গড়গড়ার মা’লো তৃতীয় পরিচ্ছেদ: মেয়েমানুষের বুদ্ধি

Woman reading

দধিমঙ্গল

মেয়েমানুষের বুদ্ধি যে তেমন সুবিধের নয় এবিষয়ে আমাদের কোনও সন্দেহ নেই। আমরা evidence এবং authority দুইই মানি। সেই কবে শুনেছি নারীবুদ্ধি প্রলয়ংকরী। কিন্তু প্রলয়টি যে কোন রূপে আসবে সেটি অবশ্য এই প্রবচনটি থেকে বোঝার উপায় নেই। তবে প্রামাণ্য উক্তি এত আছে যে আসল কথাটা বুঝতে বেশি সময় লাগেনা। আমরা, যারা কিনা বদভ্যেসের কারণে তত্ত্বকথা সায়েবদের থেকেই শিখি, তাঁরা দেখবো এমনকি খোদ ইংল্যান্ডেও সেই কবে ১৬১৫ সাল Joseph Swetnam নামে এক খুচরো লিখিয়ে একখানি চটি বই লিখেছিলেন। বইটির নাম The Arraignment of Lewd, Idle, Forward, Unconstant Women. তার মুখবন্ধে আছে:

Jewels are all precious but they are not all of one price, not all of one virtue, no more women are all of same disposition: women are all necessary evils and yet not all given to wickedness and many so bad that in my conceit should I speak the worth that I know of some woman I should make their eares glow that hear me […].

১৬১৭ সনে Constantia Munda নামধারিণী তাকে আচ্ছা করে ঝাঁটাপেটা করেছিলেন বটে (The Worming of a Mad Dogge, 1617) কিন্তু তাতে করে Swetnam-এর মূল উপপাদ্যটি সত্যরূপে আরও প্রতিভাত হ’ল:  মেয়েরা জাত গোখরো। তাদের মধ্যে কতিপয়ের বিষ কিছু বেশি। অতএব, সাধু সাবধান।

বস্তুতঃ মেয়েদের যে জন্মই হয়েছে পুরুষজাতির সর্বনাশ করার জন্য, এবিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই। মনু যদিও বা ‘Old Fool’ হ’ন, সায়েবদের এইসব কথা ফেলে দেওয়ার নয়। তাঁদের এইসব যুক্তিবুদ্ধি সাগর পেরিয়ে এসে এদেশে পড়লো যখন, তখন প্রায় মহারানীর আমল। আমরা আবার নতুন করে জানলাম মেয়ে বুদ্ধির নানা দোষ। বাবু কমলাকান্ত চক্রবর্তী সাক্ষী। নারীর রূপবর্ণনায় তিনি বলছেন:

“হে মানময়ী মোহিণীগণ! কুটিল কটাক্ষে কালকূট বর্ষণ করিয়া আমাকে এই দোষে দগ্ধ করিও না; কালসর্পী-বিনিন্দিত বেণীদ্বারা আমাকে বন্ধন করিও না, ভ্রুধনুতে কোপে তীক্ষ্ণ শর যোজনা করিয়া আমাকে বিদ্ধ করিও না। বলিতে কি, তোমাদের নিন্দা করিতে ভয় করে। পথ বুঝিয়া যদি তোমরা নথ-ফাঁদ পাতিয়া রাখ, তবে কত হস্তী বদ্ধচরণ হইয়া, তোমাদের নাকে ঝুলিতে পারে – কমলাকান্ত কোন্‌ ছার! তোমাদের নথের নোলক খসিয়া পড়িলে, মানুষ খুন হইবার অনেক সম্ভাবনা; চন্দ্রহারের একখানি চাঁদ যদি স্থানচ্যুত হইয়া কাহারও গায়ে লাগে, তবে তাহার হাত পা ভাঙ্গা বিচিত্র নহে। অতএব তোমরা রাগ করিয়ো না”।

