পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (একবিংশতি পর্ব)

aalpon

এলফুল বেলফুল তুলতে গেলাম

 ইতুর ছয় কথা শুনে এলাম:

 একথা শুনলে কি হয়?

 অন্ধের চক্ষু হয়

 নির্ধনের ধন হয়

 অবিদ্যার বিদ্যে হয়

 অপুত্রের পুত্র হয়

 বন্দী থাকলে খালাস হয়

 অব্যিয়েতের বিয়ে হয়।।

  এই দিয়েই গোড়ার কথা শুরু হয়েছিলো। এখনও স্পষ্ট দেখা যায় শীতের দুপুরে তিনতলার টানা বারান্দায় গরম ধোঁয়া ওঠা হাঁড়ি নামলো। তাতে একসঙ্গে সেদ্ধ হয়েছে গোবিন্দভোগ, মটর ডাল আলু বেগুন মূলো সিম ফুলকপি আর কাঁচা লঙ্কা। তাতে ঢালা হবে ঘি। তারপর সেই ভাত গরম গরম খেয়ে ফেলতে হবে। একটুও পড়ে থাকলে চলবে না। তারপর খেতে হবে নতুন গুড় দিয়ে ঘন ক্ষীরের মত চোষির পায়েস। শীতের আলতো রোদে আসন পিঁড়ি হয়ে মেয়েদের খাওয়া ব্রতকথা শোনার পর। ঘরের মেয়ে পরের মেয়ে, কোনও ভেদাভেদ নেই। হয়ত পুরোনো আমলে মেয়েলী ব্রতের মূল কথা সেটিই ছিলো; সংসারে সুখ শান্তি ধরে রাখা মা লক্ষ্মীরা যেন মিলেমিশে থাকে। পরের মেয়েরা যখন বালিকা দশায় ঘরের বউ হতো, তখন তাদের শিকড় ছড়াতো তাড়াতাড়ি, তবুও বৌ কি আর মেয়ে হয়? বড়জোর ‘মেয়ের মত’। ব্যাস্!

পূর্ণলক্ষ্মীর সংসারে কলকাতায় থাকা মেয়েরা যেমন ব্রত করতো, তেমনি দুই বৌ-ও। বড় আর সেজ। ‘সাত মহারাণী’র বৃত্তান্ত করতে গিয়ে তাদের কথা আর বলা হয়নি। বরেন্দ্রনাথের বিয়ে হয়েছিলো একটু বেলায়। মায়ার বিয়ের মাস ছয়েক পরে। প্রীতি গোয়াবাগানের একটি পুরোনো পরিবারের মেয়ে। বাবা মারা গিয়েছিলেন ছোটবেলায়। রেখে গিয়েছিলেন একুশ বছর বয়েসী এক অনিন্দ্যসুন্দরী (কিন্তু কালো )স্ত্রী, ছোট ছোট তিনটি ছেলেমেয়ে আর চক মেলানো পঙ্খের কাজ করা একটি বাড়ি। আর কিছু না। প্রীতির মা বড় কষ্টে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছিলেন। দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো সকাল সকাল। মেজমেয়ে প্রীতি প্রৌঢ়া মা’র সংসারের হাল ধরে ছিলো যতদিনে সবচেয়ে ছোট ভাই অংশু সংসারের হাল ধরার যোগ্য হয়েছে; ততদিনে প্রীতিকে আর বিবাহযোগ্যা বলা চলেনা। বরাতে ছিলো পূর্ণলক্ষ্মীর ‘বড় বৌমা’ হওয়া। প্রীতির চেহারা ঠিক সাদামাটা নয়। রংটি কাঁচা সোনা। নাক একটু পুরুষালী, তীক্ষ্ণ, ঈগলপাখির ঠোঁটের মত, সরু ছুঁচোলো চিবুক। চুল লালচে কোঁকড়া। (“আমার এই মেয়েটি ওনার চেহারা পেয়েছে” ) পছন্দ হয়েছিলো পূর্ণলক্ষ্মীর। বনেদী বাড়ির মেয়ে বলে কথা…হলোই বা পড়তি ঘর! তবে মেয়ের বয়েস যে কিছু বেশী সেকথাটা প্রীতির শাশুড়ি ভুলতে পারেননি। বৌভাতের শাড়িটি ছিলো ঘি রঙের কড়িয়াল। মেরুন রঙের চওড়া ধাক্কা দেওয়া জরি পাড় ।

