পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (অষ্টাদশ পর্ব )

 

 


Image

 

বীরেন্দ্রনাথ যখন মেয়েদের ওপর রেগে যেতেন, বলতেন, “মহারাণীরা কোথায় গেলেন?” আর ছেলেদের বেলায়, “তোমার লাট সায়েবরা…”। বরেন্দ্রনাথ, বারীন্দ্রনাথ, ব্রজেন্দ্রনাথ, ব্রতীন্দ্রনাথ। পলি, বুলু,দীপু, সলিল। পূর্ণলক্ষ্মীর চার ‘স্বগ্গে যাওয়ার বাঁশগাড়ি’ (ভুবনমোহিনী উবাচ) । মেয়েরা জেনে এসেছে বরাবর। পূর্ণলক্ষ্মীর চার দূর্বলতা। 

পলি খামখেয়ালি, বেশীর ভাগটাই শান্ত। রেগে গেলেও গলা চড়েনা। বুলু মধ্যমণি। আগেও বলেছি কথায় আছে  ‘জ্যেষ্ঠই শ্রেষ্ঠ, কনিষ্ঠটি মায়ের প্রাণ। মাঝেরটিকে কেউ দেখেনা, দেখেন ভগবান”। পূর্ণলক্ষ্মীর ছেলেদের বেলা সে কথা খাটেনা। বাকি তিন ছেলের বেলায় পান থেকে চূণ খসলেই উদ্যত হাতপাখা।   বুলুর জীবনে মাত্র একবার। যেবার পণ্ডিতে মশাইয়ের  টিকি কেটে দেওয়ার অপরাধে তীর্থপতি ইন্সটিটিউশন থেকে তার  নাম কাটা গিয়েছিলো।

ব্রজেন্দ্রনাথ বরাবরই হেড আপিসের বড়বাবু। কখন যে রেগে যাবে বোঝা শক্ত ছিলো। ছোটবেলায়  রেগে গেলেই দুধে আলতা মুখ গনগনে লাল। আর শার্ট খুলে ফেলে খালি গায়ে খালি পায়ে রাস্তা দিয়ে দে দৌড়।  তারপর অবধারিত কোনও দিদির আর্তনাদ: “ ও মা –আ- আ- আ…দীপু পালাচ্ছে-এএএএএ…” এবং তারপর কোনও দাদার বা কাজের লোকের পশ্চাৎ ধাবন এবং আসামী গ্রেপ্তার। তারপর হাতপাখা। বাড়ির বামুন ঠাকুর তার নাম দিয়েছিলো ‘বোকা ব্যারিস্টার’।

কোন ছেলে বেশী ভালোবাসতো মাকে? বাবা বরাবরই দূরের মানুষ। তিনি মেয়েদের সঙ্গে যত হাসি গল্প করেন ছেলেদের সঙ্গে তার এক কণাও না। কোর্ট থেকে ফেরার পর যেটুকু সময় বা ছুটিছাটায়, তাঁকে ঘিরে ‘মহারাণী’দের ভীড়।  একমাত্র সবার ছোট খুকু ছাড়া। বাবা বড্ড বড় আর বুড়ো। খুকুর আশ্রয় তার দুই জামাইবাবু আর ডলুদা। ছেলেদের সভা মাকে ঘিরে। পলিকে বোঝা দায়। বড় অন্তর্মুখী। বাবার পেশা নিয়েছে কিন্তু বড় মুখচোরা ছেলে। Judicial History of British India তে যে বরেন লাহিড়ীর জুড়ি পাওয়া ভার সেকথা বার লাইব্রেরীর প্রতিটা বই আর মানুষ জানতো।।  কিন্তু নিজের ঘরে কাঁচের আলমারিতে How  Green was My Vallley, Golden Treasury … এইসব… কোন কাজটা  কাজ আর কোনটা আকাজ তার বোধটাও ছিলো আলাদা। শিলার মেয়ের জন্যে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে কাঠ চেঁছে খোদাই করে রং পালিশ করে  পুতুলের খাট বানিয়ে দিয়েছিলো তার বড় মামা। সে খাট সোনা কলেজ পড়ার সময় পর্যন্ত যত্ন করে রেখেছিলো।কিন্তু কোর্ট কাছারির সম্পর্কে বরেন্দ্রনাথের ভারি একটা ঔদাসিন্য ছিলো। একটা স্নেহ ভালবাসার চোরা স্রোতও ছিলো বরেন্দ্রনাথের  মধ্যে। সেটা বোঝা যেত কিন্তু ধরা যেতোনা। সাংসারিক বোধ আর তার প্রকাশটাও ঠিক আর পাঁচটা লোকের মত ছিলোনা তার। অসহিষ্ণু বীরেন্দ্রনাথের আঁচ থেকে এই ছেলেকে আঁচল দিয়ে ঢেকে রাখতেন পূর্ণলক্ষ্মী।

