গড়গড়ার মা’লো চতুর্থ পরিচ্ছেদ: ‘মিনসে’দের পালিশ ষষ্ঠী অথবা মেয়েলী বুলি ।

GARGARA IV BHASHA

“সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায়না বলা সহজে”!!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মেয়েমানুষদের বড় ঝক্কি। তারা বিপদে পড়লে ন্যানজার হয়, ন্যাকরা করে আর তার ওপর যদি তারা হুড়কো হয় তাহলে তো কথাই নেই।
হুড়কো শব্দটি পাই আশাপূর্ণা দেবীর কোনো একটি গল্পে। কোনো এক প্রতিবেশিনীর ছেলের বৌ হুড়কো, সেই খবরটি  পাড়ার এক গিন্নী দিচ্ছেন তাঁর এক সই কে। তখন পুরো জ্ঞানোন্মেষ হয়নি, আধখানা বোঝা হয়ে থেকেছিল বাকিটা জেনেছিলাম গোপাল উড়ের যাত্রা গান থেকে :

এক বেদেনী বলছে:

এই ওষুধ মোর ছুঁতে ছুঁতে
হুড়কো বৌ যায় আপনি শুতে ।
বার ফটকা পুরুষ যারা
আঁচল ধরা হয়ে উঠে ।

এবার বলি বিদ্যাসুন্দর-এ হিরে মালিনীর গান:

এসো যাদু আমার বাড়ি
তোমায় দিব ভালোবাসা ।
যে আশায় এসেছো যাদু
পূর্ণ হবে মন আশা ।
আমার নাম হিরে মালিনী
ক’ড়ে রাঁড়ী নাইকো স্বামী ।

এই সব মণিমানিক্য দিয়েই তৈরী মেয়েমানুষের বুলি। শিথিলস্বভাবা কলহপ্রিয়ারা “বিদ্যাসুন্দর প্রভৃতি অদি কদর্য পুস্তক সকল পাঠ করিয়া কুপ্রবৃত্তির আলোচনা” করিতে থাকিলো। বাবুরা সভ্য হইবার তোড়জোড়   শুরু করিলেন। এই ভাব এবং ভাষার বিভীষিকা খানিক বঙ্গভাষা অভিযানের হুজুকে কমলো ঠিকই, কিন্তু সাদামাটা মেয়েদের ভাষায় পদ্মফুল ফোটানোর চেষ্টা কারা করলেন সেই খোঁজে আছি।
বিদ্যাসাগর মশাই ঝাঁটা ঝুড়ি নিয়ে ভাষা সংস্করণে নেমেছিলেন বটে। কলকাতার এক বাবু ছড়া বেঁধেছিলেন:
শহরে এক নতুন হুজুক উঠেছে রে ভাই
অশ্লীলতা শব্দ মোরা আগে শুনি নাই।
এর বিদ্যাসাগর জন্মদাতা
বঙ্গদর্শন এর নেতা।
বসন্তক, ১৮৭৪

কিন্ত সে বিদ্যাসাগরি হুজুক মেয়েমানুষের ভোগে যজ্ঞে লাগতে যুগ পেরিয়ে গেল! ভাষা সংস্কারের বিবরণ পাই দীনেশ চন্দ্র সেনের সরল বাঙ্গালা সাহিত্য বইয়ে:

“ছোট ছোট কথা এমনই কৌশলে তিনি (বিদ্যাসাগর) বাঙ্গালার গায়ে পরাইয়া দিলেন, যে আমাদের ভাষা সম্পন্ন গৃহস্থের মেয়ের মত বড় সুন্দর দেখাইল, -সেই গয়না অতিরিক্ত ভাবে পরিয়া তাহার চলাফেরার কোন বাধা হইল না। পূর্বের পণ্ডিতদের হাতে গয়না পরিয়া বঙ্গভাযা একেবারে ভারে এলাইয়া পড়িতেন, তাহার উত্থানশক্তি ও গতিশক্তি রহিত হইত। কিন্তু বিদ্যাসাগরের হাতের সাজানো মেয়েটি বেশ ছুটাছুটি করিয়া চলিতে লাগিল” ।

