গড়গড়ার মা’লো নবম পরিচ্ছেদ : অথ গোলাপ বিনোদ কথা।

GARGARA BABU BIBI

গোলাপ বনাম সুকুমারী

“রঙ্গভূমি ভালবাসি
হৃদে সাধ রাশি রাশি
আশার নেশায় করি
জীবন যাপন।।”

–গিরীশ চন্দ্র ঘোষ।

 

 

সুকুমারী  দত্তর  অপূর্ব সতী  কোনো কালজয়ী নাটক নয়। হরমণি নাম্নী এক বেশ্যা  তার লেখা পড়া জানা মেয়ের জন্যে জাল ফেললে. তাতে ধরা পড়লো চন্দ্রকেতু ঘোষ নামক  এক জমিদার তনয়.  হরমনির মেয়ে নলিনী যখন সেই  কচি বাবুটির প্রেমে ভীষণ পড়লে, তখন হরমনি  লোভে পড়ে তাকে তরুবাবু নামক এক মক্কেলের কাছেই বেঁচে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং কৃতকার্য হয়না . নলিনী চন্দ্রকেতুর সঙ্গে কাশীধাম যায় এবং গন্ধে গন্ধে চন্দ্রকেতুর পিতৃদেনবা তথাত পৌঁছিয়ে ছিল কে বোলো পূর্বক কলকাতা আনয়ন করেন. নলিনী আত্মঘাতী হয়..ইত্যাদি.  পাঠক, এই নাটকটি দেখছি একটি বিশেষ কারণে. যদি বলি কুসুমকুমারী এই নাটকে তাঁর নিজের সত্ত্বা কে দুই টুকরো করে মা মেয়ের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন, তাহলে কি আপনারা বিভ্রান্ত হবেন? সূত্র হলো সেই হাড়ি চাঁচা আর সেতার বাদন। নলিনী যে ভাষায় কথা বলে সে হলো নাটকের ভাষা,  তাতে শব্দের ঝংকার  আছে , আবেগের ঘনঘটা  আছে, যা নেই তা হলো বাস্তবের ছোঁয়া। শুনলে মনে হয় যেন একটি নাটুকে মেয়েমানুষ ঘুরে ঘুরে রাধা সতীর অভিনয় করছে।  হরমণি  যে ভাষায় কথা কয়, সে হলো কথ্য ভাষা; সে ভাষায় পালিশ কিছু নেই, কিন্তু সে ভাষা যে অভিজ্ঞতার ভাষা তা বোঝাটা শক্ত  কিছু না ।

পাঠক,  মা মেয়ের এই কথোপকথন টি শুনুন:
নলিনী: তুমি আমার সতীত্ব নাশের জন্য নানাপ্রকার চেষ্টা কচ্ছ. তুমি তোমার নিজের সতীত্ব নষ্ট করেছো বলে কি আমাকেও সেই পথগামিনী করতে চাও?

হর : আ মর বেটি ! বেটি আমার কি সতীরে !– সতীপনা দেখছেন– আরে বেটি ! সতীত্ব নিয়ে করবি কি? –সতীত্ব নিয়ে কি ধুয়ে খাবি? –না সতীত্বে পেট ভরবে? সেই জোগাড় কর, তারপর তখন আর চেষ্টা দেখিস। বেটির অরগণ নেই ছাড়গুন আছে।
আরও একটি মজার ব্যাপার দেখলাম. ভাষা যে দুই জিভে কথা কইছে সে সুকুমারী দত্ত ভালোই জানেন, কারণ, হরমণি শুধু যে মেয়ের সতীপনাকে গাল পাড়ছে তা নয়. মেয়ের নাটুকে ভাষাকেও  ভ্যাঙ্গাচ্ছে:

মেয়ে মায়ের কাছে  চন্দ্রকেতুর প্রতি তার প্রেমের গভীরতা নিয়ে কাব্যপ্রবণ আক্ষেপ আর হরমণির প্রতিক্রিয়া:
নলিনী: সেইদিন তাঁকে প্রাণনাথ বলে হৃদয়রাজ্যের রাজা করেছি — সেই অবধি তাঁর অধিনী বলে তাঁর চরণ সেবা করেছি । মা! আর অধিক কি বলবো, সেই অবধি তাঁকে হর্তা কর্তা বিধাতা , আশ্রয় অবলম্বন বলে তাঁরই আশ্রিত হয়েছি।

