আত্মীয়ারা । বিশেষতঃ অনাথা বিধবা এবং পতিপরিত্যক্তা সধবারা।
কথা ছড়িয়ে যাচ্ছে ।এইবার সব একত্র করি ।বলেছিলাম বঙ্কিম বাবুর তত্ত্বের ছ্যাঁদার কথা ।  এই যে ব্যাখ্যান টি দেওয়া হলো এনারা হলেন বঙ্কিমের বর্ণনার আধখানা । এঁরা ইতালিয়ান মার্বেল দিয়ে মেঝে তৈয়ের করেন, বাগানে পরী রাখেন । এঁদের পুত্র পৌত্রাদি কালেজে ইংরাজি পড়ে লন্ডন শহরকে ধরাধামে নামিয়ে আনেন। এঁরা হলেন কেনারাম রাজারাম বেচারাম ক্লাস। এক পুরুষ দালান দেন। এক পুরুষ সে দালান ভোগ করেন আর একপুরুষ সব বেচে খেয়ে ডুগডুগি বাজিয়ে বেড়ান।
এর পরের inferior ধাপে সরকার, মুহুরী কেরানি জাতীয় ‘সেলাম সায়েব, জো হুজুর’ রা । এঁদের ট্যাঁকের জোর কিছু কম। তা বলে, শ্রী বিনয় ঘোষের ভাষায়, এঁদের “করুণ ক্যাবলা” মনে করার কোনও কারণ নেই। এঁদের সান্ধ্য ভ্রমন হত যেখানে সে জায়গা নিয়ে আগের লেখায় বলেছি । । কিন্তু দেখা গেল তাও যথেষ্ট নয় । এরপর তাঁরা উড়েনি, নাপতিনি, মালিনী, নেড়ি (বোষ্টমী) “সহচরী দাসীরূপা”দের শরণাপন্ন হতেন অতিরেক (এক্সসেস) সাপ্লাই এর জন্যে । এ সকল বৃত্তান্ত পেয়ে ধন্য হই শ্রীযুক্ত বাবু ভবানী চরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “কলিকাতা কমলালয় ” (১৮২৩) নামক প্রামাণ্য গ্রন্থে।
ওই বইয়ে নাপতিনি ভ্রষ্ট চরিত্রা কুলরমনীদের একটি লিস্ট তুলে ধরেন:অমুক রায়ের মাগ, পালের বহু, দাসের ভগিনী , সুবোধ দত্তের বৌ, অমুক সাহার কন্যা … কিন্তু ব্রাহ্মণ বাড়িরই কথা উঠতেই একজন বলে ওঠেন:

যদ্যপি দ্বিজনারী দ্বিচারিনী হয়
শূদ্রাদির মাতৃতুল্যা গমনীয় নয় ।।
ব্রাহ্মণীর মন্দকথা এনো না কো মুখে
ইহ পরকাল ক্লেশে যাবে রবে দুখে ।।

তাঁকে নাপতিনী বোঝাচ্ছেন যে কলকাতার বাজারেএখন কোনও লঘুগুরু নেই।

কেহ হরে মাসিপিসী জানিল তা প্রতিবেশী
মামী হরে বিশ্বরূপ আশ ।।
ভাদ্রবধূ হরে কেহ কহি যদি মনো দেহ
আছে বড়বাজারে প্রকাশ ।।
খুড়ি না শাশুড়ি বাছে শুনি অনেকের কাছে
আর বহু বাজারে শুনিবে ।।