উপমাটি বেশ। পড়ে মনে মনে হাসলাম। সম্পন্ন গৃহস্থ ঘরের মেয়ের গায়ে পুরুষ গয়না দিলেন আর সেই সালংকারা কন্যা ঢুকলেন তাঁদেরই ভাবের ঘরে।তাঁরা এই ভাষায় উচ্চচিন্তা করতঃ উচ্চমার্গে বিচরণ করতে থাকলেন। আর এলেবেলে মেয়েমানুষরা পড়ে রইলেন খেউড় আর বিদ্যাসুন্দরের জগতে।তাদের বলা হ’লো ‘এইসকল লেখা বিদ্যার উদ্দেশ্য অপবিত্র করে’। কিন্তু সাধারণ মেয়েদের ছোটমনের ছোটকথা দুইপাতা গুছিয়ে দুচার খানা হাল্কা গয়না পরিয়ে কেউ বললেন না। সবই উপদেশ। সবই অমৃতবাণী। যে সদ্বংশজাতারা কপাল গুণে বিদুষী হলেন, তাঁরা হয় জ্ঞানী পুরুষমানুষদের দেখাদেখি গুরুঠকরুণ হয়ে বসলেন আর নাহলে বাবুদের অনুকরণে গুটিকয়  পদ্য লিখলেন। কিন্তু যে হতভাগীরা বালিকাদশায় পুত্রবতী হলো, তাদের সুখদুঃখের কথা সালংকারা ভাষায় কাউকে তো বলতে শোনা গেল না। ভাল ভাল নাটক নবেল যা লেখা হলো সেসব শোভা পেতে থাকলো বাবুদের বৈঠকখানায় আর কাব্য-পুরন্দরদের সাহিত্য সভায়।

দীনেশ চন্দ্র সেনের কথা আরও একটু বাকি। তিনি আরও বললেন: “কেহ কেহ এই ভাষাকে টানিয়া লইয়া একেবারে বেহদ্দ সহরের অলিগলিতে ফেলিয়াছেন”। সেই “অলিগলির” ভাষাকে ঘরে তোলা যায়না, কিন্তু তার সনে রগড় কর যায়। হুতোম প্যাঁচার নক্সা ,আলালের ঘরে দুলাল যে রগুড়ে বেহদ্দ বাংলায় আজব সহর কলকেতাকে খুব একহাত নিলেন, সেই ভাষার অনেকখানিই যে অলিগলির মেয়েলী বুলি তা আমরা খেয়ালও করলাম না। বস্তুতঃ “মাগী যে জক্কী” গোছের মেয়েলী গাল শুনে আমাদের যৎপরোনাস্তি আমোদ হ’লো।

“Oh—ay—that nasty gibberish—I must speak it I suppose. হম again আয়া হ্যায় |”
                                                                                                                                         চন্দ্রশেখর 

BANKIM

Nasty gibberish এর ভাগ রইলো মেয়েদের। ১৮৫০ এ Calcutta Review এ এক সায়েব বলছেন:

“ …(T)he lascivious interviews between them (বিদ্যা আর সুন্দর) are described again and again, with disgusting minuteness and in the most glowing language. If ever vice is decked out in gaudy colors and made to appear attractive, it has been in this novel. The study of it must destroy all purity of mind…”

বাবু ভদ্রলোকরা lascivious interviews পড়া ছাড়লেন কিনা বলতে পারিনা কিন্তু সরব খুব হলেন। কলকাতার বাবু Hur Chunder Dutt একটি Discourse লিখছেন:
“Amours of lascivious Kishna and the shepherdess Radha or of the liaison of Bidya and Sundar […] it is needless to say that topics like these execise a baneful influence on the moral character of the auditors”.
এই সব enlightened বাবুদের বৃত্তান্ত লিখলেন খোদ বঙ্গদর্শনের সম্পাদক। এটি হলো এক উচ্চদরের উচ্চশিক্ষিত বাবু ও তাঁর ভার্যার কথোপকথন:

উচ্চ। কি জান-বাঙ্গলা ফাঙ্গলা ও সব ছোট লোকে পড়ে, ও সবের আমাদের মাঝখানে চলন নেই। ও সব কি আমাদের শোভা পায়?

ভার্য্যা। কেন, তোমরা কি?

উচ্চ। আমাদের হলো Polished society-ও সব বাজে লোকে লেখে-বাজে লোকে পড়ে-সাহেব লোকের কাছে ও সবের দর নেই- polished societyতে কি ও সব চলে?

ভার্য্যা। তা মাতৃভাষার উপর পালিশ-ষষ্ঠীর এত রাগ কেন?

