গড়গড়ার মা’লো সপ্তম পরিচ্ছেদ: নাটুকে বাবু এবং মন্দ স্ত্রীলোক ( ১)

GARGARA BABU NATAK

 

১/ রাজারাম সম্বাদ

কদিন আগেই বাবুয়ানি নিয়ে দু চার কথা বলেছিলাম। তাতে  একজায়গায় লিখেছিলাম বাবুয়ানির তিন পুরুষ হলো কেনারাম রাজারাম, বেচারাম।  ১৮৫৭র আশ পাশ হলো রাজারামদের যুগ । তাঁরা বাপ পিতামহের দুই পয়সা পেলেন, হিন্দু কলেজে  গিয়ে বাবু হলেন । এরই মধ্যে যাঁরা  আলালের ঘরের দুলাল হয়ে উঠতে  পারলেন না তাঁরা নাট্যশালায় further  এনলাইটেনমেন্ট এর উপায় খুঁজে পেলেন । ১৮৫৭ সালে দেখা গেল তিন বাবু নাট্যশালায় মজলেন । ১৮৫৭ তে লখনৌয়ের বাদশাহ যখন তাড়া খাচ্ছেন তখন একই সঙ্গে তিন তিনটে  নাট্যশালা একসঙ্গে শুরু হতে দেখা গেল. সাতু বাবুর (আশুতোষ দেব) সিমলার বাড়িতে  বাবু নন্দকুমার রায়ের অভিজ্ঞান শকুন্তলের  অভিনয় ৩০সে জানুয়ারী।  মার্চ মাসে বাবু রামজয় বসাকের বাড়ি রামনারায়ণ তর্করত্নের  ‘কুলীন কুলসর্বস্ব’ , এবং বাবু কালীপ্রসন্ন সিংহের বিদ্যোৎসাহিনী সভার উদ্বোধনে ওই একই ‘নাটুকে রামনারায়ণ’এর ‘বেণী সংহার’ নামানো হয় ১১ই  এপ্রিলে. তার আট বছরের মধ্যেই  মধ্যেই দেখা যাচ্ছে মেট্রোপলিটন   থিয়েটার (১৮৫৯)  শোভাবাজার রাজাদের  প্রাইভেট থিয়েট্রিক্যাল সোসাইটি  (১৮ই জুলাই ১৮৬৫) বাবু যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের  পাথুরিয়াঘাটা  বঙ্গনাট্যালয় (৩০শে ডিসেম্বর ১৮৬৫)  এবং যারে কয় last but not least, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাবুদের  নাট্যশালা (জানুয়ারী ১৮৬৭) এবং বাবু বলদেব ধর ও চুনিলাল বসুর  বহুবাজার বঙ্গ নাট্যালয় (১৮৬৮)  ।

শুরুরও শুরু থকে। সর্বনাশের  গোড়াপত্তন যে Hindoo এনলাইটেনমেন্ট এ সে ব্যাপারটি পরিষ্কার। একটি পোকায় কাটা বইএর পাতা উল্টে দেখি ১৮৩৭ ২৯শে মার্চ গভর্নমেন্ট হাউসে  হিন্দু কলেজের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে  ছাত্র বাবু রা Shakespeareএর খানিক খানিক অভিনয় করেন ।  এরপর দেখছি ১৮৫১র ৭ ই অগাস্ট  বট তলায় ডেভিড হেয়ার  একাডেমী শুরু হয়  হাটখোলার বাবু গুরুচরণ দত্তর উদ্যোগে। , ১৮৫৩ তে সে একাডেমির হিন্দু ছাত্র রা শেক্সপিয়রের মার্চেন্ট অফ ভেনিসের Act  IV Scene One  এর আবৃত্তি করেন।সমাচার দর্পন তার actor দের তালিকা ছেপে বেশ ফলাও  করে খবরটি ছাপিয়েছিল. অভিনেতার আলীকে দেখলাম Portiar  ভূমিকায় Obhoychurn Bose. Nerissaর ভূমিক।য় Rajendranarain Mitter  আর Nelly Gray র ভূমিকায় Gobinchunder Dutt ।

আলোকপ্রাপ্ত  রাজা রামরা যে ঐ সময় থেকেই নাট্য রঙ্গে মজেছেন তা  জানা গেল । তবে কিনা নারী চরিত্রে অভিনয় করার জন্যে যে ব্যাটাছেলে ছাড়া গতি নেই তা জলবত্তরলম্ । নব্য বাবুরা  তাতেই খুশি। মেয়েমানুষ যে পাড়ায় গেলে পাওয়া যায় সে পাড়ায় যায়ই বা কে, তাদের  স্কুলের বাবুদের সঙ্গে অভিনয় করতে দেওয়ার মত নিঘিন্নে কাজই বা করে কে। অতএব, Obhoychurn বিনে গতি নেই। ছোটবেলায় শোনা মায়ের ছোটবেলার গল্প মনে পড়ে গেল, সেটা এই ফাঁকে  বলে নিই। মায়েদের ছোটবেলা তে  পাড়ায় পাড়ায় যাত্রার পালার চল ছিল  সেটা প্রাক স্বাধীনতা যুগ. মায়ের কাছেই শুনেছি দুর্গাবাড়ি তে যাত্রা হলে বড় দাদা কাকাদের সঙ্গে বাড়ির ছোট মেয়েদের যাত্রা দেখতে যাওয়ার অনুমতি মিলতো । যত না উৎসাহ ছিল যাত্রা দেখার, তার চেয়ে অনেক বেশি রোমাঞ্চ ছিল  চট দিয়ে ঢাকা গ্রীন রুম এ উঁকি দেওয়াতে। “ওই দ্যাখ, সীতা  বিড়ি খাচ্ছে” বলে অধিকারী মশাইয়ের তাড়া খাওয়ার গল্পও মায়ের মুখেই শোনা। পালার নাম ছিল ‘সীতার বনবাস’।যাকগে, কথাটা এই জন্যে বলা যে বালক নটীদের দেখে মায়ের দেখা ধূমপান রত সীতাকে মনে পড়ে গেছিলো। এবার আসল কথায় ফিরি।

সায়েবদের থেকে মদ ছাড়াও বাবুরা পেয়েছিলেন শেক্সপীয়ার । সে বেশ সকাল সকালই  পেয়েছিলেন দেখা যাচ্ছে ।  তাঁরা ইংরিজি নাটক দেখতে বেশ যেতেন, এমনকি অভিনয় ও যে করতেন এক আধটু সে ও  শুনলাম। দুই চার পত্রিকাতে সে সবের রিভিউ ও বেরোতো ।  কিন্তু আমার ওসব উচ্চ বিষয়ে মন নেই  আমি খালি বাজে জিনিস  খুঁজে বেড়াই । ১৮৪৮  সালে Sans Souci থিয়েটার এ  ‘ওথেলো’ র অভিনয় হয়। ২১ শে অগাস্ট ‘সংবাদ প্রভাকর’ লেখে:

“গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর সান্শশি  (Sans Souci) নামক থিয়েটারে বেশ সমারোহ হইয়াছিল , বহুদিবস হইলো ঐরূপ সমারোহ হয় নাই , কলিকাতা ও অন্যান্য স্থানের সাহেব ও বিবি এবং এতদ্দেশীয় বাবু  ও রাজাদিগের সমাগম  দ্বারা নৃত্যাগারের শোভা  অতি মনোরম হইয়াছিল […] এতদ্দেশীয় নর্তক বাবু বৈষ্ণবচাঁদ আঢ্য ওথেলোর ভঙ্গি  ও বক্তৃিতার দ্বারা সকলকে সন্তুষ্ট করিয়াছেন, তিনি  কোনো রূপে ভীত অথবা কোনো ভঙ্গির অবহেলন  করেন নাই, তিনি চতুর্দিগ হইতে ধন্য ২  শব্দ শ্রবণ করিয়াছেন এবং তাহার উৎসাহ ও সাহস বদ্ধমূল হইয়াছে , যে বিবি ডেসডিমোনা হইয়াছিলেন তিনিও বিলক্ষণ প্রতিষ্ঠিতা হইয়াছেন..” ।

এর পরে আরও খানিক নাট্য সমালোচনা আছে বৈষ্ণব চাঁদ আঢ্যর  অভিনয় নিয়ে , কিন্তু ওই যে বললাম আমি খালি বাজে খবর খুঁজে মরি, আমার নজর পড়লো ‘বিবি’ ডেসডিমোনার ওপর।  খানিক চিন্তা করলাম এই বিবি কোনও ইহুদি বিবি কিনা, কারণ তাঁদের সৌন্দর্য বিষয়ে দু চার কথা ‘সধবার একাদশী’ তে নিমচাঁদের মুখে শুনেছিলাম বটে । কিন্তু পরে দস্তুরমতো চিন্তা করে দেখলাম সেইসময় কিছু ইংরেজ বিবির কলকাতায় গতায়াত হয়েছিল । বামাবোধিনী বিবি শিক্ষয়িত্রী রেকমেন্ড করছে, সে কথা আগেই বলেছি।  নাট্যজগতেও দুই বিবির খোঁজ পেলাম ; মিস এলিস  আর মিসেস গ্রেগ । মিস এলিস এর খবরটি বেশ চমকপ্রদ । ১৮৫৩ ৬ই অগাস্ট ‘সংবাদ প্রভাকর’ বলছে:

 

অবগতি হইলো ওরিয়েন্টালি ছাত্ররা এক প্রকান্ড ভাণ্ড কান্ড ফাঁদিয়াছেন , এতদিন মেন্ Clinger সাহেব একাকী অধিকারী হইয়া বিলিতি যাত্রার উপদেশ দিতেছিলেন । এইক্ষণে এক শ্বেতাঙ্গি শ্ৰীমতী তাহার অধিকারিণী হইয়াছেন , ইহার নাম ইলিস, যিনি আসিয়া ভাব ভঙ্গির শিক্ষা প্রদান করিলে নাটকের আরো চটক পড়িবেক্ ।

(এই বিবি এলিসের গড়ের মাঠে ‘নৃত্যাগার’ ছিল এবং ১৮৫১র ২৬শে এপ্রিল  সংবাদ প্রভাকর জানাচ্ছে যে সেই নৃত্যাগার  ‘পবন ঠাকুরের কৃপায় পতিত হইয়াছে’।)

 

যাই হোক, চটক কতটা পড়িয়াছিল বলা যায় না  তবে বিলিতি বিবিদের যে প্রথম যুগের নাট্যশালায় যাতায়াত ছিল, তা দেখাই যাচ্ছে ।  ১৮৫৪ ১৭ই মার্চ  ওরিয়েন্টাল থিয়েটার, ২৬৮ গরানহাটা, চিৎপুরে রোড এ মার্চেন্ট অফ ভেনিস আবার পেশ করা হয় . এবার Portiar ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে মিসেস গ্রেগ কে। The Bengal Harkaru জানাচ্ছে “that will be her last performance and indeed the close of her last day’s  sojourn in Bengal.” এই সব বিবিদের সুখ দুঃখের কথা লিখবো কোনো একসময় । এনারা ছিলাম মহারানীর আমলের ‘Cargo ‘… জাহাজ ভর্তি হয়ে এঁরা এদেশে আসতেন, ভাগ্য খুঁজতে. কেউ বা গরিব বাপের মেয়ে, বর জোটেনি,তাই চলেছেন বিদেশে  বরের খোঁজে,  কারোর স্বামী ছেড়ে গেছে অথবা কোনো লম্পট বদমাইশের হাত থেকে পালিয়ে তাঁরা নতুন দেশে নতুন জীবন খুঁজছেন । যাঁদের ভাগ্যদেবী  নতুন দেশেও  মুখ ফিরিয়ে নিতেন, তাঁরা আবার ‘Returned Cargo হয়ে ফিরে যেতেন নিজেদের দেশে । মিসেস গ্রেগ তেমনি কেউ ছিলেন কিনা কে জানে…

***

বাবুদের নাট্যশালায় ফিরি। ১৮৫৭ জুলাই মাসে সাতুবাবুর প্রাসাদে  ‘অভিজ্ঞান শকুন্তল’ র অভিনয়ে নারীচরিত্রে তখনও বাবুদের রবরবা। Cast list টি দেখলাম ।

শকুন্তলার ভূমিকায় ছাতু বাবুর পৌত্র বাবু শরৎ চন্দ্র দেব ।

অনসূয়া: অবিনাশ চন্দ্র ঘোষ।

প্রিয়ম্বদা : ভুবনমোহন ঘোষ ।

অভিনয়ের পরে এক বাবু জানালেন: “যখন বিশ হাজার টাকার অলংকারে মন্ডিত হইয়া  শরৎবাবু দীপ্তিময়ী শকুন্তলার রানিবেশ দেখাইয়াছিলেন  তখন দর্শকবৃন্দ চমৎকৃত হইয়াছিলেন”।
মনে মনে ভাবলাম, হইবেনই ।  আশ্রম বাসিনী শকুন্তলার বিশ হাজারী ঠমক দেখে দর্শক কুল  ভিরমি যে খাননি সেটা শরৎবাবুর কপালগুণ ।এধারে আমি নিরন্তর কাস্ট লিস্ট  খুঁজে চলেছি আর বাবুদের অবলোকন করছি.. বাবু যতীন্দ্র মোহন ঠাকুরের পাথুরিয়া ঘাটা বঙ্গ নাট্যালয়ে  ১৮৬৬ তে  ‘বিদ্যাসুন্দর’ নাটকের অভিনয় হয়. তার কাস্ট লিস্টটিও দেখলাম:

বিদ্যা: মদনমোহন বর্মন (খোট্টা)

হিরে মালিনী:: শ্রী কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায়

সুলোচনা চপলা (রাজকন্যার দাসী ) : শ্রী  ষষ্ঠীদাস মুখোপাধ্যায় , শ্রী যদুনাথ ঘোষ, শ্রী হরকুমার গঙ্গোপাধ্যায়

বিমলা: শ্রী নারায়ণ চন্দ্র বসাক ।

 

২/ অভিনয়ে পূর্ণ হলো কলিকাতা ধাম

 

Michael

 

পিছিয়ে এলাম ১৮৫৯ এ । তার একটি বিশেষ কারণ আছে। ১৮৫৯ সালে বঙ্গরঙ্গমঞ্চ জমজমাট। জনৈক রামদাস সেন ১০ই মে সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়ে ছড়া কাটলেন:
নিত্য নিত্য শুনতে পাই অভিনয় নাম।

অভিনয়ে পূর্ণ হলো কলিকাতা ধাম ।।

হায় কি সুখের দিন হইলো প্রকাশ ।

দুঃখের হইলো অন্ত সুখ বারোমাস ।।

দিন  দিন বৃদ্ধি হয় সভ্যতা সোপান ।

দিন দিন বৃদ্ধি হইলো বাংলার মান ।।

হায় কি সুখের দিন  হইলো উদয় ।

এদেশে প্রচার হলো নাট্য অভিনয়।।

 

এবার পাইকপাড়ার রাজাদের কথা পৃথকভাবে না লিখলে অপরাধ হবে। তাঁদের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়ির নাট্যশালায় বড় বড় মানুষের পায়ের ধুলো পড়তো। রাজা গজারা ছাড়াও তাঁদের বেলগাছিয়া নাট্যশালায় যাঁরা যেতেন তাদের মধ্যে ছিলেন বাবু  প্যারীচাঁদ মিত্র , শ্রীযুত পন্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর , পন্ডিত রামনারায়ণ তর্করত্ন । বাংলাদেশের ছোট গবের্নের  শ্রীযুক্ত মান্যবর হেলিডে সায়েবেরও নাম পাওয়া গেল । কিন্তু আর একটি গুরুতর  কারণে এই নাট্যশালা বিশিষ্ট । এই মঞ্চে রামনারায়ণ তর্করত্নর ‘রত্নাবলী’ নামে যে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়, তা দেখে মোহিত হয়েছিলেন  মাইকেল মধুসূদন দত্ত  নামধারী একজন বিলেত ফেরত বয়ে যাওয়া বাবু ।  তিনি তখন সদ্য সদ্য মাদ্রাজ থেকে কলকাতা এসেছেন এবং কলকাতা পুলিশ আদালতে কেরাণীর চাকরি নিয়েছেন । তাঁর আর্থিক অবস্থা যে কি ছিল সে বাংলাদেশের তাবৎ মানুষ জানেন, ও নিয়ে বেশি বলার প্রয়োজন দেখিনা।  তা সেই অবস্থা থেকে তাঁর উদ্ধার পরিকল্পে  তাঁর বন্ধু বাবু গৌরমোহন বসাক তাঁর সঙ্গে এইসব বড়োমানুষদের পরিচয় করিয়ে দেন। রত্নাবলী নাটক দেখতে যে সব সায়েব সুবো আসতেন, তাঁদের জন্যে এক খানি ইংরিজি অনুবাদ  প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, পাইকপাড়ার রাজা শ্রীযুত প্রতাপ চন্দ্র সিংহ বাহাদুর সেই অনুবাদটির বরাত তাঁকেই দেন। পাওনা ধার্য্য হয়েছিল ৫০০ টাকা।

এই রত্নাবলী  নাটক দেখেই পুলিশ  কোর্টের কেরাণীর নাটক লিখতে সাধ গিয়েছিলো । ফলশ্রুতি স্বরূপ ‘শর্মিষ্ঠা’  এবং বঙ্গসাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দর তোলপাড় ।

কিন্তু আমরা এখানে মাইকেল গাথা রচনা করতে বসিনি । পাঠক যদি এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ চান তবে পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ বইটি পড়বেন. আরাম পাবেন. যাইহোক, শর্মিষ্ঠার অভিনয় হলো এবং কশ্চিৎ রাজা ঈশ্বর চন্দ্র সিংহ বন্ধু গৌরদাস বসাক কে যে Dramatis Personae খানি পাঠালেন তাতে দেখা গেল:

Debjani: Hemchunder Mookerjee
Sharmista: Krishtodhon Banerjea (a new comer)
Purnika: Kally Das Sandel    (formerly our dancing girl)
Dabika: Aghor Chunder Dhagria
Notee: Chunilal Bose  (as before)
Maid Servant: Kally Prasanna Mookerjee
Dancing Girls: Same as before plus Bankim chunder Mookerjee.

একটি ব্যাপার দেখে বড় আশ্চর্য্য হলাম. ১৮৫৯-১৮৬৬ নাক উঁচু উচ্চবর্ণের বাবুরা ‘মেড়ো আর ‘খোট্টা’দের সঙ্গে  অবলীলায়  নাট্য কর্ম করেছেন , কোথাও বাধেনি।  বোধ করি এই সব মেড়ো ও খোট্টা পথ ভুলে হিন্দু কলেজ বা সমগোত্রীয় কোনো কলেজে মনোভুলে ঢুকে পড়েছিলেন, তাতেই ভাগ্যক্রমে এঁদের  কুলীন সংসর্গ হয়েছিল… লিখতে লিখতে আমার দিদিমার কথা মনে পড়ে গেল । তিনি তাঁর এক বৈবাহিককে আজীবন ‘স্যান্ডেল মশাই’ বলে সম্বোধন করতেন, ছোটবেলায় এ নিয়ে তাবৎ মজা পেতাম । উটি যে আদতে বিলিতি লব্জ তা জেনেছিলাম বহু দিন পরে।

kalighat-patachitra-paintings-exhibition.JPG II

৩/ কুম্ভদাসী, পরিচারিকা, কুলটা, স্বৈরিণী, নটী, শিল্পকারিকা প্রকাশবিনষ্টা রূপাজীবা গণিকাচেতি বেশ্যাবিশেষাঃ
                                                                                                  কামসূত্র

 

এখন আমি যে কথাটি বলতে চাইছি তাহলো থিয়েটার এ ১৮৫৫-৫৭ র আগে স্ত্রীলোকের আমদানি হয়েছিল কিন্তু তাঁরা ধোপে টেকেন নি। দাড়ি-চাঁছাদের দিয়েই নাট্যমোদীদের সন্তুষ্ট রাখা হচ্ছিলো তার কারণ সুশীলরা দুষ্প্রাপ্য এবং দুঃশীলাদের ছোঁয়াচ বঙ্গ সমাজের ন্যায়বাগীশরা তেমন ভালো চোখে দেখেন নি।

বাবু নবীন চন্দ্র বসুর এমনি বুকের পাটা যে ১৮৩৫  তাঁর নাট্যশালার  বিদ্যাসুন্দর অভিনয়ে  চার চারটি মন্দ  স্ত্রীলোক  কে তিনি  মঞ্চে ঠেলে তুললেন. তাঁদের প্রমোশন হলো)  তাঁদের তিনজনের খবরের কাগজ পঞ্চমুখে  প্রশংসা করলো । আমরা অভিনেত্রীদের নাম জানলাম – রাধারাণী, জয়দুর্গা, রাজকুমারী ও বৌহরো ম্যাথরানী। আরও জানলাম যে, এঁদের সবাইকে পতিতালয় থেকেই অভিনয়ের জন্য আনা হয়েছিল।গুণীজন রাধারাণী, জয়দুর্গা, রাজকুমারীর গুণগান গাইলেন কিন্তু বৌহরো ম্যাথরানীর প্রসঙ্গ উঠতে দেখলাম না কোথাও । বোধ করি নাম খানি  তাঁদের জিভে বেঁধেছিলো । ম্যাথরানী তলিয়ে গেলেন ।  রক্ষণশীল সমাজ চুপ করে রইলো না। সুলভ সমাচার পত্রিকায় লেখা হল:

 

সিমলার কতগুলি ভদ্রসন্তান বেঙ্গল থিয়েটার নাম দিয়া আর একটি থিয়েটার খুলিতেছে। ….যে যে স্থানে পুরুষদের মেয়ে সাজাইয়া অভিনয় করতে হয়, সেই স্থানে আসল একেবারে সত্যিকারের মেয়ে মানুষ আনিয়া নাটক করিলে অনেক টাকা হবে – এই লোভে পড়িয়া তাঁহারা কতগুলি নটীর অনুসন্ধানে আছেন।….মেয়ে নটী আনিতে গেলে মন্দ স্ত্রীলোক আনিতেই হইবে, সুতরাং তাহা হইলে শ্রাদ্ধ অনেক দূর গড়াইবে। কিন্তু দেশের পক্ষে তাহা নিতান্ত অনিষ্টের হেতু হইবে।

 

বাবু নবীন চন্দ্র বসুর নাট্যশালা বেঙ্গল থিয়েটরের দরজা বন্ধ হলে কিছুদিন বঙ্গসমাজ ভরাডুবির হাত হতে রক্ষে পেলেন। এর পরবর্তী সময়ে Kally Prasanna Mookerjee, Chunilal Bose আদিরা দাড়ি কামিয়ে রং মেখে শাড়িটি পরে স্টেজ আলো করতে থাকলেন। সে বৃত্তান্ত প্রথম অনুচ্ছেদে বলেছি।

১৮৭৩ সালে ছাতুবাবুর নাতি তাঁর দালানের সামনে মাঠে  ন্যাশনাল থিয়েটার দিলেন। এই হল প্রথম পেশাদারি থিয়েটার। বাবুদের দালান থেকে নাট্যকলা পথে নামলে।  আর  ছাতুবাবুকে মাইকেল বাবু উজোতে লাগলেন : “তোমরা স্ত্রীলোক লইয়া থিয়েটার খোলো, স্ত্রীলোক না লইলে কছুতেই ভালো হইবে না“…so on and so forth ।  কথায় আছেই ‘সঙ্গদোষে শিলা ভাসে’ ।  তাঁর সঙ্গে তাল দিয়ে নাচতে লাগলেন শরৎবাবুর (ছাতুবাবুর নাতি)  ভগ্নিপতি Mr. O.C Dutt., বিহারীলাল চট্টোপাধ্যায় (এঁর কথা পূর্বে বলা হয়েছে)  ন্যাদাড়ু গিরিশ, অর্থাৎ বাবু শ্রীযুত গিরিশ চন্দ্র ঘোষ , বটুবাবু, বাবু প্রিয়নাথ বসু , ছাতুবাবু  স্বয়ং এবং আরও তিন চার  immoral ভদ্রসন্তান। এইবার ষোলো কলা পূর্ণ হলো । মাইকেলের ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক স্টেজে উঠলো, বাবুরা আবারো  জাতে তুললেন চার বেশ্যা কে । তাঁরা হলেন : গোলাপসুন্দরী, এলোকেশী, জগত্তারিণী,  শ্যামাসুন্দরী ।
খবরের পাতায় ইংরিজি বাংলায় সোরগোল পড়ে গল।। মহা হাঙ্গামা।  ১৮৭৩ ১৮ই অগাস্ট, হিন্দু প্যাট্রিয়ট  বললেন:

…Mr Michael Modhusudan Datta’s classic drama of Sarmistha was selected  for the first performance. The actors performed their parts verucreditably, the two actresses, who are professional women, we are informed, were most successful. W3e wish this dramatic corps had done without the actresses. It is true that professional women join the jattras and natches, but we had hoped that the managers of the Bengali Theatres would not bring themselves down to the level of Jattrawallas.

