বিবাহ রহস্য: দ্বিতীয় পর্ব

BIBAHA

অষ্টবর্ষা ভবেদ্ গৌরী নববর্ষা তু রোহিণী

দশমে কন্যকা প্রোক্তা অতউর্দ্ধাং রজস্বলা ।।

তস্মাৎ সংবৎসরে প্রাপ্তে দশমা কন্যকা বুধৈঃ

প্রদাতব্যা প্রযত্নেন ন দোষঃ কালদোষতঃ ।।

আটবছরে মেয়ে হ’লো গৌরী(গৌরী নামের এবং গৌরীদানের মানে মর্যাদা এবার জলের মত সহজ হ’ল।)। নয় বছরে রোহিণী। দশে কন্যকা, তারপরেই রজস্বলা। এই শেষ দশাটি সর্বনাশের মাথায় বাড়ি। দশম বর্ষ উপস্থিত হইলে পণ্ডিতেরা যত্নশীল হইয়া কন্যাদান করিবেন; তখন আর কালদোষ জন্য দোষ নাই।

“ওঠ ছুঁড়ি তোর বে/ গামছা পর গে”। মেয়ের দশ পেরিয়েছে, এবার যেমন তেমন করে পার করে দাও। সব মাসই শুভ। মলমাস আবার কি? মেয়ের বয়স বেড়ে বেড়ে গাছপাথর নেই, জাত খোয়াবে নাকি!তারপরেই তার কানে মন্ত্র পড়ে দেওয়া হ’লো।তার অর্ধেকখানি সে ভালো বুঝেলোই না। শরীর রইলো শরীরের খোলে। সে ঋতুর পর ঋতু তার কর্তব্যটি করে গেলো, আর মনটি বাঁধা রইলো খাঁচায়। শরীর আর মনের দুটো জগৎ তৈরী হ’লো। মন কি চায় শরীর জানলো না আর শরীর যা চায় তা মন উচ্চারণই করতে পারলো না।

****

ডাকলে তুমি অমনি শোনো,   অমনি তুমি কাছে এসো,

আমি তোমায় ভালোবাসি,     তুমি আমায় ভলোবেসো

(গিরীশচন্দ্র)

রাসসুন্দরী , হেমন্তবালা … একেক জনের একেক গল্প, কিন্তু মূল গত টি কিরকম যেন একই ধারা. হেমন্তবালার কথায় পাই :

“অবশেষে ১৩১১সালের ২৮এ ফাল্গুনের রাত সময় রাত তিনটার সময় ১৫০\দামের কার্বন লাইট বিকল   হওয়ায় রান্নাঘরের কেরোসিন কুপির ধোঁয়াটে আলোয়চোখ বোঁজা নিদ্রালু চোখে ভালো করে না দেখেই আমার শুভ বিবাহ হয়ে গেল। সোলার মালা গাছি ভূতলে পরে রইলো মুদ্রিত চোখে সেটি যথাস্থানে অর্পিত হতে পারেনি. সেটি কে যেন কুড়িয়ে নিয়ে স্বস্থানস্থ করে দিলেন।তখন আমার বয়স দশ বছর চার মাস.  আজ থেকে আমার পরিচয়: জেলা রংপুর, ভিতরবন্ধ বড়তরফের শ্রী বরদাকান্ত রায়চৌধুরী  মহাশয়ের পুত্রবধূ ও নাটোর রাজ্ বড়তরফের মহারাজা জগদীন্দ্র রায়বাহাদুরের ভাগিনেয় বধূরূপে পরিবর্তিত হয়ে গেল। গৌরীপুরের বড়োখুকির এইখানেই ইতি।”

স্বামীকে কোনোকালেই পছন্দ হয়নি হেমন্তবালার। খান দুই বই পড়েছিলেন যাতে লেখা ছিলো স্ত্রীলোক পুরুষের দাসী, স্বামী হলেন ইষ্টদেবতা। পড়লেই গা জ্বলে যেত তাঁর। পণ করেছিলেন এই ধর্ম তিনি  কিছুতেই মানবেন না। কিন্তু বলাই সহজ! দেখা গেল, “মনে বিদ্বেষ পুষে মনের কথা মনে চেপে বাইরে আনুগত্য দেখাই. ভয়ে ভয়ে  থাকি . আরও বহু কথা বাদ দেওয়া যাক. […] ওই ব্যক্তি কলকাতা গেলে আমি নাটোরে পরম সুখে এক থাকি […] এই তো সম্পর্ক।”