১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ পূর্ণলক্ষ্মীর কালবেলা। বীরেন্দ্রনাথের শরীর হৃৎযন্ত্র দুই-ই দুর্বল হয়ে আসছে। পারিবারিক ডাক্তার প্রায় জোর করেই তাঁর কোর্ট যাওয়া বন্ধ করেছেন। নিচের বৈঠকখানা অন্ধকার সন্ধ্যেবেলায়। দীপু তখন Isc সবে শেষ করেছে। সেকি বুঝেছিলো মা কতটা অসহায়? হঠাৎ একটা ব্রিটিশ ফার্মে শিক্ষানিশ হয়ে ঢুকে পড়েছিলো কাউকে কিছু না বলে কয়ে। মাসের শেষে যথা সর্বস্ব এনে তুলে দিতো মায়ের হাতে। কাঠবেড়ালির সেতু বন্ধন।

১৯৬৩ তে বুলু পুরোদস্তুর ডাক্তার। মায়ের গর্ব। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ভীষণ। ১৯৬৪তে চলে গেলো ইংল্যান্ড। তাকে আরও বড় হতে হবে। যেদিন জানতে পারলেন, পূর্ণলক্ষ্মী কেঁদেছিলেন সামান্য। কিন্তু বাধা দেননি। দিলে লাভও যে খুব হতো তা নয়।এই জ্যোতিষ্ক ছেলের সঙ্গে বীরেন্দ্রনাথের আর দেখা হয়নি।

১৯৬২তে সলিলকে বীরেন্দ্রনাথ পাঠিয়ে দেন জার্মানি।সকালে পড়াশুনো করতো আর রাত্রে কাজ। আর মাকে বোঝাতো একদিন সে মায়ের সব সমস্যার সমাধান করে দেবে। তার একটু সময় দরকার। বীরেন্দ্রনাথ যখন যান আসার সামর্থ্য ছিলোনা তার। ফোনে খুব কেঁদেছিলো। দিদিদের আদরের ‘খোকন’ আশির দশকে বরারের মত দেশে ফিরেছিলো ধ্বংস স্তূপ হয়ে। তবে সে অবস্থাতেও তার কথা রেখেছিলো সে। সব বোনেদের বাড়ি তার যাতায়াত ছিলো। কোনও কাজ পড়লেই তার ডাক পড়তো দিদিদের বাড়ি। ছেলেমানুষের মত খুশি হতো তখন। পূর্ণলক্ষ্মীর সঙ্গে একটা ছেলেমানুষি খেলা সে খেলেছে পূর্ণলক্ষ্মীর শেষ দিন পর্যন্ত। রোজ সকালে মার থেকে সে দৈনিক পাঁচ টাকা হাত খরচ আদায় করতো। সেই সময়ে মা ছেলে যখন চোখে চোখ রেখে হাসতো, মনে হতো দুটো ছোট ছেলেমেয়ে একটা ভারি মজার খেলা খেলছে। মা চলে যাওয়ার পর খোকন বেঁচেছিলো আর মাত্র সাত বছর। করুণার গলা সেই দ্বিতীয়বার কেঁপেছিলো: “হতভাগা ছেলে একটু চিকিৎসার সুযোগও দিলোনা। নাচতে নাচতে চলে গেলো”!