হর: আহা ! বেটি আমার ভিক্ষা চেয়ে প্রাণটা শীতল কল্লে রে!  বেটি আমার কবিতা আওড়াতে লাগলেন (বিকৃত স্বরে) হত্তা কত্তা বিধাতা করেছি –কটাক্ষপাত করেছি — মুণ্ডুপাত করেছি, বেটি আমার রাজরাজেশ্বরী হয়েছেন।  (চতুর্থ অঙ্ক, প্রথম গর্ভাঙ্ক)
Verisimilitude, authenticity ইত্যাদি বড় বড় তত্ত্ব আমরা ব্যবহার করতে চাইনে, তবে হরমণির মধ্যে গোলাপের গল্প আর তার মাহেশের জীবনটি যেন কেউ তুলে বসিয়ে দিলো নাটকের পাতায় । আর নলিনীর প্রেমাবেগে একটি রং চং মাখা কথা বলা পুতুল বৈ আর কিছু পাওয়া গেল না।  যে চরিত্র কলের পুতুলের মতো সাজানো গোজানো ভাষায় কথা বলে, সে থেটারে বসে একপ্রকার সহ্য করা যায়, কিন্তু জীবনে সে মানানসই হয়না। ঐটি ই হলো  “জীবন ত্যাজিয়া ঝাঁপিয়ে জীবনে”র মূল ধরতাই । যে জীবন ঘেন্নার, সে জীবন ত্যাগ করলাম , কিন্তু যে সাজানো গোজানো জীবনে ঢোকার লোভ হলো, তাতে ঠিক প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলো না, সে রং চং-এ মাটির কাঠামো হয়ে রইলো এবং ভেঙেও গেল।  নলিনী সুকুমারী কিনা বলতে পারবো না, কিন্তু নলিনীর ভাব ভঙ্গি , কথার ধরণে কোথায় যেন এক aspiring মিসেস সুকুমারী দত্তকে দেখতে পেলাম। নাটকের কভার পৃষ্ঠায় যে ট্রাজেডি কথাটি তিন তিনবার লেখা হয়েছে , তার আসল ব্যঞ্জনা নাটক ছাপিয়ে সংলাপ ছাপিয়ে, এক বেশ্যার ‘ভদ্রমহিলা’ হয়ে ওঠার মর্মান্তিক চেষ্টার রূপক বর্ণনা  অর্থাৎ কিনা allegory হয়ে পড়েছে বলে বোধ হলো। সে ঠিক না ভুল তা পাঠকরা বিচার করবেন।

 

 

বিনোদিনী উবাচ…

 

Binodini

 

যাহারা বিনোদিনীর ন্যায় অভাগিনী , কুৎসিত পন্থা ভিন্ন  যাহাদের জীবনোপায় নাই, মধুর বাক্যে  যাহাদিগকে  ব্যাভিচারীরা প্রলোভিত করিতেছে , তাহারাও মনে মনে আশান্বিত হইবে যে, যদি বিনোদিনীর মতো কায়মনে রঙ্গালয়কে আশ্রয় করি, তাহা হইলে এই ঘৃণিত জন্ম  জনসমাজের কার্যে অতিবাহিত করিতে পারিবযাহারা অভিনেত্রী তাহারা বুঝিবে কিরূপ মনোনিবেশের সহিত  নিজ ভূমিকার প্রতি যত্ন করিলে জনসমাজে প্রশংসা ভাজন হইতে পারে
শ্রী গিরিশচন্দ্র ঘোষ

 

বিনোদিনী দাসী, যাঁরে তাবৎ বাঙালি  ‘নটি বিনোদিনী’ বলে থাকেন, আমার কথা  আর আমার অভিনেত্রী জীবনের  দৌলতে তিনি বাংলা  সাহিত্যে একেবারে জাজ্বল্য হয়ে আছেন।যদি খুব ভুল না করি, তাহলে ইনিই   এখনো পর্যন্ত একমাত্র মন্দ স্ত্রীলোক যাঁর জীবনী ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে।  এই যে ইনি বাঙালির সংস্কৃতিতে ফাইভ ষ্টার  পেলেন, সে যে  রামকৃষ্ণ পরমহংসের দৌলতে সে  বোঝা কঠিন নয়। মহাপুরুষের আশীর্বাদ ধন্যা হলে বেশ্যা জাতে  না উঠে  যায় কোথায়।  আমাদের বাসি খবরে প্রয়োজন নেই। কথার মধ্যেও যেমন কথা থাকে, সে রূপক ই হোক বা আভাস ই হোক, তা আমরা খুব জানি। তাই মন দিয়ে লেখাটি পড়ি। ভারী সুন্দর করে তিনি তাঁর রামকৃষ্ণ দর্শনের কথা বললেন:

“যখন তিনি অসুস্থ হইয়া শ্যামপুকুরের  বাটিতে বাস বাস করিতেছিলেন, আমি শ্রীচরণ দর্শন করিতে যাই  তখন সেই রোগক্লান্ত প্রসন্নবদনে  আমায় বললেন : “আয় মা বোস”, আহা কি স্নেহপূর্ণ ভাব ! এ নরকের কীটকে যেন ক্ষমার জন্য সতত আগুয়ান! কতদিন তাঁহার প্রধান শিষ্য নরেন্দ্রনাথের (পরে যিনি বিবেকানন্দ স্বামী বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন) ” সত্যম শিবম” মঙ্গলগীতি  মধুর কণ্ঠে থিয়েটার এ বসিয়া শ্রবণ করিয়াছি . আমার থিয়েটার কার্যকরী দেহকে এই  জন্য ধন্য মনে করিয়াছি।”

কিন্তু ওই অংশে আর একটি কথা উঁকি দিচ্ছে . আমি সেটির প’রেই মনোস্থাপন করলাম। তিনি বলছেন, “নরেন্দ্রনাথের সত্যম শিবম” মঙ্গলগীতি  মধুর কণ্ঠে থিয়েটার এ বসিয়া শ্রবণ করিয়াছি “। এইখানে একটু খটকা লাগলো.. নরেন দত্তর গান থেটারে,  এ কিরকম! তারপর ঝটকা লাগলো. ওই গান টি তাঁর মনের ভেতর রয়ে গেছিলো, সেই গান তিনি মনে মনে শুনতেন . পাঠক, এইবার গিরিশবাবু আর বিনোদিনীর কথা গুলো আবার বিবেচনা করুন:  “কুৎসিত পন্থা” “ ঘৃণিত জন্ম” আর  “থিয়েটার কার্যকরী দেহ” । এই হ’লো নাটুকে বেশ্যার ত্রহ স্পর্শ। এই স্পর্শ দোষ থেকে বাঁচার  মন্ত্র হলো ওই সত্যম শিবম জপমন্ত্র। ওই একরকম বেঁচে থাকার উপায় । পাঠক, বেশ্যার মন আর দেহ কি আলাদা?  নিশ্চই তাই।  থিয়েটার কার্যকরী দেহ রইলো বাবুদের আর দর্শকের জিম্মা; মন শুনে গেল সত্যম শিবম।  সেই  মন্ত্র ধরে রাখার উপায়টি বাতলে দিলেন গিরিশ বাবু :

“আমার অন্য কথা ভালো লাগিত না । গিরিশ বাবু মহাশয়  যে সকল বিলাতের বড় বড়  অভিনেতা বা অভিনেত্রীর  গল্প করিতেন, যে সকল বই  পড়িয়া শুনাইতেন , আমার তাহাই ভালো লাগিত.  মিসেস সিডনিস  যখন থিয়েটারের কার্য  ত্যাগ করিয়া . দশ বৎসর বিবাহিতা অবস্থায়  অতিবাহিত করিবার পর  পুনরায় যখন  রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হন,  তখন তাঁহার  অভিনয়ে কোন সমালোচক  কোন স্থানে  কিরূপ দোষ ধরিয়াছিল, কোন অংশে তাঁহার উৎকর্ষ বা  ত্রুটি  ইত্যাদি  পুস্তক হইতে পড়িয়া বুঝাইয়া দিতেন. […] বঙ্কিমবাবুর “দুর্গেশনন্দিনী”  কোন পুস্তকের ছায়াবলম্বনে লিখিত, “রজনী” কোন পুস্তকের  ভাব সংগ্রহে রচিত , এইরকম কত বলিব  গিরিশ বাবু মহাশয়ের ও অন্যান্য  স্নেহশীল বন্ধুগণের  যত্নে  ইংরাজি, গ্রীক, ফ্রেঞ্চ, জার্মানি  প্রভৃতি  বড় বড় অথরের কত গল্প যে আমি শুনিয়াছি  তাহা বলিতে পারিনা. শুধু শুনিতাম না , তাহা হইতে ভাব সংগ্রহ করিয়া  সতত সেই সকল চিন্তা করিতাম।”