কিন্তু কথা কি অত সহজে ‘বাদ দেওয়া যায়’? দুপাতা পরেই তা আচমকা ফুটে বেরোলো। হেমন্তবালার বিয়ে দশ বছরে। চোদ্দ বছরে সন্তান হয় না কেন? সেই অপরাধে কর্তৃকারক তঁকে দেড় বছর বাপের বাড়ি যেতে দিলেন না। তারপর ওষুধ আর দেবতার মানসিকের পর্ব। মাসের চারটি রবিবার সারাদিন উপোস, সন্ধ্যায় সূর্যার্ঘ্য দিয়ে দিনের শেষে চাট্টি হবিষ্যি। কাত্যায়নী পুজোয় যজ্ঞের পোড়া কলা খাওয়া, নবদ্বীপের নৃসিংহদেবের ঠাঁইয়ে মানসিক, মা ষষ্ঠীর কাছে মানত, এতসব পুণ্য কাজ করার পর গর্ভধারণ। তবেই কিনা বাপের বাড়ি যাওয়ার অনুমতি হ’লো! ভাগ্যিস ছেলে হ’ল, নাহলে কপালে আরও কত দুর্গতি লেখা ছি’ল কে জানে।

HEMANTABALA-DEBI-220x300

অনেক ভারি ভারি কথা আছে তাঁর প্রবন্ধ সংগ্রহে: ‘প্রেম ও বিবাহ’ ‘নারীর কর্তব্য’। কিন্তু ফাঁকফোকর দিয়ে যে মানুষটাকে দেখা যায়, সে যে কি চায় তা আর বলে দিতে হয়না। শুধু চোখ থাকা দরকার।

“মেয়েরা একটু গুছিয়ে সংসার করতে চায়। তাদের একটু সাজসজ্জা না হলে চলে না।তাদের একটু পান দোক্তা চাই, সুর্তি-জর্দা চাই […] আচার কাসুন্দি ঝাল চচ্চড়ি বড়ি পাঁপড় চাই।তাদের একটু হস্তশিল্প চাই। তাদের একটু সিনেমা থিয়েটার দেখা চাই। সর্বোপরি চাই তাদের স্বামী সোহাগ। […] পুরুষ ঐটুকু যদি দিতে না পারে তাহলে বিয়ে করে কেন?”

বড় সর্বনেশে কথা বললেন গৌরীপুরের বড়খুকি। স্বামী সোহাগের অনুপানে কতটা দেহ কতটা মন, তা না শিখলো পুরুষ না বোঝাতে পারলো স্ত্রীজাতি।কমবেশি হলে চলতে পারে কিন্তু দাঁড়িপাল্লা যেন একদিকে বেশী না ট’লে যায়। “রক্তমাংস” দিয়ে স্বামী সেবা মনে ধরেনি হেমন্তবালার। কিন্তু মন যে নভোচারী, তাও তো নয়! এ মন আচার চায়, বড়ি পাঁপড় চায়। স্বাদ গন্ধ স্পর্শ সব চায়! শ্বশুড়বাড়িতে বঙ্কিমবাবুর নভেল পড়তেন,ফুলের শয্যা চাঁদের আলোর স্বপ্ন দেখতেন। ভাগ্যিস ঠিক বয়সে শ্রীগুরু বুঝিয়েছিলেন বিধিনিষেধ মানতেই হবে, নাহলে “ধিক্কার আসবে ব্যাভিচার আসবে”! না হলে কি করতেন শ্রীবরদাকান্ত রায়চৌধুরীর পুত্রবধূ? শ্রীগুরুর দেখা মিলেছিলো ঠিক সময়। তাঁর তখন সতেরো আঠেরো। চারবছরের ছেলের মা।