১২৮০ ১৪ই ভাদ্র ‘মধ্যস্থ’ পত্রিকায় মনমোহন বসু ব্যঙ্গ করে লিখলেন:

 

… বিলাতে রঙ্গভূমিতে স্ত্রীর প্রকৃতি স্ত্রীর দ্বারাই প্রদর্শিত হয়. বঙ্গদেশে দাড়ি গোঁপ ধারী (হাজার কামাক) জ্যেঠা ছেলেরা মেয়ে সাজিয়া  কর্কশ স্বরে  সুমধুর বামা স্বরের কার্য করিতেছে . ইহা কি তাঁহাদের ন্যায় সমাজ সংস্কারক সম্প্রদায়ের সহ্য হয়? […] অতএব ‘আন্ স্ত্রী!’ […] বাঁচিয়া থাকিলে আরও কত কি দেখিতে পাইবো । কিন্তু এত সভ্যতার তেজ সহ্য করিয়া বাঁচিয়া থাকা দায় ।

 

১৫ই জানুয়ারী ১৮৭৪ দেখলাম অমৃতবাজার  সমাজ পরিত্যক্ত ধর্ম বহির্ভূত স্ত্রীলোকদের নিয়ে নাটক করানোয় আশংকা প্রকাশ করছে যে এই করতে গিয়ে যদি সমাজের একজন লোককেও পরিহার করতে হয় তবে সে  বড় দুঃখের বিষয় হইবেক । অমৃতবাজারের আশঙ্কা একেবারে যে  ননসেন্স তা বলতে পারা গেল না।  শ্রীযুত পন্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর শর্মা প্রতিবাদে পাপ  থিয়েটার সংসর্গ  ত্যাগ করলেন। ১৮৭৩ ২৯শে জুন দত্তোকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন দেহ রাখলেন। Dear Vid এর কার্যকলাপ তাঁকে দেখে যেতে হলো না।

পাঠক, এইবার কামসূত্রের ৫৮ নম্বর সূত্র, যেটি এই অংশের  মাথায় লটকেছি , সেটি দেখুন। নটী এবং শিল্পকারিকা যে আদতে বেশ্যা যেহেতু তাঁরা নিজেদের expose করে থাকেন (প্রকাশ বিনষ্টা ) সে তো বাৎস্যায়ন কোন মান্ধাতার আমলে বলেই গেছেন ।  এঁদের দিয়ে কাম প্রশমন হয়। উচ্চ সংস্কৃতি হয় কি ? তার ওপর যখন তারা আসে খোদ বেশ্যা পাড়া থেকে তখন সোনায় সোহাগা। আদর্শ  হিন্দু বংশোদ্ভূতরা করেন কি? ১৮৭৪ এর জানুয়ারী মাসে যখন  মাইকেল এর হতভাগ্য ছেলেপুলেদের সাহায্যার্থে  আবার ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক মঞ্চস্থ   হয়,  দুটি  অসমসাহসিনী ব্রাহ্মিকা সেই বেশ্যাদোষ দুষ্ট নাটক দেখতে গেছিলেন ।  প্রকারান্তরে তাঁদের সাবধান করে দেওয়া হয়, এটুকু জানি । সেই অজানা দুই স্ত্রীলোকের দুঃসাহসের পায়ে আমি গড় করি।

 

Epilogue

 নাট্যজগতে বেশ্যা-দৌরাত্ম ঠেকিয়ে রাখা গেল না । ১৮৭৪ থেকে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার এর যুগ । সতী কি কলঙ্কিনী  নাটকে এলেন রাজকুমারী, হরিদাসী, যাদুমনি, কাদম্বিনী, বিনোদিনী,   পাঁচ পাঁচটি বেশ্যা।

এবার এইসব কূলভ্রষ্টাদের কথা বলার সময় হ’লো।
ক্রমশঃ

 

Featured Image: https://www.heartforartonline.com/products/man-with-sitar-kalighat-painting

Posted in Uncategorized | Leave a comment

গড়গড়ার মা’ লো ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: বাবু বৃত্তান্ত

BABU COVER

যদি প্রশ্ন করে যায় ‘Baboo’ কি ও কয়প্রকার? তাহলে সমস্যাটি এই দাঁড়াবে যে এই ডেফিনেশন এবং অ্যানালিসিস কোন পথে যাবে এই নিয়ে গোলমাল বাঁধবে। আমরা সহজ মতে দুইটি পথ বেছে নেবো : ইতিহাসের রাজপথ আর সাহিত্যের অলিগলি ।  দুটি পথ স্বতন্ত্র, কিন্তু চলনে খুব মিল। ঠিক যেমন মূল গায়েন আর তার দোহার।

ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখলাম বাবু ইতিহাস বড় বিচিত্র । কোম্পানির আমল শুরু হবার পর যে ধামা-ধরা শ্রেণীটি তৈরী হলো, তেনাদের মধ্যে খাজাঞ্চি দেওয়ানজী নায়েব, বানিয়ানরা আছেন প্রথম ধাপে । এঁরা আদতে দালাল। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোম্পানির সায়েবদের রফা করাতেন, দু পাঁচ টাকা নিজেরাও মারতেন। এছাড়াও কোম্পানির বড়  কর্তাদের  নায়েবগিরি করতেন, কোম্পানিকে এটাসেটা সরবরাহ করতেন। এঁদের মধ্যে পাথুরিয়া ঘাটার মল্লিক, ঘোষ  আর ঠাকুর ছাড়াও যাঁদের নাম একনিঃশ্বাসে করা হতো তেনারা হলেন, খিদিরপুরের ঘোষাল, জোড়াসাঁকোর সিংহ, নিমতলা আর কুমোরটুলির মিত্তির, রামবাগানের দত্ত, বাগবাজারের মুকের্জি, কুমোরটুলির সরকার… এঁরা সব  সায়েবদের  নথিপত্র আলো করে ছিলেন. এছাড়াও   ছিলেন অক্রুর দত্ত, হিদারাম বাঁড়ুজ্জে  এবং গোবিন্দ মিত্তিরের মতো কিছু ‘ব্ল্যাক ডেপুটি’ যাঁরা সায়েবদের হাড় ভাজা ভাজা করে ছেড়েছিলেন , অর্থাৎ  কিনা তাঁদের প্রাপ্য দেনা পাওনা বুঝিয়ে দেন নি । যে সময়ের নথি দেখলাম তাতে বাবু দ্বারাকানাথ Tagore হলেন ‘জুনিয়র ব্রান্চ ‘ যিনি নিমক মহলের দেওয়ান হিসাবে দু পয়সা কামিয়েছেন।
কিন্তু এঁদের নিচেও দুই একটি সারি আছে। তাতে পেলাম আরও দুটি উপশ্রেণী । এক নম্বরে সরকার। পাঠক, এঁদের বাজার সরকার বলে ভুল করবেন না ।

১৮৩৫ সালে Emma Roberts নামে এক মেমসায়েব বলছেন:
The Circars, who may be styled agents of all descriptions are for the most part tolerably well acquainted with the English language; but these men are notorious for their knavery: they live by the extravagance of their employees an the ruin of more than half of Company’s servants maybe traced in the facilities thrown in their way by the supple Circar, who in their zeal for ‘master’ has obtained for him money on credit to any amount.

It would be unjust and ungrateful to withhold the praise honestly earned by many of these men, who have shewn utmost gratitude to employers from whom their gains have been exceedingly trifling consisting of a small percentage upon the articles supplied.
আরো এগোনোর আগে বলে রাখি, আমার ঘোর সন্দেহ “হাত ঝাড়লেই পর্বত” প্রবচনটির উৎপত্তি এই সায়েব-সরকার গোছের সম্পর্ক থেকেই।

 

এর পরের ধাপে কেরাণীকূল। তাঁরা কাছা কোঁচা দুলিয়ে, গালে পানটি পুরে, in white muslin, flowng and graceful, হেলেদুলে আপিসে আসতেন। তাঁরা ইংরাজি বাংলা দুয়েতেই লিখতেন, কিন্তু  very slow in writing and they will not be pushed। এয়াঁরা ছিলেন পাখির ওঁচা পায়রা, কারণ যেকালে ইংরেজ কেরানীর মাইনে ছিল ৮০ তংখা, ফিরিঙ্গি করাণীর ৪০, এই থার্ড ক্লাস বাবুদের মাইনে ছিল ৪ থেকে ১০ তংখা। দু এক কলি ইংরাজি জানা থাকলে আরও ১০ টাকা বেতন বেশি।খুব সম্প্রতি আর একজাতের সন্ধান পেলাম। তাঁরা হলেন ‘ Bubbulias’। এনাদের চিনতাম না। এঁদের সম্পর্কে C.M নামক জনৈক attorney বলছেন:

Be it known that in almost all the attorneys’ offices they are retained,-a Baniyan, a Sircar, a Head Writer – their numerous attendants –a seat also of their dependant apprentices (who pretend to write without salaries ) and to close the pack, the Bringers of Business, the Law-Brokers, the Bubbulias (or promoters of domestic broils)…
(Observations, etc, Upon the State of the Practice in the Supreme Court of Judicature at Fort William in Bengal, Calcutta 1825)

এই বুব্বুলিয়া-রা হলেন শয়তানের বরপুত্র. বড়োমানুষদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে এঁরা খুড়োকে ভাইপো, অথবা ভাইকে ভাইয়ের  বিরুদ্ধে  ফুসলে মামলা বাঁধাতেন তারপর সেই মামলা অ্যাটর্নি আপিসে এনে ১০ শতাংশ দালালি জোগাড় করতেন ।  অনেক অনেক পয়সাওয়ালা  বড়োমানুষদের এনারা পথে বসিয়েছেন ; এইসব বড়োমানুষরা আপনাপন বুদ্ধির দোষে সর্বস্ব খুইয়ে নিজেরাই বুব্বুলিয়া হয়েছেন সে নজিরও আছে।

এসব হলো কোম্পানির আমলের কথা। দেওয়ানচি থেকে কেরাণী, বুব্বুলিয়া, নানা নিধি বাবুদের  যোগদানে যে সমাজটি তৈরী হলো ১৮ শো শতকে, মহারানীর আমলে তাঁদের শ্রেণী চরিত্র পাওয়া গেল বঙ্কিম-এর ‘লোকরহস্যে’:

“যাঁহার বাক্য মনোমধ্যে এক, কথনে দশ, লিখনে শত এবং কলহে সহস্র তিনিই বাবু। যাঁহার বল হস্তে একগুণ, মুখে দশগুণ, পৃষ্ঠে শতগুণ এবং কার্য্যকালে অদৃশ্য, তিনিই বাবু। যাঁহার বুদ্ধি বাল্যে পুস্তকমধ্যে, যৌবনে বোতলমধ্যে, বার্দ্ধক্যে গৃহিণীর অঞ্চলে, তিনিই বাবু। যাঁহার ইষ্টদেবতা ইংরাজ, গুরু ব্রাহ্মধর্ম্মবেত্তা, বেদ দেশী সম্বাদপত্র এবং তীর্থ “ন্যাশনাল থিয়েটার,” তিনিই বাবু। যিনি মিসনরির নিকট খ্রীষ্টিয়ান, কেশবচন্দ্রের নিকট ব্রাহ্ম, পিতার নিকট হিন্দু, এবং ভিক্ষুক ব্রাহ্মণের নিকট নাস্তিক, তিনিই বাবু। যিনি নিজগৃহে জল খান, বন্ধুগৃহে মদ খান, বেশ্যাগৃহে গালি খান, এবং মুনিব সাহেবের গৃহে গলাধাক্কা খান, তিনিই বাবু। যাঁহার স্নানকালে তৈলে ঘৃণা, আহারকালে আপন অঙ্গুলিকে ঘৃণা এবং কথোপকথনকালে মাতৃভাষাকে ঘৃণা, তিনিই বাবু। যাঁহার যত্ন কেবল পরিচ্ছদে, তৎপরতা কেবল উমেদারিতে, ভক্তি কেবল গৃহিণী বা উপগৃহিণীতে, এবং রাগ কেবল সদ্‌গ্রন্থের উপর, নিঃসন্দেহে তিনিই বাবু।“

এনারা নানা কর্মে সুদক্ষ । মদ মোহ মাৎসর্যে কল্কি অবতারের বরপুত্র। ১৮৬০ সালে বটতলায় ছাপা  হরিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘কলির  রাজ্যশাসন’ যে ছবি দেখেছি, তাতে মদ কোন পথে বাবুসমাজে ঘাঁটি  গাড়লো  তার একটা অতি মোটা দাগের ইঙ্গিত আছে: বলা হচ্ছে  , কলির আজ্ঞায় সুরাদবী কালাপানি পেরিয়ে  গোরাদের বশ করেন। তারপর  সেই নেশা এসে পড়ে টাউন কলকাতায়।

সুরা কন ক্ষমা কর           এ দাসের দোষ ধর
এ জন্মে সাধিব তবে কার্য   ।।
আনি দেহ ইস্টিমার            হইয়া সাগর পার
বশ করি আসি সেই রাজ্য ।।
শুনে কলি দেন  সায়            আজ্ঞা  পেয়ে মদ যায়
উপনীত বিলাত নগরে ।।
ছুটিল সৌরভ তার                   পেয়ে সেই সমাচার
জয়ধ্বনি প্রতি ঘরে ঘরে ।।
চোলে যেতে টলে পদ                 হয়ে ভাবে গদগদ
আধো আধো বচনে বচন ।।
মাতিল যতেক গোরা                 যেন নদিয়ার গোরা
নদে ছেড়ে বিলাত গমন ।।

পাইয়া সুরার তার             নানা নিধি নাম তার
রাখিলেন ইংরাজ সকল ।।
ব্র্যান্ডি আর ওয়াইন         সুধার শ্যাম্পেন  জিন
যার গন্ধে ক্ষিতি টলমল ।।

এই  কলির কেচ্ছায় কালাপানি পেরিয়ে যে মদের নেশা সাহেবদের মধ্যে গিয়ে ঢুকলো, সেই নেশা এবার  ফিরে এলো কলকাতার বাবুসমাজে । বাবু হরিপ্রসাদের নক্শাখানি খুব উচ্চ সাহিত্য না হলেও তার বক্তব্য  খুব ফেলে দেওয়ার মতও নয়।

রবার্ট ক্লাইভএর আমল থেকেই যে সব Punch  House কলকাতায় গজিয়েছিলো তার বিবরণ যা পাওয়া যায় তাতেই এর প্রমাণ । তবে কিনা এইসব গরিব রাইটার সাহেবদের অত বিয়ার শ্যাম্পেন খাওয়ার রেস্ত ছিল না তাই আরক সিরাজ এইসব সস্তার মদ মিলিয়ে জুলিয়ে তাঁদের কোনো মতে চলতো । যাঁরা সাহেবদের ধামা ধরলেন, সেই সব বাবুরা এই গুণটি ভালো মতো রপ্ত করলেন। গাঁজা ভাং আফিম তো ছিলই, তার ওপর জুটলো মদ । পাঠকরা যদি এ  বিষয়ে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করতে চান, তাহলে টেকচাঁদ ঠাকুরের ” মদ খাওয়া বড় দায় মদ খাওয়ার কি উপায়’ (১৮৫৯)  বইখানি জোগাড় করে পড়বেন। তাতে তিনি লিখছেন:  “কলকাতায় যেখানে যাওয়া যায় সেখানেই মদ খাইবার ঘটা। কি দুঃখী, কি বড় মানুষ, কি যুবা, কি বৃদ্ধ সকেলই মদ্য পাইলে অন্ন ত্যাগ করে”। আমোদের খোরাক এই বইয়ে আরও আছে কিন্তু দেখছি আমার এই লেখাটি একটি quote শাস্ত্র হয়ে পড়ছে তাই লোভ সংবরণ করলাম ।

শ্বেতচামরে ঘর ঝাড়িবে
নাচবে খ্যামটা স্বর্ণবাই৷৷

 