রাতরাতি ‘পুতুল’ থেকে বড়বৌমা হতে কিরকম লাগে, একমাত্র প্রীতিই জানতো…কাজটা সহজ ছিলোনা, পুরোপুরি হতে পেরেছিলো কিনা জানার কোনও উপায় নেই আর। “আপিস কাছারি করা’ মেয়েকে নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন পূর্ণলক্ষ্মী। দায়িত্ব, কর্তব্য, আচার বিচার সব হাত ধরে। ইতুর যোগাড়, শাশুড়ির একাদশীর যোগাড়, নীলষষ্ঠীর বাজার, ডাক্তার বদ্যির টেলিফোন নম্বর, সমস্ত ‘বড়বৌমা’র দায়িত্ব হয়ে গিয়েছিলো খুব তাড়াতাড়ি। কিন্তু প্রীতি কোনওদিনই ঠিক কর্ত্রী হয়ে উঠতে পারেননি। সেটা শুধু পূর্ণলক্ষ্মীর চাবির গোছার জন্যে নয়।

কথায় আছে, ‘জমি বাপের নয়, দাপের’। সংসারের ক্ষেত্রেও কথাটা ষোলো আনা খাঁটি। যার স্বামীর ভয়ে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়না, সে শত গুণে গুণবতী হয়েও সিংহাসন পায়না। এটিই সংসারের নিয়ম। তাই ‘সেজ বউ’ হয়েও প্রীতির শাশুড়ি রাজরানী। আর তার কপালে ‘বড়বউ’ নামটা লেখা হলেও ও বস্তুটি তার আর হয়ে ওঠা হয়নি। তাছাড়া ছোটবেলায় ‘বাপ মরা’ মেয়ে বিপর্যস্ত এক মায়ের থেকে তেমন কোনও মনোহারি পাঠও পায়নি যাতে একাধারে শাশুড়ি এবং সাত সাতটি ননদের মন কেড়ে নিতে পারে।

তবে পষ্ট কথায় কষ্ট নেই। কিছুই কি পায়নি লাহিড়ী বাড়ির বড়বউ? তার দুই মেয়ে স্বাতী আর হৈমন্তী ছিলো তাদের পিসীদের চোখের মণি। ঠাকুমার প্রাণ। সেটুকুও অবশ্য বিনামূল্যে পাননি প্রীতি।  পিসীদের দেখাদেখি মেয়েরাও  পূর্ণলক্ষ্মীকে ‘মা’ ডাকে। আর জন্মদাত্রীকে ‘বউমা’। এ দুঃখ লুকিয়ে রেখেছিলেন প্রীতি। কেউ বুঝতেই পরেনি। শুধু বহু বছর পরে স্বাতী যখন শ্বশুরবাড়ী যাত্রা করছে, বিয়ের পিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে প্রীতি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “টুকু, একবার আমায় ‘মা’ বলে ডাক!”

বড় মেজো সেজ। সম্পর্কের চলন এইরকম হয় সংসারে। কিন্তু পূর্ণলক্ষ্মীর সংসারে সবই যেন ‘কেমনধারা’। বড়বউয়ের পর মেজবউ নেই। কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলো এনিড্ লাহিড়ী। বারীন্দ্রনাথ দেশ ছেড়েছিলো বীরেন্দ্রনাথ চলে যাওয়ার বছর খানেক আগে। ‘আরও বড়’ হওয়ার তাগিদে। আর ফেরা হয়নি। এডিনবরাতে শিক্ষানবিশি করার সময় ভাব হয় একটি স্কটিশ নার্সের সঙ্গে। বিদেশ বিভুঁই-এ স্কটল্যান্ডের এই মেয়েটির হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলো বারীন। শিক্ষানবিশী শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আংটি বদল। একটা হলুদ হয়ে যাওয়া ছবি কোথায় যেন আছে। তাতে একটা রোগা চুল উলটে আঁচড়নো, চোখে চশমা কালো ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘাঙ্গী সোনালী চুল বিদেশিনী। পেছনে চার্চ। বিয়ের ছবি।  বোঝা যায়। এনিড হাসছে। ঠিক বিয়ের পর পর সব মেয়েই একইরকম হাসে। খানিকটা উচ্ছলতা, অনেকটা আনন্দ, একটু ভয় মেশানো। নিতান্ত সাদামাটা বিয়ে। নতুন পাশ ডাক্তার টাকাই বা কোথায় পায়? তাছাড়া…

পূর্ণলক্ষ্মী চিঠি পেয়েছিলেন প্রায় একমাস পরে। পড়ে খুব কেঁদেছিলেন। এই ছেলেই নাকি ছাতা দিয়ে তাঁর মাথা ঢাকবে? আর একজন কিন্তু গালে টোল ফেলে খুব হেসেছিলো। তার নাম মঞ্জুলা। ডক্টর মঞ্জুলা মুখার্জি। পূর্ণলক্ষ্মীর মেজবৌমা হওয়ার জন্যে যে মনে প্রাণে তৈরী ছিলো। অপেক্ষা করছিলো বারীণের জন্যে।নিয়মিত পূর্ণলক্ষ্মীর খবর করেছে চার বছর ধরে। মায়া ছায়া খুকুর মঞ্জুলাদি।

—ওমা, মাসিমা কাঁদছেন কেন? আপনার ছেলে যা কালো, এইই ঠিক হয়েছে। সাহেব নাতি নাতনী হবে আপনার। বারীণও ওখানে খুব ভালো করবে, দেখবেন”!

