হাতবিধবা :গড়াগড়ার মা লো (১)

bidhaba-sringar-water-colour-on-paper-national-gallery-of-modern-art1

হাত বিধবা

অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তথা।

পঞ্চকন্যা স্মরে নিত্যং মহাপাতক নাশনম্‌।।

যাবৎ বাঁচি তাবৎ শিখি। ‘হাতবিধবা’ কথাটা শিখেছিলাম গিরিবালা দেবীর রায়বাড়ি উপন্যাস পড়ে। প্রথম দর্শনেই থমকেছিলাম। কল্যাণী দত্তকে গুরু মানি। কিন্তু বিধবা মহলের শেষ কথাটি তিনিও বলে যাননি। কল্যাণী দত্তর পিঞ্জরে বসিয়া তে পড়েছিলাম চোদ্দবছর বয়সে গর্ভিণী অবস্থায় বিধবা হয়ে বাপের বাড়ী ফিরে আসা এক মেয়ের কথা সেসময় একদশী করতে হত নির্জলা। সে যাতে স্নান করার সময় লুকিয়ে জল না খায় তাই একাদশীর দিন পুকুরে স্নান করতে দেওয়া হতনা । তোলা জলে দাসীর পাহারায় স্নান করতে হত। দাসী নজর রাখত মেয়ে জল খাচ্ছে কিনা । ঘটনা চক্রে মেয়েটির প্রসব বেদনা উঠলো গ্রীষ্মের একদশীর দিন। পিপাসায় কাতর মেয়েটি জলের জন্য ছটফট করতে থাকে,তাকে এক ফোঁটা জলও দেওয়া হয়নি । সারারাত কষ্ট পাওয়ার পর পরদিন সকালে সে একটি মৃত পুত্রসন্তান প্রসব করে ।এইরকমের নানানিধি। ইন্দুমতী। মুরলা। শিবমোহিনী। গিরিবালাদেবীর ‘ইনি’ আর এক কাঠি সরেস।

ঘটনাটি এইরকম: নায়িকা বিনু সদ্য সদ্য বিয়ের পর বাপের বাড়ি গেছে। তার প্রবাদপ্রতিম কবিরাজ ঠাকুর্দা মশাই এক জমিদার বাড়ির রোগিনীর পথ্য বলছেন তাজা কই-মাগুর মাছের ঝোল আর দাদখনি চালের ভাত। ওমা সে কি কথা, রোগিনী যে বামুনের বিধবা! বিনু শুনলো ঈশানচন্দ্র ম্যানেজার বাবুকে গম্ভীর গলায় বলছেন, “আপনার আপত্তি, ব্রাহ্মণের বিধবাকে মাছের ব্যবস্থা দিচ্ছি কেন? কিন্তু আপনার মনিব বিধবা নন, তাঁর হাত বিধবা। বিধবার গর্ভপাতজনিত সূতিকা রোগ হয়না, হয় হাতবিধবার।”
বোকাসোকা বিনু নতুন শোনা কথার মানে বুঝতে গেলো তার “বিদ্যাবতী ঠাকুমা”র কাছে। তিনি নাতনিকে জ্ঞানবৃক্ষের প্রথম ফল খাওয়ালেন, “যে বিধবা আচারনিষ্ঠা পালন করেনা অথচ হাতে লোক দেখানো গয়না পরেনা, তারই নাম হাতবিধবা”।

