গড়গড়ার মা’লো দ্বাদশ পরিচ্ছেদ: শিক্ষিতা স্ত্রী অথবা পাস করা মাগ

 

স্ত্রী শিক্ষা বনাম স্ত্রীর শিক্ষা

তাত্ত্বিক যুক্তি deductive logic এবং আনুপাতিক অনুমান deductive  inference। ‘পতিতগণ যদি  বই লিখিতে বা পত্রিকা সম্পাদনা করিতে পারেন , তবে পতিতাগণ পারিবে না কেন?’ ‘পতিতারা যদি একত্র মিলিত হইয়া সমিতি গঠন করে  তবে দেশের চোর ডাকাতরাও সমিতি গঠন করিবে ।” মানদার তাত্ত্বিক যুক্তি এবং মহাত্মা গান্ধীর আনুপাতিক অনুমান থেকে আমরা একটি পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাই, বিশেষ এই সমিতি গঠনের বায়ুটি উনিশ শতকে  বঙ্গদেশ শিখেছিল  সায়েবদের অনুকরণে এবং শেলি বায়রন শেক্সপীয়র আদি বায়বীয় অসুখ অন্তঃপুরে ঢুকেছিলো  স্ত্রী শিক্ষার  হুজুগে।  আমরা এও জানি মানদা এই সকল পড়েছিলেন I এবং কুতর্কের শিক্ষা এবং আরও কিছু অসৎ প্রবৃত্তি যে  ইন্দ্রিয়পরায়ণা কলহপ্রিয়া স্ত্রীজাতি শিখেছিলেন দুই পাতা ইংরাজি পড়ে তাতে সন্দেহ নেই।

পাঠক, যদি জিজ্ঞাসা করি স্ত্রী শিক্ষা আর স্ত্রীর শিক্ষার মধ্যে পার্থক্য কি? সাদৃশ্যই বা কোথায়?  তবে এই হেঁয়ালিটির সঠিক উত্তর হবে , প্রথমটি হলো সায়েবদের দেওয়া কুমন্ত্রণায় বাঙালি বাবুদের ঘরের মেয়েদের দুই পাতা পড়ানোর ঐতিহাসিক অভিযান (এটি ঢাক ঢোল পিটিয়ে শুরু হয় ১৮৪৯ সালে) ।  দ্বিতীয়টি হলো সংসারে  খাল কেটে কুমির ডেকে আনার এক  নব্যবাবুসুলভ আহাম্মকি। প্রথম আর দ্বিতীয়টির মধ্যে একটি কার্য কারণ সম্পর্ক আছে বটে । স্ত্রী শিক্ষা নিয়ে দুচার কথা বলা হয়েছে মেয়েমানুষের বুদ্ধি পরিচ্ছেদে এবং নারী জাতির আত্মিক উন্নতি নিয়ে যে আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল, সেই বামা বোধিনী আন্দোলন আমরা খানিক খানিক নেড়ে চেড়ে দেখলাম ।  স্ত্রী শিক্ষা আর স্ত্রীর শিক্ষা বিপর্যয় নিয়ে যে ডামাডোল  শুরু হলো, সেটি এইবার দেখার সময় হয়েছে।
প্রথমেই  স্মরণ করি সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রাচীনা ও নবীনা’ প্রবন্ধটি। তিনি বলছেন:

“(…) দিনকতক ধূম পড়িল, স্ত্রীলোকদিগের অবস্থার সংস্কার কর, স্ত্রীশিক্ষা দাও, বিধবাবিবাহ দাও, স্ত্রীলোককে গৃহপিঞ্জর হইতে বাহির করিয়া উড়াইয়া দাও, বহুবিবাহ নিবারণ কর; এবং অন্যান্য প্রকারে পাঁচী রামী মাধীকে বিলাতি মেম করিয়া তুলা। ইহা করিতে পারিলে যে ভাল, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই; কিন্তু পাঁচী যদি কখন বিলাতি মেম হইতে পারে, তবে আমাদিগের শালতরুও একদিন ওক্‌বৃক্ষে পরিণত হইবে, এমন ভরসা করা যাইতে পারে। যে রীতিগুলির চলন, আপাততঃ অসম্ভব, সেগুলি চলিত হইল না; স্ত্রীশিক্ষা সম্ভব, এ জন্য তাহা এক প্রকার প্রচলিত হইয়া উঠিতেছে। পুস্তক হইতে এক্ষণে বাঙ্গালি স্ত্রীগণ যে শিক্ষা প্রাপ্ত হয়, তাহা অতি সামান্য; পরিবর্ত্তনশীল সমাজে অবস্থিতি জন্য অর্থাৎ শিক্ষিত এবং ইংরেজের অনুকরণকারী পিতা ভ্রাতা স্বামী প্রভৃতির সংসর্গে থাকায় তাহারা যে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়, তাহা প্রবলতর। এই দ্বিবিধ শিক্ষার ফল কিরূপ দাঁড়াইতেছে? বাঙ্গালি যুবকের চরিত্রে যেরূপ পরিবর্ত্তন দেখা যাইতেছে, বাঙ্গালি যুবতীগণের চরিত্রে সেরূপ লক্ষণ দেখা যাইতেছে কি না? যদি দেখা যাইতেছে, সেগুলি ভাল, না মন্দ?”

বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশ্নোবোধক অলঙ্কার সংযোন টি দ্যোতক।  অলঙ্কার শাস্ত্র বলে উত্তর হবে  নেতিবাচক ।যাই হোক, পাঁচী রামি, মাধিকে বিলাতি মেম করার প্রকল্পটি শুরু   হয় ১৮৪০ সালে।

 James Stuart Mill অথবা বাবু হেমেন্দ্রপ্রসাদের ক্ষেদোক্তি

জেমস স্টুয়ার্ট মিল এর হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া (১৮৪০) এক মহান গ্রন্থ। বাবু স্টুয়ার্ট মিল এতদ্বারাএই বুঝয়েছিলেন যে নেটিভ দের সার্বিক বোধোদয়ের অন্যতম উপায় হলো তাহাদের সম্ভাব্য সহধর্মিণীদের শিক্ষিত করে তোলা। এ বাবদ তিনি লিখছেন:

“The condition of women is one of the most remarkable circumstances in the manners of nation… As society refines upon its enjoyments, and advances into the state of civilization, …in which the qualities of the mind are ranked above the qualities of the body, the condition of the weaker sex is gradually improved, till they associate on equal terms with men and occupy the place of voluntary and useful conjugators.”

অর্থাৎ বাবুকুলের সর্বাঙ্গীন শ্রীবৃদ্ধির তরে তাঁদের  উপযুক্ত  শিক্ষিতা বিবি  সহধর্মিনী প্রয়োজন  যাতে তাঁরা ইংরেজ সরকারের স্বাস্থ্য সমৃদ্ধিতে আরও ইন্ধন জোগাতে পারেন. উনিশ শতকের বাংলা ভাষায় ‘বাবু’ শব্দটি বহুবর্ণ. একাধারে কর্তা, স্বামী, মনিব, আবার কেরানীও বটে. এই বহুমাত্রিক বাবুর  মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় স্ত্রী নামক সেবাদাসীর পরিবর্তে শিক্ষিত বিবি বিধেয় হলো ।  অতএব বেথুন  স্কুল । অতএব নারী জাগরণ।

১৮৯৩ সালে উনিশ বৎসর বয়স্ক বাবু হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ মনোরমা নাম্নী এক ত্রয়োদশ বর্ষীয়া  বালিকার সঙ্গে তাঁর বিবাহ উপলক্ষে লিখছেন:

“I must be either a fool or a rogue to sermonize on such a subject […] personally, I have very little faith in the sex –rightly termed the weaker sex. I have very little faith in their feelings and emotions in their brains, in their capacity for love and affection.”

এবং তাঁর  ঘাড়ে যাঁরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাঁকে  নবীনা করার গুরু দায়িত্ব সম্পর্কে বলছেন:

“I shudder as I look before me and probe into the stupendous task—the task of forming a character —the task of making another my own, the task of making another human being my partner in life… the stupendous task that lies before me.”