এবার আর একজনের কথা বলি। সে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ এর কুমুদিনী। তার শরীর আর মনের কথাটি বলে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি কিনা পুরুষ মানুষ, তাঁর অত হায়ালজ্জা নেই। এই হ’লো কুমুদিনীর ফুলশয্যার পরের দিনের প্রলাপ :

“নিরপরাধ ছেলেকে নিষ্ঠুর বাপ যখন অকারণ মারে তখন সে যেমন কিছুই বুঝতে পারে না, অভিমান করে আঘাত গায়ে পেতে নেয়, প্রতিবাদ করবারও চেষ্টা করতে মুখে বাধে, ঠাকুরের ‘পরে কুমুর আজ সেইরকম ভাব। যে আহ্বানকে সে দৈব বলে মেনেছিল, সে কি এই অশুচিতার মধ্যে, এই আন্তরিক অসতীত্বে? ঠাকুর নারীবলি চান বলেই শিকার ভুলিয়ে এনেছেন নাকি; যে শরীরটার মধ্যে মন নেই সে’ই মাংসপিণ্ডকে করবেন তাঁর নৈবেদ্য? আজ কিছুতে ভক্তি জাগল না। এতদিন কুমু বার বার করে বলেছে, আমাকে তুমি সহ্য করো– আজ বিদ্রোহিণীর মন বলছে, তোমাকে আমি সহ্য করব কী করে? কোন্‌ লজ্জায় আনব তোমার পূজা?”

শেষমেষ স্বামীগৃহ ছেড়েছিল কুমুদিনী কিন্তু এমনই কপাল, যাকে সে গুরুর আসনে বসিয়েছিলো সেই দাদাই কুমুদিনীকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফেরৎ পাঠালেন মধুসূদন ঘোষালের গোয়ালে। সে তখন ঘোষালবাড়ির গৃহদীপ্তি, তার শরীরে তখন স্বামীর সদ্য গজানো শিকড়। তাকে ধরে রাখার দুঃসাহস নুরনগরের বিপ্রদাস চাটুজ্যেরও নেই। উপন্যাসটি সকলের পড়া। তাই আর বেশি বললাম না।

aalpon

 ***

জঙ্গলা কখনও পোষ না মানে, মন সদা তার সোঁদর বনে

যে সতীলক্ষ্মীদের ‘স্বামী’ কথাটার মর্মই বোঝা হলো না তাদের স্বামী সোহাগের কাঙ্গালপনা দেহতেই আটকে রইলো। সে কথা অকপটে লিখলেন দুটি পুরুষ। দীনবন্ধু মিত্রর সধবার একাদশীর ছবিটি বড় মর্মান্তিক। ননদ ভাজের আলাপে স্বামীসোহাগের আকুলিবিকুলির যে ছবিটি তিনি আঁকলেন, তা আর যাই হোক, পতি পরমেশ্বরের জন্য সতীসাধ্বীর প্রেম নয়। এতে চাঁদের আলো, ফুলের মালা, মলয় সমীরণ কিছুই নেই। যা আছে তা হ’ল এই:

(দ্বিতীয় অঙ্ক প্রথম গর্ভাস্ক কঁশারিপাড়া। কুমুদিনীর শয়নঘর কুমুদিনী এবং সৌদামিনীর প্রবেশ)

কুমু:  এর চেয়ে বিধবা হয়ে থাকা ভাল—আমি ভাই আর সইতে পারি নে, আমি গলায় দড়ি দে মরবো।

সৌদা: আস্তে বলিস্, মা শুনলে রাগ করবেন।

কুমু:  করুন গে—সাধে বলি, মনের দুঃখে বলি—দেখ দেখি ভাই রক্ত মাংসের শরীর ত বটে,ঠাকুরজামাই এক শনিবার না এলে তোমার মনটি কেমন হয়, চক্ৰ যে ছল ছল কত্তে থাকে ।

