পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (চতুর্দশ পর্ব )


Image

সুদীপ প্রদীপ জন্মেছিলো বাড়িতে। ১৯৪৬ এর মাঝামাঝি কলকাতার চেহারা  এমন নয় যে মাঝরাতে মেয়ের প্রসব বেদনা উঠলেই মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যায়। শিশু-মঙ্গলের এক দাই আর  আঠেরো সন্তানের জন্মদাত্রী ভুবনমোহিনীকে নিয়ে পুর্ণলক্ষ্মীকেই এই গুরু দায়িত্বটি নিতে হয়েছিলো। মেয়েদের কাজ ছিলো ছোটমা’র তত্ত্বাবধানে ওপর নিচ করে গামলা গামলা গরম জল আনা নেওয়া করা, পরিস্কার কাচা কাপড় টুকরো করা আর ছোট ছোট ভাই বোনদের পাহারা দেওয়া। তাদের ভারি মজা লেগেছিলো, বিশেষ করে সেজ আর ন’মেয়ে অণিমা আর মিনতির। তারা মাসি হতে চলেছে !

 

পরে মিনতি তাঁর মেয়েকে গল্প করেছিলেন: “সুদীপকে পরিস্কার টরিস্কার করে মা আর দিদিমণি পান খেতে বসবে, আর ওমনি পাশের ঘর থেকে দাই বললো, “ওগো মায়েরা, পান খেয়ো পরে…আরও একটা আছে বলে মনে হচ্ছে গো…শিগ্গির এসো…বাস্ আবার মা আর দিদিমণি পড়িমরি করে ছুটলেন আর আমি আর সেজদি ছুটলাম ছোটমা’র সঙ্গে তিনতলায় আবার জল ফোটাতে…তখন ভোরের কাক ডাকলো একটা ! সকালবেলা যখন মা’র ঘরে গেলাম, দেখলাম দিদি অঘোরে ঘুমোচ্ছে । দুপাশে দুটো একরকম দেখতে পুতুল। আমার আর সেজদির খুব হাসি পেয়েছিলো ।”

 

বীরেন্দ্রনাথকে যখন নাতিদের মুখ দেখতে ডাকা হয়েছিলো,  তিনি বলেছিলেন. “ওরে বাবা… এ যে দেখছি একসঙ্গে দু দুটো বাঙাল!”

 

ভাগ্যদেবতা আড়ালে বসে হেসেছিলেন। দুই বাঙাল তাদের পিতৃভূমি কোনওদিনই দেখেনি। ওই দুর্নামটিই আনন্দ আর গর্বের সঙ্গে বয়ে বেড়িয়েছে সারাজীবন। নীহার রঞ্জনের কর্মস্থলে দুটি দুধের শিশু নিয়ে ফেরার প্রশ্নই ছিলনা; হিন্দু বি সি এস্ রা তখন অনেকেই চেষ্টা করছিলেন বদলি নিয়ে এপারে চলে আসার। নীহার রঞ্জন তাদের একজন।

 

শোভনা বালীগঞ্জেই রয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর আর শেরপুরে যাওয়া হয়নি। মামারা ভাগ্নেদের নাম দিয়েছিলো জগাই মাধাই।

                                                                                 ***
Image

“MOHAMED ALI JINNAH: His Moslem tiger wants to eat the Hindu cow”
                                                                          (Time  April 22, 1946 )

 

১৯৪৬ এর ১৬ই আগস্ট আগুন ঠিক কিভাবে লেগেছিলো বলা মুশকিল। নানা মুনির নানা মত। কারো মতে  সব নষ্টের গোড়া ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী সোরাবর্দী। তিনি লালবাজারর পুলিশ কন্ট্রোল রুমে গিয়ে নাকি সমস্ত নারকীয় ঘটনাটি পরিচালনা করেন। পুলিশের ব্রিটিশ বড়কর্তার হাত পা তিনিই বেঁধেছিলেন। আর গভর্নর Burrows তাঁর হাতের পুতুল।    