নথের ফাঁদ বড় ফাঁদ। অবলা পুরুষজাতি একবার তাতে পা দিলে আর রক্ষে নেই। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত একটি সাময়িক পত্রিকা ক’দিন আগে হাতে পেলাম। নাম ‘প্রয়াস’। তার  প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় জনৈক শৈলেন্দ্রনাথ সরকার একখানি ‘বিষবৃক্ষ অনুশীলন’ লিখেছেন। প্রবন্ধটি কৃষ্ণকান্তের উইল এবং বিষবৃক্ষ  তুলনামূলক সমালোচনা। তাতে তিনি অকাট্য যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছেন যে সব দোষ রোহিণী এবং কুন্দনন্দিনীর। দুই নায়কই সুন্দরী বিধবার রূপের ফাঁদে পা দিয়ে মরেছিলেন: “নগেন্দ্র ও গোবিন্দলাল উভয়ের চরিত্রই প্রথম নির্দোষ ছিল; উভয়েই আপনাপন স্ত্রীকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন […] কিন্তু উভয়েই আপাতমধুর প্রেমে বশীভূত হইয়া পরে বিষময় যণ্ত্রণা ভোগ করিয়াছিলেন”।

উল্লিখিত প্রবন্ধ থেকে আমরা জানলাম গোবিন্দলাল যেহেতু রোহিণীর সঙ্গে পাপপঙ্কে নিমজ্জিত ছিলেন তাই তিনি ভ্রমরকে হারালেন। নগেন্দ্রর বুদ্ধি আর একটু বেশী ছিল তাই তিনি কুন্দকে বিয়ে করে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন তাই আপদ বিদায়ের পর তিনি আবার সুর্য্যমুখীকে ফেরৎ পেলেন। বিষবৃক্ষ আবার উল্টে পাল্টে দেখলাম। কথাটা যে সরকারমশাই নেহাৎ ভুল বলেছেন তা নয়। বইতে সেরকমই কতকটা ঘটেছে বটে।কুন্দকে বিয়ে করার দিন পনরো পরে নগেন্দ্র হরদেব ঘোষালকে লেখা চিঠিতে বিলাপ করছেন:

“তুমি লিখিয়াছ যে, আমি এ পৃথিবীতে যত কাজ করিয়াছি, তাহার মধ্যে কুন্দনন্দিনীকে বিবাহ করা সর্বাপেক্ষা ভ্রান্তিমূলক কাজ। ইহা আমি স্বীকার করি। আমি এই কাজ করিয়া সূর্যমুখীকে হারাইলাম। সূর্যমুখীকে পত্নীভাবে পাওয়া বড় জোর কপালের কাজ। সকলেই মাটি খোঁড়ে, কোহিনুর এক জনের কপালেই উঠে। সূর্যমুখী সেই কোহিনুর। কুন্দনন্দিনী কোন্ গুণে তাঁহার স্থান পূর্ণ করিবে?তবে কুন্দনন্দিনীকে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিয়াছিলাম কেন? ভ্রান্তি, ভ্রান্তি! এখন চেতনা হইয়াছে। কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ হইয়াছিল মরিবার জন্য। আমারও মরিবার জন্য এ মোহনিদ্রা ভাঙ্গিয়াছে। এখন সূর্যমুখীকে কোথায় পাইব?”

কি ভাগ্য তাঁকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না। পাপ বিদায় হ’লো সতীলক্ষ্মীও ঘরে ফিরলেন।

বিলাত থেকে এলো গোরা,
মাথার পর কুর্তি পরা,
পদভরে কাঁপে ধরা,
হাইল্যান্ড নিবাসী তারা

(হুতোম প্যাঁচার নক্সা)