এই stupendous task  এই নব্য বাবুটি কিভাবে কার্যকরী করেছিলেন বা আদৌ করেছিলেন কিনা বলা যায় না তবে  প্রাচীনা কে নবীনা করার রঙ্গে যে নব্যবঙ্গদেশ মেতে উঠেছিল তা হিন্দুয়ানির ধ্বজাধারীরা ভালো চোখে দেখেন নি । পাঁচী রামী মাধীদের মন্দ কপাল : দেশি পুতুল হতে মেম পুতুল, নব্য বাবুদের গবেষণাগারের বিষয়বস্তু, আবার অন্যদিকে সনাতন পন্থীদের হাসির খোরাক, বটতলায় ছাপা শস্তা প্রহসনের সং।

GARGARA XII PREM

চুলটানা বিবিয়ানা ও বঙ্গীয় কর্মশালা

স্ত্রীজাতি এক নিষ্ক্রিয় উপাদান । কর্তৃপক্ষ যেমন সাজান  তেমনি সাজে, বাঁচালে বাঁচে, মারলে মরে। যখন তাকে বিবি সাজানো হলো, একদল বললে ‘বাহ্, বেড়ে  দেখাচ্ছে ‘ আর একদল বললে  নাঃ এ অচল।প্রথম দল Useful conjugator পন্থী, দ্বিতীয় দল সনাতনপন্থী হিঁদু ভাগ্যবিধাতা । দুই দলেরই সমান গোঁ।  ‘সমাজ দীপিকা’ পত্রিকায়, ১২৯২ ভাদ্র সংখ্যায়  ‘স্ত্রী শিক্ষা  ও স্ত্রী স্বাধীনতা’ প্রবন্ধে স্ত্রী শিক্ষায় উৎসাহীদের জিগেস করা হচ্ছে : “শিক্ষা দেওয়ার অর্থে  কি তাঁহারা বডি তে বডি ঢাকিয়া, মোজা জুতা পায় দিয়া, গাড়ি চড়িয়া, শিক্ষকের মুখে স্বরের অ স্বরের আ , হইতে সাইন্স এম.এ  পর্যন্ত এই বুঝেন?”

পাঠক, দেখুন  স্ত্রীরা কি বোঝেন তা জিগেস করা হচ্ছে না। মনোজ্ঞ বিষয় টি আলোচনা করছেন কর্তৃকারকেরা । স্ত্রীজাতি  কি ভাবছেন সে জানার প্রয়োজন কোথায়? বাস্তবিক, তাঁরা বোঝেন ই বা কি?  ‘বসন্তক’ পত্রিকায় ‘নসিরামের মেলা’ গল্পে পরীক্ষক ছাত্রীকে জিগেস করছেন , ” বিদ্যানুশীল কাকে বলে?” ছাত্রী উত্তর দিচ্ছে: “কেতাব পড়া, মাসিক পত্রিকা পড়া , কার্পেট বোনা”। এরপর শিক্ষক যখন জানতে চাইলেন “আহার করে কি করবে?” উত্তর পেলেন: “কার্পেট বুনবো”।

এসবের শোনার পর সাধারণ বুদ্ধি বলে এসকল অতি অচল পদার্থ, কার্পেট বোনা হতে পারে, মাসিক পত্রিকা পড়া হলেও হতে পারে কিন্তু শিক্ষা, বিশেষতঃ ইংরেজি শিক্ষা  নৈব নৈব চ. Useful conjugator পন্থীরা আশা বাদী… তারা গোঁ ধরে রইলেন এবং ক্রমেক্রমে দেখা গেল তাঁদের জয় হচ্ছে। স্ত্রীশিক্ষা বা স্ত্রীর শিক্ষা ধাপে ধাপে এগোচ্ছে এবং স্কুলের গাড়িতে কছু conjugtor রাও খাতাকলম নিয়ে সওয়ার হচ্ছেন। পাঠক, এমতাবস্থায় আমার একখানি গানের কলি মাথায় এলো; সেটি হলো:

জয় ক’রে তবু ভয় কেন তোর যায় না,…
আশার আলোয় তবুও ভরসা পায় না,

১৯১৫ সালে শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখছেন:
“বিধাতা একদিন পুরুষকে পুরুষ এবং মেয়েকে মেয়ে করিয়া সৃষ্টি করিলেন, এটা তাঁর একটা আশ্চর্য উদ্ভাবন, সে কথা কবি হইতে আরম্ভ করিয়া জীবতত্ত্ববিৎ সকলেই স্বীকার করেন। জীবলোকে এই যে একটা ভেদ ঘটিয়াছে এই ভেদের মুখ দিয়া একটা প্রবল শক্তি এবং পরম আানন্দের উৎস উৎসারিত হইয়া উঠিয়াছে। ইস্কুল-মাস্টার কিংবা টেক্‌স্‌বুক-কমিটি তাঁহাদের এক্সেসাইজের খাতা কিংবা পাঠ্য ও অপাঠ্য বইয়ের বোঝা দিয়া এই শক্তি এবং সৌন্দর্যপ্রবাহের মুখে বাঁধ বাঁধিয়া দিতে পারেন, এমন কথা আমি মানি না। মোটের উপর, বিধাতা এবং ইস্কুল-মাস্টার এই দুইয়ের মধ্যে আমি বিধাতাকে বেশি বিশ্বাস করি। সেইজন্য আমার ধারণা এই যে, মেয়েরা যদি বা কাণ্ট-হেগেল্‌ও পড়ে তবু শিশুদের স্নেহ করিবে এবং পুরুষদের নিতান্ত দূর-ছাই করিবে না।
কিন্তু তাই বলিয়া শিক্ষাপ্রণালীতে মেয়ে পুরুষ কোথাও কোনো ভেদ থাকিবে না, এ কথা বলিলে বিধাতাকে অমান্য করা হয়। বিদ্যার দুটো বিভাগ আছে। একটা বিশুদ্ধ জ্ঞানের, একটা ব্যবহারের। যেখানে বিশুদ্ধ জ্ঞান সেখানে মেয়ে-পুরুষের পার্থক্য নাই, কিন্তু যেখানে ব্যবহার সেখানে পার্থক্য আছেই। মেয়েদের মানুষ হইতে শিখাইবার জন্য বিশুদ্ধ জ্ঞানের শিক্ষা চাই, কিন্তু তার উপরে মেয়েদের মেয়ে হইতে শিখাইবার জন্য যে ব্যবহারিক শিক্ষা তার একটা বিশেষত্ব আছে, এ কথা মানিতে দোষ কী?”
(সংযোজন স্ত্রীশিক্ষা ভাদ্র-আশ্বিন, ১৩২২)

 

অর্থাৎ , হে স্ত্রীজাতি, ভুলিয়ো না, কামানের গোলা হেন জার্মান দর্শন  হজম করার পরও তোমার আসল কার্য সন্তান প্রতিপালন এবং আপনাপন পুরুষ গণের সমাদর ও সর্বসময় হিতসাধন । এবং, যতই বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ ডিঙ্গাও, তোমাদের  পাঠ্য এবং পুরুষদিগের পাঠ্য ভিন্ন হইবেক তাহা অনস্বীকার্য। Usefulness এর সংজ্ঞার বাকিটা পাঠকরা পড়ে বুঝে নেবেন এই আশায় রইলাম। স্ত্রীজাতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই  দ্বিধাজড়িত  অনুনয়ে বোঝা যায় “পুরুষদের নিতান্ত দূর-ছাই” সম্ভাবনাটি  যে আছে, সে কথা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায়না। ইতিহাস বাচনভঙ্গি বোঝায়। ১৮৮৭ তে বঙ্কিমবাবু আরো নির্দ্বিধায় আসল গান টি গেয়ে রেখেছিলেন। রবিবাবুর বাচন ভঙ্গিতে যা কৌশলে ঢাকা পড়লো, বঙ্কিমী বাংলায় তা সূর্যের ন্যায় আলোকিত:

 

“স্ত্রীলোকের প্রথম ধর্ম্ম পাতিব্রত্য। অদ্যাপি বঙ্গমহিলাগণ পৃথিবীতলে পাতিব্রত্য-ধর্ম্মে তুলনারহিতা। কিন্তু যাহা ছিল তাহা কি আর আছে? এ প্রশ্নের উত্তর শীঘ্র দেওয়া যায় না। প্রাচীনাগণের পাতিব্রত্য যেরূপ দৃঢ়গ্রন্থির দ্বারা হৃদয়ে নিবদ্ধ ছিল, পাতিব্রত্য যেরূপ তাহাদিগের অস্থি মজ্জা শোণিতে প্রবিষ্ট ছিল; নবীনাদিগেরও কি তাই? অনেকের বটে, কিন্তু অধিকাংশের কি তাই? নবীনাগণ পতিব্রতা বটে, কিন্তু যত লোকনিন্দাভয়ে, তত ধর্ম্মভয়ে নহে। ”   (‘প্রাচীনা ও নবীনা’)

 

বঙ্কিমবাবুর  প্রতিবেদনে প্রশ্নবোধক  অলংকারের ব্যবহার অর্থবহ। প্রশ্নটির যে প্রয়োজন নেই এবং উত্তর টি স্বতঃসিদ্ধ, তা বোঝানোর এর চেয়ে উৎকৃষ্ট  অলংকরণ পাওয়া ভার। সাহিত্যসম্রাট কে আমার প্রণাম।

এখন দেখা গেল রবিবাবু আর বঙ্কিম বাবুর বাগধারা দুই খাতে বইলেও, যে সত্যটি বেশ পরিষ্কার তা হলো স্ত্রী জাতির চরিত্র জনিত উদ্বেগ ।  শিথিলস্বভাবা বলে কিছু খ্যাতি আমরা মেয়েমানুষেরা সেই  আদি পিতার সময় থেকে বহন করে চলেছি , এ নিয়ে কিছু কথা আগেও বলেছি ; সতেরোশো শতকের ইংল্যান্ডেও এ জাতীয় নারীস্তুতি প্রচলিত হয়েছিল, যদি কখনো সুযোগ  পাই সে নিয়েও বলবো। তবে সায়েবরা এসে যে বঙ্গদেশের নিড়বিড়ে বাবুদের এই উৎকণ্ঠা আরও উস্কে দিলে সেটা পরিষ্কার ।তাঁরা যা নিয়ে এলেন তা হলো ব্যাটাছেলেদের সঙ্গে স্ত্রীজাতির মেলামেশা নামক কন্টামিনেশন। পাঠক, মীর মোশারফ হোসেনের উদাসীন পথিকের মনের কথায় (১৮৯০) একটি সহজ সরল ইঙ্গিত দেখুন। এই পর্বে ‘জকি’ নামক চরিত্র তার বৌ ‘মাখন’ কে বকা ঝকা করছে সে পরপুরুষদের সামনে বেরোত না বলে। এইবার কথোপকথনটি শুনুন:

 

আমি সাহেবের কুঠিতে থাকিয়া দেখিতেছি, নুতন কোন সাহেব আসিলে মেমসাহেব নিজে যাইয়া আগু বাড়াইয়া আনেন। দুইজনে চুমা খাওয়া হয়, গলায় গলায় মিশিয়া হাত ধরাধরি হয় । তোরা কোন কার্য্যের নহিস। কেবল ঘোমটা—তোদের কেবলই ঘোমটা ।”
“আমি গরিব, দুঃখী বাঙালীর মেয়ে। বাঙ্গালা আমাদের দেশ । আমার দেশের চাল-চলন যাহা আছে তাহাই করিব। সাহেব বড়লোক, দেশের রাজা । তাহরা যাহা করেন, আমার সে সকল দেখিয়া দরকার কি ? আমি গরিব মানুষ, মেমসাহেবের মত ব্যবহার করিতে আমার ক্ষমতা নাই। হইবেও না।”

 

