গড়গড়ার মা’লো অষ্টম পরিচ্ছেদ: নাটুকে স্ত্রীলোক

GARGARA ABHINETRI

১৮৭৩ থেকে শুরু হ’লো আমোদের ছড়াছড়ি । বাবু গিরীশ চন্দ্র ঘোষ ‘ নোটো গিরীশ’ হতে প্রমোশন পেলেন। ‘মেঘনাদ বধে’  তাঁর অভিনয় দেখে ‘সাধারণী’র সম্পাদক শ্রীযুত অক্ষয় চন্দ্র সরকার তাঁকে ‘Garrick of Bengal’ শিরোপা দিলেন ।  সতীর true definition নিয়ে তিন তিনটে নাটক লেখা হলো আর ওরই মাঝে দু’ দশটি বেশ্যা জাতে উঠলেন। শেষ কথাটি আগের কিস্তিতে বলা হয়েছে। এই কিস্তি হলো প্রসঙ্গ উল্লেখ পূর্বক ব্যাখ্যা। সে আমরা খুব পারি। ঐ করেই চুল পাকলো কলম ক্ষয়ে গেলো ।

বেশ্যাকে জাতে উঠতে হলে কি করতে হয় ? না, নাচতে হয়, গাইতে হয়, সর্বোপরি ভদ্রলোকের ভাষায় কথা কইতে হয়। যাঁরা সেসব পারলেন তাঁরা নোটো বাবুদের নেক নজরে পড়ে তরে গেলেন। যাঁরা সরস্বতীর আশির্বাদ পেলেন না তাঁরা শুধু বাবুদের সঙ্গ করে মরলেন। ‘সধবার একাদশী’ র এক মা লক্ষ্মীর মুখের বুলি আগে বর্ণনা করেছি। সেই নাটকেরই বেশ্যার নাম কাঞ্চন। পাঠক, তাঁর মনোবেদনাটি পড়ে দেখুন:

কাঞ্চন: অটলবাবু আমার ওপর বড় নির্দয় . উনি সাতদিন ভাঁড়য়ে একদিন যান . উনি কত বড় মানুষ, আমরা গরিব, আমাদের বাড়িতে উনি গেলে ওনার মানের খর্ব হয়- আমরা নাচতে জানিনে, গাইতে জানিনে , কথা কইতে জানিনে , কিসে ওর মনোরঞ্জন করবো?

অটল:  আমি তো কাল গিচলেম।

কাঞ্চন: চকিতের ন্যায় ।

নিম:  শালী আমার সঙ্গে কথা কইলে যেন হাঁড়ি চাঁচা  ডাকতে লাগলো , এখন কথা কচ্ছে যেন সেতার বাজছে।
(প্রথম অঙ্ক প্রথম গর্ভাঙ্ক)

কাঞ্চনের অভিমানের  ফাঁক দিয়ে ” চকিতের ন্যায়” মনোরঞ্জনের যে বাসনা দেখা গেল, তা নাটুকে বুলি, সে ভাষা কাঞ্চনের নয়, কোনও মাতাল বাবুর কপচানো এস্টেজের  কথা তোতা পাখির মতো আউড়ে যাওয়া । এই সময়ে শহরের রাস্তায়, থিয়েটারে , বেশ্যার বাড়িতে মাতাল বাবুদের অভাব নেই। তাঁরা বোতল খালি করে শেক্সপীয়ার, মিল্টন, মধুসূদন, বিদ্যাসুন্দর একই দক্ষতায় কপচান এবং বেশ্যা পল্লীতে বা গঙ্গার ধারে বেশ্যা প্রতি ধাবিত হন । এ সব চরিত্র  সে সময়কার নাটকে বহু পাবেন, দুই একজনের কথা যেন মনে হচ্ছে আগে খানিক  বলেছি। ‘সধবার একাদশী’ র নিমচাঁদ ই হলো সেই গ্যালেরির এক যোগ্য উদাহরণ। তা এই মাতালবাবু যা বললেন তাও অনুধাবনযোগ্য। যিনি শুধু ‘সঙ্গ’ করার বাবু, তাঁর সঙ্গে কথা কওয়ার কালে বেশ্যার ভাষার রাখঢাক নেই ; সেখানে তার আসল  গলা, বুলি  বেরোয়, কিন্তু যে বাবু তাকে প্রমোশন  এর স্বপ্ন দেখান willy nilly, তাঁর সঙ্গে কথা কওয়ার সময় বেশ্যার গলায় সেতার বাজে , সে যে কত চেষ্টায় রপ্ত তা বিলক্ষণ বোঝা যায় যখন রাগের মাথায় “চকিতের ন্যায়” তার আসল ভাব ও ভাষা বেরিয়ে পড়ে : “অটল তুই কি পাগল হোলি নাকি! আমি তো আর তোর ঘরের মাগ নই যে বাগানে গিইচি বলে তোর মুখ হেঁট হবে।”

