পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (দ্বাবিংশতি পর্ব)

-tagore-untitled-portrait-of-a-woman

 

এনিড লাহিড়ী এসেছিলো যুদ্ধজয় করতে। তালেগোলে পূর্ণলক্ষ্মীর সেকথা মনে ছিলনা। ঠিক জানতো কোথায় ধাক্কা দিলে সিংহদুয়ার খুলবে। একটু অবসর হলেই শাশুড়ির খাটে উঠে বসে শাশুড়ির একটা শিরা ওঠা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বারীণের সাতকাহন গল্প শোনাত শাশুড়িকে…বারীণ রাগ করলে কি বলে…বারীণ কি খেতে ভালবাসে…তার ছোটবেলার কোন কোন গল্প সে শুনিয়েছে,বারীণের মনখারাপের কথা, অপরাধবোধের কথা, কিছুই বাকি থাকেনি। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হলো পূর্ণলক্ষ্মীর ইংরেজিটি যে বেশ সড়গড় সেকথা তার ছেলেমেয়েরা বুঝতেই পারেনি কখনো!(“তা তোমাদের মত বিদ্যেধরী না হলেও ওভাষা আমিও একটু আধটু কি আর বুঝিনে!”) মেমসায়েবের গালগল্প হাসিমুখে শুনতে শুনতে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে যে দুটো একটা ফোড়ন কাটতেন তাতে পরিস্কার বোঝা যেত যে ষোলো আনা নাহলেও চোদ্দ আনা তিনি পরিস্কার বুঝছেন।(“আর ক’দিন পরে জন্মালে আমার তিনটে পাশ দেওয়া কেউ ঠেকাতে পারতো না, বুঝলি!) বরফ গলে জল হয়েছিলো বৈকি। বড়ঘরের একপাশে একখানা পুরোনো টেবিলে লেসের টেবল ক্লথ  আর চারদিকে চারখানা  চেয়ার পেতে খাওয়া ব্যবস্থা হয়েছিলো (“পরে বেশ করে গঙ্গাজল দিয়ে মুছে নিলেই ঠিক হয়ে যাবেখ’ন”।) সলিল আর দীপুর উদ্যোগে অন্দরমহলের হাতার মধ্যে চারটে ইঁটের উনুন তৈরী করে মুর্গি রান্না হয়েছিলো আচ্ছা করে পেঁয়াজ রসুন গরম মশলা আর ঘি ঢেলে। সারাটা সময় ‘রাম পাখি’র গন্ধ নাকে আঁচল দিয়ে সামলাতে সামলাতে উপদেশের স্রোত নেমে এসেছে সুপুরি গাছের ফাঁক দিয়ে।
–“ঘি গরম করে ওতে একটু চিনি ফুটিয়ে ওপর দিয়ে ঢেলে দিস। খাসা রং হবে। ওরে, বুঝে সুঝে ঝাল দিস। শেষে একটা কেলেংকারি না হয়!” রান্না হয়ে গেলে ঐখানেই মুর্গির ‘ভুষ্টিনাশ’। আর সবাই মাটির ভাঁড়ে। মেমসায়েবদের জন্যে কাঁচের প্লেট আর দুপিস্ করে পাঁউরুটি।  হাসতে হাসতে এনিডের বিষম খাওয়ার যোগাড়। তাও তো তখনও সে জানেনা সিঁড়ির মোড়ে আজ্ঞাবাহিনী বড়বউমা দাঁড়িয়ে আছেন গঙ্গাজলের কমণ্ডলু হাতে। একে একে পাপী তাপীদের শুদ্ধিকরণ করে জামাকাপড় ছাড়িয়ে তবে শান্তি।

একটা মাস কোথা দিয়ে কেটে গিয়েছিলো কেউ বোঝেনি। এক যুগের পুরোনো বউকে বাড়ির পুরোনো বেনারসীওয়ালাকে ডেকে একটি ঘন নীল রুপোলী জরির বুটি তোলা বেনারসি দিয়েছিলেন পূর্ণলক্ষ্মী । আর একটি লোহা বাঁধানো। মঞ্জুলার কথা কি মনে পড়েছিলো ফাঁকফোকর দিয়ে? কে জানে…মেমবউয়ের অনেক কথাই পূর্ণলক্ষ্মী বিশ্বাস করতে পারেননি। পরে হেসে হেসে মেয়েদের বলেছিলেন, “মেয়েটা ভালোরে…আমার মন রাখার জন্যে কত কথাই বললে…ও নাকি বুলুর পছন্দের সব রান্না ওদের শহরের বাঙালী বউদের থেকে শিখে নিয়েছে…” বলে অল্প হেসেছিলেন। বছর বারো পরে ছোট মেয়ে খুকু বুলুদার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে দেখেছিলো মন রাখা বা গড়া নয়। অক্ষরে অক্ষরে সত্যি বলেছিলো এনিড। ততদিনে শ্রী বারীন্দ্রনাথ দেবশর্মনঃ গোত্র বদল করে ফেলেছেন। খাবার টেবিলে বারীণ বসেছিলেন তাঁর সান্ধ্য আহার বিফস্টেক আর আলু নিয়ে। এনিড ননদ আর ভগ্নীপতিকে যত্ন করে বেড়ে দিয়েছেন মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, মাছের চপ, আমের চাটনি আর দই। মেয়েদের সঙ্গে সেও ঐ খাবারই খেয়েছে। তবে খুকুর আর সেকথা পূর্ণলক্ষ্মীকে জানানো হয়নি। শুনলে হয়ত স্বভাবমত দুলে দুলে নিঃশব্দে হাসতেন!