2013GL0450

এবার আবার বঙ্কিমে ফিরি। তিনি বাবুকে define করলেন বটে, কিন্তু তাঁর তত্ত্বে ছ্যাঁদা থেকে গেল। সমস্ত গুণাগুণ এক আধারে মিশে যে পাম্প শু পরা কালিঘাটের পটমার্কা  বাবুটির ছবি তিনি আঁকলেন,  তাতে মুড়ি মিছরি সব এক বর্ণ, এক জাত। উচ্চবর্ণ বাবু, অর্থাৎ কিনা খাজাঞ্চী, দেওয়ানজি স্থানীয় কুলীন বাবুদের lifestyle আর কেরানী মুহুরী বাবুদের lifestyle যে এক হবেনা, সে ভালো বোঝালেন না। পাঠক, এইবার এই ছবিখানি বিবেচনা করুন। এনারা হলেন বাবু সমাজের ব্রাহ্মণ:
উচ্চবর্ণ বাবুরা, অর্থাৎ নায়েব দেওয়ান জাতীয়রা, তাঁরা সকালবেলা শুদ্ধ হয়ে কিছু লোকজনের সঙ্গে মোলাকাৎ করেন, তাঁর পর তাঁরা যে সকল তৈল মর্দনে “সুখানুভব” হয়, তাহা দ্বারা স্নান সমাপন . তার পর হলো “পূজা হোমদান”। ভোজন করতঃ কিঞ্চিৎ বিশ্রাম ( সায়েবদের deshabillé  siesta)  অতঃপর “অপূর্ব পোষাক জামাজোড়া ইত্যাদি গায়ে ছড়িয়ে “পালকী বা “অপূর্ব শকট আরোহনে  কর্মস্থলে গমন.  কাজ কর্ম সারা হলে বাড়ি ফিরে গঙ্গা জল স্পর্শ করে শুদ্ধ হওন এবং তৎপরবর্তী কালে কিঞ্চিৎ জলযোগান্তে , সান্ধ্য মজলিশ  বা স্বজন বন্ধু অথবা সায়েবদের সাক্ষাৎকার হেতু গমন। এই গমনের অমিত সম্ভাবনা।
পাঠক,  মনে রাখবেন যে এই সময়টা থেকেই সায়েবদের তাড়া খাওয়া গুটি কতক নবাব সুলতান গোছের লোক কলকাতায় বাসা বেঁধেছিলেন. তাঁদের কল্যাণে যেমন অনেক খেমটাওয়ালী বেগম হয়েছিলেন , (হুতোম উবাচ) তেমনি পিল পিল করে  কিছু বাইজি  মুর্শিদাবাদ, বেনারস, লখনৌ, মহীশুর থেকে কলকাতার ঘাটে এসে ঠেকেছিলেন। শোনা যায়  মীরজাফরের আমলের শেষে এক বড়োমানুষ মুর্শিদাবাদের নিক্কি বাই কে এক হাজার টাকা মাস মাইনেতে বাঁধা রেখেছিলেন। এছাড়া ঐ একই সময়ে কোনো এক বাবু রূপলাল মল্লিক সারা রাত ব্যাপী মেহফিলে তাঁহা তাঁহা বাঈজী জড়ো করেছিলেন। সেই মেহেফিল এ মহামান্য সদাশয় সাহেবরাও যোগদান করেন। এ বাদে চিৎপুর আদি জায়গায় সান্ধ্যভ্রমণের জায়গার অভাবও তো ছিল না, যদি ট্যাঁকে দু পয়সা থাকে ।  এ সময়ে আবার দেবী বাই, হরিমতি বাইয়ের মতো  কিছু হিন্দু মেয়েও বাই হিসেবে নাম কিনেছিলেন । বিশ শতকের প্রথম দিকেও তাঁরা মুজরো করতেন। এছাড়া অধিকন্তু ন দোষায় রইলো  বাড়ির নিকট এবং লতায় পাতায়, নিরাশ্রয় আত্মীয়ারা । বিশেষতঃ অনাথা বিধবা এবং পতিপরিত্যক্তা সধবারা।
কথা ছড়িয়ে যাচ্ছে ।এইবার সব একত্র করি ।বলেছিলাম বঙ্কিম বাবুর তত্ত্বের ছ্যাঁদার কথা ।  এই যে ব্যাখ্যান টি দেওয়া হলো এনারা হলেন বঙ্কিমের বর্ণনার আধখানা । এঁরা ইতালিয়ান মার্বেল দিয়ে মেঝে তৈয়ের করেন, বাগানে পরী রাখেন । এঁদের পুত্র পৌত্রাদি কালেজে ইংরাজি পড়ে লন্ডন শহরকে ধরাধামে নামিয়ে আনেন। এঁরা হলেন কেনারাম রাজারাম বেচারাম ক্লাস। এক পুরুষ দালান দেন। এক পুরুষ সে দালান ভোগ করেন আর একপুরুষ সব বেচে খেয়ে ডুগডুগি বাজিয়ে বেড়ান।
এর পরের inferior ধাপে সরকার, মুহুরী কেরানি জাতীয় ‘সেলাম সায়েব, জো হুজুর’ রা । এঁদের ট্যাঁকের জোর কিছু কম। তা বলে, শ্রী বিনয় ঘোষের ভাষায়, এঁদের “করুণ ক্যাবলা” মনে করার কোনও কারণ নেই। এঁদের সান্ধ্য ভ্রমন হত যেখানে সে জায়গা নিয়ে আগের লেখায় বলেছি । । কিন্তু দেখা গেল তাও যথেষ্ট নয় । এরপর তাঁরা উড়েনি, নাপতিনি, মালিনী, নেড়ি (বোষ্টমী) “সহচরী দাসীরূপা”দের শরণাপন্ন হতেন অতিরেক (এক্সসেস) সাপ্লাই এর জন্যে । এ সকল বৃত্তান্ত পেয়ে ধন্য হই শ্রীযুক্ত বাবু ভবানী চরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “কলিকাতা কমলালয় ” (১৮২৩) নামক প্রামাণ্য গ্রন্থে।
ওই বইয়ে নাপতিনি ভ্রষ্ট চরিত্রা কুলরমনীদের একটি লিস্ট তুলে ধরেন:অমুক রায়ের মাগ, পালের বহু, দাসের ভগিনী , সুবোধ দত্তের বৌ, অমুক সাহার কন্যা … কিন্তু ব্রাহ্মণ বাড়িরই কথা উঠতেই একজন বলে ওঠেন:

যদ্যপি দ্বিজনারী দ্বিচারিনী হয়
শূদ্রাদির মাতৃতুল্যা গমনীয় নয় ।।
ব্রাহ্মণীর মন্দকথা এনো না কো মুখে
ইহ পরকাল ক্লেশে যাবে রবে দুখে ।।

তাঁকে নাপতিনী বোঝাচ্ছেন যে কলকাতার বাজারেএখন কোনও লঘুগুরু নেই।

কেহ হরে মাসিপিসী জানিল তা প্রতিবেশী
মামী হরে বিশ্বরূপ আশ ।।
ভাদ্রবধূ হরে কেহ কহি যদি মনো দেহ
আছে বড়বাজারে প্রকাশ ।।
খুড়ি না শাশুড়ি বাছে শুনি অনেকের কাছে
আর বহু বাজারে শুনিবে ।।

যদি প্রশ্ন করা হয়  এত সামগ্রী কোথা থেকে বাজারে আসত , তাহলে বলবো  যে অন্দরমহলে বাবুরা  যাওয়ার সময় পেতেন না সে অন্দরমহলে এই সব নাপতিনি মালিনীদের নেড়িদের যাতায়াত ছিল। বিষবৃক্ষর হিরে দাসী আর হরিদাসী বৈষ্ণবী কে পাঠকের মনে আছে কি?  ১৮৫৩ -র হিসাব অনুযায়ী কলকাতা শহরে তখন সাড়ে চার লক্ষ জন সংখ্যার বারো হাজার ই বেশ্যা , তার মধ্যে দশ হাজারের কাছাকাছি  কুলীন সধবা অথবা অল্পবয়েসী বিধবা । অন্দরমহলের এনারা হলেন নন রেজিস্টার্ড উদ্বৃত্ত ।

এইবার ঢুকে পড়লাম বটতলায়। শস্তা গণ্ডার চটি বইয়ের বাজারে। যদি জিগ্যেস করা যায়  ‘বাবু বটতলায় ক’বার যায়?’ সঠিক উত্তর হবে  ‘বারবার’। এপাড়ায় পাঁজি মেয়েদের ছড়া পাঁচালি ছাড়াও যা বস্তুটি ছাপা হ’ত তাঁকে ভদ্রভাষায় বলা হয় যৌনসাহিত্য।  আমি কিনা দুপাতা ইংরেজি পড়া ফিমেল, তাই দুই একখানা পড়ে মনে হ’ল এর আদৎ ঝাঁঝ পরভৃৎ উপভোগে।  পরভৃৎ উপভোগ ‘  এর মত nasty  gibberish’  যদি কেউ না বোঝেন  , Voyeuristic  pleasure কথাটি নিশ্চিৎ বুঝবেন।

bidhaba

উপরোক্ত বাবুর দূতীবিলাসের (১৮৬০) এই দৃশ্যটি দেখুন:

সুস্বর অনল সম সন্তাপ জন্মায় ।
সুস্থির রাইতে নারে পরে ছাতে যায় ।।
মলয়  মারুত  তাহে লাগে  তার গায়।
অস্থির  হইয়া  কামে  চারিদিক চায় ।।
অন্য  মৌথপরি  নারী  দন্ডাইয়া ছিল ।
অর্ধেক শরীর তার দেখিতে পাইলো ।।
সুন্দরীর মুখ চক্ষু গুণ নিরখিয়ে ।
বিতর্ক করিছে কত কামেতে মজিয়ে ।।
ছাতে পুনর্বার আর তারে না দেখিয়া ।
বারান্দায় বৈসে আসি মলিন হইয়া ।।

দেখা যাচ্ছে নায়ক তাঁর  অপরিতৃপ্ত “সন্তাপ” জুড়োচ্ছেন গেরস্থ বাড়ির ছাদে উঁকিঝুঁকি দিয়ে। কিন্তু আরও ক’টি Peeping Tom কে আমরা দেখলাম বইয়ের পাতার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে সেই দৃশ্য চাখতে।  পালিশ ষষ্ঠীর বাবুকে পাঠকদের মনে আছ কি? বঙ্কিম বাবু আলগা  করে “একখানি অপকৃষ্ট অশ্লীল এবং দুর্নীতিপূর্ণ অথচ সরস পুস্তক”  বলে ছেড়ে দিলেন কিন্তু  সেই রসের দমক টি আমরা দেখলাম।

একদল পন্ডিতের মতে ব্রাহ্ম ধর্ম আর জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক জোয়ার নাকি  বাবুদের অপকৃষ্টি ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেছিলো । বটতলা হাতড়ে আমার তেমনটি  মনে হলো না ।এই vicarious ‘গুপ্তকথা’র  চাহিদা দেখলাম বিশ শতকর গোড়াতেও চালু ছিল। ক’টি  নাম বলি:

পতিত-পতিতার গুপ্তকথা , পীর-মোহান্তর গুপ্তকথা , ভাশুর-ভাদ্রবধূর গুপ্তকথা , জামাই শাশুড়ির গুপ্তকথা , নফর-মালকিনের গুপ্তকথা , বাবু -বিবির গুপ্তকথা   আরও নানাবিধ. বিশ শতকে  ঝাঁকা মুটে এসব মাথায় করে দুই পয়সায় বেচতো কিনা বলতে পারিনা কিন্তু  দেখলাম ১৯০৪ এও এই ধারাটি বেশ ভালোই বয়ে চলেছে ।

বাবু ভুবন চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের  হরিদাসের গুপ্তকথার   (১৯০৪)  থেকে সামান্য একটু খানি বলি:

” দিবাশেষের বসন্তের শীতল বাতাস ধীরে ধীরে প্রবাহিত হচ্ছিলো, বায়ূস্পর্শে আমি সুখানুভব কোচ্ছি, পল্লীর দুই ধারে নুতন নুতন দৃশ্য দর্শন কোচ্ছি , নয়ন পুলকিত হোচ্ছে . নুতন দৃশ্যাবলীর মধ্যে এক দৃশ্য আমার কাছে খুব নুতন … ।“

এইটুকুই শুধু বলবো এই যে, যা হরিদাস দর্শন ‘কোল্লেন’  তা হ’লো নানা জাতের কাঁচুলি শোভিত হিন্দু বাইজি আর যা তিনি বাকি বইয়ে কোল্লেন তা ঘুলঘুলি দিয়ে বাবু পাঠকরা দেখতে পেলেন বই কি!

বটতলা খানিক ঘুরেছি।  ‘গুপ্তকথা’ র মত আর একটি ধারা দেখেছি প্রহসনের। ১৮৯৮এ বাবু রাখালদাস ভট্টাচার্য র ‘সুরুচির ধ্বজা’ তে এক বাবু কে দেখলাম । তিনি সেই ইংরিজি বিলাসী বাবু, যাঁকে আমরা অশ্লীল বই পড়তে দেখেছিলেম বঙ্কিমের ‘লোকরহস্য’ তে । তিনি তাঁর এক ইয়ারের কাছে দুঃখ কচ্ছেন যে তাঁর স্ত্রী হ’লো damn nasty creature না পারে নাচতে, না পারে গাইতে , না পারে ইংরাজিতে দুটো কথা কইতে । Gentleman এর society তে move করতে জানেনা। তিনি পরিত্রাণের উপায় খুঁজছেন। তার  ইয়ার তাঁকে আশ্বাস দিচ্ছেন, একজন enlightened, a mere girl of twenty five তাঁদের সমাজে join করেছে। সে আবার very beautiful । তিনি তাকে “যোগাড়” করবেন।  সমাজটি যে ব্রাহ্ম সমাজ তা আশা করি পাঠক বুঝবেন।

অলমিতি বিস্তারেণ।

Epilogue

Robi Belraus
( Belarauser আঁকা তরুণ রবীন্দ্রনাথ)

১৮০০- থেকে ১৯০০’র এইসব জঞ্জাল ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ মনে পড়ে গিয়েছিলো, ঐ একই যুগে, ১৮৭৯তে একটি তরুণ, “মেঘলাদিনের ছায়াঘন অবকাশের আনন্দে”, অন্তঃপুরের কোণার ঘরে শ্লেটের ওপর উপুড় হয়ে লিখেছিলেন ‘গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে…”  তিনিই সে যুগের সেরা বাবু। তিনি এলে সূর্যোদয় হয় । তাঁর গান বুঝে না বুঝে  গলায় তুলে নেন  আশ্চর্যময়ী দাসী, মানদাসুন্দরী, পূর্ণকুমারী দাসীরা… কিন্তু সে আর এক ভাব, আর এক সময়ে ।

বটতলা তখনও হাজারো বাবুকে ছায়া দিয়ে চলছে ।

Featured Image: https://www.google.ca/search?q=Babu+Kalighat&tbm=isch&tbo=u&source=univ&sa=X&ved= Tagore: A rare painting of Young Tagore by Belarus https://www.pinterest.com/pin/317644579947327661/

Posted in Uncategorized | Leave a comment

গড়গড়ার মা’লো পঞ্চম পরিচ্ছেদ: বেশ্যাপুরাণ

Gargara Beshya III

 

ফুলমনি জয়মনি আন্দি লক্ষী পদ্মমণিস্তথা

পঞ্চবেশ্যাম্   স্মরেণ্নিত্যম মহাপাতক নাশনম্।।

                                                                         মনোমোহন বসু

 

 ১  পূর্বাভাস

 

ষষ্ঠ দৃশ্য

( গীত )

Impudent offspring of a low Brahmin Adroit hypocrite,
Hindu erudite, glutton so mean
If nothing would cost you to cast off caste,
Smash orthodoxy, be at once an outcast !
Then pooh pooh to sooktani, Soak soup molecktani,
Drink Brandy-/anz, cross A’ala-pant,
Bid adieu to your old grzhiniz,
Jump and dance—there is a chance—
Sing and sink—swoon soon on the bosom of syren

 

সোনামুখী, যাদুমণি, সোহাগবালা আদি syrenদের  নিয়ে ঊনিশ শতকের কলকাতা বড় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। এয়াঁরা সব হয়  তাড়া খাওয়া বিধবা, ফেলে দেওয়া ঘরের বউ আর নয়তো গয়লা, কৈবর্ত,হাড়ি নাপিত বাড়ির না খেতে পাওয়া ঝি ঝিউড়ি । এঁদের দাপে কলকাতা টলোমলো। এঁরা ছোটবড়’র ধার ধারেন না, খালাসি থেকে বাবু, এঁদের সব চলে।

( জনৈক মাতাল ব্রাহ্মণের প্রবেশ) মাতাল — ( গীত )
মাইরি বলছি সোনামুখী তোরে বড় ভালবাসি ।
নইলে কি’ লো এ ভোর বেলা, মজা ছেড়ে নাইতে আসি ॥
ফাকায় ঢুকে রান্নাঘরে, শিকে হতে হাড়ী পেড়ে,
ঢাকন খুলে টকের মাছ সব, এনেছিলেম চুরী করে,
বুদ হয়ে প্রাণ বাধা-নেশায়, ‘ চোখ বুজে কাল কাটাই হাসি ॥
ঘর কন্নাতে সব পুড়িয়েছি, মাগ ছেলেকে ভাসিয়ে দিছি,
তুই নাইতে এলি ফেলে মোরে চিকণ দাঁতে দিয়ে মিশি,
তাই বকনা হারা এঁড়ের মতন খুঁজতে তোরে ছুটে আসি ॥

 

যে দুইটি গান দিয়ে শুরু হলো, সে দুটি-ই  বিহারীলাল চট্টোপাধ্যায়ের নবরাহা নাটকটি  থেকে ইংরিজি গানটি শিখেছিল এক স্ত্রীলোক এক বিটলে ভট্চায্যির থেকে,  যাঁর আবার শিক্ষে হয়েছিল এক সাহেব মিনসের কাছে । দ্বিতীয় টি তে তো দেখায় যাচ্ছেই এক উচ্চবর্ণের বাবু তাঁর সোনামুখীকে জলের ধারে ধাওয়া করছেন । এইবার দুইটি গান মিলিয়ে পাঠক বিচার করুন । উচ্চবর্ণের খদ্দেরদের একটি চিত্র দেখতে পাবেন । তাঁরা syrenদের জন্যে সর্বস্ব দিতে পারেন ।এঁদের কথা  একটু বিশদে পরে বলা যেতে পারবে ।

এবার হুতোমের কথা শুনুন:

 

“বেশ্যাবাজিটি  আজকাল এ শহরে বাহাদুরির কাজ ও বড়োমানুষের এলবাত পোসাখের মধ্যে গণ্য , অনেক বড়োমানুষ বহুকাল মোর গ্যাচেন  কিন্তু তাঁদের রাঁড়ের বাড়ি গুলি  আজ মনিমেন্টের মতো  তাঁদের স্মরণার্থ রয়েচেন–সেই তেতালা কি দোতালা বাড়িটি ভিন্ন তাঁদের জীবনে আর যেমন কিছু কাজ হয়নি যা দেখে সাধারণ তাঁরে স্মরণ করে।কলকেতার অনেক প্রকৃত হিন্দু দলপতি  ও রাজা রাজড়ারা  রাত্তিরে নিজ বিবাহিত স্ত্রীর মুখ দেখেন না , বাড়ির প্রধান  আমলা দেওয়ান মুছুদিরা যেমন হুজুরের হয়ে বিষয় কর্ম দেখেন — স্ত্রীর  রক্ষনাবেক্ষনের ভাঁড় ও আইনমতে তাঁদের অর্শায়, সুতরাং তাঁরা ছাড়বেন কেন”।

পড়ে মনে হতে পারে যে কালীপ্রসন্ন সিংহ বড়োমানুষদের গুণকীর্তন করছেন কিন্তু আদতে তাঁর ভূমিকাটি ছিল যাকে বলে সমস্যায়িত। হুতোম নয়,  বিদ্যোৎসাহিনী সভার সম্পাদক  শ্রী কালীপ্রসন্ন সিংহ সংবাদ প্রভাকর এ লিখেছেন:

[…] বারযোষা কুল (বেশ্যা) সমস্ত রাত্রি মদ্যপান দ্বারা গীতবাদ্যাদির কোলাহলে এত উৎপাত আরম্ভ করে যে ভদ্রলোক মাত্রই উক্ত পল্লীতে শয়নাগার ত্যাগকরণে বাধ্য হন […] রাত্রিকালে মদ্যবিক্রয় যাহা ভয়ানক অত্যাচার কারণ এই বারস্ত্রীগণের আলয়েই সম্পন্ন হয়, আরও বঙ্গীয় যুবকবৃন্দের ইহা স্বভাব সংশোধন  বলিলেও বলা যাইতে পারে , কারণ তাহারা কি প্রাতঃকালে  কি সায়ং কালে সাবকাশ হইলেই  এই কদাচার  কর্মে প্রবৃত্ত হয় .

চিঠির শেষে তিনি বেশ্যাদিগের জন্যে স্বতন্ত্র পল্লীর আর্জি জানিয়ে আবেদন শেষ করেন।  এই চিঠিটি লেখা হয় ১৮৫৬ সালে অর্থাৎ হুতোম প্যাঁচার নকশা লেখার ও সাত বছর আগে।

চিঠিটি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছি ; বেশ্যাকুলের উদ্ধার নিয়ে  তাঁর কোনো প্রস্তাব নেই । এই আবর্জনা যে থাকবেই সে তিনি ধরেই নিয়েছেন, শুধু আবর্জনাগুলোকে ঝেঁটিয়ে যেন একপাশে  ঠেলে দেওয়া হয় যাতে সম্ভ্রান্ত বাবুদের নিদ্রার ব্যাঘাত না ঘটে, কিন্তু এইসব অবিদ্যাদের একপাশে সরিয়ে রাখলেই কি ভাবে বঙ্গীয় যুবকবৃন্দের চরিত্রের উন্নতি হবে সেই কথাটি ভালো বুঝলাম না ; সে আমার অক্ষমতাবশতঃ হতে পারে।

সে যাই হোক, কলকাতার নীতিবাগিশ বাবুরা সদাশয় সরকার বাহাদুরের এমনি শান্তি ভঙ্গ করতে থাকলেন মামলা মোকদ্দমা চিঠি লেখালিখি করে যে এই সময়েই কলকাতায় আলাদা পল্লী করে এইসব অবিদ্যাদের পৃথক করা হলো । এঁদের ঘাঁটি হলো সোনাগাজী, চিৎপুর, গরাণহাটা এইসব জায়গায় । নীতিবাগিশরাও শ্বাস নিতে পারলেন আর কলকাতার আমুদে পুরুষমানুষদেরও শহরের খোপে খোপে আমোদের জায়গা তৈরী হলো।

Beshya II

 

২ / কারে বলবো বনমালী …

 

এই যে বেশ্যা উৎখাত অভিযান, তার ঢেউ এ প্রথম এলো The Cantonment Act, ১৮৬৪ তে। সেনা ব্যারাকের চৌহদ্দির মধ্যে বেশ্যাবাজার বসানো চলবে না। গুটি পনেরোই যথেষ্ট। তারপরেই  চৌদ্দ আইন ।  রূপচাঁদ পক্ষী গাইলেন:

 

কারে বলবো বনমালী! এ দুঃখের কথা
হলো চৌদ্দ আইন বড়োই কঠিন বল যাই কোথা
ভেবে ভেবে গুমড়ে মরি এ কি আইন হলো জারী
দিগম্বরী করবে যত বারবণিতা।

 

এই চৌদ্দ আইন হলো ইংলণ্ডে ১৮৬৪, ১৮৬৬, ১৮৬৯-এর The Contagious Disease Acts  এর নেটিভ ভার্সন ।

এই আইনটি বলবৎ করার খুব চেষ্টা হয়েছিল ইংলন্ড-এ  মহারানীর নৌ সৈন্যদের স্বাস্থ্য রক্ষা প্রকল্পে। এর দ্বারা সিদ্ধান্ত হয়েছিলো সমস্ত  বেশ্যাদের নাম রেজেষ্টারী করে তাদের  সকল রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তবেই প্রাকটিস করতে দেওয়া হবে। মহারাণী সাম্রাজ্য যারা রক্ষা করে সেইসব সৈ্ন্য সামন্ত যাতে বেশ্যা সংসর্গ করেও সুস্থ সবল থাকতে পারে তারজন্যেই এই ব্যবস্থা। মজার কথা হলো এই, পুরুষদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার কথাটি কারও মাথায় এলো না। যেহেতু মেমসাহেবরা বাঘিনীর জাত, তাঁরা খুব লড়েছিলেন এই আইনের বিরুদ্ধে। তাঁদের পুরোভাগে ছিলেন হ্যারিয়েট মার্টিন আর জোসেফিন বাটলার । জোসেফিন বাটলার ১৮৭১ সালে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন:

“There is a double motive in these Acts … one the providing of clean women for the army and navy, the other the reclamation of women. We cannot serve two masters.” Clearly, women were not being reclaimed. They were being regulated to better gratify the natural lusts of man.”

