গড়গড়ার মা’লো পঞ্চম পরিচ্ছেদ: বেশ্যাপুরাণ

Gargara Beshya III

 

ফুলমনি জয়মনি আন্দি লক্ষী পদ্মমণিস্তথা

পঞ্চবেশ্যাম্   স্মরেণ্নিত্যম মহাপাতক নাশনম্।।

                                                                         মনোমোহন বসু

 

 ১  পূর্বাভাস

 

ষষ্ঠ দৃশ্য

( গীত )

Impudent offspring of a low Brahmin Adroit hypocrite,
Hindu erudite, glutton so mean
If nothing would cost you to cast off caste,
Smash orthodoxy, be at once an outcast !
Then pooh pooh to sooktani, Soak soup molecktani,
Drink Brandy-/anz, cross A’ala-pant,
Bid adieu to your old grzhiniz,
Jump and dance—there is a chance—
Sing and sink—swoon soon on the bosom of syren

 

সোনামুখী, যাদুমণি, সোহাগবালা আদি syrenদের  নিয়ে ঊনিশ শতকের কলকাতা বড় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। এয়াঁরা সব হয়  তাড়া খাওয়া বিধবা, ফেলে দেওয়া ঘরের বউ আর নয়তো গয়লা, কৈবর্ত,হাড়ি নাপিত বাড়ির না খেতে পাওয়া ঝি ঝিউড়ি । এঁদের দাপে কলকাতা টলোমলো। এঁরা ছোটবড়’র ধার ধারেন না, খালাসি থেকে বাবু, এঁদের সব চলে।

( জনৈক মাতাল ব্রাহ্মণের প্রবেশ) মাতাল — ( গীত )
মাইরি বলছি সোনামুখী তোরে বড় ভালবাসি ।
নইলে কি’ লো এ ভোর বেলা, মজা ছেড়ে নাইতে আসি ॥
ফাকায় ঢুকে রান্নাঘরে, শিকে হতে হাড়ী পেড়ে,
ঢাকন খুলে টকের মাছ সব, এনেছিলেম চুরী করে,
বুদ হয়ে প্রাণ বাধা-নেশায়, ‘ চোখ বুজে কাল কাটাই হাসি ॥
ঘর কন্নাতে সব পুড়িয়েছি, মাগ ছেলেকে ভাসিয়ে দিছি,
তুই নাইতে এলি ফেলে মোরে চিকণ দাঁতে দিয়ে মিশি,
তাই বকনা হারা এঁড়ের মতন খুঁজতে তোরে ছুটে আসি ॥

 

যে দুইটি গান দিয়ে শুরু হলো, সে দুটি-ই  বিহারীলাল চট্টোপাধ্যায়ের নবরাহা নাটকটি  থেকে ইংরিজি গানটি শিখেছিল এক স্ত্রীলোক এক বিটলে ভট্চায্যির থেকে,  যাঁর আবার শিক্ষে হয়েছিল এক সাহেব মিনসের কাছে । দ্বিতীয় টি তে তো দেখায় যাচ্ছেই এক উচ্চবর্ণের বাবু তাঁর সোনামুখীকে জলের ধারে ধাওয়া করছেন । এইবার দুইটি গান মিলিয়ে পাঠক বিচার করুন । উচ্চবর্ণের খদ্দেরদের একটি চিত্র দেখতে পাবেন । তাঁরা syrenদের জন্যে সর্বস্ব দিতে পারেন ।এঁদের কথা  একটু বিশদে পরে বলা যেতে পারবে ।

এবার হুতোমের কথা শুনুন:

 