ফলকথা হ’লো এই যে নাচতে গাইতে এবং সর্বোপরি কথা কইতে জানলে ভদ্র বাবুদের পাশে চকিতের  ন্যায় হলেও বসা যায়  এইটেই হলো সার সত্য। এই স্বপ্ন খোলার ঘরে বসে কত বেশ্যা দেখেছিলো কে জানে! পাঠক জিগেস করতে পারেন, ঘন্টা দুইয়ের জন্যে পাশে বসলো, দুচার কথা কইলো, তাতে কোন মহাভারত  অশুদ্ধ হলো ? নাট্যশালার খোলামেলায় এই সকল মন্দ স্ত্রীলোক সরল সচ্চরিত্র ভদ্রসন্তানদের কতটাই বা বিপদ ঘটাতে পারেন?

এইবার আবার বাবু মনমোহন বসুর কথায় ফিরি কারণ এই বিষয়টি তিনি বিশদ বুঝিয়েছিলেন ন্যাশনাল থিয়েটার এর প্রথম বাৎসরিক অনুষ্ঠানে:

“কি আকৃতি , কি প্রকৃতি, কি স্বর, কিছুতেই কর্কশ ও রুক্ষ স্বভাবের পুরুষেরা কোমলাঙ্গী, কোমলহৃদয়া মধুরভাষিনী কামিনীগণের ন্যায় হইতে পারেনা. সত্যিকার রমণীকে রমণী সাজাইলে দেখিতে শুনিতে সর্বপ্রকারের ভালো হয় . কিন্তু এ বিষয়ে যেমন উত্তম হইলো , অন্যান্য বিষয়  যে আছে তাহাতেও উপেক্ষা করা উচিত নয়. দৃশ্য-মনোহারিত্ব. ও আমোদ সুখ প্রার্থনীয় বটে কিন্তু সমাজের ধর্ম নীতি অধিক প্রার্থনীয় কিনা তাহা কি আর বহু বাক্যে বুঝাইয়া দিতে হইবে ?  এ দেশে কুলজা কামিনীকে অভিনেত্রী রূপে প্রাপ্ত হওয়া  এক কালেই অসম্ভব , স্ত্রী অভিনেত্রী সংগ্রহ করিতে হইলে  কুলটা বেশ্যা পল্লী  হইতেই আনিতে হইবে. ভদ্রযুবকগণ আপনাদের মধ্যে বেশ্যা কে লইয়া আমোদ করিবেন , বেশ্যার সঙ্গে একত্র সাজিয়া  রঙ্গ ভূমিতে রঙ্গ করিবেন, বেশ্যার সঙ্গে নৃত্য করিবেন, ইহাও কি কর্ণে শুনা যায়?  ইহাও কি সহ্য হয়?  ইহাও যে রাজধানীতে — এত সুশিক্ষা  সদুপদেশ , ও সভ্যতার মধ্যে কোনো সম্প্রদায় কত্তিৃক অনায়াসে অনুষ্ঠিত হইতেছে , ইহার অপেক্ষা বিস্ময় ও আক্ষেপের বিষয় আর কি আছে?”