সেই যে তিনি শুরু করেছিলেন সেই থেকে মধ্যবিত্ত মেয়েরা পিলপিল করে তাঁর পিছন পিছন গিয়ে এমন শোরগোল তুলেছিলেন যে ১৮৮৪তে গভর্নমেন্ট ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ বলে সে আইন রদ করে।
সেই একই আইন  হার ম্যাজেস্টি’স নেটিভ সাব্জেক্টসদের জন্য বলবৎ  হ’লো ১৮৬৮ সালে। সেই হলো চৌদ্দ আইন।সে আইন মোতাবেক, সকল বারস্ত্রীকে তাদের সাকিন, মালিক, হাল হকিকত সব পুলিশে রেজিস্টারি করতে হবে(‘খাতায় নাম লেখানো’ কথাটি নিয়ে অনেক ভেবেছি…আসল বৃত্তান্ত জেনেছিলাম ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডের মেয়েদের অবস্থা নিয়ে লেখা পড়ার করার কালে। কেন ওপথে গেছিলাম পরে কখনো সে কথা বলা যাবে )।এইবার তাদের বছর বছর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে যাতে মহারানীর প্রজাবাবুরা বেশ্যা সংসর্গ করতে গিয়ে কোনো আপদ বিপদে না পড়েন। চুড়ো বাঁশিও বজায় রইলো, সেবাদাসীরাও সাড়ে সব্বোনাশ করতে পারলে না । এসব গূঢ়কথা আলোচনা করা উচিতকর্ম নয় জানি কিন্তু এই কথা ক’টি না বললে আমার পাঁচালি সম্পূর্ণ হবে না ।

এই পরম সমাজকল্যাণ মূলক আইনটির ফলাফল ছাপা হলো  ১৫ই এপ্রিল  ১৮৬৯ এ সংবাদ প্রভাকর  -এ

“বেশ্যাদিগের   রেজিস্টারি ও ব্যাধি পরীক্ষা সম্বন্ধে রাজধানীর মধ্যে যে কত প্রকার ভয়ঙ্কটর ভয়ঙ্কর কথা শোনা যাইতেছে তাহা প্রকাশ করিতে হইলে বিদ্রোহীর মধ্যে গণনীয় হওয়া অসম্ভাবিত হয়না. […] কেহ বলিতেছে পুলিশের লোকেরা  স্ত্রীলোকদের প্রতি নির্দয় হইয়া রেজিস্ট্রারের জন্যে গ্রেপ্তার করিতেছে. তাহাদের ক্রন্দনে  ও আর্তনাদ এ  পুলিশের আহ্লাদ বর্ধিত হইতেছে. কোনো কোনো ডাক্তার অসম্ভব  বলপ্রকাশ কোরিয়া এ কাজ করিতেছেন.  যাঁহাদিগের ব্যাধি নাই  তাহারাও পরীক্ষার পর গৃহে আসিয়া  উদোর বেদনায় ৩/৪ দিন শয্যাগত থাকিতেছে।”

এই আইনটির যে বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছিল সেটির নাম বেশ্যা গাইড। শ্রী গিরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সংগৃহীত সে বইও মন দিয়ে পড়লাম. একটি আইন বড় মনোগ্রাহী ঠেকলো:

 

“যদ্যপি কোনো বেশ্যালয় রক্ষক বেশ্যালয়বৃত্তি ত্যাগ করিতে চাহে  তাহা হইলে তাহা হইলে ইংরাজি দরখাস্ত দ্বারা ওই বিষয়ে  কমিশণার  সাহেবকে জানাইতে হইবে  এবং কমিশণার সাহেব  ওই সংবাদ পাইয়া  জেনারেল রেজিস্টারি ও থানার রেজিস্টারি বহি হইতে তাহার নাম  উঠাইয়া দিতে  ও তাহার রেজিস্ট্রেশন টিকেট  ফিরাইয়া লইতে আদেশ করিবেন।”

 

বেশ বোঝা গেল বেশ্যা বৃত্তি হ’লো ঘুঘুর ফাঁদ । ঢোকা যত সোজা বেরোনো ততটা নয় । বেরোতে চাও তো ইংরিজি তে আপিল করতে হবে তবে সায়েব ভেবে দেখবেন তোমাকে ছাড়া হবে কিনা. কিন্তু এই “ইংরাজি তে আপিল” টি কে লিখবেন, বেশ্যা স্বয়ং না তাঁর বাবু সে বিষয়ে এক বর্ণও পেলাম না। এদিকে এই চৌদ্দ আইন নিয়ে একটি পাঁচালি লেখা হলো ১৮৭২ এ। পাঠকদের অনুরোধ করি শ্রী অঘোরচন্দ্র ঘোষ প্রণীত “পাঁচালী কমলকলি” সম্ভব হলে পড়ে দেখবেন। বিস্তর উপকার পাবেন।
এই আইন এর কোপ এড়াতে বেশ্যারা কলকাতা ছেড়েছিলো অনেকেই ।কমলকলিতে একটি খেমটা  আছে এই বিষয়ে . :

 

রাঁড়ের দফা রফা হলো
পোড়া আইনের জ্বালায় কে কোথায় পালায় ,
কেউ বা গোলায় মাখছে ধুলো ।।
তেতলাতে যারা ছিল দিবানিশি,তারা এ –
ক্ষণ হলো ফরেশ-ডাঙ্গবাসী, কেউ গিয়েছে
কাশী, তীর্থ বারাণসী , প্রয়াগবাসী হয়ে কেউ
রহিল সোনাগাজী মেছোবাজার শূণ্যা –
কার,দেখে শুনে লোক করে হাহাকার
কথা গেল সে বারেন্ডার বাহার ,
অঘোর বলে আহা কি হইলো।

 

তামাশা যে কি আকার নিয়েছিল, খেমটার চলনেই তা পরিষ্কার। কিন্তু আসল তামাশা প্রকট হলো আর একটি ছড়ায় :

 

এই রুপেতে যাচ্ছে সবে করে দড়াদড়ি ।
ফরাসডাঙায় হয়েছে কেমন রাঁড়ের ছড়াছড়ি ।।
আনাচে কানাচে রাঁড় রাঁড়ময়ই সব ।
ফরেশডাঙায় যত ছোঁড়াদের বাড়িলো উৎসব ।।
আহ্লাদে আটকানা কি বুড়ো কি ছোঁড়া ।
কাঁকুড়ফাটা হয়ে উত্তাল ছিল যত গোঁড়া ।।
সিকি আদুলি ফেলে আগে দিত মালসা ভোগ ।
দু চারি পয়সায় ঘুচলো এখন যত ভোগাভোগ ।।
গৌরাঙ্গ স্মরণ করি শিকোয় তুলে ঝুলি ।
রাঁড়ের বাড়ি উঁকি ঝুঁকি মাচ্ছে কুলি কুলি ।।

 

পরিষ্কার বোঝা গেল কালীপ্রসন্ন আদি বড়োমানুষদের প্রজেক্ট ফেল হয়েছে। আবর্জনা একজায়গায় করে, তা সে সোনাগাজী মেছোবাজারই হোক বা ফরাসডাঙ্গাই হোক, বরং শাপে বরই হয়েছে। যুবক বৃন্দ এখন বুক ফুলিয়ে যা খুশি করতে পারেন কারণ ভদ্র পল্লীর বাইরে কে কোন গো ভাগাড়ে যাচ্ছেন কেউ নজরদারি করতে যাবে না। ফাঁকি তে পড়লো বারবনিতা কুল। তাঁদের গণিকা পল্লীতে এমন ছাগল ঠাসা করা হলো যে তাঁরা সের দরে বিকোতে লাগলেন। যা অঢেল পাওয়া যায় তার আবার দাম কি ?

 

৩/ আমার ভালোবাসা আবার কোথায় বাসা বেঁধেচে…

 

এইসব সোনামুখী সোনামনি, নরি, মরি কোথা থেকে কিভাবে ভেসে এসেছিলো সে জানলাম ১৮৬৮র অমৃতবাজার এর একটি প্রবন্ধর থেকে ২০০র কাছাকাছি মেয়েদের পরিচিতি আছে এই প্রবন্ধে: তারা যা বললে তা মোটামুটি এই:

শুভচারিনী কলু: বিধবা হইয়া ঘরে ব্যভিচারিণী হই,আত্মীয়স্বজন ক্রমে জানিতে পারিয়া জ্বালাতন আরম্ভ করে, জ্বালা সয়ে কিছুদিন ছিলাম শেষে আর সহ্য করিতে না পারিয়া ঘরের বাহিরে আসি ।

সুবচনী  :  বিধবার কষ্ট সহ্য করিতে না পারিয়া কূলে কালি দেই ।

ইচ্ছা বাগদি:  অল্প বয়সে স্বামী প্রাণত্যাগ করে,শাশুড়ি আমাকে এক বেশ্যার নিকট বিক্রয় করে ।

বামা গোয়ালা: অল্প বয়সে বিধবা হই, শেষে ক্রমে যৌবনকাল এলো, আমাদের প্রতিবেশী ক্ষুদি কারিগর  নামক একজন আমায় কুলটা করে । ক্রমে এটি রাষ্ট্র হওয়ায়  সকলে জ্বালাতন করায় ঘরের বাহির হই ।

ঘর থেকে বেরিয়ে তাঁদের যে মধুবৃন্দাবন জুটতো তার একটি ছবি আছে শ্রী কেদারনাথ দত্তর সচিত্র গুলজারনগর  বইয়ে। (জাতে এই বইটি আলালের ঘরে দুলালে,এর সমগোত্রীয়, প্রকাশ ১২৭৮) দরকার না থাকলেও বলে রাখি, ‘মাখনওয়ালার গলি’ পরবর্তীকালের Beadon Street:

“আমরা ওই গলিকে মাখনওয়ালার গলি বলতেম  ওই গলিতে যে কত খুন, কত গলায় দড়ি কত বিষ খেয়ে মরা, কত ভয়ানক চুরি, সিঁধ দাঙ্গা, মাতলামি ঢলাঢলি অবাধে হয়ে গেছে ধরাও পড়ে নাই তা শ্মরণ  কল্লে গা শিউরে ওটে এমনকি বকনা পিয়ারির নামে জ্বর আসতো, হাপসী মাধাই-এর নামে রক্ত শুকাতো […] তথায়  কেঁদো কেঁদো  বাড়িওলানীর কারদানিতে যমরাজ অস্থির হতেন।বকনা পিয়ারির ময়নাপণা দাপট গলাবাজি আজও জাগরুক্ আচে […] তার দাপে হাঁড়ি ফাটতো, পদক্ষেপে ভূমি কাঁপতো, চিৎকারে গর্ভপাত হতো […] এক খানা বড় আঁশবঁটি পিয়ারির ব্রহ্মাস্ত্র ছিল,ঝকড়ার সময় পিয়ারী ওই বঁটি জারি করতো  , এছাড়া গালাগালি, কীলকিলি,  ভেঁউচন (ভ্যাঁংচানি) খেঙরানো ৫৬ পুরুষ তোলা […] প্রভৃতি অস্ত্র শস্ত্র আবশ্যক মতো ব্যবহার করতো”।

এই নরকে যাদের স্থান হ’লো সেইসব মেয়েমানুষের মুখের কোনও রাখঢাক নেই।

Beshya

 

৪/ বেরিয়ে এলাম বেশ্যা হলাম কুল করলাম ক্ষয় /তবুও কিনা ভাতার শালা ধম্কে কথা কয়।

যারা ভাসলো এবং ভাসালো, তাদের বেহদ্দ গান আর ছড়ায় বাংলা ভাষার অশ্লীলতা আরও দুই পোঁচ বাড়লো। ভাষা কথা বলে। কি নির্লিপ্তির সঙ্গে তাঁরা শরীর, খিদে, পুরুষদের নিয়ে কথা বললেন তা দেখে কেউ প্রথমবার চোখ সরিয়ে নিলে আশ্চর্য হবো না:

 

আমার ভালোবাসা আবার কোথায় বাসা বেঁধেছে ,
পিরীতের পরোটা খেয়ে মোটা হয়েছে ।
মাসে মাসে বাড়ছে ভাড়া ,
বাড়িউলী দিচ্ছে তাড়া ,
গয়লাপাড়ার ময়লা ছোঁড়া প্রাণে মেরেছে ।

 

এই পিরীত পদাবলীসাহিত্যর ‘প্রেম’ যে নয় সে কি বলে দিতে হবে? ছবির কাঠামোটি রইলো কেষ্ট ঠাকুরের কিন্তু গয়লা ছোঁড়া যে আসলে ছোট জাতের ‘ভাতার’ সে স্পষ্ট । পিরীতের পরোটা কথাটি তে চমক লেগেছিলো।  যে খাবার সহজে মেলে না, কোন হতভাগীর মনে হয়েছিল সে জিনিসটি ভালোবাসার রূপক হতে পারে কে জানে!একটি তির্যক নির্লজ্জ হাসি চন্ডিদাস আর অন্যান্য  বৈষ্ণব পদকর্তাদের গরানহাটা মেছোবাজারের পথে নামিয়ে আনলেন. পষ্ট দেখলাম গয়লা পাড়ার ময়লা ছোঁড়া আলোআঁধারি কোনো গলি তে দাঁড়িয়ে কোনো বারেন্দা লক্ষ্য করে পানের দোনা ছুঁড়ছেন।

ইংরিজি তে একটি কথা আছেই ‘subversion’. এ হলো সেই ধাঁচের প্রতিক্রিয়া যা প্রাতিষ্ঠানিক বুলি ব্যবহার করেও,তার মধ্যে প্রতিরোধের আগুন ধরিয়ে দেয়। যে ভদ্রসমাজে তাদের জায়গা হলো না সেই ভদ্র সমাজের পরম আদরের ‘প্রেম’কে এইসব মেয়েমানুষ কাদা মাখিয়ে শোধ তুললো।

 

যে পেটের ক্ষিদেই মেটে না তার আবার মনের খিদে নিয়ে অত বাড়াবাড়ি কিসের?

 

মাছ খাবি তো ইলিশ
নাং ধরবি তো পুলিশ II

 

গয়লা থেকে পুলিশ। এছাড়া আছেন নব্য বাবুরা। বেশ্যাপাড়ার এই সাম্যবাদের ছড়া পাঁচালি কমলকলিতে এইভাবে লেখা হ’ল:

 

এক্ষণেতে নব্য বাবু আছেন তথা যারা ,
দিব্য করে চুল ফিরায়ে বাহার দিয়ে তারা
পকেটে ফেলে পাঁচ পয়সা ,চুরুট গুঁজে মুখে,
রাঁড়ের বাড়ি এয়ার্কিটি মাচ্চে মনসুখে
আট পয়সার মজুর যারা খেজুর চাটায়ে থাকে,
খাট পালঙ্কে খাসা বিছানায় শুচ্চে লাখে লাখে।

 

পিরীত, ভালোবাসা, এইসবের নানা ব্যাখ্যান ছড়িয়ে আছে এই জগতে। কত আর বলি। কিন্তু এই বিকৃত রুচি আর রসনার মধ্যে কোথাও কোথাও দুঃখের আভাসও পেয়েছি। সেইসব গানে ছড়ায় দেখেছি ভাষা মোলায়েম হয়ে অনুনয়ের সুর ধরেছে।

 

সদা প্রাণ কোনো চায়?
ভালোবাসার মুখে আগুন,
শত্রু বেড়ে পায়ে
ভালোবেসে খুব জেনেছি,
হাতে হাতে ফল পেয়েছি
সারা রাত কেঁদে মরেছি,
তোমার ধরে দুটি পায়ে

 

অথবা দুর্গাচারণ রায়ের “দেবগণের মর্ত্যে আগমনে ফুলের গন্ধ :

 

আবার কি বসন্ত এলো?
অসময়ে ফুটলো কুসুম,
সৌরভের প্রাণ জাদু আমার
সৌরভের প্রাণ আকুল হলো ।

 

আবর্জনার স্তূপের মধ্যে এইরকম অজস্র ফুল উঁকি ঝুঁকি দেয় সে আমলের বেশ্যাদের গানে । তার মাত্র দুটিই পেশ করলাম।

 

পরিশিষ্ট

 

সবশেষে বলি, একখানি নতুন কথা শিখলাম এইসব যাদের-নাম-নিতে-নেই তাদের উচ্চভাব নাড়াচাড়া করার সুবাদে। কথটি হ’ল ‘হলদে ভাতার’। এও জানলাম ইনি হলেন বিশেষ ভালোবাসার মানুষ। এনার জন্যে ঘি দিয়ে ভাত রাঁধা হয়। কিন্তু আমি দেখতে পেলাম বংশীধারী পীতাম্বরকে। অনেক পতিতাই সেই রকম একজনকেই খুঁজে বেড়িয়েছে হয়তো, মুখে স্বীকার করে নি… সে হাপসী মাধাই বা বকনা পিয়ারীদের ভয়ে কিনা কে জানে!

আরও কথা বাকি রইলো, সে পরে হবে’খন।

 

Featured Image:
https://www.storyltd.com/auction/item.aspx?eid=3842&lotno=30

https://www.google.ca/search?q=beshya+kalighat+patachitra&tbm=isch&tbo=u&source=univ&sa=X&

 

 

 

 

 

 

 

 

Posted in Uncategorized | 3 Comments

গড়গড়ার মা’লো চতুর্থ পরিচ্ছেদ: ‘মিনসে’দের পালিশ ষষ্ঠী অথবা মেয়েলী বুলি ।

GARGARA IV BHASHA

“সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায়না বলা সহজে”!!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মেয়েমানুষদের বড় ঝক্কি। তারা বিপদে পড়লে ন্যানজার হয়, ন্যাকরা করে আর তার ওপর যদি তারা হুড়কো হয় তাহলে তো কথাই নেই।
হুড়কো শব্দটি পাই আশাপূর্ণা দেবীর কোনো একটি গল্পে। কোনো এক প্রতিবেশিনীর ছেলের বৌ হুড়কো, সেই খবরটি  পাড়ার এক গিন্নী দিচ্ছেন তাঁর এক সই কে। তখন পুরো জ্ঞানোন্মেষ হয়নি, আধখানা বোঝা হয়ে থেকেছিল বাকিটা জেনেছিলাম গোপাল উড়ের যাত্রা গান থেকে :

এক বেদেনী বলছে:

এই ওষুধ মোর ছুঁতে ছুঁতে
হুড়কো বৌ যায় আপনি শুতে ।
বার ফটকা পুরুষ যারা
আঁচল ধরা হয়ে উঠে ।

এবার বলি বিদ্যাসুন্দর-এ হিরে মালিনীর গান:

এসো যাদু আমার বাড়ি
তোমায় দিব ভালোবাসা ।
যে আশায় এসেছো যাদু
পূর্ণ হবে মন আশা ।
আমার নাম হিরে মালিনী
ক’ড়ে রাঁড়ী নাইকো স্বামী ।

এই সব মণিমানিক্য দিয়েই তৈরী মেয়েমানুষের বুলি। শিথিলস্বভাবা কলহপ্রিয়ারা “বিদ্যাসুন্দর প্রভৃতি অদি কদর্য পুস্তক সকল পাঠ করিয়া কুপ্রবৃত্তির আলোচনা” করিতে থাকিলো। বাবুরা সভ্য হইবার তোড়জোড়   শুরু করিলেন। এই ভাব এবং ভাষার বিভীষিকা খানিক বঙ্গভাষা অভিযানের হুজুকে কমলো ঠিকই, কিন্তু সাদামাটা মেয়েদের ভাষায় পদ্মফুল ফোটানোর চেষ্টা কারা করলেন সেই খোঁজে আছি।
বিদ্যাসাগর মশাই ঝাঁটা ঝুড়ি নিয়ে ভাষা সংস্করণে নেমেছিলেন বটে। কলকাতার এক বাবু ছড়া বেঁধেছিলেন:
শহরে এক নতুন হুজুক উঠেছে রে ভাই
অশ্লীলতা শব্দ মোরা আগে শুনি নাই।
এর বিদ্যাসাগর জন্মদাতা
বঙ্গদর্শন এর নেতা।
বসন্তক, ১৮৭৪

কিন্ত সে বিদ্যাসাগরি হুজুক মেয়েমানুষের ভোগে যজ্ঞে লাগতে যুগ পেরিয়ে গেল! ভাষা সংস্কারের বিবরণ পাই দীনেশ চন্দ্র সেনের সরল বাঙ্গালা সাহিত্য বইয়ে:

“ছোট ছোট কথা এমনই কৌশলে তিনি (বিদ্যাসাগর) বাঙ্গালার গায়ে পরাইয়া দিলেন, যে আমাদের ভাষা সম্পন্ন গৃহস্থের মেয়ের মত বড় সুন্দর দেখাইল, -সেই গয়না অতিরিক্ত ভাবে পরিয়া তাহার চলাফেরার কোন বাধা হইল না। পূর্বের পণ্ডিতদের হাতে গয়না পরিয়া বঙ্গভাযা একেবারে ভারে এলাইয়া পড়িতেন, তাহার উত্থানশক্তি ও গতিশক্তি রহিত হইত। কিন্তু বিদ্যাসাগরের হাতের সাজানো মেয়েটি বেশ ছুটাছুটি করিয়া চলিতে লাগিল” ।