সতেরো’শ শতকের মাঝামাঝি যে সদাশয় সায়েবরা তাঁদের মেমদের পাপপঙ্ক থেকে উদ্ধার করতে আদাজল খেয়ে লাগলেন তাঁদের পিছুপিছু গুটিকতক মেমসায়েবও স্বীয় ভগিনীবৃন্দকে মানুষ করার ব্রত নিলেন।তাঁরা মহীয়সী, তাঁদের ত্রুটি ধরার সাহস বা আস্পর্দা কোনোটাই আমাদের নেই কিন্তু লক্ষ্য করা গেলো এনারাও তাঁদের সায়েবদের মতই সুর ধরেছেন মেয়েমানুষের আপনাপন পাপপ্রবৃত্তির থেকে বাঁচার একটিই উপায়: খানিক খানিক পড়াশুনো করে ধর্মমতে এবং পথে স্বামীসেবা এবং সন্তান প্রতিপালন। অর্থাৎ হয় তুমি সূর্য্যমুখী নয় তুমি পাপিষ্ঠা। তোমার মরণই ভালো। এমনকি মেরী উলস্টোনক্রাফটের মত বাঘিনীও ঢোঁক গিলে বললেন যেসব মেয়েদের পুরুষের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার দখল বা দুঃসাহস আছে, তাঁরা হলেন ‘ব্যতিক্রম’। দলছুট পুরুষালি মেয়েমানুষ। তাঁদের ধরলে চলবেনা।

বাঙ্গালী বাবু বিবিরা চললেন তাঁদের পিছন পিছন।
হুতোমের কথা ধার করে বলি সাহেব সহবাসে তাঁরা যে আর “হতভাগা ম্যাড়া বাঙ্গালী” নেই তা বিলক্ষণ বোঝা গেল।১৮৪২ সনে, মধুসূদন দত্ত (তিনি তখনও মাইকেল হ’ন নি), একখানি প্রবন্ধ লিখে গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন। লেখাটি হ’ল: ‘An Essay on the Importance of Education of Hindu Females’. তার থেকে খানিকটা দিলাম:
It is needless to dwell upon the numerous benefits a child may derive from an educated nurse. In a country like India. Where the nurse ship […] generally devolves on the mother, the importance of educating the females […] is very great.

ঐ সময়ে থেকেই মোটামুটি যেসকল আলোকপ্রাপ্ত বাবুরা, তাঁদে মধ্যে সেরা বাবু দেবেন ঠাকুর, তত্ত্ববোধিনী আদি পত্রিকা ছাপা শুরু করলেন, সেই পথ বেয়ে এলো বামাবোধনী পত্রিকা (১৮৬৩)। হিন্দু ফিমেলরা ভরাডুবি থেকে বাঁচার একটি পথ দেখতে পেলেন এবং কিভাবে নিজেদের মন্দ স্বভাব সামলে সুশীলা হওয়া যায় সেই পাঠ নিতে সচেষ্ট হলেন।সুশিক্ষার অনেক সুবিধে: বিদ্বান উদার স্বভাব স্বামীরা তাতে প্রসন্ন হ’ন এবং সন্তানপালনও উত্তমরূপে নির্বাহ হয়। বিদ্যাশিক্ষার অর্থোপার্জন উদ্দেশ্য নহে এমনটিও তাঁরা শিখলেন।

bamabodhini. II jpg

অথ জ্ঞানদা ও সরলা কথোপকথন

স: আমার বোধহয় মেয়েদের লেখাপড়ায় দোষ আছে। এক তো শুনি এতে মেয়েরা বিধবা হয়।

জ্ঞা: আজও তোমার এত ভুল[…] লেখাপড়াতেই যদি বিধবা করে তাহলে ইংরেজদের দেশের সব মেয়েই বিধবা হতো। বিধবা লেখাপড়া শিখে হলেই কি লেখাপড়ার দোষ হল?