এই গিরিশ বাবু মহাশয়ের কারণেই বিনোদিনীর মুখের ভাষা নাটুকে পালা হয়ে পড়লো না । সেই সদাশয় ব্যক্তি বিনোদিনীর কার্যকরী দেহের থেকে মনটিকে টেনে বার করে নিলেন; ধুলো ঝাড়লেন, ঘষলেন,মাজলেন, তারপর  সেই মন  যখন  কথা কইলো, তখন সে থিয়েটার কার্যকরী দেহর ছায়া চকিতের ন্যায়ও ভাষায় ছাপ ফেললো না।

মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েন  বড় বিচিত্র। বিনোদিনী বলছেন:

“গিরিশবাবুর সঙ্গে  আমার  জোর জবরদস্তি  মান অভিমান রাগ  প্রায়ই চলতো। তিনি আমায় অত্যধিক আদর দিতেন , প্রশ্রয় দিতেন। আমি তাই বড্ডো  বেড়ে উঠেছিলুম , মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে অন্যায় ব্যবহার করতুম , কিন্তু তার জন্য তিনি আমায় একটি দিনের জন্য ও তিরস্কার করেন নি, অনাদর অযত্ন তো করেনি নি . তবে আমি একটি দিনের জন্য এমন কোনো কাজ করিনি, জাতে তাঁর এতটুকু ক্ষতি হয়।”

বেড়ে ওঠার কারণ একটুখানি ছিল বৈকি। যে সময়ের কথা তিনি বলছেন তখন  গিরিশবাবুর হাতে গড়া এই বেশ্যাটি  Prima Dona of Bengali Theatre ; Flower of Native Theatre. বাঙালি বাবুরা কোন ছার, সায়েবরাও তখন তাঁর কদর করছেন। বিনোদিনী  মনে কি ভেবেছিলেন কে জানে । নাটুকে মেয়েছেলে  যে আসলে নাটুকে বাবুদের সম্পত্তি, হাতের পুতুল, তা বুঝতে খানিক সময় লেগেছিলো তাঁর। যে কথাটি তিনি তেমনভাবে পষ্টাপষ্টি বলে উঠতে পারলেন না তা হলো তাঁর বিনিময়ে গিরিশবাবুর ষ্টার থিয়েটার লাভ।  আমার কথায়  শুধু লেখা হলো:

“নানা কারণের  প্রধান কারণ যে আমায় অনেক রূপে প্রলোভিত করিয়া কার্য উদ্ধার করিয়া লইয়া  আমার সহিত যে সকল ছলনা করিয়াছিলেন তাহা আমার হৃদয়ে বড় লাগিয়াছিল. থিয়েটার বড় ভালোবাসিতাম তাই কার্য করিতাম । কিন্তু ছলনার আঘাত ভুলিতে পারি নাই। তাই অবসর বুঝিয়া অবসর লইলাম।”

১৮৮৭ র  পয়লা জানুয়ারী তাঁর জীবনের শেষ অভিনয়। সেই ষ্টার থিয়েটারেই । নল দময়ন্তী-র  দময়ন্তী, বেল্লিক বাজারএর রঙ্গিনী। দুটিই গিরীশ বাবুর লেখা।একই রাতে একটি  চরিত্রে  সতীর সতী , তস্য সতী, যারে কয়, sublime character; দময়ন্তী নলকে বলছেন:

প্রভু,  কি দিয়ে করিব  দেব-পূজা?
দেহ, প্রাণ,– কিছু আর নহে মোর ;
দেব গণে সাক্ষী করি’ কহি_-
সকলই হে দিয়েছি তোমায় ,
জানি, নাথ, তুমি  হে আমার
দানে তবে নাহি অধিকার ।
ধর্ম পত্নী আমি তব;
দেহ মোরে পতি-পূজা উপদেশ;
কহ, নাথ, স্বয়ম্বরে দিবে দেখা?

