বিবাহ রহস্য : গড়গড়ার মা লো (২)

Babu-walking-dalmatian

বিবাহ রহস্য:

মহাভারত উবাচ

যদি জ্ঞানীগুণীদের জিগেস করি “ঐতিহ্যমতে আমাদের দেশে বিবাহের মূল উদ্দেশ্যটি কি?” তাঁরা একনিশ্বাসে বলে দেবেন: পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্য্যা। ভার্য্যা শব্দটির গূঢ়ার্থও বলে দিতে পারেন এমনকি। আমিও অর্ধেক জীবন ঐ শুনেই বসে রইলাম। তারপর খানিক নাড়াচাড়া করতে করতে পেয়ে গেলাম আরও অনেক অমূল্য রতন। কথায় আছে মহাভারতের কথা অমৃত সমান পু্ত্রার্থে ভার্যা অবশ্যই। কিন্তু তার সঙ্গে চাট্টি মানবীকল্যাণও করা হয়ে থাকলো পুরুষজাতের।মনুর বিধান ঘোলের ওপরের জলটুকু। নির্যাসটি আছে মহাভারতে।

শান্তিপর্বে যুধিষ্ঠিরেকে ভীষ্ম বোঝাচ্ছেন, স্ত্রীলোকরা জীবপ্রবাহ প্রবাহিত করে। প্রকৃতি যেমন পুরুষকে. অপত্যোৎপত্তির ক্ষেত্রভূত স্ত্রীজাতিও জীবকে বদ্ধ করিয়া রাখিয়ছে। ঐ ঘোররূপা স্ত্রীলোকেরা প্রতিনিয়ত অবিচক্ষণ মনুষ্যগণকে বিমোহিত করিয়া রাখে। উহারা সাক্ষাৎ ইন্দ্রিয়দ্বারাই নির্মিত হইয়াছে। উহাদের প্রতি লোকের অনুরাগ থাকাতেই জীব সকল উৎপন্ন হইতেছে।

বেশ। এইবার “ঘোররূপা স্ত্রীলোক”দের নিয়ে কি করতে হবে?

অনুশাসন পর্বে খুড়ো ঠাকুর্দা বড় নাতিকে বুঝিয়ে চলেছেন:

মহাত্মা মনু দেবলোকে গমন করিবার সময় পুরুষিদিগের হস্তে স্ত্রীলোকদিগকে সমর্পন করিয়া কহিয়াছিলেন. ‘মানবগণ!স্ত্রীজাতি নিতান্ত দুর্বল, সত্যপরায়ণ ও প্রিয়কারী। উহাদিগের মধ্যে কতগুলি নিতান্ত ঈর্ষাপরতণ্ত্র, মানলাভার্থী, প্রচণ্ডস্বভাব, অবিবেচক ও অপ্রিয় কার্যে নিরত। অল্পমাত্র চেষ্টা করিলেই উহাদিগের ধর্মনষ্ট করা যায়। অতএব  তোমরা প্রযত্নসহকারে উহাদিগকে রক্ষা কর।[…]উহারাই উপভোগাদি সমুদায়ের মূল[…] অপত্যোৎপাদন, অপত্য উৎপাদন হইলে তাহার প্রতিপালন, লোকযাত্রা বিধান স্ত্রীলোক হইতেই সমাহিত হইয়া থাকে।তাহদিগকে সম্মান করলে সমুদায় কার্য নিশ্চয়ই সুসিদ্ধ হয়।

তারপর এও দেখলাম ঐ পর্বেরই ৪৮ অধ্যায়ে ভীষ্মর উপদেশামৃত থেকে সুশীলারা খ’সে পড়েছেন। তিনি নাতিকে বোঝা্চ্ছেন, “পরপুরুষ দূষণ স্ত্রীজাতির স্বভাব”।