মঞ্জুলার আসা যাওয়া আস্তে আস্তে কমে গেছে। পরে শোনা গেছে সে এক ডাক্তারকে বিয়ে করে আমেরিকা চলে গেছে। সেই খবর পূর্ণলক্ষ্মীর কানে তুলে দিয়েছিলো বারীণের বন্ধু আনসার। মঞ্জুলা আর বারীণের সহপাঠী। পূর্ণলক্ষ্মী আবারও একবার কেঁদেছিলেন।বারীণের বিয়ে মেনে নিতে পারেননি পূর্ণলক্ষ্মী। যে ছেলেকে কোনওদিন প্রাণে ধরে বকতে পারেননি, তাকেই সাধ্যাতিরিক্ত একটা কড়া চিঠি লিখেছিলেন তিনি। ছেলেকে মাতৃদায় থেকে খাতায় কলমে মুক্তি দিয়ে। বারীণ সে চিঠির উত্তর দেয়নি। দিয়েছিলো এনিড।
সে চিঠি পূর্ণলক্ষ্মী বারীণের দিদিদের পড়িয়েছিলেন। স্কটিশ মেয়েটি তার নিজের ভাষায় গোটা গোটা ছাঁদে লিখেছিলো;

— “প্রিয় মা, (তোমার অনুমতি ছাড়াই আমি তোমাকে ‘মা’ ডাকব, বারীণের মত, তোমার যত আপত্তিই থাকুক।) আমি শুনলাম আমাদের বিয়ে তুমি মেনে নাওনি। আমি দুঃখ পাইনি একটুও। সময়ই সাক্ষী। একদিন আমি তোমাকে প্রমাণ করে দেব আমিই তোমার সবচেয়ে সেরা বৌ। মেয়ে কোনওদিনই হতে পারবো না, সে দুরাশা আমার নেই, কিন্তু তাদের থেকে কোনও অংশে কম হবো না। এটা আমার যু্দ্ধ জেতার লড়াই। আর আমি হেরে যেতে ভলোবাসিনা। যতদিন তা না পারছি… তোমার স্নেহের এনিড”।

চিঠি আসতেই থেকেছে…বরফ গলেছে বছর দুই পরে। এনিড জানিয়েছিলো তাদের একটি মেয়ে হয়েছে, তার নাম সুপ্রিয়া। আগাগোড়া বাংলায় পূর্ণলক্ষ্মী একখানি চিঠি লিখে ভরদুপুরে শিলাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন:
–এনিডকে একখানা চিঠি লিখেছি। একটু পড়ে দ্যাখ দিকি ঠিক হয়েছে কিনা?

কল্যাণীয়া মেজবৌমা নয়। কল্যাণীয়া এনিড।
কথায় আছে,

আসলের চেয়ে সুদ মিষ্টি।
পুতের চেয়ে নাতি ঈষ্টি।।

কিন্তু শুধু কি তাই ?

এনিডের সঙ্গে পূর্ণলক্ষ্মীর সাক্ষাৎ তারও বছর দশেক পরে। তখন শুধু সুপ্রিয়া নয়. তার সঙ্গে আর একটু ছোট সুমিত্রা। দুই মেয়েকে তাদের Grand Ma দেখাতে দেশে ফিরেছিলো বারীণ। ততদিনে পূর্ণলক্ষ্মীর চুল সাদা থেকে সোনালী। সুমিত্রা বাবার পিছন থেকে অল্প একটু উঁকি দিয়ে অনুযোগের সুরে বলেছিলো, “You never told us she was blond?”

দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিলো সে সাক্ষাৎকারে। বারীণ পই পই করে শেখানো সত্ত্বেও মিসেস্ এনিড লাহিড়ী শাশুড়ীকে জড়িয়ে ধরে দুই গালে চুমু খেয়েছিলেন। পূর্ণলক্ষ্মী বিড়বড় করেছিলেন “সব এঁটোকাঁটা হয়ে গেল”। আর তার পরের দিন বড়বৌমাকে ডেকে বলেছিলেন . “মেজবৌমার জন্যে আজ গড়িয়াহাট থেকে দুখানা ঘাগড়া কিনে এনো। ঐ ফ্রক পরে ঠ্যাং নাচানো আমি আর দেখতে পারছিনে”।

(ক্রমশঃ)

প্রচ্ছদ: http://www.dsource.in/resource/rangoli/elements-used-in-rangolis/images/16.jpg

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

One Response to পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (একবিংশতি পর্ব)

  1. Pingback: পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (একবিংশতি পর্ব) | Methinks…

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s