মধ্যষাটের আর সত্তরের দশকে কলকাতার পারিবারিক মানচিত্রে অমন অনেক মেমবউ। স্যুইনহো স্ট্রীটের বোস বাড়ির ছেলে দেশে ফিরেছিলো এম্ আর সি পি আর মিসেস মার্জরি বোসকে নিয়ে। বোস গিন্নী বলেছিলেন. “ও ছাই আমি উচ্চারণ করতে পারিনে”। নাম বদলে হয়েছিলো মঞ্জরী। মিসেস মঞ্জরী বোসও নার্স ছিলেন। আজীবন স্বামীর চেম্বারে পাশে পাশে থেকেছেন। পাড়ার অনেকেই জানত মঞ্জরী রাঙা আলুর পুলি আর পাটিসাপটা পটিয়সী। পাড়ার আর এক বউ ছিলো মিসেস খ্রিস্টাল্ মুখার্জী। সন্ধে হলেই শাশুড়ী ডাকতেন, “ও খীষ্টাল, আমার আহ্ণিকের আসন দাও”! ‘স্ত্রীরত্নম্ দুষ্কুলাদপি’ বলে কথা!

পূর্ণলক্ষ্মীর মনে বারীণের আসার রেশ রয়ে গেছিলো অনেকদিন। বেশ কিছুদিন পরে বড় নাতনীকে বলেছিলেন, “বি.এ পাশ করে বিলেত গিয়ে সায়েব বিয়ে করিস। ফুটফুটে ছেলেপিলে হবে সব। আমি তোর বাবাকে বুঝিয়ে বলবো ‘খন”।

কাঁচা সোনা রঙের দুর্বলতা পূর্ণলক্ষ্মীর বরাবরের। তাই তাঁর সেজ বৌকে দেখে অনেকেই ভারী অবাক হয়েছিলো:  “অমন রাজপুত্রর মত রাঙা টুকটুকে ছেলের পাশে…” সেজবৌ রোগা, বেশ কালো, ক্ষীণজীবি চেহারা। নাকটি বাঁশির মত আর পাখির ডানার মত ভুরু হলেও ব্রজেন্দ্রনাথের পাশে মানানসই বলা যাবেনা কোনওমতেই। তবে এমনধারা কাজ তো পূর্ণলক্ষ্মী বছর চল্লিশেক আগেও একবার করেছিলেন। আর এমনই ভাগ্যর পরিহাস, এ মেয়ের নামও বাসন্তী! শ্বশুরবাড়িতে পা ফেলা মাত্রই তার নাম রাখা হয়েছিলো মঞ্জু। “ও মা, আপন খুড়শাশুড়ীর নাম ধরে বৌকে ডাকা যায় নাকি..”

মায়ের সঙ্গে শিলা গিয়েছিলো মেয়ে দেখতে। পরিবারটি চাকরি সূত্রে প্রবাসী বাঙ্গালী। সাত ভাই বোনের সবার ছোট। বিহারে চক্রধরপুরে বাড়ি। বাবা নেই। কলকাতায় এক আত্মীয়ের বাড়ি এনে মেয়ে দেখানো হয়েছিলো। বেরিয়ে এসে শিলাকে পূর্ণলক্ষ্মী বলেছিলেন, “আমি দীপুর বিয়ে এখানেই দেবো। তুমি একটি কথা কইবে না”। শিলা বাড়ি ফিরে দীপুকে বলেছিলো, “তুই একবার যা”। দীপু উত্তর দিয়েছিলো, “তোরা তো দেখেছিস!”

চক্রধরপুর থেকে ট্রেন কলকাতা পৌঁছেছিলো মাঝ সকালে। লাহিড়ী বাড়িতে গোধূলির আগে বৌ-বরণের নিয়ম নেই। নতুন বৌ প্রথম উঠেছিলো বড় ননদের বাড়ি। নীহররঞ্জন তখন রাইটার্সে। তারপর সন্ধ্যেবেলায় শ্বশুরবাড়ি। বরণ হয়ে যাওয়ার পর শোভনা মাকে একান্তে ডেকে বলেছিলেন, আমার কর্তব্য করে গেলাম। কাল বৌভাতে আমি আসবোনা। তোমরা আনন্দ কোরো!” পূর্ণলক্ষ্মী করুণার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। উচ্ছ্বাসের একটু অভাবই ছিলো দীপুর বৌভাতে। ঠিক যেমন শোভনা বলেছিলেন, “আমাদের মুখ তো বন্ধ করলে, কুটুম্ব প্রতিবেশীদের মুখ বন্ধ করতে পারবে তো?” সেটা পারা যায়নি।