উপমাটি বেশ। পড়ে মনে মনে হাসলাম। সম্পন্ন গৃহস্থ ঘরের মেয়ের গায়ে পুরুষ গয়না দিলেন আর সেই সালংকারা কন্যা ঢুকলেন তাঁদেরই ভাবের ঘরে।তাঁরা এই ভাষায় উচ্চচিন্তা করতঃ উচ্চমার্গে বিচরণ করতে থাকলেন। আর এলেবেলে মেয়েমানুষরা পড়ে রইলেন খেউড় আর বিদ্যাসুন্দরের জগতে।তাদের বলা হ’লো ‘এইসকল লেখা বিদ্যার উদ্দেশ্য অপবিত্র করে’। কিন্তু সাধারণ মেয়েদের ছোটমনের ছোটকথা দুইপাতা গুছিয়ে দুচার খানা হাল্কা গয়না পরিয়ে কেউ বললেন না। সবই উপদেশ। সবই অমৃতবাণী। যে সদ্বংশজাতারা কপাল গুণে বিদুষী হলেন, তাঁরা হয় জ্ঞানী পুরুষমানুষদের দেখাদেখি গুরুঠকরুণ হয়ে বসলেন আর নাহলে বাবুদের অনুকরণে গুটিকয়  পদ্য লিখলেন। কিন্তু যে হতভাগীরা বালিকাদশায় পুত্রবতী হলো, তাদের সুখদুঃখের কথা সালংকারা ভাষায় কাউকে তো বলতে শোনা গেল না। ভাল ভাল নাটক নবেল যা লেখা হলো সেসব শোভা পেতে থাকলো বাবুদের বৈঠকখানায় আর কাব্য-পুরন্দরদের সাহিত্য সভায়।

দীনেশ চন্দ্র সেনের কথা আরও একটু বাকি। তিনি আরও বললেন: “কেহ কেহ এই ভাষাকে টানিয়া লইয়া একেবারে বেহদ্দ সহরের অলিগলিতে ফেলিয়াছেন”। সেই “অলিগলির” ভাষাকে ঘরে তোলা যায়না, কিন্তু তার সনে রগড় কর যায়। হুতোম প্যাঁচার নক্সা ,আলালের ঘরে দুলাল যে রগুড়ে বেহদ্দ বাংলায় আজব সহর কলকেতাকে খুব একহাত নিলেন, সেই ভাষার অনেকখানিই যে অলিগলির মেয়েলী বুলি তা আমরা খেয়ালও করলাম না। বস্তুতঃ “মাগী যে জক্কী” গোছের মেয়েলী গাল শুনে আমাদের যৎপরোনাস্তি আমোদ হ’লো।

“Oh—ay—that nasty gibberish—I must speak it I suppose. হম again আয়া হ্যায় |”
                                                                                                                                         চন্দ্রশেখর 

BANKIM

Nasty gibberish এর ভাগ রইলো মেয়েদের। ১৮৫০ এ Calcutta Review এ এক সায়েব বলছেন:

“ …(T)he lascivious interviews between them (বিদ্যা আর সুন্দর) are described again and again, with disgusting minuteness and in the most glowing language. If ever vice is decked out in gaudy colors and made to appear attractive, it has been in this novel. The study of it must destroy all purity of mind…”

বাবু ভদ্রলোকরা lascivious interviews পড়া ছাড়লেন কিনা বলতে পারিনা কিন্তু সরব খুব হলেন। কলকাতার বাবু Hur Chunder Dutt একটি Discourse লিখছেন:
“Amours of lascivious Kishna and the shepherdess Radha or of the liaison of Bidya and Sundar […] it is needless to say that topics like these execise a baneful influence on the moral character of the auditors”.
এই সব enlightened বাবুদের বৃত্তান্ত লিখলেন খোদ বঙ্গদর্শনের সম্পাদক। এটি হলো এক উচ্চদরের উচ্চশিক্ষিত বাবু ও তাঁর ভার্যার কথোপকথন:

উচ্চ। কি জান-বাঙ্গলা ফাঙ্গলা ও সব ছোট লোকে পড়ে, ও সবের আমাদের মাঝখানে চলন নেই। ও সব কি আমাদের শোভা পায়?

ভার্য্যা। কেন, তোমরা কি?

উচ্চ। আমাদের হলো Polished society-ও সব বাজে লোকে লেখে-বাজে লোকে পড়ে-সাহেব লোকের কাছে ও সবের দর নেই- polished societyতে কি ও সব চলে?

ভার্য্যা। তা মাতৃভাষার উপর পালিশ-ষষ্ঠীর এত রাগ কেন?

উচ্চ। আরে, মা মরে কবে ছাই হয়ে গিয়েছেন-তাঁর ভাষার সঙ্গে এখন আর সম্পর্ক কি?

ভার্য্যা। আমারও ত ঐ ভাষা-আমি ত মরে ছাই হই নাই।

উচ্চ। Yes for thy sake, my jewel, I shall do it-তোমার খাতিরে একখানা বাঙ্গলা বই পড়িব। কিন্তু mind একখানা বৈ আর নয়!

ভার্য্যা। তাই মন্দ কি?

উচ্চ। কিন্তু এই ঘরে দ্বার দিয়ে পড়্‌ব-কেহ না টের পায়।

ভার্য্যা। আচ্ছা তাই।

(বাছিয়া বাছিয়া একখানি অপকৃষ্ট অশ্লীল এবং দুর্নীতিপূর্ণ অথচ সরস পুস্তক স্বামীর হস্তে প্রদান। স্বামীর তাহা আদ্যোপান্ত সমাপন।)

ভার্য্যা। কেমন বই?

উচ্চ। বেড়ে। বাঙ্গালায় যে এমন বই হয়, তা আমি জানিতাম না।

ভার্য্যা। (ঘৃণার সহিত) ছি! এই বুঝি তোমার পালিশ-ষষ্ঠী? তোমার পালিশ-ষষ্ঠীর চেয়ে আমার চাপড়া-ষষ্ঠী, শীতল ষষ্ঠী অনেক ভাল।
‘বাঙ্গালা সাহিত্যের আদর’ । লোকরহস্য, ১৮৭৫)

বাবুরা hand contaminate না করার প্রকাশ্য ব্রত নিলেন আর যত দোষ হ’লো পোড়া বাঙ্গালীর মেয়ের।এইবার বঙ্গললনাদের কথার আর একটি নমুনা রেখে বিষয়ান্তরে যাই। পাঠক এই লেখাটি বিবেচনা করুন:
শ্যামবাবু । গুড্ মর্ণিং রামবাবু-হা ডু ডু?

রামবাবু। গুড্ মর্ণিং শ্যামবাবু-হা ডু ডু। [উভয়ে প্রগাঢ় করমর্দ্দন]

শ্যামবাবু । I wish you a happy new year, and many many returns of the same.

রামবাবু। The same to you.

[শ্যামবাবুর তথাবিধ কথাবার্ত্তর জন্য অন্যত্র প্রস্থান। ও রামবাবুর অন্তঃপুরে প্রবেশ]

রামবাবুর স্ত্রী। ও কে এসেছিল?

রামবাবু। ঐ ও বাড়ীর শ্যামবাবু।

স্ত্রী। তা, তোমাদের হাতাহাতি হচ্ছিল কেন?

রামবাবু। সে কি? হাতাহাতি কখন হ’লো?

স্ত্রী। ঐ যে তুমি তার হাত ধ’রে ঝেঁক্‌রে দিলে, সে তোমার হাত ধ’রে ঝেঁক্‌রে দিলে? তোমার লাগে নি ত?

রামবাবু। তাই হাতাহাতি! কি পাপ! ওকে বলে shaking hands. ওটা আদরের চিহ্ন।

স্ত্রী। বটে! ভাগ্যে, আমি তোমার আদরের পরিবার নই! তা, তোমার লাগেনি ত?

রামবাবু। একটু নোক্‌সা লেগেছে; তা কি ধর্‌তে আছে?

স্ত্রী। আহা তাই ত! ছ’ড়ে গেছে যে? অধঃপেতে ড্যাকরা মিন্‌সে! সকাল বেলা মর্‌তে আমার বাড়ীতে হাত কাড়াকাড়ি করতে এয়েছেন! আবার নাকি হুটোহুটি খেলা হবে? অধঃপেতে মিন্‌সের সঙ্গে ও সব খেলা খেলিতে পাবে না।

রামবাবু। সে কি? খেলার কথা কখন হ’লো?

স্ত্রী। ঐ যে সেও ব’ল্লে, “হাঁডু ডু ডু!” তা, হাঁ ডু ডু ডু খেলবার কি আর তোমাদের বয়স আছে?

রামবাবু। আঃ, পাড়াগেঁয়ের হাতে পড়ে প্রাণটা গেল। ওগো, হাঁ ডু ডু নয়; হা ডু ডু-অর্থাৎ How do ye do? উচ্চারণ করিতে হয়, “হা ডু ডু!”

এটি সেই একই লোকরহস্য প্রবন্ধ সংকলনের “New Year’s Day” লেখা থেকে।

এ লেখার রসের ভাঁড় যে পাড়াগঁয়ে মূর্খ স্ত্রীটি, সে কি আর বলে দিতে হবে? এইবার যে কথটি বলবো সেটিই হ’লো আসল। মেয়েরা অপকৃষ্ট বই পড়েন, তাঁরা পালিশ ষষ্ঠীর ধার ধারেন না, তাঁদের মুখের অসংস্কৃত ভাষা নিয়ে রগড় খুব করা যায়। বেশি পড়ে ওঠা হয়নি। তাও সামান্য যা পড়েছি তাই দিয়ে আমার Discourse খাড়া করি। মোটামুটি ১৮৭৩ থেকে ১৮৯৮ বাংলা প্রহসনের বই কিছু নাড়াচাড়া করলাম। চারটি প্রহসন থেকে কিছু কছু অংশ দেবো। সে পড়ে পাঠকরা বিবেচনা করুন আমি আড়বুদ্ধি কিনা।

মৎস্যধরা: শ্রী কালীদাস চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৩)

লেখকের বিজ্ঞাপন:
“অগ্নিপুরাণে মৎস্যধরা বিষয়ক যে মনোহর উপাখ্যান আছে, তাছাই অবলম্বন পূর্বক এই নাটক খানির রচনা হইয়াছে। ইহার প্রথম ও দ্বিতীয়াঙ্ক এবং পাৰ্ব্বতী ও পদ্মার কন্দল ও পরিহাস এ সমস্তই অবলম্বিত গ্রন্থবহিভূত। আর আর যে সমস্ত এই পুস্তকে লিখিত হইয়াছে, তাহাও উক্ত গ্রন্থের অবিকল অনুবাদ নহে, স্থানে স্থানে পরিত্যক্ত ও কোন কোন স্থলে সংলগ্ন বিবেচনা করিয়া নূতন নূতন ভাবের নিয়োজন করা হইয়াছে। এই বিষয়টি সংকলন করিতে যে কত দূর প্রয়াস পাইয়াছি বলিতে পারি না। এক্ষণে সরল-হৃদয় পাঠকবৃন্দের সমীপে বক্তব্য যে তাহারা যদ্যপি এই নাটক খানি পাঠে কিঞ্চিৎ মনোনিবেশ করেন, তাহা হইলে মাদৃশ জনের পরিশ্রম সার্থক হয়।  আড়ুই, জেলা বৰ্দ্ধমান । ৭ই বৈশাখ, সন ১২৮০ | শ্ৰীকালীদাস শর্মা “।
এই সব “নূতন নূতন ভাবের নিয়োজন” যা হ’লো তার মাঝে আছে মেয়েদের ভাব ও ভাষায় দেবী ও অন্যান্য মেয়েমানুষের কথাবার্তা:

বাগ্দিনী: আ মরণ আর কি ! মুখ পোড়ার একবার কথা শুনলে ? আপনার আঁটি নেই, পরের মেগের ওপোর অত উচু নজর কেন ?

শিব: পরের মাগ আবার কি ? সয়াতে আর আমাতে কি কিছু ভিন্ন আছে ?

বাগ্দিনী: আমি তেমন মেয়ে নই। তোমার এত যদি আম্বা হয়েচে ঘরে যাওনা ?

শিব: তুমিও তে। আমার কিছু পর নও । তোমার সই তেমন নয়। তার কাছে আর আমার যেতে ইচ্ছে নেই।

বাগ্দিনী: কেন ? কেন ? আমার সইয়ের এমন কি দোষ যে তুমি আর তার কাছে যাবে না।

শিব: তার অন্তঃকরণটা বড় কঠিন; আর দিবারাত্র কেবল কন্দল নিয়েই থাকে। তুমি যদি সয়া বোলে আমারে দয়। কর, তা হলে আমি আর জন্মেও তার মুখ দশন করি না ।

বাগ্দিনী: তিনি দেখতে কেমন হে ?

শিব: তোমার কোড়ে আঙ্গুলেরও যুগ্যিও নয়।

বাগ্দিনী:  তবে যে সকলে বলে শিবের মাগ ভারি সুন্দরী।

এইবার পাঠক পরবর্তী উদ্ধৃতি র তালিকাটি দেখুন:

নবরাহা: শ্রী বিহরীলাল চট্টোপাধ্যায় (১৮৯৭)

তৃ-স্ত্রীলোক । অfর শুনিছিস ? কলকেতার একজন অধ্যাপক ভট্চায্যি সাহেবদের পেয়ারের লোক হবে বলে কুকুরের মতন তাদের পাতের এ-টো খান খায় ?

প্র-স্ত্রীলোক । হা বোন, সেদিন ওঁর কাছে শুনছিলুম বটে। সে মিনসে নাকি সাহেবদের সঙ্গে হাওয়া খেতে কি একটা পাহাড়ে গিয়ে বড় ঢলিয়েছে !

দ্বি-স্ত্রীলোক । কেন হাওয়া খেতে পাহাড়ে গেল কেন ? আর কি কোথায় হাওয়া নেই ?

তৃ-স্ত্রীলোক । ওলো তা নয় তা নয়। আজকাল বাৰু দের পাহাড়ে হাওয়া খাওয়া রোগ হয়েছে । সাহেবরা বাবুগোছের হিন্দুদের খাবার ও সাহেবদের খাবার আলাদা আলাদা হেঁসেলের বন্দোবস্ত করেছে। ঐ ভট্টচায্যি মিনসে বাঙ্গাল একটা হেঁসেলের সাহেব তার সঙ্গে রগড় করে তার হাত ধ’রে যে গানটী গেয়েছিল আমাদের তিনি সে গানটী আমায় শিখিয়ে দিয়েছেন ।

প্র-স্ত্রীলোক। কি গান ভাই কি গান ? বলনা শুনি ।

তৃ-স্ত্রীলোক। দূর পোড়ারমুখী ! এত লোকের সামনে মেয়ে মানুষ গান গাইব কেমন করে ?

দ্বি-স্ত্রীলোক । মেলার ঠেলায় নাটঘাট হয়ে যখন ভিড়ে নাইতে চলিছিস তখন তার একটা রগড়ের গান গাইতে পারিসনি ? ডুবে জল খেলে শিবের বাপেও টের পায় না, গোলে হরিবোল দিলে কে শুনতে পায় ? আর এত ভিড়ের মধ্যে তোমায় কেইবা চিনবে যে তুমি অমুক লোকের মেয়ে অমুক লোকের বউ এখানে এসে গান গাচ্ছ? যতক্ষণ আমরা অন্দরে বন্ধ থাকি ততক্ষণই আমাদের আব্রু। একবার বাইরে বেরুলে মোদের আর পায় কে ? ষাড়িনীর মতন ধাওয়া করে ধাক্কা দিয়ে পুরুষ গুলোকে হুড়িয়ে ঠেলে দিয়ে বেড়িয়ে বেড়াই। কি গান শিখিছিস ফাকায় গেয়ে ফেলে আপনার পেট থালাস কর আমাদেরও হাসিয়ে মেরে ফেল আর ঐ জামাজোড়-পরা ভেকো পুরুষগুলোর মুণ্ডু ঘুরিয়ে দে ।

তৃ-স্ত্রীলোক। তোরা ভাই অ মোয় পাগল পেয়েছিস নিতান্ত ছাড়বিনি ? তবে শোন । সেই হেঁসেল ওলা সাহেব সেই টিকি ওলা অধ্যাপক টাকে চোঙ্গার বাঁদর সাজিয়ে তাকে টিকি ধরে নাচাতে নাচাতে এই গান গেয়েছিল […]

প্রকৃতির পরিশোধ: শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭৪)

দ্বিতীয় দৃশ্য

এক দল মালিনীর প্রবেশ

গান

বুঝি বেলা বহে যায়,

কাননে আয়, তোরা আয়।

আলোতে ফুল উঠল ফুটে, ছায়ায় ঝরে পড়ে যায়।

সাধ ছিল রে পরিয়ে দেব মনের মতন মালা গেঁথে,

কই সে হল মালা গাঁথা, কই সে এল হায়,

যমুনার ঢেউ যাচ্ছে বয়ে, বেলা চলে যায়।

পথিক। কেন গো এত দুঃখ কিসের! মালা যদি থাকে তো গলাও ঢের আছে।

মালিনী। হাড়কাঠও তো কম নেই।

দ্বিতীয় মালিনী। পোড়ারমুখো মিন‍্‍সে, গোরুবাছুর নিয়েই আছে। আর,আমি যে গলা ভেঙে মরছি, আমার দিকে এক বার তাকালেও না! (কাছে গিয়া গা ঘেঁষিয়া) মর্ মিন‍্‍সে গায়ের উপর পড়িস কেন?

সেই লোক। গায়ে পড়ে ঝগড়া কর কেন! আমি সাত হাত তফাতে দাঁড়িয়ে ছিলুম।

দ্বিতীয় মালিনী। কেনে গা! আমরা বাঘ না ভাল্লুক! না হয় একটু কাছেই আসতে! খেয়ে তো ফেলতুম না।

[হাসিতে হাসিতে সকলের প্রস্থান]

স্বর্গীয় প্রহসন: শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৯৮)

 

শীতলা। ( মনসার প্রতি লক্ষ করিয়া স্বগত) মোলো মোলো! আমাদের মন‍্‌সে হিংসেয় ফেটে মোলো। আমি চাঁদের পাশে বসেছি, এ আর ওঁর গায়ে সইল না। ঘুর ঘুর করে বেড়াচ্ছে দেখো-না। এতগুলো পুরুষমানুষের সামনে লজ্জাও নেই! মাগী এবার পাড়ায় গিয়ে কত কানাঘুষোই করবে! উনিও বড়ো কসুর করেন নি। কার্তিক-ঠাকুরটিকে নিয়ে যেরকম নিলজ্জপনা করেছে আমি দেখে লজ্জায় মরে যাই আর-কি। কার্তিক কোথায় নুকোবে ভেবে পায় না। ঐ তো চেহারা, ঐ নিয়ে এত ভঙ্গিও করে! মাগো, মাগো, মাগো! (প্রকাশ্যে) আ মর্ মাগী! চাঁদের সামনে দিয়ে অমন বেহায়ার মতো আনাগোনা করছিস কেন? যেন সাপ খেলিয়ে বেড়াচ্ছে! কার্তিকের ওখানে ঠাঁই হল না নাকি?

সুরসভার মধ্যে মনসার ও শীতলার গ্রাম্য ভাষায় তুমুল কলহ

ইন্দ্র। ( শশব্যস্ত হইয়া একবার মনসা ও একবার শীতলার প্রতি) ক্রোধ সংবরণ করো! ক্রোধ সংবরণ করো! অয়ি অসূয়াতাম্রলোচনে, অয়ি গলদ‍্‌বেণীবন্ধে, অয়ি বিগলিতদুকূলবসনে, অয়ি কোকিলজিতকূজিতে, তারতর সপ্তম স্বরকে পঞ্চম স্বরে নম্র করিয়া আনো। অয়ি কোপনে—

ঘেঁটু। ( উত্তরীয় ধরিয়া ইন্দ্রকে আসনে বসাইয়া) তুমি এত ব্যস্ত হও কেন দাদা? ওদের এমন রোজ হয়ে থাকে। থাকত ওলাবিবি, তা হলে আরো জমত। তার কি খাবার গোল হয়েছে তাই সে শচীর সঙ্গে ঝগড়া করতে গেছে।

ইন্দ্র। ( ব্যাকুলভাবে) হা সুরেন্দ্রবক্ষোবিহারিণী দেবী পৌলমী!

চারটি প্রহসন চার ধারার, কিন্তু এদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মেয়েমানুষের বুলির আঁচড়ে যে কুঁদুলে, পুরুষ-হ্যাংলা  অভব্য মেয়েমানুষকে ঘিরে হাসির হররা উঠলো, তাতে আমরা যোগ দিতে পারলাম না । এমনকি  তার হোতা যদি হন শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , তাহলেও না!

 

 

শেষ কথা

 

antahpur

বিশ শতক-এর গোড়ায়  মেয়েরা আর একটু এগোলেন. স্ত্রী-শিক্ষার হুজুগ-এ তাঁদের হাব ভাব পোশাক- আসাক ও বেশ খানিক বদলালো. সাদামাটা বাড়ির মেয়েরা সায়া সেমিজের ব্যবহার শিখলেন । ভাষার কতক শ্রীবৃদ্ধি হ’লো নিশ্চয়ই, কারণ মেয়েলী ভাষার ধারা যে কেতাবি পথ ধরে এগোচ্ছে সেটা পরিস্কার। আরও  দুই পা যাঁরা এগোলেন, তেনাদের পরনে লেস দেওয়া জ্যাকেট, এগারো হাতি সারি পার্শি ঢং এ পড়া, কাঁধে একটি  ব্রোচও দেখা যায় বড়োমানুষের বৌ ঝিদের ছবিতে। এনারা ইংরাজিও বেশ পড়েন।

বোঝা যাচ্ছে দিন কাল পাল্টাচ্ছে : গিরিজায়া, হরিমোহিনীর বদলে কামিনী, তরুবালা, হেমলতা, প্রিয়ম্বদা।

১৮৯৮ এ ‘অন্তঃপুর’ পত্রিকা। বনলতা দেবী ছিলেন ‘অন্তঃপুরে’র একাধারে পরিচালক ও সম্পাদক। পত্রিকাতে কেবল মহিলাদের রচনাই প্রকাশিত হত। প্রথম সংখ্যার ‘প্রস্তাবনা’ অংশে সম্পাদিকা পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন – “আজকাল মাসিকপত্রিকার অভাব নাই, রমণীদিগের উপযুক্ত পত্রিকার কয়েকখানা সুন্দররূপে পরিচালিত হইয়া রমণীদিগের উন্নতির সহায়তা করিতেছে। আমরাও আজ ক্ষুদ্রশক্তি লইয়া রমণীদিগের ও তাহাদের সুকুমারমতি বালক বালিকাদিগের জন্য একখানি ক্ষুদ্র পত্রিকা প্রকাশ করিতেছি। অন্যান্য খ্যাতনামা পত্রিকার সহিত প্রতিযোগিতা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, সেরূপ দুঃসাহসও নাই। কেবল রমণীদিগের উন্নতিকল্পে আপনাদের যৎসামান্য শক্তি নিয়োগ করিয়া ধন্য হইব এই আশা” ।

১৮৯৯-এর ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে – “বেথুন কলেজের লেডি সুপারিন্টেন্ডেন্ট কুমারী চন্দ্রমুখী বসু এম.এ. এবং শ্রীমতী নির্ম্মলা সোম এম.এ. এই বৎসর এন্ট্রান্স পরীক্ষার পরীক্ষক মনোনীত হইয়াছেন।“

১৯১০ সালে গোরা । সুচরিতা ললিতারা  পুরুষ সমাজে হুঁকো পেয়েছেন । চায়ের টেবিল এ বসে তাঁরা তত্ত্ব আলোচনা, সাহিত্যালোচনা করেন। পুরুষমানুষের সঙ্গে এক টেবিলে বসে চা খান. কিন্তু এতেও কামিনী কলঙ্ক ঘোচে কি ?  মেয়েমানুষের ‘ঝেঁকরে’ দেওয়া বুলি নাই, কিন্তু মেয়েমানুষের পালিশ ষষ্ঠীতে যোগ দানের আস্পর্দা তো আছে । সেই নিয়ে রঙ্গ তামাশাই বা মন্দ কি?