উচ্চ। আরে, মা মরে কবে ছাই হয়ে গিয়েছেন-তাঁর ভাষার সঙ্গে এখন আর সম্পর্ক কি?

ভার্য্যা। আমারও ত ঐ ভাষা-আমি ত মরে ছাই হই নাই।

উচ্চ। Yes for thy sake, my jewel, I shall do it-তোমার খাতিরে একখানা বাঙ্গলা বই পড়িব। কিন্তু mind একখানা বৈ আর নয়!

ভার্য্যা। তাই মন্দ কি?

উচ্চ। কিন্তু এই ঘরে দ্বার দিয়ে পড়্‌ব-কেহ না টের পায়।

ভার্য্যা। আচ্ছা তাই।

(বাছিয়া বাছিয়া একখানি অপকৃষ্ট অশ্লীল এবং দুর্নীতিপূর্ণ অথচ সরস পুস্তক স্বামীর হস্তে প্রদান। স্বামীর তাহা আদ্যোপান্ত সমাপন।)

ভার্য্যা। কেমন বই?

উচ্চ। বেড়ে। বাঙ্গালায় যে এমন বই হয়, তা আমি জানিতাম না।

ভার্য্যা। (ঘৃণার সহিত) ছি! এই বুঝি তোমার পালিশ-ষষ্ঠী? তোমার পালিশ-ষষ্ঠীর চেয়ে আমার চাপড়া-ষষ্ঠী, শীতল ষষ্ঠী অনেক ভাল।
‘বাঙ্গালা সাহিত্যের আদর’ । লোকরহস্য, ১৮৭৫)

বাবুরা hand contaminate না করার প্রকাশ্য ব্রত নিলেন আর যত দোষ হ’লো পোড়া বাঙ্গালীর মেয়ের।এইবার বঙ্গললনাদের কথার আর একটি নমুনা রেখে বিষয়ান্তরে যাই। পাঠক এই লেখাটি বিবেচনা করুন:
শ্যামবাবু । গুড্ মর্ণিং রামবাবু-হা ডু ডু?

রামবাবু। গুড্ মর্ণিং শ্যামবাবু-হা ডু ডু। [উভয়ে প্রগাঢ় করমর্দ্দন]

শ্যামবাবু । I wish you a happy new year, and many many returns of the same.

রামবাবু। The same to you.

[শ্যামবাবুর তথাবিধ কথাবার্ত্তর জন্য অন্যত্র প্রস্থান। ও রামবাবুর অন্তঃপুরে প্রবেশ]

রামবাবুর স্ত্রী। ও কে এসেছিল?

রামবাবু। ঐ ও বাড়ীর শ্যামবাবু।

স্ত্রী। তা, তোমাদের হাতাহাতি হচ্ছিল কেন?

রামবাবু। সে কি? হাতাহাতি কখন হ’লো?

স্ত্রী। ঐ যে তুমি তার হাত ধ’রে ঝেঁক্‌রে দিলে, সে তোমার হাত ধ’রে ঝেঁক্‌রে দিলে? তোমার লাগে নি ত?

রামবাবু। তাই হাতাহাতি! কি পাপ! ওকে বলে shaking hands. ওটা আদরের চিহ্ন।

স্ত্রী। বটে! ভাগ্যে, আমি তোমার আদরের পরিবার নই! তা, তোমার লাগেনি ত?

রামবাবু। একটু নোক্‌সা লেগেছে; তা কি ধর্‌তে আছে?

স্ত্রী। আহা তাই ত! ছ’ড়ে গেছে যে? অধঃপেতে ড্যাকরা মিন্‌সে! সকাল বেলা মর্‌তে আমার বাড়ীতে হাত কাড়াকাড়ি করতে এয়েছেন! আবার নাকি হুটোহুটি খেলা হবে? অধঃপেতে মিন্‌সের সঙ্গে ও সব খেলা খেলিতে পাবে না।

রামবাবু। সে কি? খেলার কথা কখন হ’লো?

স্ত্রী। ঐ যে সেও ব’ল্লে, “হাঁডু ডু ডু!” তা, হাঁ ডু ডু ডু খেলবার কি আর তোমাদের বয়স আছে?

রামবাবু। আঃ, পাড়াগেঁয়ের হাতে পড়ে প্রাণটা গেল। ওগো, হাঁ ডু ডু নয়; হা ডু ডু-অর্থাৎ How do ye do? উচ্চারণ করিতে হয়, “হা ডু ডু!”