সব মেয়ের ‘যুদ্ধ জেতার লড়াই’ লড়তে পারেনা। মঞ্জুও পারেনি। হয়তো ইচ্ছেও ছিলোনা তেমন। একটা অদৃশ্য বৃত্ত এঁকে নিয়েছিলো নিজের চারপাশে। কথায় বলে, দেওয়ালেরও কান আছে। কিছু কথা তার কানেও গিয়ে থাকবে প্রথম কিছুদিনের মধ্যে। তিনবছরে সেই বৃত্তের বলয় একটু বেড়েছে। তাতে জায়গা হয়েছে স্বামী ব্রজেন্দ্রনাথ আর ছেলে সোমনাথের। কালো মেয়েদের জীবনও ভালো মন্দে মেশানো হয়। দীপু কিন্তু তার এই আটপৌরে স্ত্রীকে শেষমেশ ভালোই বেসে ফেলেছিলো। মায়ের কাছে নিভৃতে স্বীকারও করেছিলো, মায়ের পছন্দ তারও বেশ পছন্দ হয়েছে। একটু সময় লেগেছে এই যা…

তবে তেমনটি না হলে একটু “আশ্চয্যির ব্যাপার হতো বই কি! লাহিড়ী বাড়ির পুরুষরা বংশানুক্রমিক স্ত্রৈণ…দুনিয়া জানে…”

জল্পনা কল্পনা চলেছে কিছুদিন …এ কাণ্ডটা কেন করলেন পূর্ণলক্ষ্মী? খুব বড়লোকের মেয়েও তো নয় মঞ্জু? নাকি দীপুর এক পায়ে খুঁত আছে বলে? ছোটবেলার বন্ধু পিনাকী দাসের বাড়ি কি একটু বেশি যাতায়াত করছিলো দীপু? পিনাকির ছোট বোনটা আবার আস্ত ডানা কাটা পরী। আবার দেখেছো দীপুর বৌভাতের পর কিন্তু পিনাকি একটিবারও আর এ বাড়ি আসেনি। থা উঠে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। যথাসময়ে পিনাকির বোনের বিয়েতে দীপু সস্ত্রীক নেমন্তন্ন খেয়ে এসেছে।

দুপুরবেলা। বছর পনেরো পরে ফলাও করে নাতনীকে তার মামার বিয়ের বৃত্তান্ত শনিয়ে পূর্ণলক্ষ্মী হাসছেন। একটু পরেই চারটে বাজবে। সেজবৌ এসে পড়বে তাঁর চুল বেঁধে দিতে। বাইরে বেলা মরে আসছে।

–তোমার মা মাসিরা কদিন খুব মুখ ভার করে ছিলো। আমি ঠিক জানতুম সব ঠিক হয়ে  যাবে। সংসারের সেটাই নিয়ম।

–সত্যি করে বলো তো দিদা এ কাজটা তুমি কেন করেছিলে?

–শোনো বলি।তোমার মা মাসিদের বোলো না। সেজবৌমাকে যখন তার বৌদিরা ঘরে নিয়ে এলো, আমার মনে হলো এ মেয়ের কি করে বিয়ে হবে? পাশে ডেকে বসালুম। পিঠে হাত রেখে নাম জিগেস করতে গিয়ে দেখি ভয়ে লজ্জায় কাঁপছে। আমার সাত মেয়ের মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। আমার মনে হলো, আহা এই মেয়েটি যদি তাদের একজন হ’ত তাহলে আমি

কি করতাম! তখনই মনস্থির করে ফেললুম।খবরদার কাউকে বলিস নি”

Kolkata_711

 

দীপুর বিয়ে সত্তরের গোড়ার দিকের কথা। কে বলে সময় একমাত্রিক? লাহিড়ী বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে যখন সময় হোঁচট খেয়ে থমকে থামছে, বাইরের সময় এগিয়ে চলেছে, মোড় নিচ্ছে। কলকাতার চেহারা পাল্টাচ্ছে খুব রাতারাতি। দেওয়াল গুলোর ভাষা বদলাচ্ছে। ‘জয় জওয়ান জয় কিষাণ’ অথবা ‘ভোট পাবে কারা, কাস্তে হাতুড়ি তারা’ কারা যেন শেষ রাতে মুছে দেয়। তার ওপর কাঁচা রঙে মোটামোটা করে লিখে দেয় : ‘বন্দুকের নলই শক্তির উৎস’ ‘নকশালবাড়ি লাল সেলাম’। কিছু একটা ঘটছে, বুঝতে পারে সোনা। মা আর সন্ধেবেলায় কোথাও যেতে চায়না। আরও অনেক কিছু, যা সোনা দেখতে পায় কিন্তু ধরতে পারেনা…

(ক্রমশঃ)

 প্রচ্ছদ: রবীন্দ্রনাথ ঠকুর
কলকাতা ৭১: Google 

 

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Fiction and tagged , , , , , . Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s