“বেশ্যাবাজিটি  আজকাল এ শহরে বাহাদুরির কাজ ও বড়োমানুষের এলবাত পোসাখের মধ্যে গণ্য , অনেক বড়োমানুষ বহুকাল মোর গ্যাচেন  কিন্তু তাঁদের রাঁড়ের বাড়ি গুলি  আজ মনিমেন্টের মতো  তাঁদের স্মরণার্থ রয়েচেন–সেই তেতালা কি দোতালা বাড়িটি ভিন্ন তাঁদের জীবনে আর যেমন কিছু কাজ হয়নি যা দেখে সাধারণ তাঁরে স্মরণ করে।কলকেতার অনেক প্রকৃত হিন্দু দলপতি  ও রাজা রাজড়ারা  রাত্তিরে নিজ বিবাহিত স্ত্রীর মুখ দেখেন না , বাড়ির প্রধান  আমলা দেওয়ান মুছুদিরা যেমন হুজুরের হয়ে বিষয় কর্ম দেখেন — স্ত্রীর  রক্ষনাবেক্ষনের ভাঁড় ও আইনমতে তাঁদের অর্শায়, সুতরাং তাঁরা ছাড়বেন কেন”।

পড়ে মনে হতে পারে যে কালীপ্রসন্ন সিংহ বড়োমানুষদের গুণকীর্তন করছেন কিন্তু আদতে তাঁর ভূমিকাটি ছিল যাকে বলে সমস্যায়িত। হুতোম নয়,  বিদ্যোৎসাহিনী সভার সম্পাদক  শ্রী কালীপ্রসন্ন সিংহ সংবাদ প্রভাকর এ লিখেছেন:

[…] বারযোষা কুল (বেশ্যা) সমস্ত রাত্রি মদ্যপান দ্বারা গীতবাদ্যাদির কোলাহলে এত উৎপাত আরম্ভ করে যে ভদ্রলোক মাত্রই উক্ত পল্লীতে শয়নাগার ত্যাগকরণে বাধ্য হন […] রাত্রিকালে মদ্যবিক্রয় যাহা ভয়ানক অত্যাচার কারণ এই বারস্ত্রীগণের আলয়েই সম্পন্ন হয়, আরও বঙ্গীয় যুবকবৃন্দের ইহা স্বভাব সংশোধন  বলিলেও বলা যাইতে পারে , কারণ তাহারা কি প্রাতঃকালে  কি সায়ং কালে সাবকাশ হইলেই  এই কদাচার  কর্মে প্রবৃত্ত হয় .

চিঠির শেষে তিনি বেশ্যাদিগের জন্যে স্বতন্ত্র পল্লীর আর্জি জানিয়ে আবেদন শেষ করেন।  এই চিঠিটি লেখা হয় ১৮৫৬ সালে অর্থাৎ হুতোম প্যাঁচার নকশা লেখার ও সাত বছর আগে।

চিঠিটি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছি ; বেশ্যাকুলের উদ্ধার নিয়ে  তাঁর কোনো প্রস্তাব নেই । এই আবর্জনা যে থাকবেই সে তিনি ধরেই নিয়েছেন, শুধু আবর্জনাগুলোকে ঝেঁটিয়ে যেন একপাশে  ঠেলে দেওয়া হয় যাতে সম্ভ্রান্ত বাবুদের নিদ্রার ব্যাঘাত না ঘটে, কিন্তু এইসব অবিদ্যাদের একপাশে সরিয়ে রাখলেই কি ভাবে বঙ্গীয় যুবকবৃন্দের চরিত্রের উন্নতি হবে সেই কথাটি ভালো বুঝলাম না ; সে আমার অক্ষমতাবশতঃ হতে পারে।

সে যাই হোক, কলকাতার নীতিবাগিশ বাবুরা সদাশয় সরকার বাহাদুরের এমনি শান্তি ভঙ্গ করতে থাকলেন মামলা মোকদ্দমা চিঠি লেখালিখি করে যে এই সময়েই কলকাতায় আলাদা পল্লী করে এইসব অবিদ্যাদের পৃথক করা হলো । এঁদের ঘাঁটি হলো সোনাগাজী, চিৎপুর, গরাণহাটা এইসব জায়গায় । নীতিবাগিশরাও শ্বাস নিতে পারলেন আর কলকাতার আমুদে পুরুষমানুষদেরও শহরের খোপে খোপে আমোদের জায়গা তৈরী হলো।

Beshya II

 

২ / কারে বলবো বনমালী …

 