এটি সেই একই লোকরহস্য প্রবন্ধ সংকলনের “New Year’s Day” লেখা থেকে।

এ লেখার রসের ভাঁড় যে পাড়াগঁয়ে মূর্খ স্ত্রীটি, সে কি আর বলে দিতে হবে? এইবার যে কথটি বলবো সেটিই হ’লো আসল। মেয়েরা অপকৃষ্ট বই পড়েন, তাঁরা পালিশ ষষ্ঠীর ধার ধারেন না, তাঁদের মুখের অসংস্কৃত ভাষা নিয়ে রগড় খুব করা যায়। বেশি পড়ে ওঠা হয়নি। তাও সামান্য যা পড়েছি তাই দিয়ে আমার Discourse খাড়া করি। মোটামুটি ১৮৭৩ থেকে ১৮৯৮ বাংলা প্রহসনের বই কিছু নাড়াচাড়া করলাম। চারটি প্রহসন থেকে কিছু কছু অংশ দেবো। সে পড়ে পাঠকরা বিবেচনা করুন আমি আড়বুদ্ধি কিনা।

মৎস্যধরা: শ্রী কালীদাস চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৩)

লেখকের বিজ্ঞাপন:
“অগ্নিপুরাণে মৎস্যধরা বিষয়ক যে মনোহর উপাখ্যান আছে, তাছাই অবলম্বন পূর্বক এই নাটক খানির রচনা হইয়াছে। ইহার প্রথম ও দ্বিতীয়াঙ্ক এবং পাৰ্ব্বতী ও পদ্মার কন্দল ও পরিহাস এ সমস্তই অবলম্বিত গ্রন্থবহিভূত। আর আর যে সমস্ত এই পুস্তকে লিখিত হইয়াছে, তাহাও উক্ত গ্রন্থের অবিকল অনুবাদ নহে, স্থানে স্থানে পরিত্যক্ত ও কোন কোন স্থলে সংলগ্ন বিবেচনা করিয়া নূতন নূতন ভাবের নিয়োজন করা হইয়াছে। এই বিষয়টি সংকলন করিতে যে কত দূর প্রয়াস পাইয়াছি বলিতে পারি না। এক্ষণে সরল-হৃদয় পাঠকবৃন্দের সমীপে বক্তব্য যে তাহারা যদ্যপি এই নাটক খানি পাঠে কিঞ্চিৎ মনোনিবেশ করেন, তাহা হইলে মাদৃশ জনের পরিশ্রম সার্থক হয়।  আড়ুই, জেলা বৰ্দ্ধমান । ৭ই বৈশাখ, সন ১২৮০ | শ্ৰীকালীদাস শর্মা “।
এই সব “নূতন নূতন ভাবের নিয়োজন” যা হ’লো তার মাঝে আছে মেয়েদের ভাব ও ভাষায় দেবী ও অন্যান্য মেয়েমানুষের কথাবার্তা:

বাগ্দিনী: আ মরণ আর কি ! মুখ পোড়ার একবার কথা শুনলে ? আপনার আঁটি নেই, পরের মেগের ওপোর অত উচু নজর কেন ?

শিব: পরের মাগ আবার কি ? সয়াতে আর আমাতে কি কিছু ভিন্ন আছে ?

বাগ্দিনী: আমি তেমন মেয়ে নই। তোমার এত যদি আম্বা হয়েচে ঘরে যাওনা ?

শিব: তুমিও তে। আমার কিছু পর নও । তোমার সই তেমন নয়। তার কাছে আর আমার যেতে ইচ্ছে নেই।

বাগ্দিনী: কেন ? কেন ? আমার সইয়ের এমন কি দোষ যে তুমি আর তার কাছে যাবে না।

শিব: তার অন্তঃকরণটা বড় কঠিন; আর দিবারাত্র কেবল কন্দল নিয়েই থাকে। তুমি যদি সয়া বোলে আমারে দয়। কর, তা হলে আমি আর জন্মেও তার মুখ দশন করি না ।

বাগ্দিনী: তিনি দেখতে কেমন হে ?