পরবর্তীটিতে এক মেথরানী, যে অশ্লীল নাচ গানে স্টেজ মাতায়। রঙ্গিনী গাইছে:

মায় বাপ জিসিকে রোয়ে,
জরু ছোড়ে কে কসবি ঘরমে শোয়ে,
হাম ওস্কে দেওয়ে; গঙ্গা কিরা ময় সাচি কহি ॥
যো না মানে দেওতা ভি না মানে পীর,
বে পয়জারসে যিসিকে না নোয়ে শির,
সরাব মে রহে যো মস্তাগীর,— যো
ছোড়া হ্যায় জাত,
ডেম (damn) ডেম বলে ছোড়হে লাথ,
উসিকে দেনে ময় খাড়া রহি ॥

Binodini RAY0001
দময়ন্তীর ভোল পাল্টে  রঙ্গিনীর নাচটি নাচতে নাচতে  ফ্লাওয়ার অফ নেটিভ থিয়েটার কি ভাবছিলেন কে জানে। এ নাটকও গিরিশ বাবুর লেখা কিনা। এবং প্রহসন। আগের কিস্তিতে গোলাপের প্রসঙ্গে বলেছিলাম কোথায় জীবনের শুরু কোথায় নাটকের শেষ কে জানে… এখনো সেই  একই কথা বললাম। নল দময়ন্তীতে বিনোদিনী দময়ন্তী, নল নাট্যকার গিরিশ বাবু স্বয়ং। তার আগে ১৮৮৩ সালেও এই ষ্টার থিয়েটারেই গিরিশ বাবুর সঙ্গে তাঁরই লেখা দক্ষ যজ্ঞ । সে নাটকেও বিনোদিনী সতী, গিরিশবাবু মহাদেব। সেটিই স্টার থিয়েটরে তাঁর প্রথম অভিনয়।

বিনোদিনীর জীবনে  গুর্মুখ রায় কে বাদ দিয়েও, পাঁচ পাঁচটি বাবু। রাধারমণ বাবু, ছোটবাবু , গিরিশ বাবু। গিরিশ বাবু ঈশ্বর। তিনি কাদার তাল আর পাঁকের ময়লা তুলে  প্রতিমা তৈয়ের করলেন। তারপর সে প্রতিমা সোনার দরে বেচলেন। আর এক বাবু রীতিমতো তলোয়ার নাচানো ‘সম্ভ্রান্ত যুবক বাবু’। তিনি নিজে বিয়ে শাদি করে থিতু হয়ে , বিনোদিনীর নতুন বাবুর খবর পেয়ে তলোয়ার বাগিয়ে তাঁর একদা বাঁধা মেয়েমানুষকে কাটতে গেলেন। আর একজন ‘রাঙা’ বাবু’ তাঁকে ছায়া দিলেন ১৮৮৭ থেকে  ১৯১২ পর্যন্ত। একটি মেয়েও হয়েছিল তাঁদের। মেয়েটির নাম ছিল শকুন্তলা । ১৯০২ এ সে মারা যায়। ১৯১২ তে মারা যান দুই বাবু  : গিরিশ বাবু আর ‘রাঙা’ বাবু। তলোয়ার বাবুটি আগেই গিয়েছিলেন।  বিনোদিনী সম্পর্কে পড়তে গিয়ে দেখলাম এই  ‘রাঙা’বাবুটিকে   কেউ বলেছেন ‘স্বামী’ , কেউ বলেছেন ‘বেনেফ্যাক্টর’। ‘স্বামী’ কথাটি কিন্তু বিনোদিনী একবারও উচ্চারণ করলেন না, কারণ মিথ্যা বলা তাঁর ধাতে ছিল না । গিরিশ বাবুর লেখা  ভূমিকা তিনি প্রথম সংস্করণে ছাপান নি কারণ,”তাহাতে অনেক সত্য ঘটনার উল্লেখ ছিল না”।  সুতরাং তাঁর একটি ‘প্রাণের দেবতা’ (রাঙা বাবু)  থাকলেও, তাঁর ‘মাথা মুণ্ড” জীবনীতে তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন যে তিনি বেশ্যাই ছিলেন, এবং বেশ্যার ব্যবহারই পেয়ে গেছেন, যতই সতী আর দময়ন্তী সাজুন না কেন,:

পতিপ্রেম সাধ আমাদের আছে, কিন্তু কোথায় পাইব? কে আমাদের হৃদয়ের পরিবর্তে হৃদয় দান করিবে? লালসায় আসিয়া প্রেমকথা কহিয়া মনোমুগ্ধ করিবার অভাব নাই , কিন্তু কে হৃদয় দিয়া পরীক্ষা করিতে চান যে আমাদের হৃদয় আছে ? আমরা প্রথমে প্রতারণা করিয়াছি , কি প্রতারিত হইয়া  প্রতারণা শিখিয়াছি , কেহ কি অনুসন্ধান করিয়াছেন? […] অনেক প্রদেশে জল জমিয়ে পাষাণ হয়. আমাদের তাহাই […] যাহা হউক, এখন ও কথা থাকুক।

গৌরবে বহুবচনের এমন সার্থক প্রয়োগ খুব কম দেখেছি।
  

১৯১২-র ৯ই ফেব্রুয়ারি গিরিশচন্দ্রের প্রয়াণ । কলকাতার টাউন হলে সর্বশ্রী সারদাচরণ মিত্র, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি প্রমুখ বিশিষ্টজনেরা বর্ধমানের রাজা বিজয়চাঁদ মহতাবের সভাপতিত্বে যে বিরাট শোকসভার ডাক দিলেন সেখানে নাট্যাচার্যের প্রতি সম্মান আর শুদ্ধতার অজুহাতে অভিনেত্রীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো ( একথা আগেও বলেছি)। প্রতিবাদে স্টার থিয়েটারের “সুধাকন্ঠী” সুশীলাবালার (১৮৮৪-১৯১৫) নেতৃত্বে অভিনেত্রীরা গিরিশচন্দ্রের উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যে শোক প্রকাশের অধিকার দাবি করেছিলেন। দাবি মঞ্জুর হয়নি।  শেষ পর্যন্ত ১৮ই সেপ্টেম্বর অভিনেত্রীদের তরফে একটি শোকসভা হয় স্টার রঙ্গমঞ্চে। সুশীলাবালার জিজ্ঞাস্য ছিল— ‘নারীকে বেশ্যা বানায় যাঁরা তাঁরা বেশ্যাকে ঘৃণা করে কোন মুখে?’ শোকসভায় সুশীলাবালা বলেছিলেন, ‘… পতিতা আমরা, সমাজ বর্জিতা বটে — কিন্তু আমরা মানুষ। … প্রিয়জন বিরহে যদি ক্রন্দনের অধিকার থাকে, … বুকফাটা হাহাকারে যদি দোষ না থাকে তবে আমাদের শোক দূষণীয় হইবে কেন?’

এই প্রশ্নটির সদুত্তর কোনও Reformist অবলাবান্ধব দিতে পারেন নি বলেই জানি। নাট্য ইতিহাসের রেজিস্টারি তাই বলে।

 

পরিশিষ্ট

বিনোদিনীর পর ‘নাট্যসম্রাজ্ঞী’ তারাসুন্দরী, ‘নটকুলমনি’ কুসুমকুমারী , ‘সুধাকন্ঠী’ সুশীলাবালা , ‘সংগীতনিপুণা’ নরীসুন্দরী, সারদামণির স্নেহ ধন্যা নীরদা সুন্দরী… এমন আরও কত পাপিষ্ঠার কথা  অ-বলা  রয়ে গেল। তাঁদের  সম্ভবত কোনো গিরিশ বাবু জোটে নি…তাঁরা তাই চকিতের ন্যায় মিলিয়ে গেলেন…  কত গুলো পোকায় কাটা আবছা ছবি শুধু রয়ে গেল, আর কোনো কোনো সুভাগিনীর ক্ষেত্রে, গুটি কতক নেহাতই কাঁচা, অপটু কবিতা।

গবেষকরা সে সকল আবেগমথিত কবিতা পড়িয়া এবং ছবি দেখিয়া যৎপরোনাস্তি উল্লসিত হইলেন এবং archival material বিবেচনা করিয়া তাহা লইয়া সংকলন বাহির করার প্রয়াস পাইলেন। অধম আমরা সেই জ্ঞানবৃক্ষের ফল লইয়া কোলাহল করিতে থাকিলাম।

 

Featured Image: Kalighat Pat Babu Bibi Google
বিনোদিনী :  https://alchetron.com/Binodini-Dasi-1207453-W

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in বাংলা, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, Uncategorized and tagged . Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s