১৯১২ সনে শ্রী দ্বিজেন্দ্রলাল রায় নিম্নোক্ত গান খানি রচেন। এটি একটি বিখ্যাত গানের প্যারডি, রবিবাবুকে লক্ষ্য করে। কিন্তু আমি দেখি এক ঢিলে দুই পাখি কাৎ। রবিবাবুর গানের আদ্যশ্রাদ্ধও হলো, আবার  জাতে উঠতে চাওয়া  মেয়েমানুষের আস্পর্দাকেও খুব এক চোট নেওয়া হলো:

 

সে আসে ধেয়ে

এন, ডি, ঘোষের মেয়ে ।

রিনিক ধিনিক রিনিক ধিনিক

চায়ের গন্ধ পেয়ে ।

কুঞ্চিত ঘন কেশে

বোম্বাই শাড়ি বেশে

খটমট বুট শোভিত পদ

সুবিদিত ম্যাটিনেই ।

বঞ্চিত নহে শরবত্‍-কেক

বিস্কুট তায় প্লেটে ।

অঞ্চল বাঁধা ব্রোচে

রুমালেতে মুখ মোছে ।

জবাকুসুমের গন্ধ আসিছে

ড্রইংরুমটি ছেয়ে …
(আনন্দবিদায়,  ১৯১২)

গানটি নিবেদন করে আজকের মতো পাঁচালী পাঠ শেষ করলাম । নারীজন্ম সার্থক হ’লো।

Copyright @ purnachowdhury.wordpress.com 

                                                                                                     

Posted in Uncategorized | Leave a comment

গড়গড়ার মা’লো তৃতীয় পরিচ্ছেদ: মেয়েমানুষের বুদ্ধি

Woman reading

দধিমঙ্গল

মেয়েমানুষের বুদ্ধি যে তেমন সুবিধের নয় এবিষয়ে আমাদের কোনও সন্দেহ নেই। আমরা evidence এবং authority দুইই মানি। সেই কবে শুনেছি নারীবুদ্ধি প্রলয়ংকরী। কিন্তু প্রলয়টি যে কোন রূপে আসবে সেটি অবশ্য এই প্রবচনটি থেকে বোঝার উপায় নেই। তবে প্রামাণ্য উক্তি এত আছে যে আসল কথাটা বুঝতে বেশি সময় লাগেনা। আমরা, যারা কিনা বদভ্যেসের কারণে তত্ত্বকথা সায়েবদের থেকেই শিখি, তাঁরা দেখবো এমনকি খোদ ইংল্যান্ডেও সেই কবে ১৬১৫ সাল Joseph Swetnam নামে এক খুচরো লিখিয়ে একখানি চটি বই লিখেছিলেন। বইটির নাম The Arraignment of Lewd, Idle, Forward, Unconstant Women. তার মুখবন্ধে আছে:

Jewels are all precious but they are not all of one price, not all of one virtue, no more women are all of same disposition: women are all necessary evils and yet not all given to wickedness and many so bad that in my conceit should I speak the worth that I know of some woman I should make their eares glow that hear me […].

১৬১৭ সনে Constantia Munda নামধারিণী তাকে আচ্ছা করে ঝাঁটাপেটা করেছিলেন বটে (The Worming of a Mad Dogge, 1617) কিন্তু তাতে করে Swetnam-এর মূল উপপাদ্যটি সত্যরূপে আরও প্রতিভাত হ’ল:  মেয়েরা জাত গোখরো। তাদের মধ্যে কতিপয়ের বিষ কিছু বেশি। অতএব, সাধু সাবধান।

বস্তুতঃ মেয়েদের যে জন্মই হয়েছে পুরুষজাতির সর্বনাশ করার জন্য, এবিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই। মনু যদিও বা ‘Old Fool’ হ’ন, সায়েবদের এইসব কথা ফেলে দেওয়ার নয়। তাঁদের এইসব যুক্তিবুদ্ধি সাগর পেরিয়ে এসে এদেশে পড়লো যখন, তখন প্রায় মহারানীর আমল। আমরা আবার নতুন করে জানলাম মেয়ে বুদ্ধির নানা দোষ। বাবু কমলাকান্ত চক্রবর্তী সাক্ষী। নারীর রূপবর্ণনায় তিনি বলছেন:

“হে মানময়ী মোহিণীগণ! কুটিল কটাক্ষে কালকূট বর্ষণ করিয়া আমাকে এই দোষে দগ্ধ করিও না; কালসর্পী-বিনিন্দিত বেণীদ্বারা আমাকে বন্ধন করিও না, ভ্রুধনুতে কোপে তীক্ষ্ণ শর যোজনা করিয়া আমাকে বিদ্ধ করিও না। বলিতে কি, তোমাদের নিন্দা করিতে ভয় করে। পথ বুঝিয়া যদি তোমরা নথ-ফাঁদ পাতিয়া রাখ, তবে কত হস্তী বদ্ধচরণ হইয়া, তোমাদের নাকে ঝুলিতে পারে – কমলাকান্ত কোন্‌ ছার! তোমাদের নথের নোলক খসিয়া পড়িলে, মানুষ খুন হইবার অনেক সম্ভাবনা; চন্দ্রহারের একখানি চাঁদ যদি স্থানচ্যুত হইয়া কাহারও গায়ে লাগে, তবে তাহার হাত পা ভাঙ্গা বিচিত্র নহে। অতএব তোমরা রাগ করিয়ো না”।

নথের ফাঁদ বড় ফাঁদ। অবলা পুরুষজাতি একবার তাতে পা দিলে আর রক্ষে নেই। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত একটি সাময়িক পত্রিকা ক’দিন আগে হাতে পেলাম। নাম ‘প্রয়াস’। তার  প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় জনৈক শৈলেন্দ্রনাথ সরকার একখানি ‘বিষবৃক্ষ অনুশীলন’ লিখেছেন। প্রবন্ধটি কৃষ্ণকান্তের উইল এবং বিষবৃক্ষ  তুলনামূলক সমালোচনা। তাতে তিনি অকাট্য যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছেন যে সব দোষ রোহিণী এবং কুন্দনন্দিনীর। দুই নায়কই সুন্দরী বিধবার রূপের ফাঁদে পা দিয়ে মরেছিলেন: “নগেন্দ্র ও গোবিন্দলাল উভয়ের চরিত্রই প্রথম নির্দোষ ছিল; উভয়েই আপনাপন স্ত্রীকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন […] কিন্তু উভয়েই আপাতমধুর প্রেমে বশীভূত হইয়া পরে বিষময় যণ্ত্রণা ভোগ করিয়াছিলেন”।

উল্লিখিত প্রবন্ধ থেকে আমরা জানলাম গোবিন্দলাল যেহেতু রোহিণীর সঙ্গে পাপপঙ্কে নিমজ্জিত ছিলেন তাই তিনি ভ্রমরকে হারালেন। নগেন্দ্রর বুদ্ধি আর একটু বেশী ছিল তাই তিনি কুন্দকে বিয়ে করে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন তাই আপদ বিদায়ের পর তিনি আবার সুর্য্যমুখীকে ফেরৎ পেলেন। বিষবৃক্ষ আবার উল্টে পাল্টে দেখলাম। কথাটা যে সরকারমশাই নেহাৎ ভুল বলেছেন তা নয়। বইতে সেরকমই কতকটা ঘটেছে বটে।কুন্দকে বিয়ে করার দিন পনরো পরে নগেন্দ্র হরদেব ঘোষালকে লেখা চিঠিতে বিলাপ করছেন:

“তুমি লিখিয়াছ যে, আমি এ পৃথিবীতে যত কাজ করিয়াছি, তাহার মধ্যে কুন্দনন্দিনীকে বিবাহ করা সর্বাপেক্ষা ভ্রান্তিমূলক কাজ। ইহা আমি স্বীকার করি। আমি এই কাজ করিয়া সূর্যমুখীকে হারাইলাম। সূর্যমুখীকে পত্নীভাবে পাওয়া বড় জোর কপালের কাজ। সকলেই মাটি খোঁড়ে, কোহিনুর এক জনের কপালেই উঠে। সূর্যমুখী সেই কোহিনুর। কুন্দনন্দিনী কোন্ গুণে তাঁহার স্থান পূর্ণ করিবে?তবে কুন্দনন্দিনীকে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিয়াছিলাম কেন? ভ্রান্তি, ভ্রান্তি! এখন চেতনা হইয়াছে। কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ হইয়াছিল মরিবার জন্য। আমারও মরিবার জন্য এ মোহনিদ্রা ভাঙ্গিয়াছে। এখন সূর্যমুখীকে কোথায় পাইব?”

কি ভাগ্য তাঁকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না। পাপ বিদায় হ’লো সতীলক্ষ্মীও ঘরে ফিরলেন।

বিলাত থেকে এলো গোরা,
মাথার পর কুর্তি পরা,
পদভরে কাঁপে ধরা,
হাইল্যান্ড নিবাসী তারা

(হুতোম প্যাঁচার নক্সা)

সতেরো’শ শতকের মাঝামাঝি যে সদাশয় সায়েবরা তাঁদের মেমদের পাপপঙ্ক থেকে উদ্ধার করতে আদাজল খেয়ে লাগলেন তাঁদের পিছুপিছু গুটিকতক মেমসায়েবও স্বীয় ভগিনীবৃন্দকে মানুষ করার ব্রত নিলেন।তাঁরা মহীয়সী, তাঁদের ত্রুটি ধরার সাহস বা আস্পর্দা কোনোটাই আমাদের নেই কিন্তু লক্ষ্য করা গেলো এনারাও তাঁদের সায়েবদের মতই সুর ধরেছেন মেয়েমানুষের আপনাপন পাপপ্রবৃত্তির থেকে বাঁচার একটিই উপায়: খানিক খানিক পড়াশুনো করে ধর্মমতে এবং পথে স্বামীসেবা এবং সন্তান প্রতিপালন। অর্থাৎ হয় তুমি সূর্য্যমুখী নয় তুমি পাপিষ্ঠা। তোমার মরণই ভালো। এমনকি মেরী উলস্টোনক্রাফটের মত বাঘিনীও ঢোঁক গিলে বললেন যেসব মেয়েদের পুরুষের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার দখল বা দুঃসাহস আছে, তাঁরা হলেন ‘ব্যতিক্রম’। দলছুট পুরুষালি মেয়েমানুষ। তাঁদের ধরলে চলবেনা।

বাঙ্গালী বাবু বিবিরা চললেন তাঁদের পিছন পিছন।
হুতোমের কথা ধার করে বলি সাহেব সহবাসে তাঁরা যে আর “হতভাগা ম্যাড়া বাঙ্গালী” নেই তা বিলক্ষণ বোঝা গেল।১৮৪২ সনে, মধুসূদন দত্ত (তিনি তখনও মাইকেল হ’ন নি), একখানি প্রবন্ধ লিখে গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন। লেখাটি হ’ল: ‘An Essay on the Importance of Education of Hindu Females’. তার থেকে খানিকটা দিলাম:
It is needless to dwell upon the numerous benefits a child may derive from an educated nurse. In a country like India. Where the nurse ship […] generally devolves on the mother, the importance of educating the females […] is very great.

ঐ সময়ে থেকেই মোটামুটি যেসকল আলোকপ্রাপ্ত বাবুরা, তাঁদে মধ্যে সেরা বাবু দেবেন ঠাকুর, তত্ত্ববোধিনী আদি পত্রিকা ছাপা শুরু করলেন, সেই পথ বেয়ে এলো বামাবোধনী পত্রিকা (১৮৬৩)। হিন্দু ফিমেলরা ভরাডুবি থেকে বাঁচার একটি পথ দেখতে পেলেন এবং কিভাবে নিজেদের মন্দ স্বভাব সামলে সুশীলা হওয়া যায় সেই পাঠ নিতে সচেষ্ট হলেন।সুশিক্ষার অনেক সুবিধে: বিদ্বান উদার স্বভাব স্বামীরা তাতে প্রসন্ন হ’ন এবং সন্তানপালনও উত্তমরূপে নির্বাহ হয়। বিদ্যাশিক্ষার অর্থোপার্জন উদ্দেশ্য নহে এমনটিও তাঁরা শিখলেন।

bamabodhini. II jpg

অথ জ্ঞানদা ও সরলা কথোপকথন

স: আমার বোধহয় মেয়েদের লেখাপড়ায় দোষ আছে। এক তো শুনি এতে মেয়েরা বিধবা হয়।

জ্ঞা: আজও তোমার এত ভুল[…] লেখাপড়াতেই যদি বিধবা করে তাহলে ইংরেজদের দেশের সব মেয়েই বিধবা হতো। বিধবা লেখাপড়া শিখে হলেই কি লেখাপড়ার দোষ হল?

স: কিন্তু ভাই অনেক মেয়ে এতে খারাব হয়ে যায় ।

জ্ঞান:  তুমি লেখাপড়ার কিছু জানো না বলে এমন কথা কও যার স্বভাব খারাব, যে খারাব সংসর্গে  থাকে  সে  লেখা পড়া করুক আর না করুক  প্রায় খারাব হয়.  অনেক মন্দ মেয়েমানুষ  খারাব মতলবেই একটু লিখতে পড়তে শিখে খারাব বই পরে খারাব পত্র  লিখতে শেখে, তাই বলে কি লেখাপড়ার দোষ ? […] তারা তো জ্ঞান পাবার জন্যে লেখা পড়া করে না ।

স:তুমি এক এক করে আমার সব কথা কেটে দিলে দেখতে পাই. আচ্ছা তোমারে জিজ্ঞাসা করি বলো দেখি এই যে এত মেয়ে লেখাপড়া কচ্চে না , তাই ক্ষতি কি হচ্চে ?

জ্ঞান: ভাই কি ক্ষতি হচ্চে তুমি আবার আমায় জিজ্ঞাসা  করো? একবার আমাদের অবস্থার পানে চেয়ে দ্যাখো দেখি?  […] তারা যাদের ভালোবাসে লেখাপড়া না জানাতে তাদের কত অনিষ্ট করে, মাতৃদোষে কত শিশু নষ্ট হয়.

স: তোমার কথাগুলি ভাই আমার মনে বড় লাগছে কিন্তু অনেকে বলে মেয়েমানুষ কি লেখা পড়া শিখে চাকরি  করতে যাবে  না সভায় যে বক্তৃতা করবে? তাদের লেখাপড়ার দরকার কি?

জ্ঞান: […] মেয়েমানুষ পুরুষের সভায় যাবে কোনো, তারা আপনারা একত্র হয়ে নানা প্রকার জ্ঞান আলোচনা কত্তে পারে। আর আমি ঠিক বলতে পারি মেয়েমানুষের আপনারা উদ্যোগী  না হলে তাদের দুঃখ যাবে না, মঙ্গলও হবে না।  (বামাবোধিনী পত্রিকা, ভাদ্র, ১২৭০)

আমরা দেখলাম যে শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণ করে সতী সাবিত্রী হওয়ার পথেও গেরো আছে। কারণ যারা ‘মন্দ মেয়েমানুষ’ তার শিক্ষা পেলেও তাদের মন উল্টো বাগে চলবেই। আর যারা বিদ্যেবতী সতী সাবিত্রী, তাঁরাও পুরুষের ছোঁয়া বাঁচিয়েই চলুন। তাঁদের পুরুষের গুলতানির মধ্যে না যাওয়াই ভালো। নিজেরাই না’হয় গোল হয়ে বসে দুটি দুটি জ্ঞানের কথা বললেন, সেই বা মন্দ কি?

কেউ যেন মনে না করেন গালগল্প শোনাচ্ছি। এখন কথা হ’ল এই, দুই এক খানা বই পড়ে তো আর মাস্টারি হয়না?  মেয়ে মাস্টর কোথায়? এইবার হলো মুশকিল। ‘স্ত্রী বিদ্যালয়ের আবশ্যকতা’ লেখা টি পেলাম ১২৭১ পৌষে। সেখানে এক বিদ্যোৎসাহী বলছেন শুনলাম: বালিকা বিদ্যালয়ে সচ্চরিত্র পুরুষ শিক্ষক হলে ক্ষতি নেই. “সাধুপুরুষ  কোমল হৃদয় বালিকা দিগকে শিক্ষা দান করিতে যেমন কুন্ঠিত  হন না কিন্তু স্ত্রী বিদ্যালয়ে সেটি হবার নয়”। সুতরাং তিনি সাজেস্ট করলেন: “এখন যদি কোনো বিদ্যাবতী ভদ্র গৃহস্থের স্ত্রী  স্বজাতির উন্নতি সাধনে  তৎপর হইয়া  স্ত্রী বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যের ভার গ্রহণ করেন ভালোই, নচেৎ বিবি শিক্ষয়িত্রী দ্বারা আপাততঃ  শিক্ষা কার্য  চলিতে পারে ।” এই প্রস্তাবটি শেষ হলো বামাকুল হিতৈষীদের শিক্ষয়িত্রীদের স্কুল স্থাপন করতে উদ্বুদ্ধ করে। পাছে নগেন্দ্র বা গোবিন্দলালের মত সচ্চরিত্র damn fool-রা মাস্টর হয়ে সে গোয়ালে ঢোকে,এবং সর্বস্ব খুইয়ে বসে, তার জন্যেই এই ব্যবস্থা।

কোন ফাঁদি নথ কোথায় আঁকশি হয়ে আছে বলা কি যায়? বিশেষ, তার একটু আগেই আমরা শুনেছি,”এখন তাহাদিগের (স্ত্রীলোক, মেয়েমানুষ) যৌবনাবস্থা, এই সময়ে তাহাদের মনোবৃত্তি সকল বলবতী হইয়া  প্রবল বেগে স্ব স্ব কার্য্য করিবেই করিবে”। যাদের কোনও শিক্ষাই নেই তাহারা অজ্ঞানতা বশতঃ কি যে করতে পারে তার ঠিক আছে? অথবা, যে পাপীয়সী শুধু খারাপ পত্র লিখিবে বলিয়াই লেখাপড়া শিখিতেছে, ওই যৌবনাবেগতাড়িত শিক্ষা  সৎ পথে প্রয়োগ না করিয়া নিশ্চই অসৎপথে চালিত করিবে এবং ঘোর পাপে “জড়ীভূতা” হইয়া নিজেরাও ডুবিবে এবং সদাশয় পুরুষদেরও অনন্তসাগরে ডুবাইবার প্রয়াস পাইবে। অতএব, আবারও বলি, মূল দোহারটি হ’ল, ‘সাধু সাবধান!’

জ্যৈষ্ঠ,১২৭৭এর একটি সংখ্যা দেখলাম একটি লম্বা ফিরিস্তি দেওয়া হয়েছে স্ত্রীগণের কিরূপ শিক্ষা আবশ্যক এবং তদ্দ্বারা তারা কি শিক্ষা করবেন।তিন নম্বরে তাদের বলা হচ্ছেই স্বামীর প্রতি তাঁরা যেন ‘বিশুদ্ধ’ প্রেম প্রদর্শন করেন. চার নম্বরে, পতি ভিন্ন  অপর পুরুষকে মনে মনেও ইচ্ছা না করেন। কিন্তু মোক্ষম উপদেশটি পেলাম আট নম্বরে: “শারীরিক কর্তব্য পালন করিবে। যাহাতে শরীরকে সুস্থ ও পবিত্র রাখিয়া ধর্ম সাধন করিতে পারো তাহার চেষ্টা করিবে. অভক্ষ্য ভক্ষণ, অপেয় পান, অপরিমিত ইন্দ্রিয় সেবা বিষবৎ পরিত্যাগ করিবে.”