যদি প্রশ্ন করা হয়  এত সামগ্রী কোথা থেকে বাজারে আসত , তাহলে বলবো  যে অন্দরমহলে বাবুরা  যাওয়ার সময় পেতেন না সে অন্দরমহলে এই সব নাপতিনি মালিনীদের নেড়িদের যাতায়াত ছিল। বিষবৃক্ষর হিরে দাসী আর হরিদাসী বৈষ্ণবী কে পাঠকের মনে আছে কি?  ১৮৫৩ -র হিসাব অনুযায়ী কলকাতা শহরে তখন সাড়ে চার লক্ষ জন সংখ্যার বারো হাজার ই বেশ্যা , তার মধ্যে দশ হাজারের কাছাকাছি  কুলীন সধবা অথবা অল্পবয়েসী বিধবা । অন্দরমহলের এনারা হলেন নন রেজিস্টার্ড উদ্বৃত্ত ।

এইবার ঢুকে পড়লাম বটতলায়। শস্তা গণ্ডার চটি বইয়ের বাজারে। যদি জিগ্যেস করা যায়  ‘বাবু বটতলায় ক’বার যায়?’ সঠিক উত্তর হবে  ‘বারবার’। এপাড়ায় পাঁজি মেয়েদের ছড়া পাঁচালি ছাড়াও যা বস্তুটি ছাপা হ’ত তাঁকে ভদ্রভাষায় বলা হয় যৌনসাহিত্য।  আমি কিনা দুপাতা ইংরেজি পড়া ফিমেল, তাই দুই একখানা পড়ে মনে হ’ল এর আদৎ ঝাঁঝ পরভৃৎ উপভোগে।  পরভৃৎ উপভোগ ‘  এর মত nasty  gibberish’  যদি কেউ না বোঝেন  , Voyeuristic  pleasure কথাটি নিশ্চিৎ বুঝবেন।

bidhaba

উপরোক্ত বাবুর দূতীবিলাসের (১৮৬০) এই দৃশ্যটি দেখুন:

সুস্বর অনল সম সন্তাপ জন্মায় ।
সুস্থির রাইতে নারে পরে ছাতে যায় ।।
মলয়  মারুত  তাহে লাগে  তার গায়।
অস্থির  হইয়া  কামে  চারিদিক চায় ।।
অন্য  মৌথপরি  নারী  দন্ডাইয়া ছিল ।
অর্ধেক শরীর তার দেখিতে পাইলো ।।
সুন্দরীর মুখ চক্ষু গুণ নিরখিয়ে ।
বিতর্ক করিছে কত কামেতে মজিয়ে ।।
ছাতে পুনর্বার আর তারে না দেখিয়া ।
বারান্দায় বৈসে আসি মলিন হইয়া ।।

দেখা যাচ্ছে নায়ক তাঁর  অপরিতৃপ্ত “সন্তাপ” জুড়োচ্ছেন গেরস্থ বাড়ির ছাদে উঁকিঝুঁকি দিয়ে। কিন্তু আরও ক’টি Peeping Tom কে আমরা দেখলাম বইয়ের পাতার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে সেই দৃশ্য চাখতে।  পালিশ ষষ্ঠীর বাবুকে পাঠকদের মনে আছ কি? বঙ্কিম বাবু আলগা  করে “একখানি অপকৃষ্ট অশ্লীল এবং দুর্নীতিপূর্ণ অথচ সরস পুস্তক”  বলে ছেড়ে দিলেন কিন্তু  সেই রসের দমক টি আমরা দেখলাম।

একদল পন্ডিতের মতে ব্রাহ্ম ধর্ম আর জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক জোয়ার নাকি  বাবুদের অপকৃষ্টি ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেছিলো । বটতলা হাতড়ে আমার তেমনটি  মনে হলো না ।এই vicarious ‘গুপ্তকথা’র  চাহিদা দেখলাম বিশ শতকর গোড়াতেও চালু ছিল। ক’টি  নাম বলি:

পতিত-পতিতার গুপ্তকথা , পীর-মোহান্তর গুপ্তকথা , ভাশুর-ভাদ্রবধূর গুপ্তকথা , জামাই শাশুড়ির গুপ্তকথা , নফর-মালকিনের গুপ্তকথা , বাবু -বিবির গুপ্তকথা   আরও নানাবিধ. বিশ শতকে  ঝাঁকা মুটে এসব মাথায় করে দুই পয়সায় বেচতো কিনা বলতে পারিনা কিন্তু  দেখলাম ১৯০৪ এও এই ধারাটি বেশ ভালোই বয়ে চলেছে ।