ভালো কথা। খুড়োঠাকুর্দার নাতি ত্রেতা যুগে বসে কি বুঝলেন জানিনা, কিন্তু কলিযুগের আমরা, বিশেষ করে যাঁরা discourse analysis করে ভাত যোগাড় করি, তারা অনেক ফাঁকফোকর খুঁজে পেলেম। স্ত্রীলোকরা ভালো না মন্দ? কাহাদের দেখভাল পুরুষজাতি করিবেন? যাহাদের “অল্পেই ধর্ম নষ্ট করা যায়” না ঠক বাছিতে গাঁ উজাড় হইবে বলিয়া সমগ্র স্ত্রী জাতিকেই গোশালায় পোরা বিধেয়? তাছাড়া একথাও ভুলিলে চলিবে না যে উপভোগাদি এবং সন্তান উৎপাদন মনুষ্যগণের পুণ্য কর্তব্য এবং এই সকল কর্ম স্ত্রীলোকদিগ ব্যতীত সম্ভবে না। সুতরাং শুদ্ধমাত্র কুশীলাদের বিবাহ নামক খুড়ার কল দ্বারা উদ্ধার করিলে উপভোগ সামগ্রী এবং সন্তান উৎপাদন যণ্ত্র কিছু কম পড়িবে, অতএব সুশীলা কুশীলা দুই শ্রেণীকেই “প্রযত্নসহকারে রক্ষা করা” পুরুষজাতির কর্তব্য।

তাহলে যা দাঁড়ালো,তাএই : স্ত্রীলোক দুষ্টা হইতেও পারেন আবার নাও হইতে পারেন তবে প্রথম সম্ভাবনাটিই অধিকতর প্রবল। একথাও সত্য যে মনুষ্যসমাজে তাঁহাদের অন্ততঃ দুটি আবশ্যকতা নিশ্চয় আছে। এই কারণে আদি পিতার ইচ্ছা অনুসারে ইহাদিগকে বিবাহন্ধনে আবদ্ধ করাই বিধেয়। তাহাতে মনুষ্য সমাজ ও পুরুষজাতি, দুইয়েরই শুভ। এবং যত সকাল সকাল তাহা সারিয়া ফেলা যায়, ততই মঙ্গল। আদি পিতার তাহাই মত; তিনি বিধান দিয়াছিলেন, ত্রিংশৎবর্ষ পাত্রের দশম বর্ষীয়া, একবিংশতি বয়স্ক পাত্র সপ্তম বর্ষীয়া এবং চতুর্বিংশতি বয়স্ক পাত্র অষ্টমবর্ষীয়া কন্যাকে বিবাহ করিতে হইবে।

এইবার আসি আসল কথায়। ৭৮/১ নিমতলা ঘাটের ঁকাশী দত্ত বাটীর জনৈক বাবু রাধাকান্ত দত্তচৌধুরী বিবাহ রহস্য নামক একটি বই লেখেন ১৩৪৩ বঙ্গাব্দে। (আমার শিরোনামটি তাঁর থেকেই ধার করা) । এই কেতাবটির উদ্দেশ্য ছিল “জাতের আশা ভরসা সর্ববিধ আন্দোলন অগ্রদূত ছাত্রবৃ্ন্দ” কে গার্হস্থধর্ম এবং তার সারাৎসার দাম্পত্য প্রেমের পথে অনুপ্রাণিত করা। পাতা উল্টে দেখি বাবু রাধাকান্তর প্রস্তাবটি মনুসংহিতা হয়ে মহাভারতের পথ ধরে, ‘ঘোর প্রকৃতি’ স্ত্রীলোকদের কি উপায়ে পুরুষজাতি উদ্ধার করবে তারই চর্বিতচর্বণ।।আরও দেখলাম তার মাঝে ‘সম্ভোগ’ এর প্রয়োজনীয়তাটিও গুছিয়ে পেশ করা হয়েছে।

