‘আপন কথা’

obin

শেষ দুপুরবেলাটা খুব গা ছমছমে আর অদ্ভূত। বাগান থেকে একটা মিলমিশ গন্ধ বেরোয় রোদ থাকলে : মাটি, লাইল্যাক, গোলাপ, সোঁদা ঘাস পাতা। একটা ঢিলে ঢালা ভাব। কাজকর্মও থাকেনা বিশেষ। আজ কিন্তু ছিলো। তাই ভেবেছিলাম আজ আর চশমা এঁটে কোনও মহাভারত নিয়ে বসবো না। একটা চটি বই টেনে নিলাম । ‘আপন কথা’। কেনা ছিলো আলগোছে; পড়া হয়নি।

***
পদ্মদাসী, উত্তরের ঘর টপকে একটু একটু করে দক্ষিণের বারান্দায়। সেখানে খানিক দাঁড়িয়ে ছীরে মেথরের তিন চার রকম ঝাঁটার কেরামতি। বউকে ইংরিজিতে গাল দেওয়া। বিকেল নাগাদ সমশের কোচোয়ান আসর জমায় বাবুদের হাওয়া খেতে বেড়ানোর আগে। বাড়ির ভিতর মহলে নানা নিধি। মায়ের বসার ঘরে সরু ঠ্যাং ডিম-খাওয়া দু দুটো ইটালিয়ান কুকুর। বার বাড়িতে বাবামশাইয়ের খাশ কামরায় নানা গোলমেলে গাছপালা; ওঘরে ঢোকার নিয়ম নেই। তাছাড়া পাতলা লাল চামড়ার নাগরা চটি পরে কখন যে তিনি নিঃশব্দে বেরিয়ে আসবেন তার ঠিক নেই। তাই উঁকি দেওয়াতেও বিপদ। ভেতর বাড়িটা ভালো না। নানা অপশাসনের জায়গা। ডিমের খোলা কচমচিয়ে খেয়ে ফেললে সেখানে নির্বাসন। সেখানে একটিই রক্ষার জায়গা, ছোট পিসীমার ঘর। সেটা আবার ঠিক ‘বিষবৃক্ষ’র সূর্যমুখীর ঘরের মত সাজানো। পিসীমা পায়রা পোষেন, মালা জপেন, পুঁতি দিয়ে বালা বোনেন। সে বালা সোনার বালার চেয়ে ঢের ভালো। পিসীমা বকেন না মারেন না। লাল মাছের গামলায় লাল রং মিশিয়ে দেওয়া, সায়েবের দেওয়া মাখন রুটি খেয়ে ব্যাপটাইজড্ হয়ে যাওয়া…সব খুন মাফ। ছোটপিসীমার আদালতে শ্রী রামলাল কুণ্ডুর জারিজুরি চলবে না। ‘ছি আমনাল কুণ্ডু’ ছোট কর্তার পায়ে সুড়সুড়ি দেওয়ার খিদমদ্গার। সে চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়ে এবাড়িতে ছোট ছেলেকে আদব কায়দা শেখানোর, পেত্নীর ভয় দেখানোর ভার নিয়েছে।

এবাড়ি ‘বকুলতলার বাড়ি’। ওবাড়ি হলো আসল বাড়ি। সেখানে প্রহরে প্রহরে পেটা ঘড়ি বাজে। সে বাড়িতে মাঝে মাঝে আসেন কর্তাদাদামশায়। তিনি সবসময় থাকেন না। সিমলের পাহাড় বোলপুর চীন নানা দেশে ঘোরেন । তিনি এলে সব শুনশান। চাল চোল আলগা হবার জো নেই। তিনি গোল পছন্দ করেন না। তিনি থাকলে মাঘোৎসবে বেশী ধূম হয়। তাঁর গম্ভীর বন্ধুরা আসেন। গান হয়…মৌলা বাক্সোর বাজনা।

***

এবাড়ি ওবাড়ি, দক্ষিণের বাগান করতে করতে কখন বিকল গড়িয়ে গেছে বুঝতে পারিনি। বইটা মুড়ে রেখে খেয়াল হলো সারাদিনের জমা কাজ বাসি হয়ে এক কোণায় পড়ে আছে, স্কুলের হলুদ বাস কখন ছেলেমেয়েদের নামিয়ে চলে গেছে শুনতেই পাইনি…চোখে ভাসছে টুনি ফিরিঙ্গি, মজ্ঞরী দাসী, গোবিন্দ খোঁড়া, বড়ো মা, বৌঠান, কর্তা দিদিমা…

কব্জি ঘুরিয়ে ঘড়ি দেখলাম। সন্ধ্যে ছয়টা।

চশমা মুড়ে খাপে রাখতে রাখতে পণ করলাম আর যা করি তা করি, শেষ দুপুরে কর্মনাশা অবিন ঠাকুরের সঙ্গে আর কক্ষণো না। কাজ না থাকলেও না।

ছবি: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

3 Responses to ‘আপন কথা’

  1. Pingback: ‘আপন কথা’ | Methinks…

  2. lipikadey says:

    আমি পড়ছি মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের “দক্ষিণের বারান্দা”। লেখার ধরণ আকর্ষক না – কিন্তু এই বাড়ীর কথায়-কাণ্ডে ভরা অদ্ভুত মজাদার এক জগৎ।

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s