Contamination এর ভয় বড় ভয়। এবং সে রোধ করার কোনও উপায়ই নেই, ভদ্রসন্তানদের নাটকের এমনই ছিরি. যতই কেননা পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক নাটক লেখা হউক, তার মূল সুরটি ‘রঙ্গ’ আর ‘আমোদে’র। তাতে নট নটী এ ও’র গায়ে প্রায়শই ঢ’লে পড়ে, আদিরসাত্মক রসিকতা করে । এ সকল entertaining গলাগলি ঢলাঢলি ব্যাপার যদি একটি বেশ্যার সহিত অনুষ্ঠিত হয় তাহলে সে  মহামারী contamination  হতে  বাবুদের রক্ষা করেন কোন শ্রী হরি?  দর্শক বাবুদের দেখন সুখের লজ্জাই বা রক্ষা করেন কোন মধুসূদন? ‘প্রকাশ বিনষ্টা’দের নাহয় বাৎস্যায়ন অনুমোদন করেছেন, প্রকাশবিনষ্টদের তো কোনও বিধান নেই ! তাঁরা অটলবাবু বা নিমচাঁদ বাবুর অনুসরণে  আদাড়ে পাঁদাড়ে ঘুরুন , সে আমরা দেখতে যাচ্ছিনে, কিন্তু এক হলঘর বাবুর সামনে… ? প্রাণ থাকতে নয়।

গোড়ার দিকে তিন সতী-গন্ধী নাটকের কথা বলেছিলাম. তার মধ্যে একটি থেকে দুই একটি দৃশ্য পেশ করছি. পাঠক প্রথমে এইটি দেখুন:

( কুটীলার প্রবেশ । )
কুটীলা—দাদা, দাদা, দাদা,—

আয়ান—আরে কেন, কি হয়েচে–

কুটীলা-যা হয়েচে একবার দেখ্বে এসো—এই গে তোমার রাধা-সতী কালার সঙ্গে নিকুঞ্জবনে আমোদ প্রমোদ করচে-আর কিচু নয়—

আয়ান —  (যষ্টি হস্তে দণ্ডায়মান ) সত্য বলচিস্ রাধাকৃষ্ণ নিকুঞ্জ বনে একত্র রয়েচে ।

কুটীলা  — আমি বুঝি কেবল, তোমার কাছে মিথ্য কথাই বলে ব্যাড়াচ্চি-স্বচক্ষে দেখে এসেচি—এখন ইচ্ছে হয়, তো চল তোমার দেখুয়ে দি,—তার পর তোমার মনে যা থাকে তাই করো-বাবা বোয়ের এমন বুকের পাটা কখন দেখিনি—এই দুই প্রহর বেলা, পর পুরুষের সঙ্গে আমোদ-ওমা ছি, ছি, ছি, কুল বধূর কি এই কাম, কালা মিন্সের জালায় লোকের কাছে মুক দেখানো ভার-রাত দিন কৃষ্ণের সঙ্গে বনে বনে ফিরুবে, ঘরে এক দণ্ড থাকতে মন যায় না— ভাল কথা বলতে গেলে তেড়ে মারুতে আসে-কলঙ্কিনীর জন্যে যমুনায় ঝাপ দিয়ে মরতে ইচ্ছে হয়—এই তোমার আস্কারা পেয়েই তো এত দূর হয়েচে—তুমি দাবালে কি কখন এমন হতো–মা সাধ করে বলেন তুমি মেয়ে মানুষ, কাচা দিয়ে কাপড় পর না—

                                                                                 (সতী কি কলঙ্কিনী  নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়  ১৮৭৯)

এ হলো রাধা সতীর বৃত্তান্ত । এই নাটকে কৃষ্ণর কালী সেজে কুটিলা আর  আয়ান ঘোষকে ফাঁকি  দেওয়ার প্লট । এতে রাধা যমুনা  থেকে জল এনে কৃষ্ণের প্রাণ বাঁচালেন এবং বৃন্দাবনের শ্রেষ্ঠা  সতী সাব্যস্ত হলেন।