এই যে বেশ্যা উৎখাত অভিযান, তার ঢেউ এ প্রথম এলো The Cantonment Act, ১৮৬৪ তে। সেনা ব্যারাকের চৌহদ্দির মধ্যে বেশ্যাবাজার বসানো চলবে না। গুটি পনেরোই যথেষ্ট। তারপরেই  চৌদ্দ আইন ।  রূপচাঁদ পক্ষী গাইলেন:

 

কারে বলবো বনমালী! এ দুঃখের কথা
হলো চৌদ্দ আইন বড়োই কঠিন বল যাই কোথা
ভেবে ভেবে গুমড়ে মরি এ কি আইন হলো জারী
দিগম্বরী করবে যত বারবণিতা।

 

এই চৌদ্দ আইন হলো ইংলণ্ডে ১৮৬৪, ১৮৬৬, ১৮৬৯-এর The Contagious Disease Acts  এর নেটিভ ভার্সন ।

এই আইনটি বলবৎ করার খুব চেষ্টা হয়েছিল ইংলন্ড-এ  মহারানীর নৌ সৈন্যদের স্বাস্থ্য রক্ষা প্রকল্পে। এর দ্বারা সিদ্ধান্ত হয়েছিলো সমস্ত  বেশ্যাদের নাম রেজেষ্টারী করে তাদের  সকল রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তবেই প্রাকটিস করতে দেওয়া হবে। মহারাণী সাম্রাজ্য যারা রক্ষা করে সেইসব সৈ্ন্য সামন্ত যাতে বেশ্যা সংসর্গ করেও সুস্থ সবল থাকতে পারে তারজন্যেই এই ব্যবস্থা। মজার কথা হলো এই, পুরুষদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার কথাটি কারও মাথায় এলো না। যেহেতু মেমসাহেবরা বাঘিনীর জাত, তাঁরা খুব লড়েছিলেন এই আইনের বিরুদ্ধে। তাঁদের পুরোভাগে ছিলেন হ্যারিয়েট মার্টিন আর জোসেফিন বাটলার । জোসেফিন বাটলার ১৮৭১ সালে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন:

“There is a double motive in these Acts … one the providing of clean women for the army and navy, the other the reclamation of women. We cannot serve two masters.” Clearly, women were not being reclaimed. They were being regulated to better gratify the natural lusts of man.”

সেই যে তিনি শুরু করেছিলেন সেই থেকে মধ্যবিত্ত মেয়েরা পিলপিল করে তাঁর পিছন পিছন গিয়ে এমন শোরগোল তুলেছিলেন যে ১৮৮৪তে গভর্নমেন্ট ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ বলে সে আইন রদ করে।
সেই একই আইন  হার ম্যাজেস্টি’স নেটিভ সাব্জেক্টসদের জন্য বলবৎ  হ’লো ১৮৬৮ সালে। সেই হলো চৌদ্দ আইন।সে আইন মোতাবেক, সকল বারস্ত্রীকে তাদের সাকিন, মালিক, হাল হকিকত সব পুলিশে রেজিস্টারি করতে হবে(‘খাতায় নাম লেখানো’ কথাটি নিয়ে অনেক ভেবেছি…আসল বৃত্তান্ত জেনেছিলাম ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডের মেয়েদের অবস্থা নিয়ে লেখা পড়ার করার কালে। কেন ওপথে গেছিলাম পরে কখনো সে কথা বলা যাবে )।এইবার তাদের বছর বছর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে যাতে মহারানীর প্রজাবাবুরা বেশ্যা সংসর্গ করতে গিয়ে কোনো আপদ বিপদে না পড়েন। চুড়ো বাঁশিও বজায় রইলো, সেবাদাসীরাও সাড়ে সব্বোনাশ করতে পারলে না । এসব গূঢ়কথা আলোচনা করা উচিতকর্ম নয় জানি কিন্তু এই কথা ক’টি না বললে আমার পাঁচালি সম্পূর্ণ হবে না ।

এই পরম সমাজকল্যাণ মূলক আইনটির ফলাফল ছাপা হলো  ১৫ই এপ্রিল  ১৮৬৯ এ সংবাদ প্রভাকর  -এ