এতসব গুরুগম্ভীর ধর্মবাচন থেকে যেটুকু বোঝা গেল তা হ’লো সনাতন ধর্মের বিবাহর সংজ্ঞায় রতি এবং সম্ভোগের দায় পুরুষে অর্শায়। পই পই করে সংহিতা আর মহাভারতের দোহাই দিয়ে তাই বোঝনো হয়েছে। স্ত্রীলোকরা পেয়েছেন সন্তান ধারণ এবং স্বামী পূজার পরম প্রসাদ। এও দেখলাম দত্তচৌধুরী মশাইয়ের বইয়ে গোটা গোটা করে উদ্ধৃত করা হয়েছে বনপর্বে যুধিষ্ঠিরের প্রতি মার্কণ্ডেয়র উক্তি:
কামিনীগণ কেবল স্বীয় স্বামীর শুশ্রুষা দ্বারাই স্বর্গলাভ করিতে পারে ; কিন্তু যে রমণী পতির প্রতি ভক্তি না করে, কি যজ্ঞ কি শ্রাদ্ধ, কি উপবাস, তার সকলই বৃথা হয়

‘শুশ্রুষা’ কথাটি দ্যোতক। এইবার সেইটি নিয়ে পড়া যাক।

***

Hara Parbati

প্রজনার্থং মহাভাগাঃ পূজার্হা গৃহদীপ্তয়ঃ।

 (তাঁহারা সন্তানকে জন্ম দেন বলিয়া মহাভাগা, পূজনীয়া ও গৃহের দীপ্তিস্বরূপা )

জ্ঞানদানন্দিনীরআমার জীবনকথায় ভারী অদ্ভুত একটি  কথা পড়েছিলাম তাঁর শাশুড়ি ঠাকরুন সারদা দেবী সম্পর্কে:আমার মনে পড়ে বাবামশায়   যখন বাড়ি থাকতেন  আমার শাশুড়িকে একটু রাত করে ডেকে পাঠাতেন,ছেলেরা সব শুতে গেলে।আর মা একখানি ধোয়া সুতি শাড়ি পরতেন, তারপর একটু আতর মাখতেন. এই ছিল তাঁর রাতের সাজ; পড়ে ভারী দুঃখ হয়েছিল জোড়াসাঁকোর এই জমিদার গিন্নীর জন্যে। স্বামী কখন আহ্বান জানাবেন সেই অপেক্ষায় থাকা: স্বামীর উপভোগ প্রবৃত্তি হবে তবেই না তাঁর ডাক পড়বে, তবেই না তিনি যেতে পাবেন পূজা বা শুশ্রুষা করার জন্যে; থালা সাজিয়ে ধরবেন যাতে দেবতা প্রসন্ন হন! তাঁর মনের ভাবটি কি হতো কে জানে। তিনি বই পড়তেন কিন্তু লিখে তো যান নি কিছু যে আমরা তাঁকে শুনতে পাবো?

তবে যে সব সতীলক্ষ্মীরা নিজেদের দু চারকথা নিজেদের জীবন নিয়ে লিখে গেছেন তাঁদের মধ্যে সারদা দেবীর মেজবৌমাও পড়েন বৈকি!  জ্ঞানদানন্দিনী তাঁর আত্মকথন এ বলছেন:

প্রথম যখন অন্তঃসত্বা হলুম, তখন আমি কিছু বুঝতুম না বলে দৌড়োদৌড়ি করতুম, তাই দুই একবার সন্তান নষ্ট হয়“।

মনে ভাবি কি ভয়ানক নৈর্ব্যক্তিক একটি কথা! যেন যা ঘটেছে তা ঘটেছে দেহ যন্ত্রটির মধ্যে, তার সঙ্গে ছোট মেয়েটির কোন যোগই নেই। সে শরীর জ্ঞানদানন্দিনীরও হতে পারে, আবার অন্য কোনো কনে বৌয়েরও হতে পারে।এমনটিই যেন ঘটে থাকে এমনটি ই যেন ঘটার কথা , তাতে দুঃখই বা কি, শোক ই বা কি।

আমার আড়বুঝো মন, ভুলও বুঝে থাকতে পারি, কিন্তু যে মেয়ে গর্ভ সঞ্চারের পর দেওরের সঙ্গে ছুটো ছুটি করে খেলা করে, সে জানেই বা কি বোঝেই বা কি!  দেবতার পুজো হয়ে গেছে, মণ্ত্র তন্ত্রের পাঠটিও ঠিক মতো নেওয়া হয়নি ,ফলটি কি করে ধরে রাখতে হয় সেটুকু পর্যন্ত জানা নেই, তা নিয়ে কোনো দুঃখ ও নেই :  নিত্য পুজো, নিত্য ফল। মেয়ে মানুষ বলে কথা । এই পাঠই তো সে পেয়ে এসেছে, তার অন্যথা ভাবে কি করে? 