সৌদা:  তা ভাই দুধের সাধ তো ঘোলে মেটে না, ত৷ নইলে আমি না হয় তোকে দুদিন দিই ।

কুমু:  তুই আর কাটা যায় নুনের ছিটে দিস নে—তুই যে ভাতারকামড়া তুই আবার অন্য নোককে দিবি, ঘরে এসে একটা ঠাকুরজামাই দুটো হয় তাতেও তোর মন ওটে কি না সন্দ।

সৌদা:  আমার বড় সাধ, আমার ভাতার একদিন মদ খেয়ে ঘরে আসে আর এক মাগীকে রাখে ।

কুমু:  দূর মড়া, তোর আজগুবি সাধ দেখে আর বঁচি নে ।

সৌদা: তোকে দেখাই কেমন ক’রে বশ কত্তে হয়।

কুমু: তুই নাকি বশের বড়াই কচ্চিস্ তাই বলচি—পোড়া কপালের দশা দেখ দেখি ভাই, আজ দশ দিন বাপের বাড়ী থেকে এইচি এক দিন তাকে ঘরে দেখতে পেলেম না, এক মরে যায় জানলুম আপদ গেল, চকের উপর এ পোড়ানি সহ্য হয় না […]

Ishwar_Chandra_Vidyasagar (1)

পরিশীলিত পাঠকের  যদি ভাব এবং ভাষা দেখে ‘চক’ কপালে ওঠে তাহলে মনে করাবো এই হলো সেকালের অশিষ্ট মেয়েলি ভাষা। বিশেষ, যে মেয়ের কেতাবি বাংলার সঙ্গে পরিচয়ই হয়নি। কিন্তু তা বাদেও কথা আছে, ভাবটি যা পরিষ্কার হলো তাতে যদি নাকে কাপড় দিতে হয় দিন,কিন্তু বাবু দীনবন্ধু মিত্রর অতিরঞ্জন টুকু বাদ দিলেও এই শরীরী খিদেটি কিন্তু সর্বৈব মিথ্যে নয়। সেটি প্রমাণ হয় জনৈক ঈশ্বর চন্দ্র শর্মার  “বহু বিবাহ রহিত হওয়া উচিৎ কিনা এতদ্বিষয়ক প্রবন্ধ”থেকে। কুলীনদের বহু বিবাহ নিবারণ নিমিত্ত তিনি এই প্রস্তাবটি লিখেছিলেন ১৮৭১ খ্ৰীষ্টাব্দে, অর্থাৎ ‘বিধবা বিবাহ’ নামক প্রস্তাবটি লেখারও ষোলো বছর পরে। অল্পবয়েসী কুলীন সধবাদের সম্পর্কে তিনি যা লেখেন তার সামান্য একটু খানি তুলে  দিলাম:

“কোনো কারণে কুলীন মহিলার গর্ভ সঞ্চার হইলে তাহার পরিপাকার্থে,কন্যাপক্ষীয়দিগকে  ত্রিবিধ উপায় অবলম্বন করিতে হইবে।প্রথম, সবিশেষ চেষ্টা করিয়া জামাতার আনয়ন।  তিনি আসিয়া দুই একদিন শ্বশুরালয়ে অবস্থান করিয়া প্রস্থান করেন।দ্বিতীয়, জামাতার আনয়নে কৃতকার্য হইতে না পারিলে ব্যাভিচার সহচরী ভ্রুণ হত্যা দেবীর আরাধনা […] তৃতীয় উপায় অতি সহজ, অতি নির্দোষ ও সাতিশয় কৌতুকজনক. […] কন্যার জননী অথবা বাতির অপর কোনো গৃহিনী […] পাড়ায় বেড়াইতে যান এবং দেখ মা দেখ বাছা এইরূপ সম্ভাষণ করিয়া কথা প্রসঙ্গে বলিতে আরম্ভ করেন, অনেকদিন পরে কাল জামাই আসিয়াছিলেন […] পরে স্বর্ণমঞ্জরীর গর্ভসঞ্চার প্রচার হইলে ওই গর্ভ জামাতৃ কৃত বলিয়া পরিপাক পায়।”