কিন্তু রাধা কৃষ্ণর লীলা যে ‘আমোদ’ এ পরিণত হলো , সেই কথাটি আমাদের ভাবায়।  দিব্য প্রেম হোক আর যাই হোক, নাট্যশালার bawdry নাহলে টিকিট বিকোবে কিসে? এ বস্তুটি বাবুদের শিখিয়েছিলেন মহাত্মা শেক্সপীয়ার,  এ আমার ঘোর সন্দেহ। Bawdry দীর্ঘজীবি হোক ।

পাঠক এইবার একই নাটকে এই দৃশ্যটি অবলোকন করুন। রাধা সতী জল আনতে চলেছেন আর  বিলাপ করছেন:

প্রথম গর্ভাঙ্ক । যমুনা তট । (রাধিক সখিগণ সমভিব্যাহারে উপস্থিত। )

রাধিকা। সখি ! পা যে আর চলে না—আমার মনের ভিতর যে কি হচ্চে তা অন্তর্যামী পরমেশ্বরই জানেন—প্ৰাণেশ্বর এ হতভাগিনীর অদৃষ্ট কি শেষ এই ছিল—কুল, মান, প্রাণ মন সকল সমর্পণ করে অবশেষে তোমার বিরহ যাতনা ভোগ কত্তে হলো—ওহ ! সখি, আমি কি জল এনে প্রাণনাথের জীবন রক্ষা কত্তে পাবে? ব্রজের সাধ্বী রমণীগণ বা পারেন না, আমা হতে সে কাৰ্য্য কি সম্ভব। নাথ! তুমিই তো বলেছিলে যে আমার কালাকলঙ্কিনী নাম খণ্ডন করবে— দীননাথ ! আমি অনন্ত-কাল এ কলঙ্ক রাশি ভোগ কর্ত্তে পারি, কিন্তু তোমার বিরহ যে এক মুহুৰ্ত্ত ও সহ্য করতে পারিনে-দয়াময়! দাসীকে এ ঘোর বিপদ সাগর হতে পরিত্রাণ কর নতুবা এ যমুনার জলে ছার প্রাণ পরিত্যাগ করবো।
                                                                               (সতী কি কলঙ্কিনী  নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়  ১৮৭৯)

এইবার আপনারা বিবেচনা করুন, এই whining pining রাধাটি যদি কোনো বেশ্যা হ’ন, এবং  নাটকের কোনো এক ব্রাহ্ম মুহূর্তে তিনি যদি গিয়ে কৃষ্ণ-রূপী young বাবুটির ঘাড়ে গিয়ে পড়েন, তা হইতে যা বিপত্তি হবে সে সামলাতে বাবুর চোদ্দ পুরুষ হদ্দ হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়, বিশেষ করে সে বেটির গলায় যদি সেতার বাজে। সুতরাং  মনমোহন বাবুর কথাটি   একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয় । বাঁচতে চাও তো  হুতোমের ভাষায় ‘খ্যাংরা গুঁপো’ মিনসেদের কামিয়ে জুমিয়ে রাধা ললিতা বিশাখা রোহিনী যা খুশি সাজাও । ধর্ম সংকটের ভয় নেই ।

মনমোহন বসু হলেন সনাতন পন্থীদের ধ্বজা ধারী এবং নাট্যরঙ্গ এবং পুরুষের সতীত্ব রক্ষার  যৌথ প্রকল্পে  নিবেদিত প্রাণ।  নাটকে নটী চরিত্রে তাঁর আপত্তি নেই, কিন্তু সেই  দুশ্চরিত্রা নটীর চরিত্র কোনও সুললিত বাবু করুন ; তাতে রঙ্গ কিছু কম পড়িবেক বটে, তবে জাত ধর্ম বিনাশের সম্ভাবনা কিছুমাত্র নাই।

GARGARA SATI II

 

এইবার তাঁরই রচিত ‘সতী-নাটক’ ( ১৮৭৩) থেকে খানিকটা পাঠ করি । এটি হলো সে যুগের আর এক ‘সতী’ নাটক । এই অংশটি তে নট-নটর কথোপকথনে আমরা যথার্থ সতীত্বের একটি সটীক  ব্যাখ্যা পাই।