 

 

 

 

Image

কিন্তু এখন ১৯৬৫। মাঘ মাসে শেষ রাতে চলে গেলেন বীরেন্দ্রনাথ। পূর্ণলক্ষ্মী কাঁদেননি। সময়, বোধ কিছুই ছিলোনা কাঁদার মত। সন্ধ্যে থেকে অবস্থা খারাপ হচ্ছিলো। ডক্টর বোস মিসেস্ লাহিড়ীকে ইন্ট্রাভেনস্ ইনজেকশন দিতে শিখিয়েছিলেন। বলেছিলেন , “আমাকে ডাকার হয়ত সুযোগ পাবেন না অনেক সময়। এটা শিখে রাখুন”। সেদিন মাঝরাতে মিসেস্ লাহিড়ীর যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো অদৃষ্টের সঙ্গে। স্বামীর নাড়ি  ধরে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে  বসেছিলেন। একটা সময়ের পর করুণাকে খুব আস্তে করে বলেছিলেন, “এবার বোনেদের খবর দাও। আর সময় নেই। আর ডক্টর বোসকে একটা ফোন কোরো …সার্টিফিকেট লাগবে।”

 

শিলা গোলাপি কাগজে টেলিগ্রাম পেয়েছিলো: “Father critical. Come soon”. দুপুরবেলা মেয়ের হাত ধরে শিলা দোতলায় উঠে দেখেছিলো বাবার আরাম কেদারায় মা বসে আছে। পঞ্চাশ বছরের সিঁদুর ঘষেও খুব ভালো তোলা যায়নি। নিতান্তই অবিমৃষ্যকারীর মত চলে গিয়েছিলেন বীরেন্দ্রনাথ। তিনটি অপ্রস্তুত ছেলে আর দুটি বিয়ের যুগ্যি মেয়ে রেখে। শুভ্রা শুক্লা । খুকুর বয়স চোদ্দ। সে তার বাবাকে প্রায় চিনতোই না।

 

কেঁদেছিলেন একজন। তিনি ভুবনমোহিনী। বীরুর সংসার সামলাতে কলকাতা এসেছিলেন তিনি। এই ছেলের বাড়া ভাসুরপোর সঙ্গে তার নাড়ির বাঁধন ছিলো। বীরেন্দ্রনাথ যখন “সগ্গে যাওয়র বাঁশগাড়ি”তে চ’ড়ে বাড়ির চৌহদ্দি পেরোচ্ছেন, তিনি খুব মিনতি করে বলছিলেন, “অ বীরু আমারে ফালায়ে যাসনে”। পূর্ণলক্ষ্মীকে বলেছিলেন, “মুখপুড়ি, একটু কাঁদ্ !”
পূর্ণলক্ষ্মী খুড়িমার কথা রাখতে পারেননি।

 

ইতিহাস কি চক্রাকারে ঘোরে? একযুগ পরে ভুবনমোহিনীর যাত্রাকালে পূর্ণলক্ষ্মী ‘এ বাড়ি’র বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডুকরে উঠেছিলেন, “ও খুড়িমা, আমাকেও নিয়ে যান…’ হয়তো ভবনীপুরের বাসা বাড়ির সেই টানা বারান্দাটা মনে পড়েছিলো তাঁর। অথবা মনে হয়েছিলো তাঁকে ‘বুড়ি’ বলে ডাকার আর কেউ রইলোনা। ষোড়শীবালা গিয়েছিলেন ১৯৬৩ তে। জ্যেঠিমা তারও আগে।

 