কৌতুকজনকই বটে। শুনলেও শরীর শিউরে ওঠে। মেয়েমানুষ যে তুষের আগুন (প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই বিশেষণ তো হেমন্তবালার কথাতেও আছে) গঙ্গাজল না, তার মনের সঙ্গে যে তার শরীরেরও ধিকি ধিকি জ্বলন আছে এ কথাটি বলে গেলো এক সৃষ্টিছাড়া ব্রাহ্মণ পণ্ডিত যার কথার কোনও বাছবিচার ছিলনা।

‘সধবার একাদশী’ ১৮৬৫, বহুবিবাহ বিরোধী প্রস্তাব ১৮৭১। রবীন্দ্রনাথ আর এক সধবা বৃত্তান্ত শোনালেন ১৮৯৫এ। ‘মানভঞ্জন’এর গিরিবালাকে কারোর মনে আছে কি?
“আপন সর্বাঙ্গের এই উচ্ছলিত মদির রসে গিরিবালার একটা নেশা লাগিয়াছে। প্রায় দেখা যাইত, একখানি কোমল রঙিন বস্ত্রে আপনার পরিপূর্ণ দেহখানি জড়াইয়া সে ছাদের উপরে অকারণে চঞ্চল হইয়া বেড়াইতেছে। যেন মনের ভিতরকার কোনো এক অশ্রুত অব্যক্ত সংগীতের তালে তালে তাহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নৃত্য করিতে চাহিতেছে। আপনার অঙ্গকে নানা ভঙ্গিতে উৎক্ষিপ্ত বিক্ষিপ্ত প্রক্ষিপ্ত করিয়া তাহার যেন বিশেষ কী এক আনন্দ আছে; সে যেন আপন সৌন্দর্যের নানা দিকে নানা ঢেউ তুলিয়া দিয়া সর্বাঙ্গের উত্তপ্ত রক্তস্রোতে অপূর্ব পুলক-সহকারে বিচিত্র আঘাতপ্রতিঘাত অনুভব করিতে থাকে। সে হঠাৎ গাছ হইতে পাতা ছিঁড়িয়া দক্ষিণ বাহু আকাশে তুলিয়া সেটা বাতাসে উড়াইয়া দেয়– অমনি তাহার বালা বাজিয়া উঠে, তাহার অঞ্চল বিস্রস্ত হইয়া পড়ে, তাহার সুললিত বাহুর ভঙ্গিটি পিঞ্জরমুক্ত অদৃশ্য পাখির মতো অনন্ত আকাশের মেঘরাজ্যের অভিমুখে উড়িয়া চলিয়া যায়। হঠাৎ সে টব হইতে একটা মাটির ঢেলা তুলিয়া অকারণে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দেয়; চরণাঙ্গুলির উপর ভর দিয়া উচ্চ হইয়া দাঁড়াইয়া প্রাচীরের ছিদ্র দিয়া বৃহৎ বর্হিজগৎটা একবার চট করিয়া দেখিয়া লয়– আবার ঘুরিয়া আঁচল ঘুরাইয়া চলিয়া আসে, আঁচলের চাবির গোছা ঝিন্‌ ঝিন্‌ করিয়া বাজিয়া উঠে। হয়তো আয়নার সম্মুখে গিয়া খোঁপা খুলিয়া ফেলিয়া অসময়ে চুল বাঁধিতে বসে; চুল বাঁধিবার দড়ি দিয়া কেশমুল বেষ্টন করিয়া সেই দড়ি কুন্দদন্তপঙ্‌ক্তিতে দংশন করিয়া ধরে, দুই বাহু ঊর্ধ্বে তুলিয়া মস্তকের পশ্চাতে বেণীগুলিকে দৃঢ় আকর্ষণে কুণ্ডলায়িত করে– চুল বাঁধা শেষ করিয়া হাতের সমস্ত কাজ ফুরাইয়া যায়– তখন সে আলস্যভরে কোমল বিছানার উপরে আপনাকে পত্রান্তরালচ্যুত একটি জ্যোৎস্নালেখার মতো বিস্তীর্ণ করিয়া দেয়।“

