পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (দ্বাদশ পর্ব )

Image

শৃঙ্খলে বারবার

 ঝন্‌ঝন্‌ ঝংকার নয় এ তো তরণীর ক্রন্দন শঙ্কার–

 বন্ধন দুর্বার

সহ্য না হয় আর,

 টলমল করে আজ তাই ও।

 

  __”কে কার মধ্যে ক দ্যাখে বোঝা বড় শক্ত। রবীন্দ্রনাথ সুভাষ বোসের মধ্যে দেখেছিলেন হীরে”:

 

কল্যাণীয় শ্রীমান সুভাষচন্দ্র,

 “স্বদেশের চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করবার পুণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছ, সেই কথা স্মরণ ক’রে তোমার নামে “তাসের দেশ’ নাটিকা উৎসর্গ করলুম।”

  শান্তিনিকেতন, মাঘ, ১৩৪৫  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 —“আর সেই মানুষই গান্ধীজির বিষনজরে পড়ে গেল। কেউ দ্যাখে হীরে কেউ দ্যাখে কাঁচ। কোন দর্শনটি যে আসল আজও বুঝলুম না।। তবে হ্যাঁ, ছেলেপুলেদের সে খুব খেপিয়ে তুলেছিলো বাপু। আমরা মেয়েরাও কিছু কম ক্ষেপিনি।  সুভাষ বলতে আমরা অজ্ঞান। আমাদের আর কি দোষ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যেখানে…এক টলাতে পারেননি গান্ধীকে। কে জানে পরে মনে হয়েছিলো হয়ত তিনি ঠান্ডা মাথায় ঠিকই বুঝেছিলেন এ ছেলে দেশকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারবে, গড়তে পারবেনা…”

 

সমুদ্রের ঢেউ চোখে পড়ে আর যে নদীটি শান্ত হয়ে বয়ে চলে তার দিকে কেউ চোখ তুলে চায়না। সুভাষের গর্জন যখন দেশের লোক মুগ্ধ হয়ে শুনছে, তখন আফগানিস্তানের একটি দীর্ঘ শান্ত মানুষ গান্ধীর পাশে ছায়ার মত বয়ে চলেছেন। তিনি আছেন। গান্ধীর পাশে।

 

 — “কেউ বলতো বাদশা খান, আবার কেউ বড় শ্রদ্ধা করে ডাকতো সীমান্ত গান্ধী। গান্ধীর সবকথা যে মানতেন তা নয় কিন্তু সঙ্গ ছাড়েননি কখনো। সেই মানুষ ছিলো গান্ধীর মনের মত। বাদশা তো বাদশাই। যখনই কলকাতায় আসতেন গান্ধীজির সঙ্গে আমার চার মেয়ে দড়ি ছেঁড়া বেড়ি ছেঁড়া হয়ে ছুটতো ঐ মানুষকে চোখের দেখা দেখতে”।  খানিকটা প্রশ্রয়ের হাসি লেগে থাকে পূর্ণলক্ষ্মীর ঠোঁটে।

 

      শোভনা, করুণা, অণিমা, মিনতি। চারটি চার রকমের ।  চেহারা চরিত্র সব আলাদা। তবে কিনা, কথাতেই আছে “জ্যেষ্ঠই শ্রেষ্ঠ”, অন্ততঃ মা বাপের চোখে। এ নিয়ে তিন মেয়ের অনেক রাগ । অনেক অভিমান:

 

“দিদিই তোমার মেয়ে। আমাদের কুড়িয়ে পেয়েছিলে!”

 

তা সে কথা বলার কারণ ছিল বৈকি। শোভনার কারণে বাড়িতে দুটি ঘটনা ঘটে। চৌরঙ্গীর দোকান থেকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলার বড় ঘরে উঠে আসে একটি অর্গ্যান। মেয়ে গান শিখবে। সবাই তাজ্জব। বীরেন্দ্রনাথের মনে যে এই ছিলো ত কি পূর্ণলক্ষ্মী জানতেন ? এই গেল প্রথম ঘটনা। তার পরেরটি আরও ভয়াবহ। একতলার বৈঠকখানা থেকে দোতলার বড়ঘরে এসে পৌঁছোলেন ফ্রক পরা মিস্ স্মিথ। তিনি শোভনাকে ইংরেজী বলা আর অর্গ্যান বাজানো শেখাবেন।