স: কিন্তু ভাই অনেক মেয়ে এতে খারাব হয়ে যায় ।

জ্ঞান:  তুমি লেখাপড়ার কিছু জানো না বলে এমন কথা কও যার স্বভাব খারাব, যে খারাব সংসর্গে  থাকে  সে  লেখা পড়া করুক আর না করুক  প্রায় খারাব হয়.  অনেক মন্দ মেয়েমানুষ  খারাব মতলবেই একটু লিখতে পড়তে শিখে খারাব বই পরে খারাব পত্র  লিখতে শেখে, তাই বলে কি লেখাপড়ার দোষ ? […] তারা তো জ্ঞান পাবার জন্যে লেখা পড়া করে না ।

স:তুমি এক এক করে আমার সব কথা কেটে দিলে দেখতে পাই. আচ্ছা তোমারে জিজ্ঞাসা করি বলো দেখি এই যে এত মেয়ে লেখাপড়া কচ্চে না , তাই ক্ষতি কি হচ্চে ?

জ্ঞান: ভাই কি ক্ষতি হচ্চে তুমি আবার আমায় জিজ্ঞাসা  করো? একবার আমাদের অবস্থার পানে চেয়ে দ্যাখো দেখি?  […] তারা যাদের ভালোবাসে লেখাপড়া না জানাতে তাদের কত অনিষ্ট করে, মাতৃদোষে কত শিশু নষ্ট হয়.

স: তোমার কথাগুলি ভাই আমার মনে বড় লাগছে কিন্তু অনেকে বলে মেয়েমানুষ কি লেখা পড়া শিখে চাকরি  করতে যাবে  না সভায় যে বক্তৃতা করবে? তাদের লেখাপড়ার দরকার কি?

জ্ঞান: […] মেয়েমানুষ পুরুষের সভায় যাবে কোনো, তারা আপনারা একত্র হয়ে নানা প্রকার জ্ঞান আলোচনা কত্তে পারে। আর আমি ঠিক বলতে পারি মেয়েমানুষের আপনারা উদ্যোগী  না হলে তাদের দুঃখ যাবে না, মঙ্গলও হবে না।  (বামাবোধিনী পত্রিকা, ভাদ্র, ১২৭০)

আমরা দেখলাম যে শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণ করে সতী সাবিত্রী হওয়ার পথেও গেরো আছে। কারণ যারা ‘মন্দ মেয়েমানুষ’ তার শিক্ষা পেলেও তাদের মন উল্টো বাগে চলবেই। আর যারা বিদ্যেবতী সতী সাবিত্রী, তাঁরাও পুরুষের ছোঁয়া বাঁচিয়েই চলুন। তাঁদের পুরুষের গুলতানির মধ্যে না যাওয়াই ভালো। নিজেরাই না’হয় গোল হয়ে বসে দুটি দুটি জ্ঞানের কথা বললেন, সেই বা মন্দ কি?

কেউ যেন মনে না করেন গালগল্প শোনাচ্ছি। এখন কথা হ’ল এই, দুই এক খানা বই পড়ে তো আর মাস্টারি হয়না?  মেয়ে মাস্টর কোথায়? এইবার হলো মুশকিল। ‘স্ত্রী বিদ্যালয়ের আবশ্যকতা’ লেখা টি পেলাম ১২৭১ পৌষে। সেখানে এক বিদ্যোৎসাহী বলছেন শুনলাম: বালিকা বিদ্যালয়ে সচ্চরিত্র পুরুষ শিক্ষক হলে ক্ষতি নেই. “সাধুপুরুষ  কোমল হৃদয় বালিকা দিগকে শিক্ষা দান করিতে যেমন কুন্ঠিত  হন না কিন্তু স্ত্রী বিদ্যালয়ে সেটি হবার নয়”। সুতরাং তিনি সাজেস্ট করলেন: “এখন যদি কোনো বিদ্যাবতী ভদ্র গৃহস্থের স্ত্রী  স্বজাতির উন্নতি সাধনে  তৎপর হইয়া  স্ত্রী বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যের ভার গ্রহণ করেন ভালোই, নচেৎ বিবি শিক্ষয়িত্রী দ্বারা আপাততঃ  শিক্ষা কার্য  চলিতে পারে ।” এই প্রস্তাবটি শেষ হলো বামাকুল হিতৈষীদের শিক্ষয়িত্রীদের স্কুল স্থাপন করতে উদ্বুদ্ধ করে। পাছে নগেন্দ্র বা গোবিন্দলালের মত সচ্চরিত্র damn fool-রা মাস্টর হয়ে সে গোয়ালে ঢোকে,এবং সর্বস্ব খুইয়ে বসে, তার জন্যেই এই ব্যবস্থা।