“বেশ্যাদিগের   রেজিস্টারি ও ব্যাধি পরীক্ষা সম্বন্ধে রাজধানীর মধ্যে যে কত প্রকার ভয়ঙ্কটর ভয়ঙ্কর কথা শোনা যাইতেছে তাহা প্রকাশ করিতে হইলে বিদ্রোহীর মধ্যে গণনীয় হওয়া অসম্ভাবিত হয়না. […] কেহ বলিতেছে পুলিশের লোকেরা  স্ত্রীলোকদের প্রতি নির্দয় হইয়া রেজিস্ট্রারের জন্যে গ্রেপ্তার করিতেছে. তাহাদের ক্রন্দনে  ও আর্তনাদ এ  পুলিশের আহ্লাদ বর্ধিত হইতেছে. কোনো কোনো ডাক্তার অসম্ভব  বলপ্রকাশ কোরিয়া এ কাজ করিতেছেন.  যাঁহাদিগের ব্যাধি নাই  তাহারাও পরীক্ষার পর গৃহে আসিয়া  উদোর বেদনায় ৩/৪ দিন শয্যাগত থাকিতেছে।”

এই আইনটির যে বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছিল সেটির নাম বেশ্যা গাইড। শ্রী গিরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সংগৃহীত সে বইও মন দিয়ে পড়লাম. একটি আইন বড় মনোগ্রাহী ঠেকলো:

 

“যদ্যপি কোনো বেশ্যালয় রক্ষক বেশ্যালয়বৃত্তি ত্যাগ করিতে চাহে  তাহা হইলে তাহা হইলে ইংরাজি দরখাস্ত দ্বারা ওই বিষয়ে  কমিশণার  সাহেবকে জানাইতে হইবে  এবং কমিশণার সাহেব  ওই সংবাদ পাইয়া  জেনারেল রেজিস্টারি ও থানার রেজিস্টারি বহি হইতে তাহার নাম  উঠাইয়া দিতে  ও তাহার রেজিস্ট্রেশন টিকেট  ফিরাইয়া লইতে আদেশ করিবেন।”

 

বেশ বোঝা গেল বেশ্যা বৃত্তি হ’লো ঘুঘুর ফাঁদ । ঢোকা যত সোজা বেরোনো ততটা নয় । বেরোতে চাও তো ইংরিজি তে আপিল করতে হবে তবে সায়েব ভেবে দেখবেন তোমাকে ছাড়া হবে কিনা. কিন্তু এই “ইংরাজি তে আপিল” টি কে লিখবেন, বেশ্যা স্বয়ং না তাঁর বাবু সে বিষয়ে এক বর্ণও পেলাম না। এদিকে এই চৌদ্দ আইন নিয়ে একটি পাঁচালি লেখা হলো ১৮৭২ এ। পাঠকদের অনুরোধ করি শ্রী অঘোরচন্দ্র ঘোষ প্রণীত “পাঁচালী কমলকলি” সম্ভব হলে পড়ে দেখবেন। বিস্তর উপকার পাবেন।
এই আইন এর কোপ এড়াতে বেশ্যারা কলকাতা ছেড়েছিলো অনেকেই ।কমলকলিতে একটি খেমটা  আছে এই বিষয়ে . :

 

রাঁড়ের দফা রফা হলো
পোড়া আইনের জ্বালায় কে কোথায় পালায় ,
কেউ বা গোলায় মাখছে ধুলো ।।
তেতলাতে যারা ছিল দিবানিশি,তারা এ –
ক্ষণ হলো ফরেশ-ডাঙ্গবাসী, কেউ গিয়েছে
কাশী, তীর্থ বারাণসী , প্রয়াগবাসী হয়ে কেউ
রহিল সোনাগাজী মেছোবাজার শূণ্যা –
কার,দেখে শুনে লোক করে হাহাকার
কথা গেল সে বারেন্ডার বাহার ,
অঘোর বলে আহা কি হইলো।

 

তামাশা যে কি আকার নিয়েছিল, খেমটার চলনেই তা পরিষ্কার। কিন্তু আসল তামাশা প্রকট হলো আর একটি ছড়ায় :

 