 

–“ কি যে সব দিন গেছে…লোকে যেন ক্ষেপে গিয়েছিলো। শনির ভর হয়েছিলো সবার। শুধু সোরাবর্দীকে দোষ দিয়ে কি হবে বাপু। সে মানুষ গোলমেলে ছিলেন অতি অবিশ্যি করে। সবাই বলাবলি করতো তাঁর নাকি মুসলমান গুণ্ডাদের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিলো… কে জানে…সবই শোনা কথা। ময়দানে মিটিং করে বললেন  পুলিশের দপ্তর তিনিই সামলাবেন ওই দিন। কিন্তু হিন্দু মহাসভাও কিছু ধোয়া তুলসীপাতা ছিলো না বাপু।  এক হাতে কি আর তালি বাজে?  যে দশ বিশ হাজার সে ক’দিনে মরেছিলো তারা কি সবাই  হিন্দু ছিলো?  সেই রক্তারক্তি কি শুধু মুসলমান কসাইরা করেছিলো ? তোদের  বেহারী দারোয়ানরা কি খৈনি খা্চ্ছিলো খাটিয়ায় বসে ? তোমরা বললে আর আমরাও মেনে নিলুম ! যেসব গুণ্ডারা মানুষ কচুকাটা করেছিলো, তারা হিন্দু মুসলমান দুই ছিলো।”

 

তা ছিলো । সালতামামি বলে মরেছিলো  দশ থেকে পনেরো হাজার। আর ঘায়েল কুড়ি হাজার।

 

–“জিন্না তো ডাক দিয়েছিলেন শান্তিপূর্ণ  Direct Action এর। কিন্তু ও কথার যে কোনো মূল্য নেই আমরা সবাই জানতুম। দুই পক্ষই যে অস্ত্রে শান দিচ্ছে সে আর কারো জানতে বাকি ছিলোনা। যেমন প্রফুল্ল ঘোষ তেমন সোরাবর্দী। তার আগের রাতেই উনি বাড়ির ছেলেদের ডেকে বাড়ির পাহারার ব্যাপারে কথা কইলেন। দুপুরবেলা ময়দানে সোরাবর্দী মিটিং করবেন। বাড়ির সব দরজায় তালা পড়লো সকালবেলা।দুবাড়ির খিড়কির কড়া চেন দিয়ে বাঁধা হলো। বাড়ির ভেতর বড় বড় বাঁশ আর ডান্ডা ডাঁই করা। বাড়ির মেয়েদের ছাত বারান্দায় বেরোনো বারণ।  আমার ভয় বাড়ির মেয়েগুলোকে নিয়ে। সব উঠতি বয়সের। প্রথম দুপুর নাগাদ রব উঠলো  ব্রড স্ট্রিটের দিক থেকে…তারপর খালি  কানে তালা লাগানো চীৎকার …”

 

আসল ঘটনাটি ঘটে তারপরেই ।

 

—“উনি এসে বললেন বাড়ির ছোট ছেলেপুলেদের দুটো চিঁড়েমুড়ি খাইয়ে বড় ঘরে পুরে ফেলতে”।

 

 তখনই পূর্ণলক্ষ্মী জানতে পারলেন দীপুকে পাওয়া যাচ্ছেনা। পূর্ণলক্ষ্মী বোধহয় জীবনে সেই প্রথম আর শেষবার ফিট হয়েছিলেন। ব্রজেন্দ্রনাথ। সেজ ছেলে। বড় বরেন্দ্রনাথ আর মেজ বারীন্দ্রনাথ কে নিয়ে বেগ পেতে হয়নি পূর্ণলক্ষ্মীর। কিন্তু সেজটি বরাবরের দামাল। তাকে কেউ পেরে উঠতো না। সেই দিন সে যে কখন বাড়ির লোকেদের চোখে ধুলো দিয়ে মজা দেখতে বেরিয়ে পড়েছে কেউ বুঝতে পারেনি। যখন পারলো তখন সারা কলকাতার রাস্তা ঘাট লাল হতে শুরু করেছে। আকাশ ধূলো আর বারুদে কালো। দুপুর দুটো নাগাদ মিলিটারি নেমেছিলো কলকাতায় রাস্তায়।