 

–“বোঝো কাণ্ড। একদিকে সাহেব তাড়ানোর সাজস চলছে অন্যদিকে অন্দরমহলে ঢোকালেন খাঁটি মেম! তখন অমন অনেক সাহেব মেম ছিলোরে! ঠাকুরদার ঠাকুরদা হয়তো এসেছিলেন সেই কোম্পানির আমলে বা আর একটু পরের দিকে। এদেরই ছেলেপুলেরা কলেক্টর,জজ্, পুলিশ অফিসার বেশী হত আমাদের সময়ে। এদিকে খাঁটি ব্রিটিশ, চালচলন ঠাটবাট সব এক্কেবারে চোস্ত, কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যেত জন্ম মেদিনীপুর, লিলুয়া, কানপুরের বাইরে যায়ইনি কখনো। এদের ওপর বড় অবিচার করেছিলুম আমরা। ’৪৭-এ এরকম কত যে সে সময়ে চোখ মুছতে মুছতে বিলেত চলে গিয়েছিলো…”
মিস্ স্মিথ কোথা থেকে লাহিড়ী বাড়ির বড় মেয়েকে ইংরেজী শেখাতে এসেছিলেন কে জানে…শুধু পূর্ণলক্ষ্মী মুগ্ধ হয়ে শুনতেন মেয়ের ইংরেজী বুলি।
–“শোভনাকে দেখে খুব মা’র কথা মনে হ’ত। মারও তো কেতাবী শিক্ষা ছিলো…আমারই খালি যতটুকু যা উনি শিখিয়েছিলেন অল্প বয়সে…তারপর আর হ’ল কই?”
   ঝুলি ঝেড়ে পূর্ণলক্ষ্মী একটি ছড়া শুনিয়েছিলেন নাতনীকে:

 

Round and round the garden,

 Like a teddy bear;

 One step, two step,

 Tickle you under there!

 

তারপর আপনমনে খুব একটুখানি লজ্জার হাসি হেসেছিলেন।

 

 

 

মিস স্মিথের কাল শেষ হ’ল যখন বীরেন্দ্রনাথ শোভনাকে গোখলে মেমোরিয়ল-এ ভর্তি করে দিলেন…স্কুলের বাসে চড়ে ফ্রক পরে মেয়ে স্কুলে যেতো। অন্য মেয়েদের বেলা আর অতটা পেরে ওঠেননি বীরেন্দ্রনাথ। সংসারে পুষ্যি বেড়েছে আর মেয়েদের নিয়ে স্বপ্ন দেখার মাপও ছোট হয়ে এসেছে। তাই না অন্য মেয়েদর রাগ? তার ওপর শোভনা আবার একটু বেশী আদুরে বেশী আব্দেরে…নানা বায়নাক্কা তার…রেশমের শাড়ি, স্নো, মাথায় দেওয়ার বিলিতি শ্যাম্পু… সব “বড়লোকের মেয়ে”দের সঙ্গে পড়ার কুফল। কবে যে বাপসোহাগী মেয়ের বয়েস বেড়ে গাছপাথর ছাড়িয়েছে, কবে যে কলেজের পড়া শেষ করে মেয়ে ‘থুবড়ো’ হয়ে বাড়িতে বসেছে,  না বুঝেছেন পূর্ণলক্ষ্মী, না বুঝেছেন পূর্ণলক্ষ্মীর ‘উনি’।

 

দোষ সময়ের।

 