কোন ফাঁদি নথ কোথায় আঁকশি হয়ে আছে বলা কি যায়? বিশেষ, তার একটু আগেই আমরা শুনেছি,”এখন তাহাদিগের (স্ত্রীলোক, মেয়েমানুষ) যৌবনাবস্থা, এই সময়ে তাহাদের মনোবৃত্তি সকল বলবতী হইয়া  প্রবল বেগে স্ব স্ব কার্য্য করিবেই করিবে”। যাদের কোনও শিক্ষাই নেই তাহারা অজ্ঞানতা বশতঃ কি যে করতে পারে তার ঠিক আছে? অথবা, যে পাপীয়সী শুধু খারাপ পত্র লিখিবে বলিয়াই লেখাপড়া শিখিতেছে, ওই যৌবনাবেগতাড়িত শিক্ষা  সৎ পথে প্রয়োগ না করিয়া নিশ্চই অসৎপথে চালিত করিবে এবং ঘোর পাপে “জড়ীভূতা” হইয়া নিজেরাও ডুবিবে এবং সদাশয় পুরুষদেরও অনন্তসাগরে ডুবাইবার প্রয়াস পাইবে। অতএব, আবারও বলি, মূল দোহারটি হ’ল, ‘সাধু সাবধান!’

জ্যৈষ্ঠ,১২৭৭এর একটি সংখ্যা দেখলাম একটি লম্বা ফিরিস্তি দেওয়া হয়েছে স্ত্রীগণের কিরূপ শিক্ষা আবশ্যক এবং তদ্দ্বারা তারা কি শিক্ষা করবেন।তিন নম্বরে তাদের বলা হচ্ছেই স্বামীর প্রতি তাঁরা যেন ‘বিশুদ্ধ’ প্রেম প্রদর্শন করেন. চার নম্বরে, পতি ভিন্ন  অপর পুরুষকে মনে মনেও ইচ্ছা না করেন। কিন্তু মোক্ষম উপদেশটি পেলাম আট নম্বরে: “শারীরিক কর্তব্য পালন করিবে। যাহাতে শরীরকে সুস্থ ও পবিত্র রাখিয়া ধর্ম সাধন করিতে পারো তাহার চেষ্টা করিবে. অভক্ষ্য ভক্ষণ, অপেয় পান, অপরিমিত ইন্দ্রিয় সেবা বিষবৎ পরিত্যাগ করিবে.”

পাঠক ‘বিবাহ রহস্য’ পর্যায়ের আলোচিত ‘_সুন্দরী’ ও ‘-বালা’ দের কথা স্মরণ করুন। আমি যেহেতু আলোক-প্রাপ্ত এডুকেটেড ফিমেল (অন্ততঃ আমার তাই ধারণা) এবং আরও দেড়শো বছর এগিয়ে, এই লেখা লিখতে  বসে ঠিক করেছিলাম পষ্ট কথা পষ্ট করেই বলবো, কিন্তু কার্যকালে দেখলাম মুখের মধ্যে জিভ জড়িয়ে গেল। নাহলে অপরিমিত ইন্দ্রিয় সেবা নিয়ে আরও দুচার কথা বলতাম ।

বেশিরভাগ প্রবন্ধেরই লেখক অজ্ঞাতপরিচয়, তাই কোনটি যে অবলার আর কোনটি যে অবলাবান্ধবের, সেটি বোঝা সময়ে সময়ে শক্ত হয়ে পড়ে, তবে ১২৮২ র ফাল্গুন চৈত্র সংখ্যায় একটি লেখায় মনে হ’ল যেন নাগিনীর ফোঁস শোনা গেল:

“পুরুষের স্ত্রী থাকুক আর না থাকুক, তাহারা যত পারে বিবাহ করিবে, যথায় ইচ্ছা গমন করিবে, যত ইচ্ছা তত বয়সে বিবাহ করুক আর নাই করুক, সে কথায় তোমার প্রয়োজন কি? তোমাদের দ্বাদশ বৎসর বয়ঃক্রম অতীত হইলে বিবাহের সময় উত্তীর্ণ হইয়া গেল। […] তোমাদের পিঞ্জর ভগ্ন করার উপায় বিদ্যা শিক্ষা , আর কোনো উপায় নাই । তোমরা শিক্ষিত হইয়া নিজেরা বুঝ এবং পুরুষদের বুঝাও যে তোমরা যে গৃহের নামে গৃহিনী এবং কার্যে দাসী, সে গৃহে বাস্তবিক তোমাদের এবং পুরুষদিগের সমান অধিকার”।

এই বাক্যবাণ কোনো অবলারই হওয়া সম্ভব। তা না হয়ে এ যদি কোনো অবলাবান্ধবের  হয়, তাহলে তাঁর পায়ে আমার শতকোটি প্রণাম।

উপসংহার

অনেক জানা হল অনেক বোঝা হ’ল। বামাবোধিনীর প্রবন্ধের সমুদ্রে হঠাৎ চোখ পড়েছিলো একটা কবিতায়। কবিতার নাম ‘আত্মঘাতিনী’। বিষয় পরিচিতি বলছে সাহিত্যসেবিকা লেখিকা কুমুদিনী রায়ের শোচনীয় মৃত্যু উপলক্ষ্যে লিখিত। লেখিকা কনকাঞ্জলি রচয়িত্রী। কবিতাটি দীর্ঘ । তার একটুখানি শোনাই:

সকলে ভুলিয়া হায়,

জীবন দলিয়া পায়

অনা’সে সে চলে গেল

উদাসীর প্রায়

গভীর আঁধার রেতে

নীরব শয়ন পেতে

ভাঙিল সাধের খেলা

মরণ ছায়ায়।

আর সে নিতান্ত নাই

মিছা কাঁদে বন্ধু ভাই

আর সে অভিমানিনী

দেখিবে না চেয়ে!

গেছে যদি সুখে থাক

কুশলে আরামে থাক

জুড়াক তপ্ত হিয়া

মার কোল পেয়ে।

(তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, প্রথম বর্ষ, মাঘ-চৈত্র সংখ্যা)

কুমুদিনী রায়কে খুঁজে পাইনি। ‘কনকাঞ্জলি রচয়িত্রী’ কে তাও জানা নেই। মনে হয়েছিল কুমুদিনীর অভিমান কার ওপর? তার মনও কি বিপথে গিয়েছিলো?

পরিশেষে বলি, যে ছবিটি আঁকা হ’ল সে ১৮৬৩-১৮৯৮ এর। আমার পড়া এখনও শেষ হয়নি।১৯২২ বহুদূরে। সেই বামাবোধিনীর শেষ বছর। সময় এগিয়ে যাচ্ছে তা স্পষ্ট। মেয়েরা স্বনামে লিখতে আর ভয় পাচ্ছেন না। তবুও ১৯১৯র একটি সংখ্যায় এই বিজ্ঞাপন দেখে থমকেছিলাম। এইবার বিজ্ঞাপনটি দেখে যা বলার পাঠকেরা বলুন। আমরা শুনি।

Bamabodhini Patrika vol.11, pt. 4, (1919)_boisangraha_0043

Featured Image http://store.prathambooks.org/images/products/small/9788184793390.jpg

Second Image: https://theinkbrain.files.wordpress.com/2011/12/1930sindiacouplephoto1.jpg

Third Image: https://archive.org/details/in.ernet.dli.2015.336333

Copyright: @wordpress.com/post/purnachowdhury.wordpress.com 

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s