এই লিস্টিতে চন্দ্রাকুলবধূ দ্রৌপদী নাকচ হয়ে যান একাম্রবনের  আম্রফলের কথাটি বলার সময়  পঞ্চপতির উপরেও  তাঁর যে আর একটি পতির (কর্ণ) ইচ্ছা জেগেছিলো, এই অপরাধে। “সতীকুলের ঈশ্বরী” ইন্দ্রানী পরীক্ষায় ফেল হলেন নিম্নোক্ত কারণে:

“বলপূর্বক যে এসে ইন্দ্রকে তাড়িয়ে দে স্বর্গের সিংহাসনখানি অধিকার করে (নহুষ) শচী ঠাকরুন অমনি হুট্ করে তারির বামে বসেন! এমন ঐশ্বর্য্যপ্রাণা ভোগবিলাসিনীকে পতিপ্রাণা না বলতে পারলে তোমার মন উঠবে কেন?”

যাঁকে এই অংশে তিরস্কার করা হচ্ছে তিনি হলেন এক নটী, অর্থাৎ আর এক ভোগবিলাসিনী, যাঁর সতীপনার কোনো কারেক্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং নেই । তারপর নট চরিত্রটি এই সাব্যস্ত করলে যে , “যে কন্যারত্ন দক্ষ প্রজাপতির কুল উজ্জ্বল করে , কৈলাশনাথের হৃদয়মণি হয়ে , সতীত্বের প্রভায়  ত্রিভুবন আলো করেছেন […] সেই সতীকূলের ঈশ্বরীর নিখুঁত চরিত্র কীর্তন করে  জীবন সার্থক করি।”

তাবৎ  আনন্দ পেলাম এই দেখে যে পূর্ণ চন্দ্রের মতো পূর্ণ সতীর ব্যাখ্যা চলতে লাগলো নাটকে এবং নটী চরিত্রটিকে বলে দেওয়া হলো সতীত্বর মর্মোদ্ধার তার কম্মো না । সামাজিক অনুশাসন নাটকের পাতায় ঢুকে প’ড়ে  তাবৎ নষ্ট মেয়েমানুষকে  চোখ রাঙাতে থাকলো । তারই মধ্যে কে এক ‘শান্তে পাগলা’  কোথ্থেকে এসে তিড়িং বিড়িং করে নেচে কুঁদে মোটা দাগের গান গেয়ে ইনফেরিওর দর্শকদের  আমোদ বর্ধন করলে। অর্থাৎ কিনা, যে নাট্যকার বাবু “কৈলাসনাথের  হৃদয়মণি” কে সতীত্বের সার্টিফিকেট দিয়ে নিজের noble সাত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিটি নাটকে জাহির করলেন, আদর্শ  নারীত্বের একটি বার্নিং এক্সাম্পল সেট করলেন এবং ব্যাড উওম্যানকে chastise করলেন,  তিনিই আবার স্থুল রসিকতা করে মঞ্চের ধারাটি এবং ‘পিট্’ এর চাহিদা টিতে  ইন্ধন যোগালেন। মোটা দাগের আমোদটি বজায় থাকুক,  তার খাতিরে দুই একটি বেশ্যা/নটী  গোছের চরিত্র-ও থাকুক,  কিন্তু তাতে যেন কার্যকাল সমুৎপন্নে বাবু কুলের  শরীর এবং মন কন্টামিনেটেড না হয়ে পড়ে । তাঁরই ঢঙে বলি, “ অতএব  নারীচরিত্রে  আন্ মিন্সেদের’। বেশ্যাসক্তি বিষম বিপত্তি। স্টেজ এবং জীবন মিলে গেলে গেলে মহা বিপদ।  ওই যে বলেছি আগেই, ‘সাধু সাবধান’!