বাবু ভুবন চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের  হরিদাসের গুপ্তকথার   (১৯০৪)  থেকে সামান্য একটু খানি বলি:

” দিবাশেষের বসন্তের শীতল বাতাস ধীরে ধীরে প্রবাহিত হচ্ছিলো, বায়ূস্পর্শে আমি সুখানুভব কোচ্ছি, পল্লীর দুই ধারে নুতন নুতন দৃশ্য দর্শন কোচ্ছি , নয়ন পুলকিত হোচ্ছে . নুতন দৃশ্যাবলীর মধ্যে এক দৃশ্য আমার কাছে খুব নুতন … ।“

এইটুকুই শুধু বলবো এই যে, যা হরিদাস দর্শন ‘কোল্লেন’  তা হ’লো নানা জাতের কাঁচুলি শোভিত হিন্দু বাইজি আর যা তিনি বাকি বইয়ে কোল্লেন তা ঘুলঘুলি দিয়ে বাবু পাঠকরা দেখতে পেলেন বই কি!

বটতলা খানিক ঘুরেছি।  ‘গুপ্তকথা’ র মত আর একটি ধারা দেখেছি প্রহসনের। ১৮৯৮এ বাবু রাখালদাস ভট্টাচার্য র ‘সুরুচির ধ্বজা’ তে এক বাবু কে দেখলাম । তিনি সেই ইংরিজি বিলাসী বাবু, যাঁকে আমরা অশ্লীল বই পড়তে দেখেছিলেম বঙ্কিমের ‘লোকরহস্য’ তে । তিনি তাঁর এক ইয়ারের কাছে দুঃখ কচ্ছেন যে তাঁর স্ত্রী হ’লো damn nasty creature না পারে নাচতে, না পারে গাইতে , না পারে ইংরাজিতে দুটো কথা কইতে । Gentleman এর society তে move করতে জানেনা। তিনি পরিত্রাণের উপায় খুঁজছেন। তার  ইয়ার তাঁকে আশ্বাস দিচ্ছেন, একজন enlightened, a mere girl of twenty five তাঁদের সমাজে join করেছে। সে আবার very beautiful । তিনি তাকে “যোগাড়” করবেন।  সমাজটি যে ব্রাহ্ম সমাজ তা আশা করি পাঠক বুঝবেন।

অলমিতি বিস্তারেণ।

Epilogue

Robi Belraus
( Belarauser আঁকা তরুণ রবীন্দ্রনাথ)

১৮০০- থেকে ১৯০০’র এইসব জঞ্জাল ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ মনে পড়ে গিয়েছিলো, ঐ একই যুগে, ১৮৭৯তে একটি তরুণ, “মেঘলাদিনের ছায়াঘন অবকাশের আনন্দে”, অন্তঃপুরের কোণার ঘরে শ্লেটের ওপর উপুড় হয়ে লিখেছিলেন ‘গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে…”  তিনিই সে যুগের সেরা বাবু। তিনি এলে সূর্যোদয় হয় । তাঁর গান বুঝে না বুঝে  গলায় তুলে নেন  আশ্চর্যময়ী দাসী, মানদাসুন্দরী, পূর্ণকুমারী দাসীরা… কিন্তু সে আর এক ভাব, আর এক সময়ে ।

বটতলা তখনও হাজারো বাবুকে ছায়া দিয়ে চলছে ।

Featured Image: https://www.google.ca/search?q=Babu+Kalighat&tbm=isch&tbo=u&source=univ&sa=X&ved= Tagore: A rare painting of Young Tagore by Belarus https://www.pinterest.com/pin/317644579947327661/

Posted in Uncategorized | Leave a comment