বিনুর ভাষায় ঠাকুমার শাস্ত্রজ্ঞান টনটন।কিন্তু তাঁর নাতনীর জ্ঞানের ফল আধখানা খাওয়া হয়ে রইলো। বিনুর তখনও স্বামীসঙ্গ হয়নি কিনা। যা বুঝবার বুঝলো টনটনে মেয়েমানুষরা, দেবোপম ঈশানচন্দ্র কবিরাজ আর তাঁর সমগোত্রীয়রা। ম্যানেজারবাবুও খানিক খানিক বুঝলেন বৈকি। কবিরাজমশাই ‘বিধান’ দিলেন না ‘নিদান’ হাঁকলেন? একে বিধবা তায় বামুনের। জিওল মাছের ঝোল তার জন্যে রাঁধেই বা কে বাড়েই বা কে? কার ঘাড়ে কটা মাথা? আর সেই বা খায় কোথায় বসে? খাওয়ার বাসনই বা পায় কোথায়? তার একবেলার ভাতের এঁটো খাওয়া তো পাথরের খোরায়! তাতে মাছের উ্ছিষ্ট মাখিয়ে চোদ্দপুরুষকে নরকস্থ করবে নাকি! তার ওপর আছে অমাবস্যা একদশী। কবিরাজ মশাই কি একথা ভাবেননি? আমাদের পাপমন। নিশ্চয়ই ভেবেছেন। ভেবে চিন্তেই নিদান হেঁকেছেন।তাতে দুকূলই রক্ষা হলো। চিকিৎসকের ধর্মও পালন হলো পথ্য বিধানও দেওয়া হলো আবার পাতকী মেয়েটাকে মরার পথটিও দেখিয়ে দেওয়া হল।

ব্রাহ্মণের ধর্মরক্ষা হলো,চিকিৎসকেরও।সাপও মরলো লাঠিও ভাঙলো না।

রায়বাড়ির বউ বিনুর গল্প এগিয়ে চললো ঢিমে তেতালায়। আমার চোখ রইলো বইয়ের পাতায়, মন পড়ে রইলো ‘হাতবিধবা’য়। এক আখ্যানে আর এক আখ্যান লুকিয়ে থাকে, খুঁজে পেতে তাকে বার করে আনতে হয়। Virginia Woolf এর ‘Shakespeare’s Sister’ মনে পড়লো হাতবিধবা ভাবতে ভাবতে। Trevelyan এর History of England এ সপ্তদশ শতকের আলোচনা পড়ে তাঁর মনে হয়েছিলো এ গল্পে সাধারণ মেয়ে নেই। তার খোঁজে বেরিয়ে তিনি মনে মনে পেয়েছিলেন এক কাল্পনিক শেক্সপীয়রের বোনকে, ভাইয়ের মত নাট্যকার হতে যে লন্ডনে পালিয়েছিলো। তারপর সাত দরজায় ঘুরে তার আখ্যান শেষ হয়েছিলো এইভাবে:

At last—for she was very young, oddly like Shakespeare the poet in her face, with the same grey eyes and rounded brows—at last Nick Greene the actor-manager took pity on her; she found herself with child by that gentleman and so—who shall measure the heat and violence of the poet’s heart when caught and tangled in a woman’s body?—killed herself one winter’s night and lies buried at some cross-roads where the omnibuses now stop outside the Elephant and Castle.

Virginia-র দেখাদেখি আমিও বেরিয়ে পড়লাম সেই বিধবা মেয়েটির খোঁজে। মাথায় এক ঝাঁক প্রশ্ন: তার হাত দুটো খালি হ’লো যখন, তখন তার বয়েস কত? সে মেয়ে তখনকার দিনের রেওয়াজ মত বাপের বাড়ি ফিরলো না কেন? তার কি সাতকূলে কেউই ছিলো না? কেমন করে দিন কাটতো তার? তার এই সর্বনাশটি কোন নিকট আত্মীয়টি বা পরম হিতৈষীটি করলে? নানানিধির ‘ঠাকুর’ এবং ‘পো’দের গতিবিধি যে সে আমলের অন্দরমহলে  অবাধ ছিলো সে তো আমরা জানিই! আগেই বলেছি আমার পাপ মন। আমার সন্দেহ গিয়ে পড়লো ম্যনেজার বাবুটির ওপর। যুবতী মনিব গিন্নীর শরীর গতিকের জন্য তাঁর কিসের এত মাথাব্যথা?এ আখ্যান নানা পথে যেতে পারে।তবে আখ্যানের সমাপ্তি নিয়ে কোনও সন্দেহ বা দ্বন্দ্ব নেই আমার। ঘটনার গতিকে এটি হতে বাধ্য, তা সে রোগ, আফিমের গুলি, বিশ্বস্ত পরিচারিকার এনে দেওয়া বিষ, যাতেই হোক:

“…একদিন গভীর রাতে সে হতভাগিনীর মৃত্যু হইলো। শেষরাতে জমিদার বাটির খিড়কি দিয়া তাহার শবদেহ গ্রামের শ্মশানে লইয়া দাহ করা হইলো। তাহার জন্য শোক করিবার বড় বেশী কেহ ছিল না। ধীরে ধীরে তাহার নামটি বিস্মৃতির অতলে তলাইয়া গেলো”।

bidhaba

তারপর আমার মেয়েমানুষের মন ঘুরে গেলো অন্যদিকে।মনে হলো এত বচ্ছর বাংলা সাহিত্য চ’ষে বেড়ালাম, এই একটিমাত্র হাতবিধবার দর্শন পেলাম কেন? তখনই মনে পড়লো একজনের কথা। তিনিও এক হাতবিধবাই বটে শুধু তাঁর নামকরণটিই হয়নি এই যা। রায়বাড়ি আর ঘরে বাইরে (১৯১৬)প্রায় একই সময় লেখা।সাহিত্য সমালোচক ও অন্যান্য রসবেত্তারা ঘরে বাইরে র বিমলাকে নিয়েই অস্থির হয়ে থেকেছেন কিন্তু সেই রাজবাড়ির অন্দরমহলে যে রসিকা বিধবাটি গুনগুনিয়ে খ্যামটা খেউড় গাইছেন আর সুপুরি কুচোচ্ছেন তাঁর দিকে নজর দিতে পণ্ডিতেরা তেমন সময় পাননি। বিমলার বয়ানে:

আমার মেজো জা অন্য ধরনের ছিলেন। তাঁর বয়স অল্প, তিনি সাত্ত্বিকতার ভড়ং করতেন না। বরঞ্চ তাঁর কথাবার্তা-হাসিঠাট্টায় কিছু রসের বিকার ছিল। যে-সব যুবতী দাসী তাঁর কাছে রেখেছিলেন তাদের রকম-সকম একেবারেই ভালো নয়। তা নিয়ে কেউ আপত্তি করবার লোক ছিল না। কেননা এ বাড়ির ঐরকমই দস্তুর। আমি বুঝতুম আমার স্বামী যে অকলঙ্ক আমার এই বিশেষ সৌভাগ্য তাঁর কাছে অসহ্য। তাই তাঁর দেওরের যাতায়াতের পথে ঘাটে নানারকম ফাঁদ পেতে রাখতেন। এই কথাটা কবুল করতে আমার সব চেয়ে লজ্জা হয় যে, আমার অমন স্বামীর জন্যেও মাঝে মাঝে আমার মনে ভয়-ভাবনা ঢুকত। এখানকার হাওয়াটাই যে ঘোলা, তার ভিতর দিয়ে স্বচ্ছ জিনিসকেও স্বচ্ছ বোধ হয় না। আমার মেজো জা মাঝে মাঝে এক-এক দিন নিজে রেঁধে-বেড়ে দেওরকে আদর করে খেতে ডাকতেন। আমার ভারি ইচ্ছে হত, তিনি যেন কোনো ছুতো করে বলেন, না, আমি যেতে পারব না।– যা মন্দ তার তো একটা শাস্তি পাওনা আছে? কিন্তু, ফি বারেই যখন তিনি হাসিমুখে নিমন্ত্রণ রাখতে যেতেন আমার মনের মধ্যে একটু কেমন– সে আমার অপরাধ– কিন্তু কী করব, আমার মন মানত না– মনে হত এর মধ্যে পুরুষমানুষের একটু চঞ্চলতা আছে।

এখন কথা হলো এই যে বিধবা “সাত্ত্বিকতার ভড়ং’ করেনা সে হাতবিধবা কিসে? যারা এ কথাটি তুলবেন তাঁদের বলি, মেজঠাকরুনের রসের বিকারের কথা জানতেন শুধু বিমলা। অন্তঃপুর চার দেওয়ালের মধ্যে যা হচ্ছে সে আর কে জানতে যাচ্ছে যতক্ষণ না তা একেবারে দিনের আলোর মত স্পষ্ট হচ্ছে? আমি দেখি মেজঠারুণ সদ্গ্রন্থরসগ্রাহিনী ন’ন। তিনি দাসুরায়ের পাঁচালী পড়েন না। তিনি ছোটরানীর বৈঠকখানা যাওয়া দেখে গান ধরেন:

রাই আমার    চলে যেতে ঢলে পড়ে।

অগাধ জলের মকর যেমন,

ও তার    চিটে চিনি জ্ঞান নেই!