পাঠক ‘বিবাহ রহস্য’ পর্যায়ের আলোচিত ‘_সুন্দরী’ ও ‘-বালা’ দের কথা স্মরণ করুন। আমি যেহেতু আলোক-প্রাপ্ত এডুকেটেড ফিমেল (অন্ততঃ আমার তাই ধারণা) এবং আরও দেড়শো বছর এগিয়ে, এই লেখা লিখতে  বসে ঠিক করেছিলাম পষ্ট কথা পষ্ট করেই বলবো, কিন্তু কার্যকালে দেখলাম মুখের মধ্যে জিভ জড়িয়ে গেল। নাহলে অপরিমিত ইন্দ্রিয় সেবা নিয়ে আরও দুচার কথা বলতাম ।

বেশিরভাগ প্রবন্ধেরই লেখক অজ্ঞাতপরিচয়, তাই কোনটি যে অবলার আর কোনটি যে অবলাবান্ধবের, সেটি বোঝা সময়ে সময়ে শক্ত হয়ে পড়ে, তবে ১২৮২ র ফাল্গুন চৈত্র সংখ্যায় একটি লেখায় মনে হ’ল যেন নাগিনীর ফোঁস শোনা গেল:

“পুরুষের স্ত্রী থাকুক আর না থাকুক, তাহারা যত পারে বিবাহ করিবে, যথায় ইচ্ছা গমন করিবে, যত ইচ্ছা তত বয়সে বিবাহ করুক আর নাই করুক, সে কথায় তোমার প্রয়োজন কি? তোমাদের দ্বাদশ বৎসর বয়ঃক্রম অতীত হইলে বিবাহের সময় উত্তীর্ণ হইয়া গেল। […] তোমাদের পিঞ্জর ভগ্ন করার উপায় বিদ্যা শিক্ষা , আর কোনো উপায় নাই । তোমরা শিক্ষিত হইয়া নিজেরা বুঝ এবং পুরুষদের বুঝাও যে তোমরা যে গৃহের নামে গৃহিনী এবং কার্যে দাসী, সে গৃহে বাস্তবিক তোমাদের এবং পুরুষদিগের সমান অধিকার”।

এই বাক্যবাণ কোনো অবলারই হওয়া সম্ভব। তা না হয়ে এ যদি কোনো অবলাবান্ধবের  হয়, তাহলে তাঁর পায়ে আমার শতকোটি প্রণাম।

উপসংহার

অনেক জানা হল অনেক বোঝা হ’ল। বামাবোধিনীর প্রবন্ধের সমুদ্রে হঠাৎ চোখ পড়েছিলো একটা কবিতায়। কবিতার নাম ‘আত্মঘাতিনী’। বিষয় পরিচিতি বলছে সাহিত্যসেবিকা লেখিকা কুমুদিনী রায়ের শোচনীয় মৃত্যু উপলক্ষ্যে লিখিত। লেখিকা কনকাঞ্জলি রচয়িত্রী। কবিতাটি দীর্ঘ । তার একটুখানি শোনাই:

সকলে ভুলিয়া হায়,

জীবন দলিয়া পায়

অনা’সে সে চলে গেল

উদাসীর প্রায়

গভীর আঁধার রেতে

নীরব শয়ন পেতে

ভাঙিল সাধের খেলা

মরণ ছায়ায়।

আর সে নিতান্ত নাই

মিছা কাঁদে বন্ধু ভাই

আর সে অভিমানিনী

দেখিবে না চেয়ে!

গেছে যদি সুখে থাক

কুশলে আরামে থাক

জুড়াক তপ্ত হিয়া

মার কোল পেয়ে।

(তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, প্রথম বর্ষ, মাঘ-চৈত্র সংখ্যা)

কুমুদিনী রায়কে খুঁজে পাইনি। ‘কনকাঞ্জলি রচয়িত্রী’ কে তাও জানা নেই। মনে হয়েছিল কুমুদিনীর অভিমান কার ওপর? তার মনও কি বিপথে গিয়েছিলো?

পরিশেষে বলি, যে ছবিটি আঁকা হ’ল সে ১৮৬৩-১৮৯৮ এর। আমার পড়া এখনও শেষ হয়নি।১৯২২ বহুদূরে। সেই বামাবোধিনীর শেষ বছর। সময় এগিয়ে যাচ্ছে তা স্পষ্ট। মেয়েরা স্বনামে লিখতে আর ভয় পাচ্ছেন না। তবুও ১৯১৯র একটি সংখ্যায় এই বিজ্ঞাপন দেখে থমকেছিলাম। এইবার বিজ্ঞাপনটি দেখে যা বলার পাঠকেরা বলুন। আমরা শুনি।

Bamabodhini Patrika vol.11, pt. 4, (1919)_boisangraha_0043

Featured Image http://store.prathambooks.org/images/products/small/9788184793390.jpg

Second Image: https://theinkbrain.files.wordpress.com/2011/12/1930sindiacouplephoto1.jpg

Third Image: https://archive.org/details/in.ernet.dli.2015.336333

Copyright: @wordpress.com/post/purnachowdhury.wordpress.com 

Posted in Uncategorized | Leave a comment

বিবাহ রহস্য: দ্বিতীয় পর্ব

BIBAHA

অষ্টবর্ষা ভবেদ্ গৌরী নববর্ষা তু রোহিণী

দশমে কন্যকা প্রোক্তা অতউর্দ্ধাং রজস্বলা ।।

তস্মাৎ সংবৎসরে প্রাপ্তে দশমা কন্যকা বুধৈঃ

প্রদাতব্যা প্রযত্নেন ন দোষঃ কালদোষতঃ ।।

আটবছরে মেয়ে হ’লো গৌরী(গৌরী নামের এবং গৌরীদানের মানে মর্যাদা এবার জলের মত সহজ হ’ল।)। নয় বছরে রোহিণী। দশে কন্যকা, তারপরেই রজস্বলা। এই শেষ দশাটি সর্বনাশের মাথায় বাড়ি। দশম বর্ষ উপস্থিত হইলে পণ্ডিতেরা যত্নশীল হইয়া কন্যাদান করিবেন; তখন আর কালদোষ জন্য দোষ নাই।

“ওঠ ছুঁড়ি তোর বে/ গামছা পর গে”। মেয়ের দশ পেরিয়েছে, এবার যেমন তেমন করে পার করে দাও। সব মাসই শুভ। মলমাস আবার কি? মেয়ের বয়স বেড়ে বেড়ে গাছপাথর নেই, জাত খোয়াবে নাকি!তারপরেই তার কানে মন্ত্র পড়ে দেওয়া হ’লো।তার অর্ধেকখানি সে ভালো বুঝেলোই না। শরীর রইলো শরীরের খোলে। সে ঋতুর পর ঋতু তার কর্তব্যটি করে গেলো, আর মনটি বাঁধা রইলো খাঁচায়। শরীর আর মনের দুটো জগৎ তৈরী হ’লো। মন কি চায় শরীর জানলো না আর শরীর যা চায় তা মন উচ্চারণই করতে পারলো না।

****

ডাকলে তুমি অমনি শোনো,   অমনি তুমি কাছে এসো,

আমি তোমায় ভালোবাসি,     তুমি আমায় ভলোবেসো

(গিরীশচন্দ্র)

রাসসুন্দরী , হেমন্তবালা … একেক জনের একেক গল্প, কিন্তু মূল গত টি কিরকম যেন একই ধারা. হেমন্তবালার কথায় পাই :

“অবশেষে ১৩১১সালের ২৮এ ফাল্গুনের রাত সময় রাত তিনটার সময় ১৫০\দামের কার্বন লাইট বিকল   হওয়ায় রান্নাঘরের কেরোসিন কুপির ধোঁয়াটে আলোয়চোখ বোঁজা নিদ্রালু চোখে ভালো করে না দেখেই আমার শুভ বিবাহ হয়ে গেল। সোলার মালা গাছি ভূতলে পরে রইলো মুদ্রিত চোখে সেটি যথাস্থানে অর্পিত হতে পারেনি. সেটি কে যেন কুড়িয়ে নিয়ে স্বস্থানস্থ করে দিলেন।তখন আমার বয়স দশ বছর চার মাস.  আজ থেকে আমার পরিচয়: জেলা রংপুর, ভিতরবন্ধ বড়তরফের শ্রী বরদাকান্ত রায়চৌধুরী  মহাশয়ের পুত্রবধূ ও নাটোর রাজ্ বড়তরফের মহারাজা জগদীন্দ্র রায়বাহাদুরের ভাগিনেয় বধূরূপে পরিবর্তিত হয়ে গেল। গৌরীপুরের বড়োখুকির এইখানেই ইতি।”

স্বামীকে কোনোকালেই পছন্দ হয়নি হেমন্তবালার। খান দুই বই পড়েছিলেন যাতে লেখা ছিলো স্ত্রীলোক পুরুষের দাসী, স্বামী হলেন ইষ্টদেবতা। পড়লেই গা জ্বলে যেত তাঁর। পণ করেছিলেন এই ধর্ম তিনি  কিছুতেই মানবেন না। কিন্তু বলাই সহজ! দেখা গেল, “মনে বিদ্বেষ পুষে মনের কথা মনে চেপে বাইরে আনুগত্য দেখাই. ভয়ে ভয়ে  থাকি . আরও বহু কথা বাদ দেওয়া যাক. […] ওই ব্যক্তি কলকাতা গেলে আমি নাটোরে পরম সুখে এক থাকি […] এই তো সম্পর্ক।”

কিন্তু কথা কি অত সহজে ‘বাদ দেওয়া যায়’? দুপাতা পরেই তা আচমকা ফুটে বেরোলো। হেমন্তবালার বিয়ে দশ বছরে। চোদ্দ বছরে সন্তান হয় না কেন? সেই অপরাধে কর্তৃকারক তঁকে দেড় বছর বাপের বাড়ি যেতে দিলেন না। তারপর ওষুধ আর দেবতার মানসিকের পর্ব। মাসের চারটি রবিবার সারাদিন উপোস, সন্ধ্যায় সূর্যার্ঘ্য দিয়ে দিনের শেষে চাট্টি হবিষ্যি। কাত্যায়নী পুজোয় যজ্ঞের পোড়া কলা খাওয়া, নবদ্বীপের নৃসিংহদেবের ঠাঁইয়ে মানসিক, মা ষষ্ঠীর কাছে মানত, এতসব পুণ্য কাজ করার পর গর্ভধারণ। তবেই কিনা বাপের বাড়ি যাওয়ার অনুমতি হ’লো! ভাগ্যিস ছেলে হ’ল, নাহলে কপালে আরও কত দুর্গতি লেখা ছি’ল কে জানে।

HEMANTABALA-DEBI-220x300

অনেক ভারি ভারি কথা আছে তাঁর প্রবন্ধ সংগ্রহে: ‘প্রেম ও বিবাহ’ ‘নারীর কর্তব্য’। কিন্তু ফাঁকফোকর দিয়ে যে মানুষটাকে দেখা যায়, সে যে কি চায় তা আর বলে দিতে হয়না। শুধু চোখ থাকা দরকার।

“মেয়েরা একটু গুছিয়ে সংসার করতে চায়। তাদের একটু সাজসজ্জা না হলে চলে না।তাদের একটু পান দোক্তা চাই, সুর্তি-জর্দা চাই […] আচার কাসুন্দি ঝাল চচ্চড়ি বড়ি পাঁপড় চাই।তাদের একটু হস্তশিল্প চাই। তাদের একটু সিনেমা থিয়েটার দেখা চাই। সর্বোপরি চাই তাদের স্বামী সোহাগ। […] পুরুষ ঐটুকু যদি দিতে না পারে তাহলে বিয়ে করে কেন?”

বড় সর্বনেশে কথা বললেন গৌরীপুরের বড়খুকি। স্বামী সোহাগের অনুপানে কতটা দেহ কতটা মন, তা না শিখলো পুরুষ না বোঝাতে পারলো স্ত্রীজাতি।কমবেশি হলে চলতে পারে কিন্তু দাঁড়িপাল্লা যেন একদিকে বেশী না ট’লে যায়। “রক্তমাংস” দিয়ে স্বামী সেবা মনে ধরেনি হেমন্তবালার। কিন্তু মন যে নভোচারী, তাও তো নয়! এ মন আচার চায়, বড়ি পাঁপড় চায়। স্বাদ গন্ধ স্পর্শ সব চায়! শ্বশুড়বাড়িতে বঙ্কিমবাবুর নভেল পড়তেন,ফুলের শয্যা চাঁদের আলোর স্বপ্ন দেখতেন। ভাগ্যিস ঠিক বয়সে শ্রীগুরু বুঝিয়েছিলেন বিধিনিষেধ মানতেই হবে, নাহলে “ধিক্কার আসবে ব্যাভিচার আসবে”! না হলে কি করতেন শ্রীবরদাকান্ত রায়চৌধুরীর পুত্রবধূ? শ্রীগুরুর দেখা মিলেছিলো ঠিক সময়। তাঁর তখন সতেরো আঠেরো। চারবছরের ছেলের মা।

এবার আর একজনের কথা বলি। সে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ এর কুমুদিনী। তার শরীর আর মনের কথাটি বলে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি কিনা পুরুষ মানুষ, তাঁর অত হায়ালজ্জা নেই। এই হ’লো কুমুদিনীর ফুলশয্যার পরের দিনের প্রলাপ :

“নিরপরাধ ছেলেকে নিষ্ঠুর বাপ যখন অকারণ মারে তখন সে যেমন কিছুই বুঝতে পারে না, অভিমান করে আঘাত গায়ে পেতে নেয়, প্রতিবাদ করবারও চেষ্টা করতে মুখে বাধে, ঠাকুরের ‘পরে কুমুর আজ সেইরকম ভাব। যে আহ্বানকে সে দৈব বলে মেনেছিল, সে কি এই অশুচিতার মধ্যে, এই আন্তরিক অসতীত্বে? ঠাকুর নারীবলি চান বলেই শিকার ভুলিয়ে এনেছেন নাকি; যে শরীরটার মধ্যে মন নেই সে’ই মাংসপিণ্ডকে করবেন তাঁর নৈবেদ্য? আজ কিছুতে ভক্তি জাগল না। এতদিন কুমু বার বার করে বলেছে, আমাকে তুমি সহ্য করো– আজ বিদ্রোহিণীর মন বলছে, তোমাকে আমি সহ্য করব কী করে? কোন্‌ লজ্জায় আনব তোমার পূজা?”

শেষমেষ স্বামীগৃহ ছেড়েছিল কুমুদিনী কিন্তু এমনই কপাল, যাকে সে গুরুর আসনে বসিয়েছিলো সেই দাদাই কুমুদিনীকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফেরৎ পাঠালেন মধুসূদন ঘোষালের গোয়ালে। সে তখন ঘোষালবাড়ির গৃহদীপ্তি, তার শরীরে তখন স্বামীর সদ্য গজানো শিকড়। তাকে ধরে রাখার দুঃসাহস নুরনগরের বিপ্রদাস চাটুজ্যেরও নেই। উপন্যাসটি সকলের পড়া। তাই আর বেশি বললাম না।

aalpon

 ***

জঙ্গলা কখনও পোষ না মানে, মন সদা তার সোঁদর বনে

যে সতীলক্ষ্মীদের ‘স্বামী’ কথাটার মর্মই বোঝা হলো না তাদের স্বামী সোহাগের কাঙ্গালপনা দেহতেই আটকে রইলো। সে কথা অকপটে লিখলেন দুটি পুরুষ। দীনবন্ধু মিত্রর সধবার একাদশীর ছবিটি বড় মর্মান্তিক। ননদ ভাজের আলাপে স্বামীসোহাগের আকুলিবিকুলির যে ছবিটি তিনি আঁকলেন, তা আর যাই হোক, পতি পরমেশ্বরের জন্য সতীসাধ্বীর প্রেম নয়। এতে চাঁদের আলো, ফুলের মালা, মলয় সমীরণ কিছুই নেই। যা আছে তা হ’ল এই:

(দ্বিতীয় অঙ্ক প্রথম গর্ভাস্ক কঁশারিপাড়া। কুমুদিনীর শয়নঘর কুমুদিনী এবং সৌদামিনীর প্রবেশ)

কুমু:  এর চেয়ে বিধবা হয়ে থাকা ভাল—আমি ভাই আর সইতে পারি নে, আমি গলায় দড়ি দে মরবো।

সৌদা: আস্তে বলিস্, মা শুনলে রাগ করবেন।

কুমু:  করুন গে—সাধে বলি, মনের দুঃখে বলি—দেখ দেখি ভাই রক্ত মাংসের শরীর ত বটে,ঠাকুরজামাই এক শনিবার না এলে তোমার মনটি কেমন হয়, চক্ৰ যে ছল ছল কত্তে থাকে ।

সৌদা:  তা ভাই দুধের সাধ তো ঘোলে মেটে না, ত৷ নইলে আমি না হয় তোকে দুদিন দিই ।

কুমু:  তুই আর কাটা যায় নুনের ছিটে দিস নে—তুই যে ভাতারকামড়া তুই আবার অন্য নোককে দিবি, ঘরে এসে একটা ঠাকুরজামাই দুটো হয় তাতেও তোর মন ওটে কি না সন্দ।

সৌদা:  আমার বড় সাধ, আমার ভাতার একদিন মদ খেয়ে ঘরে আসে আর এক মাগীকে রাখে ।

কুমু:  দূর মড়া, তোর আজগুবি সাধ দেখে আর বঁচি নে ।

সৌদা: তোকে দেখাই কেমন ক’রে বশ কত্তে হয়।

কুমু: তুই নাকি বশের বড়াই কচ্চিস্ তাই বলচি—পোড়া কপালের দশা দেখ দেখি ভাই, আজ দশ দিন বাপের বাড়ী থেকে এইচি এক দিন তাকে ঘরে দেখতে পেলেম না, এক মরে যায় জানলুম আপদ গেল, চকের উপর এ পোড়ানি সহ্য হয় না […]

Ishwar_Chandra_Vidyasagar (1)

পরিশীলিত পাঠকের  যদি ভাব এবং ভাষা দেখে ‘চক’ কপালে ওঠে তাহলে মনে করাবো এই হলো সেকালের অশিষ্ট মেয়েলি ভাষা। বিশেষ, যে মেয়ের কেতাবি বাংলার সঙ্গে পরিচয়ই হয়নি। কিন্তু তা বাদেও কথা আছে, ভাবটি যা পরিষ্কার হলো তাতে যদি নাকে কাপড় দিতে হয় দিন,কিন্তু বাবু দীনবন্ধু মিত্রর অতিরঞ্জন টুকু বাদ দিলেও এই শরীরী খিদেটি কিন্তু সর্বৈব মিথ্যে নয়। সেটি প্রমাণ হয় জনৈক ঈশ্বর চন্দ্র শর্মার  “বহু বিবাহ রহিত হওয়া উচিৎ কিনা এতদ্বিষয়ক প্রবন্ধ”থেকে। কুলীনদের বহু বিবাহ নিবারণ নিমিত্ত তিনি এই প্রস্তাবটি লিখেছিলেন ১৮৭১ খ্ৰীষ্টাব্দে, অর্থাৎ ‘বিধবা বিবাহ’ নামক প্রস্তাবটি লেখারও ষোলো বছর পরে। অল্পবয়েসী কুলীন সধবাদের সম্পর্কে তিনি যা লেখেন তার সামান্য একটু খানি তুলে  দিলাম:

“কোনো কারণে কুলীন মহিলার গর্ভ সঞ্চার হইলে তাহার পরিপাকার্থে,কন্যাপক্ষীয়দিগকে  ত্রিবিধ উপায় অবলম্বন করিতে হইবে।প্রথম, সবিশেষ চেষ্টা করিয়া জামাতার আনয়ন।  তিনি আসিয়া দুই একদিন শ্বশুরালয়ে অবস্থান করিয়া প্রস্থান করেন।দ্বিতীয়, জামাতার আনয়নে কৃতকার্য হইতে না পারিলে ব্যাভিচার সহচরী ভ্রুণ হত্যা দেবীর আরাধনা […] তৃতীয় উপায় অতি সহজ, অতি নির্দোষ ও সাতিশয় কৌতুকজনক. […] কন্যার জননী অথবা বাতির অপর কোনো গৃহিনী […] পাড়ায় বেড়াইতে যান এবং দেখ মা দেখ বাছা এইরূপ সম্ভাষণ করিয়া কথা প্রসঙ্গে বলিতে আরম্ভ করেন, অনেকদিন পরে কাল জামাই আসিয়াছিলেন […] পরে স্বর্ণমঞ্জরীর গর্ভসঞ্চার প্রচার হইলে ওই গর্ভ জামাতৃ কৃত বলিয়া পরিপাক পায়।”

কৌতুকজনকই বটে। শুনলেও শরীর শিউরে ওঠে। মেয়েমানুষ যে তুষের আগুন (প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই বিশেষণ তো হেমন্তবালার কথাতেও আছে) গঙ্গাজল না, তার মনের সঙ্গে যে তার শরীরেরও ধিকি ধিকি জ্বলন আছে এ কথাটি বলে গেলো এক সৃষ্টিছাড়া ব্রাহ্মণ পণ্ডিত যার কথার কোনও বাছবিচার ছিলনা।