এখন কথা হচ্ছে চুমা খাওয়া,গলায় গলায় মিশিয়া হাত ধরা, এ সকল সামাজিক সম্ভাষণ যদি useful conjugator রা রপ্ত করেন, তাহলে সর্বনাশ। কারণ, বিবিরা ‘ইংরেজি কেতাব যে পড়বেন, সে তো খালি পিঁপড়েরে সারি  ইংরেজি অক্ষর নয়? সে হলো  কথা বলার ঢং, আদব কায়দা, সামাজিক রীতি নীতি, এবংসর্বোপোরি পরপুরুষের সহিত গলাগলি ঢলাঢলির প্রথা, সায়েবরা যারে ক’ন etiquette। এই contamination-এর ভয়ে সকল বাবুই অল্পবিস্তর শিহরিত হচ্ছেন; কেউ জোরে কাশছেন, কেউ মুখে রুমাল চাপা দিয়ে।

 

bongo0001

১৮৮১ তে বান্ধব পত্রিকায় ‘ বিবিয়ানা চলন ‘:

“বাবুরা বুট পড়েন , বিবিরাও স্লিপার বা লেডিস সূজ পরেন । উভয়েই রং বিরঙ্গের মোজা পরেন । বাবুরা ধুতির ওপর গলা খোলা কোট পরেন, বিবিরাও শাড়ির ওপর জ্যাকেট পরেন …বাবুরা ব্র্যান্ডি খান বিবিরা পোর্ট সেবন করেন …মূল কথা এই, আমাদের দেশে বিকৃত ইংরেজি সভ্যতার অনুকরণ হইতেছে… আমাদের স্ত্রীলোকদিগকেও  তাহার অনুকরণ করিতে প্রবৃত্তি দিতেছি । তাহার ফল এই হইবে যে, ফিরিঙ্গি সমাজ যে সকল দোষে দুষ্ট , আমাদের সমাজেও  সেই সকল , বরং তাহার অপেক্ষা শোচনীয়  দোষ প্রবেশ করিবে , বাঙালি বধূ বিবি হউন তাহাতে আমরা আপত্তি করিনা ; চন্দ্রপুলি ত্যাগ করিয়া হট কেক দিয়া জলযোগ করুন , তাহাতে আমাদের আপত্তি নাই, …কিন্তু তাঁহারা যেন পৃথিবীর প্রধান কর্তব্য  না ভুলেন…এক্ষণে আমাদের বধূমহলে বিবিয়ানা চলনের দিকে  যে ঝোঁক পড়িয়াছে , সাবধান না হইলে বড় বিপদ ঘটিবে”।
জ্যাকেট এ আপত্তি নাই, হট কেক এ আপত্তি নাই, তাহা হইলে  আপত্তিটা কিসে?  বিপদই বা কোন পথে আসিবে? এই অংশটি বড় দীর্ঘ হয়ে পড়ছে কিন্তু আর দুই একটি কথা না বললে সত্য প্রতিভাত হইবে না । পন্ডিতপ্রবর ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ‘লজ্জাশীলতা’ ( ১৮৯২) প্রবন্ধটি শেষ হয়েছে এই ভাবে:

 

“আজিকার নিমন্ত্রনে যে স্ত্রীলোকেরা আসিয়াছিলেন তাহাদিগের মধ্যে একজনের শব্দ অনেক বার বাহির বাটি পর্যন্ত শোনা গিয়েছিলো… কে বলো দেখি।  “কেমন করিয়া জানিব”। ” ও সেই সুকুমারী, যে চলিলে পায়ের শব্দ হইত না –মুখ তুলিয়া কথা কইতো না –যাহার মুখের হাসি মুখেই মিলিয়ে থাকিত –আহা বাছার দোষ কি? স্বামী উহাকে ইংরাজদের সহিত কথা কহাইয়াছে–তাহাদের সামনে গান করাইয়াছে–আপনার সঙ্গে মদ পর্যন্ত খাওয়াইয়াছে –আর কি ওর লজ্জা রাখিয়াছে ? তাই অত গলা হইয়াছে , ধরণ ধারণ সব বদল হইয়া গিয়াছে ।”