 ন্যায়বাগীশরা বলবেন, “একটি উদাহরণের ওপর তত্ত্ব খাড়া হয় কি করে?” হয় যে না সে কথা আমি একশো বার মানি । তাই ঘুরে ফিরে মেয়েদের আত্মকথা পড়ি আর  চিরুনি দিয়ে আঁচড়াই । মনু সংহিতা আর মহাভারতের ফাঁদ কেটে বেরোতে পেরেছেন এমন মেয়ে বড় বেশি দেখিনি।

 ***

 

রাসের মন  ! বলি শোন, পাগল হলি কি কারণ,

পাগলে কি জানে কোনো ক্রম

সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি , চার যুগেতে এলি গেলি ,

এখনো তোর ভাঙলো না রে ভ্রম ।।

 

রাসসুন্দরীর কথা ধরি।  তাঁর আমার জীবন মেয়েদের আত্মকথার জগতে আমার প্রথম নড়বড়ে পা ফেলা। ঊনকোটি ছত্রিশটি খুঁটি নাটি ধরা আছে সে লেখায়, নেই খালি স্বামী ঠাকুরটি ।  তিনি কি বা কেমন তা অজানা রয়ে গেলো। যিনি আমার সমস্ত জীবনটি জুড়ে রইলেন তাঁর কথা বলার সময় সুযোগ হলো না, এ আবার কেমন কথা?! শুধু বৈধব্যে তাঁর মাথাটা সোনার মুকুট টি খসে পড়েছে সেই নিয়ে খেদোক্তিই শুনলাম। ওইটুকুই। কিন্তু পেয়ে গেলাম এক গূঢ় উক্তি।

এক জায়গায় শুনলাম তিনি বলছেন:

ইতিমধ্যে পরমেশ্বর আমার শরীরে যেখানে যে প্রকার প্রয়োজনীয় বস্তু লাগিবে , তাহার সমুদয় সরঞ্জাম দিয়া, আমার শরীর তরণী সাজাইয়া দিয়াছেন, আহা কি আশ্চর্য ! কৌশলের বালাই লইয়া মরি ! আমার শরীর হইতে এতগুলা ঘটনা হইতেছে আমি তাহার কারণ কিছুই জানি না।হায়! একি ভেল্কিবাজি নাকি, না আমি স্বপ্ন দেখিতেছি এইপ্রকার আমার মনের ভাব হইলো , বাস্তবিক আপনার শরীর নিরীক্ষণ করিয়া দেখিলে পরমেশ্বরের প্রতি বিলক্ষণ প্রতীতি জন্মে , তাঁহাকে আর দূরে অন্বেষণের আবশ্যক হয়নাসহজ চক্ষে স্পষ্ট রূপে বেশ দেখা যাইতেছে. […] যখন আমি ১৮ বৎসর হইলাম, তখন আমার প্রথম সন্তানটি হয়, ক্রমে ক্রমে আমার বারোটি সন্তান হয়

আমি পড়ে রইলো একদিকে আর ‘আমার ‘দেহ বেরোলো ভোগের আয়োজন করতে। রাসের মন খানিক পাগল হ’ল বটে, কিন্তু শেষে তরণীর ‘প্রয়োজনীয়’ বস্তুর সমুদয় সরঞ্জাম পরমেশ্বরের পায়ে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হ’ল। কথার গতি দেখে চিন্তায় পড়লাম। পরমেশ্বরটি কে? ১২টি সন্তানের জন্ম দিয়ে কথাটি শেষ হ’ল কিনা…

‘বিবাহ রহস্য’ আগামী সপ্তাহে সমাপ্য।

Image: http://www.tejasgallery.com/wp-content/uploads/2014/06/Babu-walking-dalmatian.jpg

Image: https://www.google.ca/search?q=hara+parvati+images&source=

http://media.vam.ac.uk/media/thira/collection_images/2013GL/2013GL0450.jpg

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s