 

মায়েদের একটি মস্ত সুবিধে হ’লো তারা কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। বাবারা পারেনা। তারা খানিক স্থানুর মত বসে থেকে, তারপর যেন কিছুই হয়নি এইভাবে অসম্ভব সব কথা বলতে থাকে, যেমন” “খাটের তলা গুলো দেখা হয়েছে?” অথবা, “কয়লার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েনিতো?” এবং এইসব কথার উত্তর দেওয়া কেউ প্রয়োজন বোধ করেনা।

 

এই সময়টায় একটাই মানুষ বীরেন্দ্রনাথর চেয়ারের মাথাটি ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত, ঋজু গলায় তাঁকে বলে চলেছে কাকে কাকে ফোন করা যেতে পারে, বিশেষ করে তাঁর যেসব মক্কেল কর্মসূত্রে  কলকাতা পুলিশের সঙ্গে জড়িত। সে বীরেন্দ্রনাথের মেজো মেয়ে করুণা। কোনওকালেই কান্নাকাটিতে বিশেষ দড় নয়। জীবনে দুইবার তার গলা কাঁপতে শোনা গিয়েছিলো, তাও বহু বছর পরে।

 

এই মেয়েটি বরাবরই দলছুট, খাপছাড়া। বাবা কোনও কালেই এই মেয়েটিকে বুঝতে পারেননি। রাগ করেছেন, অভিমান করে কথা বলাও বন্ধ করেছেন শেষের দিকে, কিন্তু না করতে পেরেছেন শাসন, না পেরেছেন তার সঙ্গে খোলসা করে মনের কথা বলতে। বাবা আর মেয়ের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজটি করে যেতে হয়েছিলো পূর্ণলক্ষ্মীকে যতদিন বীরেন্দ্রনাথ বেঁচেছিলেন…
কথায় আছে “ স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম্….” । যে বাবার সঙ্গে এত ব্যক্তিত্বের সংঘাত, তাঁরই সংসারকে মেয়ে বহুদিন বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলো বীরেন্দ্রনাথ চলে যাওয়ার পর। কিন্তু সে অন্য গল্প।
–“করুণা যখন হবে, তখন আমার শাশুড়ি খুব ভেবেছিলেন ছেলে হবে। ছেলে তো হলো না, কিন্তু ও মেয়ে যে আমার ছেলের বাড়া হবে তাও জেনে যেতে পারলেন না, এইটেই দুঃখ।”

 

থাক সে কথা।

 

দীপুকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো বিকেলবেলা। বালীগঞ্জ থানা থেকে বাড়িতে ফোন এসেছিলো একটি ছোট ছেলেকে তারা উদ্ধার করেছে দুপুরবেলা। তাদেরই গুলি লেগেছিলো ছেলেটির বাঁ ঊরুতে। অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলো ফাঁড়ির মোড়ে।অনেকখানি রক্তপাত হয়েছে। হাড় ভেঙ্গে দুটুকরো হয়ে গেছে। অপারেশন করতে হবে। পুলিশ হাসপাতালে আছে। জ্ঞান ফিরতে বাবার নাম আর বাড়ির ঠিকানা বলেছিলো সে।

ব্রজেন্দ্রনাথের বাঁ পা-টি একটু ছোট হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু তাতে ব্যায়াম বীর হতে তার আটকায়নি। বহুদিন পর্যন্ত তার কাপ মেডেল সাজানো ছিল তার ঘরে। এখনও হয়তো আছে

Image

সব দিনই শেষ হয়। ১৬ই অগাস্টও হয়েছিলো। সন্ধ্যের ঝোঁকে দাঙ্গার কমে এসেছিলো। যদিও সেই নারকীয় উল্লাসের জের চলেছিলো ২২শে অগাস্ট পর্যন্ত।

 

সেই শুরু খেলা ভাঙ্গার খেলা।

 

–“ তোরা তো এত পড়াশোনা করেছিস, বলতো এখানা কার লেখা ?”