একটি  মুখের মতো জবাব দেখলাম দিলেন জনৈক বাবু মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় । তিনি বললেন এইসকল ড্যামসেলরা স্টেজ-এ ওঠেন বলেই যত নিম্নবর্গের লোক পয়সা দিয়ে টিকেট কাটে, ড্যামসেল দের সাঙ্গ পাঙ্গরা চুপি চুপি নাটক দেখতে আসে ; দাড়ি-চাঁছা নায়িকাদের দেখতে তাঁদের কি  তদ্রুপ উৎসাহ হতো? এছাড়া তিনি এও বললেন যে যাঁরা সমালোচক, তাঁরা উচ্চ শিক্ষিত হিন্দু নারীদের মঞ্চে উপস্থিত করুন, immoral বাবুরা সব কয়টি বেশ্যা কে তাড়া দিয়ে একেবারে গঙ্গা পার করে ছাড়বেন ।

সে হবার নয় । তালেগোলে বেশ্যারা স্টেজ আলো করে থেকে গেলেন । সনাতনপন্থী বাবুরা  ঢাল তলোয়ার নিয়ে নাচতে থাকলেন ।  ১৯১২ ৮ই ফেব্রুয়ারি, গিরীশচন্দ্র যখন দেহ রাখলেন, তাঁর মৃতদেহে মালা দেওয়ার অধিকারটুকুও সনাতন বাবুরা তাদের দিলে না।

লেখাটি দীর্ঘ হয়ে পড়ছে জানি, কিন্তু এ ক’টি কথা বলা প্রয়োজন ছিল। এইবার আসল কথাটি পাড়ি।

২/ আমি সখের নারী সুকুমারী
     স্ত্রী পুরুষে এ্যাক্টো করি
     দুনিয়ার লোক দেখে যারে —!

sukumari dutta
যাদুমণি, আন্দি, এইসব নাম যাদের হয় তাদের ঠিকুজি কুলুজির খোঁজ থাকে না । গোলাপসুন্দরীরও  নেই। মাহেশ থেকে কি অবস্থায় তিনি কলকাতায়  এসে খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন সে কথা কেউ বলে যান নি। তবে হ্যাঁ, কপাল করে এসেছিলেন এই বেশ্যটি।  প্রথম চোটেই মধুসূদন দত্তর নাটকে  শর্মিষ্ঠা ; ১৮৭৪ বেঙ্গল থিয়েটারে  খোদ জ্যোতি ঠাকুরের পুরু বিক্রম নাটকে রাণী ঐলাবেলা । এরপর একটি মহা কান্ড ঘটলো তাঁর জীবনে. এল আলোকপ্রাপ্ত বাবুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলো. বাবুটি সমাজসেবী radical নাম উপেন্দ্রনাথ দাস . তিনি আবার নাট্যপ্রেমীও বটে। ১৮৭৫ সালে  ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়ানো সাঙ্গ  করে তিনি তাঁর বন্ধু  বাবু শিশিরকুমার ঘোষের সাহায্যে দি  গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার -এর ম্যানেজার হলেন।  এরপর ১৮৭৫ এ লিখলেন শরৎ সরোজিনী নাটক। সেই নাটকে অত্যাচারী সাহেবদের খুব একহাত নিলেন ,এবং যা হবার তা হলো:  সরকার সে নাটক বন্ধ করলে। কিন্তু সেই নাটকে ‘সুকুমারী’র ভূমিকায় অভিনয় ক’রে গোলাপসুন্দরী রাতারাতি নাটকের হ্যান্ড বিলে হয়ে উঠলেন সুকুমারী। রীতিমত যারে কয়, a star is born. গল্পটি এখানে শেষ হলে বলা যেত happy ending. কিন্তু সে হবার নয় । উপেন্দ্রনাথ দাস  একে বাবু তাই  radical,তাঁর মাথায় খেয়াল এলো যে  এক্ট্রেসদের ভদ্রসমাজের পাতে দেওয়া একান্ত প্রয়োজন, এবং সে হতে পারে একমাত্র বিবাহ  সূত্রে।

যেমন কথা তেমন কাজ. ঘটনাক্রমে উপেন্দ্রনাথ পেয়ে গেলেন আর এক নাটুকে বাবুরে। তিনি গোষ্ঠবেহারী দত্ত . তাঁর সঙ্গে  তাঁর ‘সুকুমারী’র বিয়ে দিয়ে তিনি  তাকে যাতে তুলবেন এইরকমই সাব্যস্ত করেছিলেন তিনি। ধন্য radical  বুদ্ধি । বেশ্যা যাতে তোলা কি সোজা?  ১৮৭৫ ১২ই ফেব্রুয়ারির  ‘এডুকেশন গেজেট’ এ দেখতে পাই :