শিব: তোমার কোড়ে আঙ্গুলেরও যুগ্যিও নয়।

বাগ্দিনী:  তবে যে সকলে বলে শিবের মাগ ভারি সুন্দরী।

এইবার পাঠক পরবর্তী উদ্ধৃতি র তালিকাটি দেখুন:

নবরাহা: শ্রী বিহরীলাল চট্টোপাধ্যায় (১৮৯৭)

তৃ-স্ত্রীলোক । অfর শুনিছিস ? কলকেতার একজন অধ্যাপক ভট্চায্যি সাহেবদের পেয়ারের লোক হবে বলে কুকুরের মতন তাদের পাতের এ-টো খান খায় ?

প্র-স্ত্রীলোক । হা বোন, সেদিন ওঁর কাছে শুনছিলুম বটে। সে মিনসে নাকি সাহেবদের সঙ্গে হাওয়া খেতে কি একটা পাহাড়ে গিয়ে বড় ঢলিয়েছে !

দ্বি-স্ত্রীলোক । কেন হাওয়া খেতে পাহাড়ে গেল কেন ? আর কি কোথায় হাওয়া নেই ?

তৃ-স্ত্রীলোক । ওলো তা নয় তা নয়। আজকাল বাৰু দের পাহাড়ে হাওয়া খাওয়া রোগ হয়েছে । সাহেবরা বাবুগোছের হিন্দুদের খাবার ও সাহেবদের খাবার আলাদা আলাদা হেঁসেলের বন্দোবস্ত করেছে। ঐ ভট্টচায্যি মিনসে বাঙ্গাল একটা হেঁসেলের সাহেব তার সঙ্গে রগড় করে তার হাত ধ’রে যে গানটী গেয়েছিল আমাদের তিনি সে গানটী আমায় শিখিয়ে দিয়েছেন ।

প্র-স্ত্রীলোক। কি গান ভাই কি গান ? বলনা শুনি ।

তৃ-স্ত্রীলোক। দূর পোড়ারমুখী ! এত লোকের সামনে মেয়ে মানুষ গান গাইব কেমন করে ?

দ্বি-স্ত্রীলোক । মেলার ঠেলায় নাটঘাট হয়ে যখন ভিড়ে নাইতে চলিছিস তখন তার একটা রগড়ের গান গাইতে পারিসনি ? ডুবে জল খেলে শিবের বাপেও টের পায় না, গোলে হরিবোল দিলে কে শুনতে পায় ? আর এত ভিড়ের মধ্যে তোমায় কেইবা চিনবে যে তুমি অমুক লোকের মেয়ে অমুক লোকের বউ এখানে এসে গান গাচ্ছ? যতক্ষণ আমরা অন্দরে বন্ধ থাকি ততক্ষণই আমাদের আব্রু। একবার বাইরে বেরুলে মোদের আর পায় কে ? ষাড়িনীর মতন ধাওয়া করে ধাক্কা দিয়ে পুরুষ গুলোকে হুড়িয়ে ঠেলে দিয়ে বেড়িয়ে বেড়াই। কি গান শিখিছিস ফাকায় গেয়ে ফেলে আপনার পেট থালাস কর আমাদেরও হাসিয়ে মেরে ফেল আর ঐ জামাজোড়-পরা ভেকো পুরুষগুলোর মুণ্ডু ঘুরিয়ে দে ।

তৃ-স্ত্রীলোক। তোরা ভাই অ মোয় পাগল পেয়েছিস নিতান্ত ছাড়বিনি ? তবে শোন । সেই হেঁসেল ওলা সাহেব সেই টিকি ওলা অধ্যাপক টাকে চোঙ্গার বাঁদর সাজিয়ে তাকে টিকি ধরে নাচাতে নাচাতে এই গান গেয়েছিল […]

প্রকৃতির পরিশোধ: শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭৪)

দ্বিতীয় দৃশ্য

এক দল মালিনীর প্রবেশ

গান

বুঝি বেলা বহে যায়,

কাননে আয়, তোরা আয়।

আলোতে ফুল উঠল ফুটে, ছায়ায় ঝরে পড়ে যায়।

সাধ ছিল রে পরিয়ে দেব মনের মতন মালা গেঁথে,

কই সে হল মালা গাঁথা, কই সে এল হায়,

যমুনার ঢেউ যাচ্ছে বয়ে, বেলা চলে যায়।

পথিক। কেন গো এত দুঃখ কিসের! মালা যদি থাকে তো গলাও ঢের আছে।

মালিনী। হাড়কাঠও তো কম নেই।

দ্বিতীয় মালিনী। পোড়ারমুখো মিন‍্‍সে, গোরুবাছুর নিয়েই আছে। আর,আমি যে গলা ভেঙে মরছি, আমার দিকে এক বার তাকালেও না! (কাছে গিয়া গা ঘেঁষিয়া) মর্ মিন‍্‍সে গায়ের উপর পড়িস কেন?