এই রুপেতে যাচ্ছে সবে করে দড়াদড়ি ।
ফরাসডাঙায় হয়েছে কেমন রাঁড়ের ছড়াছড়ি ।।
আনাচে কানাচে রাঁড় রাঁড়ময়ই সব ।
ফরেশডাঙায় যত ছোঁড়াদের বাড়িলো উৎসব ।।
আহ্লাদে আটকানা কি বুড়ো কি ছোঁড়া ।
কাঁকুড়ফাটা হয়ে উত্তাল ছিল যত গোঁড়া ।।
সিকি আদুলি ফেলে আগে দিত মালসা ভোগ ।
দু চারি পয়সায় ঘুচলো এখন যত ভোগাভোগ ।।
গৌরাঙ্গ স্মরণ করি শিকোয় তুলে ঝুলি ।
রাঁড়ের বাড়ি উঁকি ঝুঁকি মাচ্ছে কুলি কুলি ।।

 

পরিষ্কার বোঝা গেল কালীপ্রসন্ন আদি বড়োমানুষদের প্রজেক্ট ফেল হয়েছে। আবর্জনা একজায়গায় করে, তা সে সোনাগাজী মেছোবাজারই হোক বা ফরাসডাঙ্গাই হোক, বরং শাপে বরই হয়েছে। যুবক বৃন্দ এখন বুক ফুলিয়ে যা খুশি করতে পারেন কারণ ভদ্র পল্লীর বাইরে কে কোন গো ভাগাড়ে যাচ্ছেন কেউ নজরদারি করতে যাবে না। ফাঁকি তে পড়লো বারবনিতা কুল। তাঁদের গণিকা পল্লীতে এমন ছাগল ঠাসা করা হলো যে তাঁরা সের দরে বিকোতে লাগলেন। যা অঢেল পাওয়া যায় তার আবার দাম কি ?

 

৩/ আমার ভালোবাসা আবার কোথায় বাসা বেঁধেচে…

 

এইসব সোনামুখী সোনামনি, নরি, মরি কোথা থেকে কিভাবে ভেসে এসেছিলো সে জানলাম ১৮৬৮র অমৃতবাজার এর একটি প্রবন্ধর থেকে ২০০র কাছাকাছি মেয়েদের পরিচিতি আছে এই প্রবন্ধে: তারা যা বললে তা মোটামুটি এই:

শুভচারিনী কলু: বিধবা হইয়া ঘরে ব্যভিচারিণী হই,আত্মীয়স্বজন ক্রমে জানিতে পারিয়া জ্বালাতন আরম্ভ করে, জ্বালা সয়ে কিছুদিন ছিলাম শেষে আর সহ্য করিতে না পারিয়া ঘরের বাহিরে আসি ।

সুবচনী  :  বিধবার কষ্ট সহ্য করিতে না পারিয়া কূলে কালি দেই ।

ইচ্ছা বাগদি:  অল্প বয়সে স্বামী প্রাণত্যাগ করে,শাশুড়ি আমাকে এক বেশ্যার নিকট বিক্রয় করে ।

বামা গোয়ালা: অল্প বয়সে বিধবা হই, শেষে ক্রমে যৌবনকাল এলো, আমাদের প্রতিবেশী ক্ষুদি কারিগর  নামক একজন আমায় কুলটা করে । ক্রমে এটি রাষ্ট্র হওয়ায়  সকলে জ্বালাতন করায় ঘরের বাহির হই ।

ঘর থেকে বেরিয়ে তাঁদের যে মধুবৃন্দাবন জুটতো তার একটি ছবি আছে শ্রী কেদারনাথ দত্তর সচিত্র গুলজারনগর  বইয়ে। (জাতে এই বইটি আলালের ঘরে দুলালে,এর সমগোত্রীয়, প্রকাশ ১২৭৮) দরকার না থাকলেও বলে রাখি, ‘মাখনওয়ালার গলি’ পরবর্তীকালের Beadon Street:

“আমরা ওই গলিকে মাখনওয়ালার গলি বলতেম  ওই গলিতে যে কত খুন, কত গলায় দড়ি কত বিষ খেয়ে মরা, কত ভয়ানক চুরি, সিঁধ দাঙ্গা, মাতলামি ঢলাঢলি অবাধে হয়ে গেছে ধরাও পড়ে নাই তা শ্মরণ  কল্লে গা শিউরে ওটে এমনকি বকনা পিয়ারির নামে জ্বর আসতো, হাপসী মাধাই-এর নামে রক্ত শুকাতো […] তথায়  কেঁদো কেঁদো  বাড়িওলানীর কারদানিতে যমরাজ অস্থির হতেন।বকনা পিয়ারির ময়নাপণা দাপট গলাবাজি আজও জাগরুক্ আচে […] তার দাপে হাঁড়ি ফাটতো, পদক্ষেপে ভূমি কাঁপতো, চিৎকারে গর্ভপাত হতো […] এক খানা বড় আঁশবঁটি পিয়ারির ব্রহ্মাস্ত্র ছিল,ঝকড়ার সময় পিয়ারী ওই বঁটি জারি করতো  , এছাড়া গালাগালি, কীলকিলি,  ভেঁউচন (ভ্যাঁংচানি) খেঙরানো ৫৬ পুরুষ তোলা […] প্রভৃতি অস্ত্র শস্ত্র আবশ্যক মতো ব্যবহার করতো”।

এই নরকে যাদের স্থান হ’লো সেইসব মেয়েমানুষের মুখের কোনও রাখঢাক নেই।

Beshya

 

৪/ বেরিয়ে এলাম বেশ্যা হলাম কুল করলাম ক্ষয় /তবুও কিনা ভাতার শালা ধম্কে কথা কয়।

যারা ভাসলো এবং ভাসালো, তাদের বেহদ্দ গান আর ছড়ায় বাংলা ভাষার অশ্লীলতা আরও দুই পোঁচ বাড়লো। ভাষা কথা বলে। কি নির্লিপ্তির সঙ্গে তাঁরা শরীর, খিদে, পুরুষদের নিয়ে কথা বললেন তা দেখে কেউ প্রথমবার চোখ সরিয়ে নিলে আশ্চর্য হবো না:

 

আমার ভালোবাসা আবার কোথায় বাসা বেঁধেছে ,
পিরীতের পরোটা খেয়ে মোটা হয়েছে ।
মাসে মাসে বাড়ছে ভাড়া ,
বাড়িউলী দিচ্ছে তাড়া ,
গয়লাপাড়ার ময়লা ছোঁড়া প্রাণে মেরেছে ।

 

এই পিরীত পদাবলীসাহিত্যর ‘প্রেম’ যে নয় সে কি বলে দিতে হবে? ছবির কাঠামোটি রইলো কেষ্ট ঠাকুরের কিন্তু গয়লা ছোঁড়া যে আসলে ছোট জাতের ‘ভাতার’ সে স্পষ্ট । পিরীতের পরোটা কথাটি তে চমক লেগেছিলো।  যে খাবার সহজে মেলে না, কোন হতভাগীর মনে হয়েছিল সে জিনিসটি ভালোবাসার রূপক হতে পারে কে জানে!একটি তির্যক নির্লজ্জ হাসি চন্ডিদাস আর অন্যান্য  বৈষ্ণব পদকর্তাদের গরানহাটা মেছোবাজারের পথে নামিয়ে আনলেন. পষ্ট দেখলাম গয়লা পাড়ার ময়লা ছোঁড়া আলোআঁধারি কোনো গলি তে দাঁড়িয়ে কোনো বারেন্দা লক্ষ্য করে পানের দোনা ছুঁড়ছেন।

ইংরিজি তে একটি কথা আছেই ‘subversion’. এ হলো সেই ধাঁচের প্রতিক্রিয়া যা প্রাতিষ্ঠানিক বুলি ব্যবহার করেও,তার মধ্যে প্রতিরোধের আগুন ধরিয়ে দেয়। যে ভদ্রসমাজে তাদের জায়গা হলো না সেই ভদ্র সমাজের পরম আদরের ‘প্রেম’কে এইসব মেয়েমানুষ কাদা মাখিয়ে শোধ তুললো।

 

যে পেটের ক্ষিদেই মেটে না তার আবার মনের খিদে নিয়ে অত বাড়াবাড়ি কিসের?