 

তেলের শিশি ভাঙল বলে

 

খুকুর পরে রাগ করো

 

তোমরা যে সব বুড়ো খোকা

 

ভারত ভেঙে ভাগ করো !

 

তার বেলা?

 

 

 

ভাঙছ প্রদেশ ভাঙছ জেলা

 

জমিজমা ঘরবাড়ী

 

পাটের আড়ত ধানের গোলা

 

কারখানা আর রেলগাড়ী !

 

তার বেলা ?

 

 

 

চায়ের বাগান কয়লাখনি

 

কলেজ থানা আপিস-ঘর

 

চেয়ার টেবিল দেয়ালঘড়ি

 

পিয়ন পুলিশ প্রোফেসর !

 

তার বেলা ?

 

 

 

যুদ্ধ জাহাজ জঙ্গী মোটর

 

কামান বিমান অশ্ব উট

 

ভাগাভগির ভাঙাভাঙির

 

চলছে যেন হরির-লুট !

 

তার বেলা ?

 

 

 

তেলের শিশি ভাঙল বলে

 

খুকুর পরে রাগ করো

 

তোমরা যে সব বুড়ো খোকা

 

বাঙলা ভেঙে ভাগ করো !

 

তার বেলা?

 

 

 

 

 

ঠিক একবছর পরে পূর্ণলক্ষ্মীর জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো ঢাকার রামবাবুর গলি। ডাংগুলি খেলা বালিকা উঠোন। বীরেন্দ্রনাথ হারিয়েছিলেন বাপ পিতামহের খোড়ো ভিটে। তাঁদের অস্থি মেশানো রুকনির শ্মশান। শোভনার আর শেরপুরে ফেরা হয়নি। নীহাররঞ্জনের বদলি হয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে।শোভনার  শ্বশুর শাশুড়িদের মৃত্যু সংবাদ একে একে পৌঁছেছে পাকিস্তানের ডাক ছাপ  দেওয়া  হলুদ পোস্টকার্ডে।

 

 

 

                                                                                     ****

 

 

 

তাঁর ‘সেতুবন্ধন’ (১৯৯৪) প্রবন্ধে দেশভাগ নিয়ে অন্নদাশঙ্কর লিখেছিলেন:

 

ভারতভাগ আমার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিলো না। কিন্তু বাংলাভাগ ছিলো আমার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। ঘটনাটা একবার ঘটে যাওয়ার পর তাকে মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য গতি ছিল না। বুদ্ধি দিয়ে মেনে নিলে কী হবে, অন্তর দিয়ে মেনে নিতে পারি নি। হৃদয়ে যে বেদনা ছিলো, সে বেদনা এখনও রয়েছে।

 

 

 

 

 

(ক্রমশঃ)

Photo Credits:

Partition: Time https://www.google.ca/search?newwindow=1&biw=1040&bih=691&tbm=isch&sa=1&q=partition+of+India&oq=partition+of+India&gs_
Jinnah: http://martinfrost.ws/htmlfiles/aug2007/part_india11.jpg

Direct Action, Calcutta, August 16, 1946: http://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/8/87/Calcutta_1946_riot.jpg

 

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

2 Responses to পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (চতুর্দশ পর্ব )

  1. Pingback: পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (চতুর্দশ পর্ব ) | Methinks…

  2. আশ্চর্য এই যে অন্নদাশঙ্করের বেদনা অন্য সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালির সংস্কৃতিচর্চায় কিন্তু স্থান পেয়েছে অত্যল্প – ঋত্বিকের অমর সৃষ্টি বাদ দিলে এই বেদনার বহিঃপ্রকাশ আমরা কতটা পেয়েছি আমাদের শিল্পসাহিত্যে বা সিনেমায় ?

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s