সেই লোক। গায়ে পড়ে ঝগড়া কর কেন! আমি সাত হাত তফাতে দাঁড়িয়ে ছিলুম।

দ্বিতীয় মালিনী। কেনে গা! আমরা বাঘ না ভাল্লুক! না হয় একটু কাছেই আসতে! খেয়ে তো ফেলতুম না।

[হাসিতে হাসিতে সকলের প্রস্থান]

স্বর্গীয় প্রহসন: শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৯৮)

 

শীতলা। ( মনসার প্রতি লক্ষ করিয়া স্বগত) মোলো মোলো! আমাদের মন‍্‌সে হিংসেয় ফেটে মোলো। আমি চাঁদের পাশে বসেছি, এ আর ওঁর গায়ে সইল না। ঘুর ঘুর করে বেড়াচ্ছে দেখো-না। এতগুলো পুরুষমানুষের সামনে লজ্জাও নেই! মাগী এবার পাড়ায় গিয়ে কত কানাঘুষোই করবে! উনিও বড়ো কসুর করেন নি। কার্তিক-ঠাকুরটিকে নিয়ে যেরকম নিলজ্জপনা করেছে আমি দেখে লজ্জায় মরে যাই আর-কি। কার্তিক কোথায় নুকোবে ভেবে পায় না। ঐ তো চেহারা, ঐ নিয়ে এত ভঙ্গিও করে! মাগো, মাগো, মাগো! (প্রকাশ্যে) আ মর্ মাগী! চাঁদের সামনে দিয়ে অমন বেহায়ার মতো আনাগোনা করছিস কেন? যেন সাপ খেলিয়ে বেড়াচ্ছে! কার্তিকের ওখানে ঠাঁই হল না নাকি?

সুরসভার মধ্যে মনসার ও শীতলার গ্রাম্য ভাষায় তুমুল কলহ

ইন্দ্র। ( শশব্যস্ত হইয়া একবার মনসা ও একবার শীতলার প্রতি) ক্রোধ সংবরণ করো! ক্রোধ সংবরণ করো! অয়ি অসূয়াতাম্রলোচনে, অয়ি গলদ‍্‌বেণীবন্ধে, অয়ি বিগলিতদুকূলবসনে, অয়ি কোকিলজিতকূজিতে, তারতর সপ্তম স্বরকে পঞ্চম স্বরে নম্র করিয়া আনো। অয়ি কোপনে—

ঘেঁটু। ( উত্তরীয় ধরিয়া ইন্দ্রকে আসনে বসাইয়া) তুমি এত ব্যস্ত হও কেন দাদা? ওদের এমন রোজ হয়ে থাকে। থাকত ওলাবিবি, তা হলে আরো জমত। তার কি খাবার গোল হয়েছে তাই সে শচীর সঙ্গে ঝগড়া করতে গেছে।

ইন্দ্র। ( ব্যাকুলভাবে) হা সুরেন্দ্রবক্ষোবিহারিণী দেবী পৌলমী!

চারটি প্রহসন চার ধারার, কিন্তু এদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মেয়েমানুষের বুলির আঁচড়ে যে কুঁদুলে, পুরুষ-হ্যাংলা  অভব্য মেয়েমানুষকে ঘিরে হাসির হররা উঠলো, তাতে আমরা যোগ দিতে পারলাম না । এমনকি  তার হোতা যদি হন শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , তাহলেও না!

 

 

শেষ কথা

 

antahpur

বিশ শতক-এর গোড়ায়  মেয়েরা আর একটু এগোলেন. স্ত্রী-শিক্ষার হুজুগ-এ তাঁদের হাব ভাব পোশাক- আসাক ও বেশ খানিক বদলালো. সাদামাটা বাড়ির মেয়েরা সায়া সেমিজের ব্যবহার শিখলেন । ভাষার কতক শ্রীবৃদ্ধি হ’লো নিশ্চয়ই, কারণ মেয়েলী ভাষার ধারা যে কেতাবি পথ ধরে এগোচ্ছে সেটা পরিস্কার। আরও  দুই পা যাঁরা এগোলেন, তেনাদের পরনে লেস দেওয়া জ্যাকেট, এগারো হাতি সারি পার্শি ঢং এ পড়া, কাঁধে একটি  ব্রোচও দেখা যায় বড়োমানুষের বৌ ঝিদের ছবিতে। এনারা ইংরাজিও বেশ পড়েন।