সাপ্তাহিক সংবাদ: প্রতিধ্বনি বলেন, গ্রেট ন্যাশনাল  থিয়েটার এর  অভিনেত্রী  শ্রীমতি গোলাপ(মোহিনী)র সহিত উক্ত নাট্যশালার অন্যতম অভিনেতা শ্রীযুক্ত বাবু গোষ্ঠবেহারী দত্তর বিবাহ ১৮৭২ অব্দের তিন আইন অনুসারে  আগামী মঙ্গলবার নির্বাহ হইবে, এমত কথা আছে ।”

কতিপয় রগুড়ে বাঙালি যে বেশ্যার বিয়ে  রঙ্গ দেখে  আটখানা হ’লেন তা বোঝা যায় তাদের ছড়াকাটা শুনে । ছড়াটি দিয়েই  গোলাপ বৃত্তান্ত শুরু করেছি । চক্ষুপাত করুন। ছড়াখানি ওই বিবাহ উপলক্ষ্যে যে ঝড় উঠেছিল তারই এক বীরত্বব্যঞ্জক উদাহরণ।

পাঠক: বিবাহ গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তদপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ‘তিন আইনে বিয়ে’ কারণ এ হলো উনিশ শতকের নবতম বিবাহ প্রথা ।  এই বিড়ম্বনার শুরু আদি ব্রাহ্মসমাজের নতুন বিবাহ প্রথা প্রবর্তন (১৮৬১) এবং তারপরে, বাবু কেশবচন্দ্র সেনের ব্রাহ্ম বিবাহ রিফর্ম মনোবাঞ্ছায়  এবং দুই ব্রাহ্ম নেতার লাঠালাঠি  ব্যাপারে। এই ‘তুই থুলি না মুই থুলি’ দেখে ইংরেজ সরকার যে নেটিভ ম্যারেজ এ্যাক্টের পরিকল্পনা করছিলেন তা শিকেয় তুলে রাখেন এবং নামকরণ না করেই ১৮৭২ এ যে আইনটি বলবৎ হয় সেই হলো তিন আইন।  এই আইনের নানা প্যাঁচ পয়জার, সে সবে আমাদের দরকার নেই. এই বিবাহ আইনের মূল কথা তিনখানি হলো:  বিবাহ হয় একনিষ্ঠ, অর্থাৎ বিবাহিতেরা খামখেয়ালিতে একে অন্যকে  ছাড়িয়া নূতন বিবাহ করিতে পারেন না।  চতুর্দশ বর্ষ বালিকাদিগের সর্বনিন্ম বিবাহোপযুক্ত বয়স বলিয়া নির্দিষ্ট হইল। এই নুতন আইন তাহাদেরই জন্য  বিধিবদ্ধ ব্যবহৃত হইয়াছে যাহারা প্রচলিত হিন্দু, মুসলমান, খ্ৰীষ্টান, য়িহদী প্রভৃতি, কোনও ধৰ্ম্মে বিশ্বাস করে না, এবং ঐ সকল ধৰ্ম্মের,নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসারে বিবাহ করিতে অনিচ্ছুক।

এখন কথা হলো এইসব আইনি মারপ্যাঁচের  সঙ্গে গোলাপের বাবু গোষ্ঠবেহারীর সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক কি?