–“বড় গোলমাল রে তখন…সুভাষ বোস জার্মানি জাপান রেঙ্গুন হয়ে কোথায় যে চলে গেলেন… জিন্নার মতিগতিও তেমন সুবিধের নয় তার আগে থেকেই…তার ওপর বোঝার ওপর শাকের আঁটি বিশ্বযুদ্ধ…কলকাতার অবস্থা তখন বড় খারাপ। চতুর্দিকে মার্কিন সেপাই, তেনারা এসেছিলেন জাপানিদের সামলাতে…তারা তখন এই আসে তো সেই আসে…চৌরঙ্গীতে গোলমাল দাঙ্গাহাঙ্গামা লেগেই থাকতো। তখন আবার গোরা পুলিশ দের পাশে পাশে এ্যাংলো ইন্ডিয়ান পুলিশ। খুন জখম রাহাজানি যুদ্ধ পালানো সেপাইদের ধর পাকড়…ধর্মতলা থেকে পার্ক স্ট্রীট, গ্রেট ইস্টার্ন, স্পেন্স আর গ্র্যান্ডের সামনে সমানে পুলিশী টহল। কত যে মাতাল দাঁতাল সেপাই দাঙ্গা বাধাতো তার ইয়ত্তা নেই…আর ফোর্ট উইলিয়ম থেকে গবর্নমেন্ট হাউস বেড় দিয়ে সেই শ্যামবাজার চিৎপুর পর্যন্ত চড়ে বেড়াতো মাউন্টি পুলিশ। দুনিয়ার যত নিষ্কর্মা ইওরোপিয়ান পুলিশ  তখন সাহেব পাড়ায় গিজগিজ করতো। কাজের মধ্যে ছিলো ভরদুপুরে মদ খেয়ে হৈ হৈ মারধোর করা…উনি মাঝে মাঝেই বলতেন “তোমার দুহিতাদের একটু সাবধানে চলাফেরা করতে বোলো…শহরের অবস্থা ভালো না।

 

              তাছাড়া সংসার চালাতে হিমসিম, তোর দাদুর একার রোজগার, নিজেরা ছাড়াও অনেক ক’টি পুষ্যি। বাজার অগ্নিমূল্য…সংসারটিতো জ্যাঠতুতো খুড়তুতো মিলিয়ে কম ছিলোনা ? কবে যে মেয়েটার বিয়ের বয়েস হয়ে গেছে বুঝতে পারিনি”।

 

                শোভনার বিয়ের দেরী হওয়ার আরও একটি কারণ ছিলো। শোভনা কালো মেয়ে। মা-দিদিমার সোনার বর্ণ পায়নি। বাবার কাটা কাটা চোখ মুখ পায়নি। মেয়েদের তুলনায় একটু বেশী লম্বা। দিদিমার আড়া পেয়েছিলো মেয়ে। ছোটবেলা থেকে স্পোর্টস করে আর সাইকেল চালিয়ে যেমন স্কুল কলেজে অনেক সোনা রুপোর কাপ জিতেছিলো, তেমনি শক্ত পোক্ত একটি শরীর ছিল তার। তার ওপর আবার সমবয়সী কাকাদের দলে ভিড়ে লাঠি আর ছোরা খেলাও শিখেছিলো। 
–“তোর দাদুকে বলেছিলাম একবার: দৌড়ে দৌড়ে আর সাইকেল চালিয়ে মেয়ের চেহারাখানি কি হচ্ছে দেখতে পাচ্ছো? বলি, জামাই কি আফগানিস্তান থেকে আসবে? তা ওনার তো ঐরকমই কথা ছিলো, বললেন,  “প্রয়োজনে তাই আসবে”!

 

শোভনার আরও অনেক গুণ ছিলো। দিদিমার শৌখিন বাতিক দুই একটি তার মধ্যেও বর্তেছিলো। কালিয়া কোর্মা, পুডিং , ফ্রুটকেক, নানারকম জ্যাম. স্যান্ডউইচ, এইসব সে খুব পারতো।অর্গ্যান বাজাতো , তেল রং আর জল রং দিয়ে চমৎকার ছবি আঁকতো সে, ভারী মিষ্টি গানের গলা ছিল তার। তবুও…ঐযে “আগে দর্শন ধারি…” করুণার বেলা গল্পটি অন্যরকম তবে এখন সে কথা থাক…

Image

–“তোর বড় দুই মাসির যুগ হলো কাননবালার যুগ। আর একটি ঊর্বশী!  যেমন মুখশ্রী, তেমনই গলা আর এ্যাকটিং। তার আর প্রমথেশ বড়ুয়ার বই এলে শোভনাকে আর ধরে রাখা যেতনা।  তার মত করে চুলে পাতাকাটা, ম্যাগিহাতা ব্লাউজ, কানের ঝুমকো সব তার চাই। করুণা অবিশ্যি বরাবরই একটু আলাদা…”

শোভনার প্রিয় ইংরেজি নভেল ছিলো Wuthering Heights:

 “Be with me always – take any form – drive me mad! only do not leave me in this abyss, where I cannot find you! Oh, God! it is unutterable! I can not live without my life! I can not live without my soul!”