বোঝা যাচ্ছে দিন কাল পাল্টাচ্ছে : গিরিজায়া, হরিমোহিনীর বদলে কামিনী, তরুবালা, হেমলতা, প্রিয়ম্বদা।

১৮৯৮ এ ‘অন্তঃপুর’ পত্রিকা। বনলতা দেবী ছিলেন ‘অন্তঃপুরে’র একাধারে পরিচালক ও সম্পাদক। পত্রিকাতে কেবল মহিলাদের রচনাই প্রকাশিত হত। প্রথম সংখ্যার ‘প্রস্তাবনা’ অংশে সম্পাদিকা পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন – “আজকাল মাসিকপত্রিকার অভাব নাই, রমণীদিগের উপযুক্ত পত্রিকার কয়েকখানা সুন্দররূপে পরিচালিত হইয়া রমণীদিগের উন্নতির সহায়তা করিতেছে। আমরাও আজ ক্ষুদ্রশক্তি লইয়া রমণীদিগের ও তাহাদের সুকুমারমতি বালক বালিকাদিগের জন্য একখানি ক্ষুদ্র পত্রিকা প্রকাশ করিতেছি। অন্যান্য খ্যাতনামা পত্রিকার সহিত প্রতিযোগিতা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, সেরূপ দুঃসাহসও নাই। কেবল রমণীদিগের উন্নতিকল্পে আপনাদের যৎসামান্য শক্তি নিয়োগ করিয়া ধন্য হইব এই আশা” ।

১৮৯৯-এর ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে – “বেথুন কলেজের লেডি সুপারিন্টেন্ডেন্ট কুমারী চন্দ্রমুখী বসু এম.এ. এবং শ্রীমতী নির্ম্মলা সোম এম.এ. এই বৎসর এন্ট্রান্স পরীক্ষার পরীক্ষক মনোনীত হইয়াছেন।“

১৯১০ সালে গোরা । সুচরিতা ললিতারা  পুরুষ সমাজে হুঁকো পেয়েছেন । চায়ের টেবিল এ বসে তাঁরা তত্ত্ব আলোচনা, সাহিত্যালোচনা করেন। পুরুষমানুষের সঙ্গে এক টেবিলে বসে চা খান. কিন্তু এতেও কামিনী কলঙ্ক ঘোচে কি ?  মেয়েমানুষের ‘ঝেঁকরে’ দেওয়া বুলি নাই, কিন্তু মেয়েমানুষের পালিশ ষষ্ঠীতে যোগ দানের আস্পর্দা তো আছে । সেই নিয়ে রঙ্গ তামাশাই বা মন্দ কি?

১৯১২ সনে শ্রী দ্বিজেন্দ্রলাল রায় নিম্নোক্ত গান খানি রচেন। এটি একটি বিখ্যাত গানের প্যারডি, রবিবাবুকে লক্ষ্য করে। কিন্তু আমি দেখি এক ঢিলে দুই পাখি কাৎ। রবিবাবুর গানের আদ্যশ্রাদ্ধও হলো, আবার  জাতে উঠতে চাওয়া  মেয়েমানুষের আস্পর্দাকেও খুব এক চোট নেওয়া হলো:

 

সে আসে ধেয়ে

এন, ডি, ঘোষের মেয়ে ।

রিনিক ধিনিক রিনিক ধিনিক

চায়ের গন্ধ পেয়ে ।

কুঞ্চিত ঘন কেশে

বোম্বাই শাড়ি বেশে

খটমট বুট শোভিত পদ

সুবিদিত ম্যাটিনেই ।

বঞ্চিত নহে শরবত্‍-কেক

বিস্কুট তায় প্লেটে ।

অঞ্চল বাঁধা ব্রোচে

রুমালেতে মুখ মোছে ।

জবাকুসুমের গন্ধ আসিছে

ড্রইংরুমটি ছেয়ে …
(আনন্দবিদায়,  ১৯১২)

গানটি নিবেদন করে আজকের মতো পাঁচালী পাঠ শেষ করলাম । নারীজন্ম সার্থক হ’লো।

Copyright @ purnachowdhury.wordpress.com 

                                                                                                     

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s