কেন তিনি মাঘ মাসের সেই দিন কাঁদেতে পারেননি সে কথাটা তিনি সোনাকে বলেছিলেন বহুকাল পরে।

 

-“তোর মামারা যখন ওনাকে নিয়ে চলে যাচ্ছিলো তখন ওনারই শেখানো একখানা কবিতা আমার কানে বাজছিলো:

 

               এতকাল নদীকূলে

 

            যাহা লয়ে ছিনু ভুলে

 

            সকলি দিলাম তুলে

 

                    থরে বিথরে—

 

     এখন আমারে লহ করুণা করে।

 

     ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই— ছোটো সে তরী

 

     আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।

 

            শ্রাবণগগন ঘিরে

 

            ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,

 

            শূন্য নদীর তীরে

 

                    রহিনু পড়ি—

 

     যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

 

 

 

বীরেন্দ্রনাথ ছবি হয়ে গেলেন।  আর কোথ্থেকে পূর্ণলক্ষ্মী এক রাজ্যি সাহস পেয়ে গেলেন। নতুন থান, আলো চালের একবেলার হবিষ্যি, একাদশী অম্বুবাচী কিছুই বাদ রইলো না। কিন্তু পানটি ছাড়লেন না। ঐ নেশাটুকু আঁকড়েই ভাঙা নৌকোর হাল ধরলেন। সঞ্চয়ের তলানির নিক্তি মাপে হিসেব। আয় ব্যয়ের কাটছাঁট  আর রাতভোর আকাশ পাতাল চিন্তা।   সাহায্যের বড় বেশী হাত ছিলোনা চারপাশে। থাকবে সে ভরসা অবিশ্যি তাঁর কোনওদিনই ছিলোনা।
–“তোমার রাগ হয়নি দিদা? মনে হয়নি তোমারও তাদের থেকে কিছু পাওয়ার ছিলো?”

 

একগাল হাসি।
— একেবারে দেবী তো নই…মাঝে মাঝে মনে হতো বইকি…তখন মনকে বোঝাতুম আগের জন্মের ঋণশোধ করছি আর তোর দাদুর ছবির দিকে তাকিয়ে বলতুম, “আমায় শক্তি দাও”।

 

ছবির বোধ শোধ থাকে কিনা কে জানে…কিন্ত এক পা এক পা করে হাঁটতে শিখেছিলেন পূর্ণলক্ষ্মী। ঠিক তাঁর ছায়ায় ছায়ায় পা ফেলে হেঁটেছে তাঁর ছেলের বাড়া মেজমেয়ে করুণা। ছোট ছোট ভাই বোনরা জানতো ছোড়দি আছে। ছোড়দি থাকবে। আরও একজন ছিলেন থেকেও নেই হয়ে। তিনি প্রমোদরঞ্জন সান্যাল। তিনি পৃথিবীটাকে দেখেছেন নানারকমভাবে। পূর্ণলক্ষ্মীকে বলেছিলেন, “আমাকে না দেখিয়ে কোনও কাগজ ফেলবেন না। কোনও কাগজে সই করবেন ন। এমনকি করুণা বললেও না”।

 

আঁচলে চাবির গোছা শক্ত করে বেঁধেছিলেন পূর্ণলক্ষ্মী। তারপর তাকিয়েছিলেন  তিনটে মেয়ের দিকে: মায়া, ছায়া, খুকু। শুভ্রা। শুক্লা। অঞ্জনা। আরও একটা বড় আঘাত তাঁর জন্যে অপেক্ষা করে আছে  যদি জানতেন তিনি…

(ক্রমশঃ )

 

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized and tagged , , . Bookmark the permalink.

2 Responses to পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (অষ্টাদশ পর্ব )

  1. এতো তাড়াতাড়ি এই পর্ব শেষ করে দিলে । সুন্দর একখানা ছবি দেখছিলাম …।।আবার অপেক্ষা

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s