সম্পর্ক একটু আছে বৈকি।  একটি হিন্দু মেয়ে আর একটি হিন্দু বাবুর কেন  তিন  আইনে বিয়ে হওয়া প্রয়োজন তা একটু ভাবলেই বেরিয়ে পড়বে।  বেজাত বেশ্যার সঙ্গে  হিন্দু কুলোদ্ভবের বিবাহ দিতে কোনো টিকিধারী – ই  সম্মত হতেন কি? তাই এই তিন আইনের খুঁট ধরে গোলাপ, তিনি মোহিনী বা সুন্দরী যাই হ’ন, তার সঙ্গে দত্ত বাবুর বিয়েটি  শাস্ত্র সম্মত না হোক, আইনসম্মত করা গেল এবং যেহেতু এই বিয়ে রেজিস্টারি বিয়ে , দত্ত বাবুর কাঁছা কোঁচা তুলে পালানোর পথটিও বন্ধ করা হলো। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। একে বেশ্যা, তাই তিন আইনে অ-হিন্দু  বিয়ে । দত্ত বাবুর পরিবার তাঁরে ত্যাগ  দিলেন । খানিক অর্থকষ্ট সহ্য করে  দত্ত বাবু তাঁর মুরুব্বি উপেন্দ্রনাথ দাসের পথ ধরে বিলেত রওনা দিলেন এবং শোনা যায় একটি হোটেল এ চাকরি নিলেন। তার কিছু পরেই তাঁর দেহান্তর হয় । ‘মিসেস সুকুমারী দত্ত’ একটি সদ্যজাত কন্যা সন্তান  নিয়ে মোচার খোলার মতো সংসার সমুদ্রে ভাসতে লাগলেন । Radicalism এর জয়গানের এখানেই অন্ত হলো। গোলাপ কিছুদিন একটি নাচ গানের স্কুল খুলে জীবনধারণের চেষ্টা করলেন, এমনকি  নাটক লিখতে শুরু করলেন ।১৮৭৫ সালে ২৩ইএ  অগাস্ট, নাটকটি গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার  এ মঞ্চস্থ হলো কিন্তু তেমন দাগ কাটতে পারলো না।
নাটকটির নাম অপূর্ব সতী ।একটি বেশ্যার ভদ্রকুলবধূ হবার ইচ্ছার কাহিনী এবং বিয়োগান্ত।

নাটকটির কভার পৃষ্ঠায়  বল হয়েছে এটি হ’লো:

TRAGEDY!
TRAGEDY!
TRAGEDY!

এই হলো আমাদের গোড়ায় বলা তিন ‘সতী’ নাটকের তিন নম্বর এবং সর্বশেষ উল্লেখ । এই নাটকটি র কথা দুই ছত্রে সে কথা শেষ হবার নয় এবং বিষয়টি গভীর। সে পরবর্তী পরিচ্ছেদের জন্যে তোলা রইলো।
কোথায় জীবনের শেষ কোথায় নাটকের শুরু বোঝা শক্ত। নাচতে গাইতে , কথা কইতে জানা এই বেশ্যাটি  বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা নাট্যকার। সমাজ এক রঙ্গশালা বটে। তাঁর পরবর্তী জীবনের কথা প্রায় কিছুই লেখা নেই । মেয়েটিকে যথাসাধ্য শিক্ষিত করেছিলেন, প্রচুর টাকাপয়সা খরচ করে একটি সম্ভ্রান্ত ‘ব্রাহ্মণ’ পরিবারে বিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু মেয়ের শশুরবাড়িতে পা দেওয়ার অধিকার তাঁকে দেওয়া হয়নি।

অপূর্ব সতীর নায়িকা নলিনীর একটি গান বলে আজ উঠি:

যদি নাহি পাই প্রাণের কানাই প্রাণ না ভাসে
নাথের উদ্দেশে , এদেশে সেদেশে , সন্ন্যাসিনী   বেশে ,
ভ্রমিব গহনে
নীরবে কাঁদিব, সবে সুধাইব, জীবন ত্যাজি ঝাঁপিয়ে   জীবনে ।।

পাঠক, শেষ পংক্তিতে একটি paradox বা কূটাভাস আছে, লক্ষ্য করেছেন কি? “জীবন ত্যাজি ঝাঁপিয়ে   জীবনে” কথাটির অন্তর্নিহিত অর্থ বা অনর্থ নিয়ে একটু চিন্তা করে দেখবেন, ওটিই হলো গোলাপ ওরফে সুকুমারীর মনের কথা।

আজ এই পর্যন্তই।

***

Featured Image : https://www.pinterest.com/pin/471752129691928597/
Sati: https://www.pinterest.com/pin/471752129691928597/
Sukumari Dutta: Natya Shodh Sansthan.

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s