‘সধবার একাদশী’ ১৮৬৫, বহুবিবাহ বিরোধী প্রস্তাব ১৮৭১। রবীন্দ্রনাথ আর এক সধবা বৃত্তান্ত শোনালেন ১৮৯৫এ। ‘মানভঞ্জন’এর গিরিবালাকে কারোর মনে আছে কি?
“আপন সর্বাঙ্গের এই উচ্ছলিত মদির রসে গিরিবালার একটা নেশা লাগিয়াছে। প্রায় দেখা যাইত, একখানি কোমল রঙিন বস্ত্রে আপনার পরিপূর্ণ দেহখানি জড়াইয়া সে ছাদের উপরে অকারণে চঞ্চল হইয়া বেড়াইতেছে। যেন মনের ভিতরকার কোনো এক অশ্রুত অব্যক্ত সংগীতের তালে তালে তাহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নৃত্য করিতে চাহিতেছে। আপনার অঙ্গকে নানা ভঙ্গিতে উৎক্ষিপ্ত বিক্ষিপ্ত প্রক্ষিপ্ত করিয়া তাহার যেন বিশেষ কী এক আনন্দ আছে; সে যেন আপন সৌন্দর্যের নানা দিকে নানা ঢেউ তুলিয়া দিয়া সর্বাঙ্গের উত্তপ্ত রক্তস্রোতে অপূর্ব পুলক-সহকারে বিচিত্র আঘাতপ্রতিঘাত অনুভব করিতে থাকে। সে হঠাৎ গাছ হইতে পাতা ছিঁড়িয়া দক্ষিণ বাহু আকাশে তুলিয়া সেটা বাতাসে উড়াইয়া দেয়– অমনি তাহার বালা বাজিয়া উঠে, তাহার অঞ্চল বিস্রস্ত হইয়া পড়ে, তাহার সুললিত বাহুর ভঙ্গিটি পিঞ্জরমুক্ত অদৃশ্য পাখির মতো অনন্ত আকাশের মেঘরাজ্যের অভিমুখে উড়িয়া চলিয়া যায়। হঠাৎ সে টব হইতে একটা মাটির ঢেলা তুলিয়া অকারণে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দেয়; চরণাঙ্গুলির উপর ভর দিয়া উচ্চ হইয়া দাঁড়াইয়া প্রাচীরের ছিদ্র দিয়া বৃহৎ বর্হিজগৎটা একবার চট করিয়া দেখিয়া লয়– আবার ঘুরিয়া আঁচল ঘুরাইয়া চলিয়া আসে, আঁচলের চাবির গোছা ঝিন্‌ ঝিন্‌ করিয়া বাজিয়া উঠে। হয়তো আয়নার সম্মুখে গিয়া খোঁপা খুলিয়া ফেলিয়া অসময়ে চুল বাঁধিতে বসে; চুল বাঁধিবার দড়ি দিয়া কেশমুল বেষ্টন করিয়া সেই দড়ি কুন্দদন্তপঙ্‌ক্তিতে দংশন করিয়া ধরে, দুই বাহু ঊর্ধ্বে তুলিয়া মস্তকের পশ্চাতে বেণীগুলিকে দৃঢ় আকর্ষণে কুণ্ডলায়িত করে– চুল বাঁধা শেষ করিয়া হাতের সমস্ত কাজ ফুরাইয়া যায়– তখন সে আলস্যভরে কোমল বিছানার উপরে আপনাকে পত্রান্তরালচ্যুত একটি জ্যোৎস্নালেখার মতো বিস্তীর্ণ করিয়া দেয়।“

গিরিবালা শরীরের নেশায় বুঁদ হয়ে রইলো আর তার স্বামী গোপীনাথ পড়ে রইলো এক অভিনেত্রীর শ্রীচরণে। গিরিবালা প্রতিশোধ নিতে থিয়েটারে নাম লেখালো এবং স্টেজে উঠে শৌখিন বাবুদের চিত্ত চাঞ্চল্য ঘটালো। গল্পের শেষটা এইরকম:

“কিন্তু যখন সে আভরণে ঝল্‌মল্‌ করিয়া, রক্তাম্বর পরিয়া, মাথার ঘোমটা ঘুচাইয়া, রূপের তরঙ্গ তুলিয়া বাসরঘরে দাঁড়াইল এবং এক অনির্বচনীয় গর্বে গৌরবে গ্রীবা বঙ্কিম করিয়া সমস্ত দর্শকমণ্ডলীর প্রতি এবং বিশেষ করিয়া সম্মুখবর্তী গোপীনাথের প্রতি চকিত বিদ্যুতের ন্যায় অবজ্ঞাবজ্রপূর্ণ তীক্ষ্ণকটাক্ষ নিক্ষেপ করিল–যখন সমস্ত দর্শক-মণ্ডলীর চিত্ত উদ্‌বেলিত হইয়া প্রশংসার করতালিতে নাট্যস্থলী সুদীর্ঘকাল কম্পান্বিত করিয়া তুলিতে লাগিল– তখন গোপীনাথ সহসা উঠিয়া দাঁড়াইয়া ‘গিরিবালা’ ‘গিরিবালা’ করিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। ছুটিয়া স্টেজের উপর লাফ দিয়া উঠিবার চেষ্টা করিল– বাদকগণ তাহাকে ধরিয়া ফেলিল।

এই অকস্মাৎ রসভঙ্গে মর্মান্তিক বাক্রুদ্ধ হইয়া দর্শকগণ ইংরাজিতে বাংলায় ‘দূর করে দাও’ ‘বের করে দাও’ বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল।

গোপীনাথ পাগলের মতো ভগ্নকণ্ঠে চীৎকার করিতে লাগিল, ‘আমি ওকে খুন করব, ওকে খুন করব।’

পুলিশ আসিয়া গোপীনাথকে ধরিয়া টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেল। সমস্ত কলিকাতা শহরের দর্শক দুই চক্ষু ভরিয়া গিরিবালার অভিনয় দেখিতে লাগিল, কেবল গোপীনাথ সেখানে স্থান পাইল না”।

গল্পের শেষে আমরা ‘বেশ হয়েছে খুব হয়েছে’ বলে গোপীনাথের এবং গোটা পুরুষ জাতির গুষ্টির তুষ্টি করতে পারি, কিন্তু গিরিবালার দশাটি এরপর কি হবে সে কথা না ভাবলে চলবে না। ‘হাত বিধবা’ পরিচ্ছেদে Virginia Woolf এর Shakespeare’s Sister এর উল্লেখ করেছিলাম। সেটি আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি। গল্পটির যদি এরপর আরও একটু বাকি থাকতো তাহলে দেখতাম গিরিবালার একটি বাবু জুটেছে এবং বাবু সদাশয় হলে গিরিবালার গরাণহাটায় একটি পাকা কোঠাও তুলে দিয়েছেন। রবি বাবু খুব সময়ে গল্পের রাশ টেনে ধরেছিলেন, নাহলে সর্বনাশ হতো। গল্পেরও, গিরিবালারও।

এমন কত যে শাঁখা-সিঁদূরে সধবা ছড়িয়ে আছেন বাংলা সাহিত্যে …বলে কুলিয়ে ওঠা যায়না।
শেষ একটি প্রশ্ন করে ইতি টানি:  মেয়েমানুষের কোনটি ভালো? খাঁচার মধ্যে পুতুল গড়াগড়ি না খোলা আকাশ? প্রবৃত্তি মার্গ, না মনুনির্দিষ্ট নিবৃত্তিমার্গ?

অথ বিবাহ রহস্য পরিসমাপ্ত

Featured Image:  https://4.bp.blogspot.com/-kM-rrKnyylY/ULjFw6J-

copyright@purnachowdhury



Posted in Uncategorized | Leave a comment

বিবাহ রহস্য : গড়গড়ার মা লো (২)

Babu-walking-dalmatian

বিবাহ রহস্য:

মহাভারত উবাচ

যদি জ্ঞানীগুণীদের জিগেস করি “ঐতিহ্যমতে আমাদের দেশে বিবাহের মূল উদ্দেশ্যটি কি?” তাঁরা একনিশ্বাসে বলে দেবেন: পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্য্যা। ভার্য্যা শব্দটির গূঢ়ার্থও বলে দিতে পারেন এমনকি। আমিও অর্ধেক জীবন ঐ শুনেই বসে রইলাম। তারপর খানিক নাড়াচাড়া করতে করতে পেয়ে গেলাম আরও অনেক অমূল্য রতন। কথায় আছে মহাভারতের কথা অমৃত সমান পু্ত্রার্থে ভার্যা অবশ্যই। কিন্তু তার সঙ্গে চাট্টি মানবীকল্যাণও করা হয়ে থাকলো পুরুষজাতের।মনুর বিধান ঘোলের ওপরের জলটুকু। নির্যাসটি আছে মহাভারতে।

শান্তিপর্বে যুধিষ্ঠিরেকে ভীষ্ম বোঝাচ্ছেন, স্ত্রীলোকরা জীবপ্রবাহ প্রবাহিত করে। প্রকৃতি যেমন পুরুষকে. অপত্যোৎপত্তির ক্ষেত্রভূত স্ত্রীজাতিও জীবকে বদ্ধ করিয়া রাখিয়ছে। ঐ ঘোররূপা স্ত্রীলোকেরা প্রতিনিয়ত অবিচক্ষণ মনুষ্যগণকে বিমোহিত করিয়া রাখে। উহারা সাক্ষাৎ ইন্দ্রিয়দ্বারাই নির্মিত হইয়াছে। উহাদের প্রতি লোকের অনুরাগ থাকাতেই জীব সকল উৎপন্ন হইতেছে।

বেশ। এইবার “ঘোররূপা স্ত্রীলোক”দের নিয়ে কি করতে হবে?

অনুশাসন পর্বে খুড়ো ঠাকুর্দা বড় নাতিকে বুঝিয়ে চলেছেন:

মহাত্মা মনু দেবলোকে গমন করিবার সময় পুরুষিদিগের হস্তে স্ত্রীলোকদিগকে সমর্পন করিয়া কহিয়াছিলেন. ‘মানবগণ!স্ত্রীজাতি নিতান্ত দুর্বল, সত্যপরায়ণ ও প্রিয়কারী। উহাদিগের মধ্যে কতগুলি নিতান্ত ঈর্ষাপরতণ্ত্র, মানলাভার্থী, প্রচণ্ডস্বভাব, অবিবেচক ও অপ্রিয় কার্যে নিরত। অল্পমাত্র চেষ্টা করিলেই উহাদিগের ধর্মনষ্ট করা যায়। অতএব  তোমরা প্রযত্নসহকারে উহাদিগকে রক্ষা কর।[…]উহারাই উপভোগাদি সমুদায়ের মূল[…] অপত্যোৎপাদন, অপত্য উৎপাদন হইলে তাহার প্রতিপালন, লোকযাত্রা বিধান স্ত্রীলোক হইতেই সমাহিত হইয়া থাকে।তাহদিগকে সম্মান করলে সমুদায় কার্য নিশ্চয়ই সুসিদ্ধ হয়।

তারপর এও দেখলাম ঐ পর্বেরই ৪৮ অধ্যায়ে ভীষ্মর উপদেশামৃত থেকে সুশীলারা খ’সে পড়েছেন। তিনি নাতিকে বোঝা্চ্ছেন, “পরপুরুষ দূষণ স্ত্রীজাতির স্বভাব”।

ভালো কথা। খুড়োঠাকুর্দার নাতি ত্রেতা যুগে বসে কি বুঝলেন জানিনা, কিন্তু কলিযুগের আমরা, বিশেষ করে যাঁরা discourse analysis করে ভাত যোগাড় করি, তারা অনেক ফাঁকফোকর খুঁজে পেলেম। স্ত্রীলোকরা ভালো না মন্দ? কাহাদের দেখভাল পুরুষজাতি করিবেন? যাহাদের “অল্পেই ধর্ম নষ্ট করা যায়” না ঠক বাছিতে গাঁ উজাড় হইবে বলিয়া সমগ্র স্ত্রী জাতিকেই গোশালায় পোরা বিধেয়? তাছাড়া একথাও ভুলিলে চলিবে না যে উপভোগাদি এবং সন্তান উৎপাদন মনুষ্যগণের পুণ্য কর্তব্য এবং এই সকল কর্ম স্ত্রীলোকদিগ ব্যতীত সম্ভবে না। সুতরাং শুদ্ধমাত্র কুশীলাদের বিবাহ নামক খুড়ার কল দ্বারা উদ্ধার করিলে উপভোগ সামগ্রী এবং সন্তান উৎপাদন যণ্ত্র কিছু কম পড়িবে, অতএব সুশীলা কুশীলা দুই শ্রেণীকেই “প্রযত্নসহকারে রক্ষা করা” পুরুষজাতির কর্তব্য।

তাহলে যা দাঁড়ালো,তাএই : স্ত্রীলোক দুষ্টা হইতেও পারেন আবার নাও হইতে পারেন তবে প্রথম সম্ভাবনাটিই অধিকতর প্রবল। একথাও সত্য যে মনুষ্যসমাজে তাঁহাদের অন্ততঃ দুটি আবশ্যকতা নিশ্চয় আছে। এই কারণে আদি পিতার ইচ্ছা অনুসারে ইহাদিগকে বিবাহন্ধনে আবদ্ধ করাই বিধেয়। তাহাতে মনুষ্য সমাজ ও পুরুষজাতি, দুইয়েরই শুভ। এবং যত সকাল সকাল তাহা সারিয়া ফেলা যায়, ততই মঙ্গল। আদি পিতার তাহাই মত; তিনি বিধান দিয়াছিলেন, ত্রিংশৎবর্ষ পাত্রের দশম বর্ষীয়া, একবিংশতি বয়স্ক পাত্র সপ্তম বর্ষীয়া এবং চতুর্বিংশতি বয়স্ক পাত্র অষ্টমবর্ষীয়া কন্যাকে বিবাহ করিতে হইবে।

এইবার আসি আসল কথায়। ৭৮/১ নিমতলা ঘাটের ঁকাশী দত্ত বাটীর জনৈক বাবু রাধাকান্ত দত্তচৌধুরী বিবাহ রহস্য নামক একটি বই লেখেন ১৩৪৩ বঙ্গাব্দে। (আমার শিরোনামটি তাঁর থেকেই ধার করা) । এই কেতাবটির উদ্দেশ্য ছিল “জাতের আশা ভরসা সর্ববিধ আন্দোলন অগ্রদূত ছাত্রবৃ্ন্দ” কে গার্হস্থধর্ম এবং তার সারাৎসার দাম্পত্য প্রেমের পথে অনুপ্রাণিত করা। পাতা উল্টে দেখি বাবু রাধাকান্তর প্রস্তাবটি মনুসংহিতা হয়ে মহাভারতের পথ ধরে, ‘ঘোর প্রকৃতি’ স্ত্রীলোকদের কি উপায়ে পুরুষজাতি উদ্ধার করবে তারই চর্বিতচর্বণ।।আরও দেখলাম তার মাঝে ‘সম্ভোগ’ এর প্রয়োজনীয়তাটিও গুছিয়ে পেশ করা হয়েছে।

এতসব গুরুগম্ভীর ধর্মবাচন থেকে যেটুকু বোঝা গেল তা হ’লো সনাতন ধর্মের বিবাহর সংজ্ঞায় রতি এবং সম্ভোগের দায় পুরুষে অর্শায়। পই পই করে সংহিতা আর মহাভারতের দোহাই দিয়ে তাই বোঝনো হয়েছে। স্ত্রীলোকরা পেয়েছেন সন্তান ধারণ এবং স্বামী পূজার পরম প্রসাদ। এও দেখলাম দত্তচৌধুরী মশাইয়ের বইয়ে গোটা গোটা করে উদ্ধৃত করা হয়েছে বনপর্বে যুধিষ্ঠিরের প্রতি মার্কণ্ডেয়র উক্তি:
কামিনীগণ কেবল স্বীয় স্বামীর শুশ্রুষা দ্বারাই স্বর্গলাভ করিতে পারে ; কিন্তু যে রমণী পতির প্রতি ভক্তি না করে, কি যজ্ঞ কি শ্রাদ্ধ, কি উপবাস, তার সকলই বৃথা হয়

‘শুশ্রুষা’ কথাটি দ্যোতক। এইবার সেইটি নিয়ে পড়া যাক।

***

Hara Parbati

প্রজনার্থং মহাভাগাঃ পূজার্হা গৃহদীপ্তয়ঃ।

 (তাঁহারা সন্তানকে জন্ম দেন বলিয়া মহাভাগা, পূজনীয়া ও গৃহের দীপ্তিস্বরূপা )

জ্ঞানদানন্দিনীরআমার জীবনকথায় ভারী অদ্ভুত একটি  কথা পড়েছিলাম তাঁর শাশুড়ি ঠাকরুন সারদা দেবী সম্পর্কে:আমার মনে পড়ে বাবামশায়   যখন বাড়ি থাকতেন  আমার শাশুড়িকে একটু রাত করে ডেকে পাঠাতেন,ছেলেরা সব শুতে গেলে।আর মা একখানি ধোয়া সুতি শাড়ি পরতেন, তারপর একটু আতর মাখতেন. এই ছিল তাঁর রাতের সাজ; পড়ে ভারী দুঃখ হয়েছিল জোড়াসাঁকোর এই জমিদার গিন্নীর জন্যে। স্বামী কখন আহ্বান জানাবেন সেই অপেক্ষায় থাকা: স্বামীর উপভোগ প্রবৃত্তি হবে তবেই না তাঁর ডাক পড়বে, তবেই না তিনি যেতে পাবেন পূজা বা শুশ্রুষা করার জন্যে; থালা সাজিয়ে ধরবেন যাতে দেবতা প্রসন্ন হন! তাঁর মনের ভাবটি কি হতো কে জানে। তিনি বই পড়তেন কিন্তু লিখে তো যান নি কিছু যে আমরা তাঁকে শুনতে পাবো?

তবে যে সব সতীলক্ষ্মীরা নিজেদের দু চারকথা নিজেদের জীবন নিয়ে লিখে গেছেন তাঁদের মধ্যে সারদা দেবীর মেজবৌমাও পড়েন বৈকি!  জ্ঞানদানন্দিনী তাঁর আত্মকথন এ বলছেন:

প্রথম যখন অন্তঃসত্বা হলুম, তখন আমি কিছু বুঝতুম না বলে দৌড়োদৌড়ি করতুম, তাই দুই একবার সন্তান নষ্ট হয়“।

মনে ভাবি কি ভয়ানক নৈর্ব্যক্তিক একটি কথা! যেন যা ঘটেছে তা ঘটেছে দেহ যন্ত্রটির মধ্যে, তার সঙ্গে ছোট মেয়েটির কোন যোগই নেই। সে শরীর জ্ঞানদানন্দিনীরও হতে পারে, আবার অন্য কোনো কনে বৌয়েরও হতে পারে।এমনটিই যেন ঘটে থাকে এমনটি ই যেন ঘটার কথা , তাতে দুঃখই বা কি, শোক ই বা কি।

আমার আড়বুঝো মন, ভুলও বুঝে থাকতে পারি, কিন্তু যে মেয়ে গর্ভ সঞ্চারের পর দেওরের সঙ্গে ছুটো ছুটি করে খেলা করে, সে জানেই বা কি বোঝেই বা কি!  দেবতার পুজো হয়ে গেছে, মণ্ত্র তন্ত্রের পাঠটিও ঠিক মতো নেওয়া হয়নি ,ফলটি কি করে ধরে রাখতে হয় সেটুকু পর্যন্ত জানা নেই, তা নিয়ে কোনো দুঃখ ও নেই :  নিত্য পুজো, নিত্য ফল। মেয়ে মানুষ বলে কথা । এই পাঠই তো সে পেয়ে এসেছে, তার অন্যথা ভাবে কি করে? 

 ন্যায়বাগীশরা বলবেন, “একটি উদাহরণের ওপর তত্ত্ব খাড়া হয় কি করে?” হয় যে না সে কথা আমি একশো বার মানি । তাই ঘুরে ফিরে মেয়েদের আত্মকথা পড়ি আর  চিরুনি দিয়ে আঁচড়াই । মনু সংহিতা আর মহাভারতের ফাঁদ কেটে বেরোতে পেরেছেন এমন মেয়ে বড় বেশি দেখিনি।

 ***

 

রাসের মন  ! বলি শোন, পাগল হলি কি কারণ,

পাগলে কি জানে কোনো ক্রম

সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি , চার যুগেতে এলি গেলি ,

এখনো তোর ভাঙলো না রে ভ্রম ।।

 

রাসসুন্দরীর কথা ধরি।  তাঁর আমার জীবন মেয়েদের আত্মকথার জগতে আমার প্রথম নড়বড়ে পা ফেলা। ঊনকোটি ছত্রিশটি খুঁটি নাটি ধরা আছে সে লেখায়, নেই খালি স্বামী ঠাকুরটি ।  তিনি কি বা কেমন তা অজানা রয়ে গেলো। যিনি আমার সমস্ত জীবনটি জুড়ে রইলেন তাঁর কথা বলার সময় সুযোগ হলো না, এ আবার কেমন কথা?! শুধু বৈধব্যে তাঁর মাথাটা সোনার মুকুট টি খসে পড়েছে সেই নিয়ে খেদোক্তিই শুনলাম। ওইটুকুই। কিন্তু পেয়ে গেলাম এক গূঢ় উক্তি।

এক জায়গায় শুনলাম তিনি বলছেন:

ইতিমধ্যে পরমেশ্বর আমার শরীরে যেখানে যে প্রকার প্রয়োজনীয় বস্তু লাগিবে , তাহার সমুদয় সরঞ্জাম দিয়া, আমার শরীর তরণী সাজাইয়া দিয়াছেন, আহা কি আশ্চর্য ! কৌশলের বালাই লইয়া মরি ! আমার শরীর হইতে এতগুলা ঘটনা হইতেছে আমি তাহার কারণ কিছুই জানি না।হায়! একি ভেল্কিবাজি নাকি, না আমি স্বপ্ন দেখিতেছি এইপ্রকার আমার মনের ভাব হইলো , বাস্তবিক আপনার শরীর নিরীক্ষণ করিয়া দেখিলে পরমেশ্বরের প্রতি বিলক্ষণ প্রতীতি জন্মে , তাঁহাকে আর দূরে অন্বেষণের আবশ্যক হয়নাসহজ চক্ষে স্পষ্ট রূপে বেশ দেখা যাইতেছে. […] যখন আমি ১৮ বৎসর হইলাম, তখন আমার প্রথম সন্তানটি হয়, ক্রমে ক্রমে আমার বারোটি সন্তান হয়

আমি পড়ে রইলো একদিকে আর ‘আমার ‘দেহ বেরোলো ভোগের আয়োজন করতে। রাসের মন খানিক পাগল হ’ল বটে, কিন্তু শেষে তরণীর ‘প্রয়োজনীয়’ বস্তুর সমুদয় সরঞ্জাম পরমেশ্বরের পায়ে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হ’ল। কথার গতি দেখে চিন্তায় পড়লাম। পরমেশ্বরটি কে? ১২টি সন্তানের জন্ম দিয়ে কথাটি শেষ হ’ল কিনা…

‘বিবাহ রহস্য’ আগামী সপ্তাহে সমাপ্য।

Image: http://www.tejasgallery.com/wp-content/uploads/2014/06/Babu-walking-dalmatian.jpg

Image: https://www.google.ca/search?q=hara+parvati+images&source=

http://media.vam.ac.uk/media/thira/collection_images/2013GL/2013GL0450.jpg

Posted in Uncategorized | Leave a comment