 

মাছ খাবি তো ইলিশ
নাং ধরবি তো পুলিশ II

 

গয়লা থেকে পুলিশ। এছাড়া আছেন নব্য বাবুরা। বেশ্যাপাড়ার এই সাম্যবাদের ছড়া পাঁচালি কমলকলিতে এইভাবে লেখা হ’ল:

 

এক্ষণেতে নব্য বাবু আছেন তথা যারা ,
দিব্য করে চুল ফিরায়ে বাহার দিয়ে তারা
পকেটে ফেলে পাঁচ পয়সা ,চুরুট গুঁজে মুখে,
রাঁড়ের বাড়ি এয়ার্কিটি মাচ্চে মনসুখে
আট পয়সার মজুর যারা খেজুর চাটায়ে থাকে,
খাট পালঙ্কে খাসা বিছানায় শুচ্চে লাখে লাখে।

 

পিরীত, ভালোবাসা, এইসবের নানা ব্যাখ্যান ছড়িয়ে আছে এই জগতে। কত আর বলি। কিন্তু এই বিকৃত রুচি আর রসনার মধ্যে কোথাও কোথাও দুঃখের আভাসও পেয়েছি। সেইসব গানে ছড়ায় দেখেছি ভাষা মোলায়েম হয়ে অনুনয়ের সুর ধরেছে।

 

সদা প্রাণ কোনো চায়?
ভালোবাসার মুখে আগুন,
শত্রু বেড়ে পায়ে
ভালোবেসে খুব জেনেছি,
হাতে হাতে ফল পেয়েছি
সারা রাত কেঁদে মরেছি,
তোমার ধরে দুটি পায়ে

 

অথবা দুর্গাচারণ রায়ের “দেবগণের মর্ত্যে আগমনে ফুলের গন্ধ :

 

আবার কি বসন্ত এলো?
অসময়ে ফুটলো কুসুম,
সৌরভের প্রাণ জাদু আমার
সৌরভের প্রাণ আকুল হলো ।

 

আবর্জনার স্তূপের মধ্যে এইরকম অজস্র ফুল উঁকি ঝুঁকি দেয় সে আমলের বেশ্যাদের গানে । তার মাত্র দুটিই পেশ করলাম।

 

পরিশিষ্ট

 

সবশেষে বলি, একখানি নতুন কথা শিখলাম এইসব যাদের-নাম-নিতে-নেই তাদের উচ্চভাব নাড়াচাড়া করার সুবাদে। কথটি হ’ল ‘হলদে ভাতার’। এও জানলাম ইনি হলেন বিশেষ ভালোবাসার মানুষ। এনার জন্যে ঘি দিয়ে ভাত রাঁধা হয়। কিন্তু আমি দেখতে পেলাম বংশীধারী পীতাম্বরকে। অনেক পতিতাই সেই রকম একজনকেই খুঁজে বেড়িয়েছে হয়তো, মুখে স্বীকার করে নি… সে হাপসী মাধাই বা বকনা পিয়ারীদের ভয়ে কিনা কে জানে!

আরও কথা বাকি রইলো, সে পরে হবে’খন।

 

Featured Image:
https://www.storyltd.com/auction/item.aspx?eid=3842&lotno=30

https://www.google.ca/search?q=beshya+kalighat+patachitra&tbm=isch&tbo=u&source=univ&sa=X&

 

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

3 Responses to গড়গড়ার মা’লো পঞ্চম পরিচ্ছেদ: বেশ্যাপুরাণ

  1. S Majumdar says:

    অনেক research করে লেখা । এতো গেল শুধু কলকাতার কড়চা । এই নৈতিক পতন কি শুধু বাঙালির ? জানতে ইচ্ছে করে ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গার কি অবস্থা ছিল । ঐ সমকালীন ভাষা থেকেও বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ – এঁরা বাংলা ভাষাকে একটি অন্য স্তরে নিয়ে গেছেন । এঁদের চরণে শতকোটি প্রণাম ।

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s