গিরিবালা শরীরের নেশায় বুঁদ হয়ে রইলো আর তার স্বামী গোপীনাথ পড়ে রইলো এক অভিনেত্রীর শ্রীচরণে। গিরিবালা প্রতিশোধ নিতে থিয়েটারে নাম লেখালো এবং স্টেজে উঠে শৌখিন বাবুদের চিত্ত চাঞ্চল্য ঘটালো। গল্পের শেষটা এইরকম:

“কিন্তু যখন সে আভরণে ঝল্‌মল্‌ করিয়া, রক্তাম্বর পরিয়া, মাথার ঘোমটা ঘুচাইয়া, রূপের তরঙ্গ তুলিয়া বাসরঘরে দাঁড়াইল এবং এক অনির্বচনীয় গর্বে গৌরবে গ্রীবা বঙ্কিম করিয়া সমস্ত দর্শকমণ্ডলীর প্রতি এবং বিশেষ করিয়া সম্মুখবর্তী গোপীনাথের প্রতি চকিত বিদ্যুতের ন্যায় অবজ্ঞাবজ্রপূর্ণ তীক্ষ্ণকটাক্ষ নিক্ষেপ করিল–যখন সমস্ত দর্শক-মণ্ডলীর চিত্ত উদ্‌বেলিত হইয়া প্রশংসার করতালিতে নাট্যস্থলী সুদীর্ঘকাল কম্পান্বিত করিয়া তুলিতে লাগিল– তখন গোপীনাথ সহসা উঠিয়া দাঁড়াইয়া ‘গিরিবালা’ ‘গিরিবালা’ করিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। ছুটিয়া স্টেজের উপর লাফ দিয়া উঠিবার চেষ্টা করিল– বাদকগণ তাহাকে ধরিয়া ফেলিল।

এই অকস্মাৎ রসভঙ্গে মর্মান্তিক বাক্রুদ্ধ হইয়া দর্শকগণ ইংরাজিতে বাংলায় ‘দূর করে দাও’ ‘বের করে দাও’ বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল।

গোপীনাথ পাগলের মতো ভগ্নকণ্ঠে চীৎকার করিতে লাগিল, ‘আমি ওকে খুন করব, ওকে খুন করব।’

পুলিশ আসিয়া গোপীনাথকে ধরিয়া টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেল। সমস্ত কলিকাতা শহরের দর্শক দুই চক্ষু ভরিয়া গিরিবালার অভিনয় দেখিতে লাগিল, কেবল গোপীনাথ সেখানে স্থান পাইল না”।

গল্পের শেষে আমরা ‘বেশ হয়েছে খুব হয়েছে’ বলে গোপীনাথের এবং গোটা পুরুষ জাতির গুষ্টির তুষ্টি করতে পারি, কিন্তু গিরিবালার দশাটি এরপর কি হবে সে কথা না ভাবলে চলবে না। ‘হাত বিধবা’ পরিচ্ছেদে Virginia Woolf এর Shakespeare’s Sister এর উল্লেখ করেছিলাম। সেটি আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি। গল্পটির যদি এরপর আরও একটু বাকি থাকতো তাহলে দেখতাম গিরিবালার একটি বাবু জুটেছে এবং বাবু সদাশয় হলে গিরিবালার গরাণহাটায় একটি পাকা কোঠাও তুলে দিয়েছেন। রবি বাবু খুব সময়ে গল্পের রাশ টেনে ধরেছিলেন, নাহলে সর্বনাশ হতো। গল্পেরও, গিরিবালারও।

এমন কত যে শাঁখা-সিঁদূরে সধবা ছড়িয়ে আছেন বাংলা সাহিত্যে …বলে কুলিয়ে ওঠা যায়না।
শেষ একটি প্রশ্ন করে ইতি টানি:  মেয়েমানুষের কোনটি ভালো? খাঁচার মধ্যে পুতুল গড়াগড়ি না খোলা আকাশ? প্রবৃত্তি মার্গ, না মনুনির্দিষ্ট নিবৃত্তিমার্গ?

অথ বিবাহ রহস্য পরিসমাপ্ত

Featured Image:  https://4.bp.blogspot.com/-kM-rrKnyylY/ULjFw6J-

copyright@purnachowdhury



Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s