 

অর্থাৎ কিনা সুকুমারীর ফিরিঙ্গি  সংসর্গে স্পর্শদোষ ঘটিয়াছে  এবং সে একটি বেহায়া মেয়েমানুষে পরিণত হইয়াছে ।

বাবুদের উভয় সংকট । প্রাচীন বাবু বলেন  “গৃহপিঞ্জরের বিহঙ্গিনী”দের  (শব্দটি বঙ্কিমী, আমার পছন্দ) শিকলি দিয়ে বাঁধো। ইংরেজি দোষ হতে দিয়ো না । কিন্তু এধারে পালিশ ষষ্ঠী বাবুটি পড়লেন আতান্তরে।অন্তরের প্রাচীন বাবু স্বীকার করলেন বিপদ আছে বটে, কিন্তু  বিবি যদি ইংরিজি না পড়লো আর পালিশ সংসর্গ না করলো তাহলে সে সহধর্মিনী হয় কি প্রকারে এবং বাবুরই বা মোক্ষপ্রাপ্তি হয় কিসে?

অতএব…

শিক্ষিতা স্ত্রী

১৮৮৫ থেকে ১৯০০র গোড়ার দিক পর্যন্ত পুরুষ জাতি ভয়ে ভয়ে রইলেন। শিক্ষিতা বিবি বিষয়ক প্রহসন ও নভেলে বটতলা জমজমাট। বলা বাহুল্য, লেখক সকলই পুুরুষ।  এই সকল জ্যাকেট এবং ইষ্টাকিন  (stocking)  পরিহিতা, পার্শি শাড়ি  বেষ্টিতা স্ত্রীকুলকে কি করে সৎ শিক্ষা দিতে হয় তার একটি  বার্নিং এক্সাম্পল সেট করা হলো ১৮৮৮ সালে লিখিত পাস করা মাগ  প্রহসনে। পাঠক, এটি একটি হাস্যরসসমৃদ্ধ  allegory ।  বর্ণনায় বলা হয়েছে:

স্ত্রী স্বাধীনের এই ফল
পতি হয় পায়ের তল ।।

এই প্রহসনের  নায়িকা কিরণ শশীর প্রথম অঙ্ক প্রথম দৃশ্যে  তাঁর ভগিনী চাতকিনীকে বলছেন:

“আমি কেয়ার করি না। ড্যাম ন্যাস্টি নেটিভগণ , মেয়েমানুষের অনার বোঝে না । ভাতার বলে যে একটা পদার্থ আছে –কি জানোয়ার আছে –তা আমার আইডিয়াতেই আসেনা;– তা আমি কি ইস্টুপিট  নেটিভ পুরুষের  অধীনতা স্বীকার করে –ব্রুট অসভ্য পরাধীন বাঙালির মতো থাকবো? তা কখনোই নয়! যদিও আমি বাঙালির মেয়ে –কিন্তু এখনকার বাঙালির মেয়ের মতো মূর্খ নই। আমি বেথুনে স্কুলে হাই প্রাইজ  পেয়েছি, যেদিন তোমার বিয়ে হয় সেদিন তোমার পতি আমার মুখে ইংলিশ স্পিচ শুনে থান্ডারস্টক হয়েছিল । তোমার বিবাহের আচার ব্যবহার দেখে  যদিও আমি দুঃখিত হয়েছিলাম , কিন্তু তোমার ব্রাইডগ্রুমকে শিক্ষিত নেটিভ এর ন্যায় সভ্য দেখে সে দুঃখ ডিশ্চার্য্য  করেছি।”
তৃতীয় দৃশ্যে তিনি গান গাইছেন:

ও প্রাণ ডিয়ার
ভ্রাতা সব কাম হিয়ার!
লেকচার দিব গার্ডেনে
হাত ধরে পুরুষ সনে
বেড়াইবো নির্জনে ,
দিবানিশি হৃদয় চিয়ার ।
হাজব্যান্ডে করে ডিসমিস , হয়েছি প্রাণ নিউ মিস ,
দিই আমি সুইট কিস,
ফ্রি লভ্ নেভার ফিয়ার ।
এই নায়িকাকে শেষ অংকে শেষ দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে  ইডেন গার্ডেন এ  ছিন্ন গাউন  ও ছিন্ন সাজে । তিনি তাঁর নেটিভ ভাতার কে বলছেন:

 

“তুমি আমার বুকে ছুরি মারো , তুমি আমাকে হত্যা করো । আমি এ পাপ প্রাণ তোমার হাতে নষ্ট করবো..আমার প্রাণে বড় যাতনা হয়েছে –আমি তোমাকে করতো কষ্ট দিয়েছি –তুমি আমার সোনার স্বামী–তুমি আমার হৃদয়ের ধন;আমার পেপার শাস্তি হয়েছে,– এখনো হৃদয় যাতনা নিবারণ হয় নাই। তুমি আমাকে বোধ করো।”

পাঠক, প্রহসনটি বিয়োগান্তক এরে কয় poetic justice. যবনিকা পতনের আগে বিজয়ী স্বামী শ্রী শশীভূষণ ঘোষ বলছেন:

“তুই আমার বড় আদরের স্ত্রী ছিলি। তুই এখন বেশ্যা হয়েছিস । না! আমি হত্যা করতে পারবো না । তোর এখনো অনেক যাতনা আছে , তুই আমার সেই আদরের কিরণশশী,– তুই আজ ভিখারিনী, ম্লেচ্ছ রমণী ! ওঃ! আমি বড় আশা করেছিলাম; আমার– পাসকরা মাগ।”

উপসংহার

এইরকম ইংরেজি জানা মাগে বটতলা এই পর্যায়ে সরগরম। প্রহসন, নভেল সবেতেই তাঁদের ব্যাভিচারিতার উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে তাঁদের বিদায় করা হচ্ছে। “পাশ করা পেত্নী” বই তো নয় ।

একটি আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সকল সাহিত্য চর্চায় ইংরেজি জানা বাবুর মদ খাওয়া এবংবেশ্যা বাজি নিয়ে খানিক রগড়  হলো বটে কিন্তু  কিরণশশীর মত যথোচিত সাজা তেমন কাউকে পেতে দেখলাম না ;  স্ত্রীজাতি স্বভাবতই শিথিলস্বভাবা কিনা, শাসন তর্জন তথা পোয়েটিক  জাস্টিস তাঁদেরই প্রাপ্য ।

একটি অন্য ভাবও খুঁজে পেলাম । সেই  উদ্ধৃিতিটি দিয়ে শেষ করি। শ্রীযুক্ত তারকনাথ বিশ্বাস  ‘বঙ্গীয় মহিলা অর্থাৎ নারীজাতির শিক্ষাবিষয়ক প্রস্তাবে’ (১৮৮৫) লিখছেন:

পুরুষ অধঃপাতে যাইতেছে বলিয়া কি রমনীগণকেও যাইতে হইবে? রমণী ভিন্ন এ সংসারে আমাদের আর কে আছে? তাঁহাদের কোমল সুন্দর প্রকৃতি  অবিকৃত না থাকিলে  পুরুষের তাপ দগ্ধ হৃদয়  কিসে জুড়াইব?

 

এ  আকুল প্রশ্নর যোগ্য জবাব একটি মনে এলো বটে, কিন্তু সে ভদ্রসমাজে মুখ ফুটে বলা অবিবেচনার কাজ হবে বোধে ক্ষ্যান্ত দিলেম।

 

Featured Image: http://www.sothebys.com/en/auctions/ecatalogue/2014/modern-and-contemporary-south-asian-art

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in বাংলা, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, History, Uncategorized, Women. Bookmark the permalink.

One Response to গড়গড়ার মা’লো দ্বাদশ পরিচ্ছেদ: শিক্ষিতা স্ত্রী অথবা পাস করা মাগ

  1. Pingback: গড়গড়ার মা’লো দ্বাদশ পরিচ্ছেদ: শিক্ষিতা স্ত্রী অথবা পাস করা মাগ | Methinks…

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s