…আর রোজ সকালে  ভেতর মহলের বারান্দায় বসে যে সুপুরি কুচোন পানের রসে ঠোঁট ভেজাবেন বলেই তো? “অন্য ধরণের” সে আর বলে দিতে হয় না।! সর্বনাশের পথে পা বাড়িয়েই আছেন শুধু তাঁকে টেনে নামানোর কেউ নেই। দেওরটি যে “অকলঙ্ক”।

তাই তিনি চুর হয়ে থাকেন হীরে, ক্ষীরো আদি যুবতী দাসীদের বয়ে আনা রসের কেচ্ছায়, পানে দোক্তায়, খেউড়ের অশ্লীল চোরাস্রোতে। চোখের বালির আর একটি সর্বনাশী বিধবার মত মেজঠাকরুণেরও জিভে লঙ্কামরিচের স্বাদ ছিলো, কিন্তু এমনই কপাল “সঙ্গে তাহার তরকারি ছিল না”। তাই তিনিও যে হাতবিধবা তা জানলো বিমলা আর বিমলার মারফৎ জানলাম আমরা।  মেজবৌয়ের ‘মদন আগুন’এর কথা রাজবাড়ির বাইরে কাকে পক্ষীতে জানতে পেলেনা।

বিনোদিনীর কথা থাক। তিনি বড় গোলমেলে মেয়েমানুষ। ফিরে আসি রায়বাড়ির হাতবিধবা আর মেজ ঠাকরুণে।

বলি, তফাৎটি কোথায়?

দুটিই অল্পবয়সী। দুটিই জমিদার বাড়ির বউ। দুটিরই হাত খালি। দুটিরই ‘তরকারি’তে মতি। কিন্তু তফাৎটি মোক্ষম। মেজবৌঠানকে গর্ভধারণ বা গর্ভপাত জনিত সূচিকায় মরতে হয়নি। বইয়ের পাতা থেকে হারিয়েও যেতে হয়নি তাঁকে।

এই দুই যণ্ত্রণা আর অপমান থেকে তাঁর ভাগ্যবিধাতা রবি ঠাকুর তাঁকে রক্ষা করেছেন।

ইতি প্রথম পরিচ্ছেদ

[1]হীরাদাসী আর ক্ষীরো ঝিকে আমরা দেখেছি বিষবৃক্ষ আর কৃষ্ণকান্তর উইল এ।

ছবি: কালিঘাটের পট
Google

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

6 Responses to হাতবিধবা :গড়াগড়ার মা লো (১)

  1. lipikadey says:

    আখ্যানের মাঝামাঝি থেকে বিনোদিনীর কথাই যে ভাবছিলাম – দেখা পেলাম শেষে এসে – তবে গোলমেলে মেয়েমানুষই বটে! ঠাকুর-পো দের অভাব ছিল না – তবু হতভাগিনীদের মৃত্যুর পর শোক করিবার লেকের অভাব ছিল! দিনকাল বদলেছে – তবু কেন যে মনে হয় মেয়েমানুষ এখনো সস্তা! পাপ-মন আমার – অথবা অশক্ত! লেখাটা অসাধারণ – নাড়া দেওয়া – ওই যে বললাম সময়-কাল পেরিয়ে কেমন যেন সমসময়ে চলে আসে কিছু কিছু জিনিস – হাতবিধবার রকমফের – অথবা পরিবর্তনহীন সমাজ।

  2. Wonderful writing – as usual, enjoyed it very much. Today, thank goodness there is birth control and consenting adults – at least in urban culture.

  3. অধীর আগ্রহে রইলাম পরের কিস্তির জন্যে

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s