 

 

বহু বহু যুগ পরে যে বোন-ঝি টিকে তিনি ‘মা-গো’ ডাকতেন, তাকে এই লাইন ক’টি মুখস্থ শুনিয়ে বলেছিলেন: “কি বুঝলি?, পারবি এইভাবে ভালোবাসতে?” বলে রিন্ রিন্ করে হেসেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ষাটের কোঠায়।

শোভনার একটি গোপন কথা ছিলো। মণি মুখোপাধ্যায় নামে একটি অল্পবয়সী ডাক্তারের যাওয়া আসা ছিলো বাড়িতে। সে ছিলো শোভনার জ্যাঠতুতো দাদার বন্ধু। সন্ধ্যেবেলা পূর্ণলক্ষ্মীর ঘরে একটি চায়ের মজলিস বসতো। ছোট ছোট চৌকো টুলের ওপর গুছিয়ে বসে তুমুল আড্ডা আর তিনতলার রান্নাঘর থেকে বড় কাঁসার থালায় বসানো গেলাসে আর কাপে অনর্গল চায়ের যোগান। বাড়ির গিন্নী, ছেলেমেয়েরা, তাদের বন্ধুবান্ধব সবার অবারিত দ্বার। সে মজলিসে কে যে কার সুবাদে এসেছে গুলিয়ে যেতো। গান গল্প’র ছড়াছড়ি: দেশের হালচাল, পিসীমার বাতের ব্যামো থেকে গ্রেটা গার্বো, সবই সে আড্ডায় জল চল। মণির সেই আসরে অনিয়মিত যাতায়াত ছিলো। শান্ত, সুন্দর,  ভদ্র। কিন্তু কিসের টানে যে সে আসতো পূর্ণলক্ষ্মীর তা না চোখে পড়লেও তিন বোন ঠিকই বুঝতো। মণিদা এলে দিদি একটু বেশী চুপচাপ হয়ে পড়ে…তার  খোলা হাসি ঠোঁটের মধ্যে আটকে থাকে…কিরকম যেন একটা বাধো বাধো ভাব।

করুণা বরাবরই ডাকাবুকো। শোভনার বিয়ের কথাবার্তা শুরু হতেই সে তার স্বভাবসিদ্ধ ঝঙ্কার তুলে পূর্ণলক্ষ্মীকে বলেছিলো, “বাইরের লোক খোঁজার দরকার কি…মণি-দা ই তো আছে!”
ভারি অবাক হয়েছিলেন পূর্ণলক্ষ্মী: “ও মা বলিস কি…অমন রাজপুত্রের মত ছেলে…তার বাবা মা’র শোভনাকে পছন্দ হবে কেন? তাছাড়া ওরা যে মুখুজ্জে!”

  তারপর কথা আর গড়ায়নি। শোভনার বিয়ে হয়েছিলো অন্য একজনের সঙ্গে। সে আর এক কাহিনী…                                            ***

শোভনার যমজ ছেলে সুদীপ প্রদীপ জন্মানোর কিছু পরেই মণি ডাক্তার নিজের চেম্বারে আত্মহত্যা করেন। কারণ অজ্ঞাত।

মিনতি তার মেয়েকে বহুবছর পরে বলেছিলেন: “দিদির গলা তুই আর কি শুনেছিস…আমার এখনো মনে পড়ে দিদির “কৌন মন লুভায়া…” এক্কেবারে বসানো কাননদেবী…অর্গ্যান বাজছে ঝমঝম করে আর দিদি গাইছে:

যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন

শুধু দূরে যেতে কেন বলো অমন…”

 

(ক্রমশঃ)

প্রচ্ছদ:http://www.dollsofindia.com/images/products/madhubani-paintings/marriage-procession-GC37_l.jpg

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s