পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (একাদশ পর্ব )

Image 

হলুদ বরণ গৌরী যাবে বরণ দোলায় চড়ে

সিঁদুরে চন্দন মুখে রাঙা রোদ পড়ে

কত বহুরি কত ঝিউড়ি শঙ্খ বাজালো

গৌরী যাবে অনেকদূরে আকাশ করে আলো

             *******

  নদী তোমায় জল দিলো তরু দিলো ছায়া

আমি দিলেম স্নেহ যখন ছিলে অসহায়া

পোড়া আঁখি জলে ভাসে হাসিখানি মুখে

লক্ষ্মী হয়ে থেকো যেন সবারই সম্মুখে

 

                          

 

গল্পের মধ্যেও গল্প থাকে।ধরতে পারা চাই।ঠিক যেমন আলোটি যখন ঘোরাচ্ছো তখন কোথায় ছায়াটি পড়বে সেইটে বুঝে নিতে হবে।রাজারাজড়ার গল্প বলা সোজা।কিন্তু যাদের দিন গেলো বৃথা কর্মে রাত্রি গেলো নিদ্রে তাদের গল্প সাতকাহন করে আর কে বলে।ষোড়শীবালার দিশী মেম হয়ে ওঠার ঘটনাটি সবাই জানে।  কিন্তু কেউ জানেনা ষোড়শীবালা একটি দিনের তরেও কেন আর সমুদ্রগড় গিয়ে উঠতে পারেননি। তখনকার দিনে ঐটিই ছিল ধারা। বাপের বাড়ি যেতে চাওয়া বড় লজ্জার ব্যাপার।পূর্ণলক্ষ্মী কোনও দিন সমুদ্রগড় যাননি।শুধু শুনেছেন আর পরে বড়নাতনীকে বলেছেন। মামাদের নাম জানতেন।ব্যস, ঐপর্যন্তই।সম্পর্ক, কুটুম্বিতা কিছুই ছিলোনা।যেমন গল্প শুনেছেন তেমন তেমন মেয়েদের বলেছেন একটু আধটু।

বহুবছর পরে বালিগঞ্জের বাড়িতে ভারি‘আশ্চয্যি’ এক ব্যাপারঘটে।মেজমেয়ে করুণা তখন বর্ধমানের কলেজে পড়ান। ।এক সহকর্মিনীর সুপারিশে এক টাঙ্গাইল শাড়ির ব্যবসায়ী এসেছিলেন শাড়ি বিক্রী করতে।কথায় কথায় বেরিয়েপড়ে  ব্যবসায়ীর বাড়ি সমুদ্রগড়।বারেন্দ্রব্রাহ্মণ।শিকড়ের টান বড় টান।করুণা বলেই ফেলেন দিদিমার বাপের বাড়িরকথা : “আপনি হয়ত চিনবেন না।আপনার বাবা চিনলেও চিনতেপারেন।মা’র দাদামশাইয়ের নাম ছিল শ্রীকালিকিঙ্কর মৈত্র।তাঁর বড়মেয়ে ষোড়শীবালা আমাদের দিদিমা”। শাড়ি বেচতেআসা মানুষটি বড় বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।তারপর খুব আস্তে আস্তে বলেন,  “আপনার দিদিমা আমার পিসীঠাকুমা।ঠাকুর্দার কাছে তাঁর গল্প শুনেছি ছোটবেলায়। আমরা কখনো দেখিনি”।

আর শাড়ি বেচতেআসেননি তিনি।এ ঘটনা যখন ঘটে পূর্ণলক্ষ্মী তখন আর নেই।

মা কেন যাননি সেটা পূর্ণলক্ষ্মী আন্দাজে ধরেছিলেন।ষোড়শীবালাকে জিগেস করার কথা তাঁর ঘুণাক্ষরেও মনে হয়নি।

–“আমাদের সময় বাপের বাড়ির থেকে তত্ত্বতাবাসের চল ছিল খুব।ষষ্ঠী, পূজোএসব ছাড়াও শীতেরতত্ত্ব, গ্রীষ্মের তত্ত্ব…সময়ের ফল মিষ্টি মাছ দিয়ে।তার ওপর শাশুড়ীথাকলে কস্তাপেড়ে শাড়ী বা গরদ।মেয়ে বাপের বাড়ি যাবে, বাবা বা ছোটভাইআসবে তত্ত্ব নিয়ে।বলতে হবে মেয়ের মা‘দেখতে চেয়েছে’।তারপর মেয়ে যখন মাস দুইমাস পরে ফিরবে তখন আরএক  প্রস্থ তত্ত্ব।নাহলে মান থাকেনা। পড়শিরা তত্ত্ব দেখতে এসে ফিরে গেলে ভারী দুর্নাম: “এক্কেবারে ধোয়া-মোছা ঘরের মেয়ে!”।কোথায় পাবেন আমার দাদমশাই? গরীব ব্রাহ্মণ,মেয়ের বিয়েতে মাছতো দূরস্থান, দুটি লুচি মণ্ডাই খাওয়াতে পারেননি! রবিঠাকুরের কবিতাপড়িসনি?

        সোম মঙ্গল বুধ এরা সব

আসে তাড়াতাড়ি ,

এদের ঘরে আছে বুঝি

          মস্ত হাওয়া – গাড়ি ?

রবিবার সে কেন , মা গো ,

           এমন দেরি করে ?

ধীরে ধীরে পৌঁছয় সে

          সকল বারের পরে ।

আকাশ – পারে তার বাড়িটি

          দূর কি সবার চেয়ে ?

সে বুঝি মা তোমার মতো

          গরিব – ঘরের মেয়ে ?”

 

ভারীএক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিলো পূর্ণলক্ষ্মীর নিজের মত করে মানে বুঝে নেওয়ার।‘হাওয়া-গাড়ি’র চেয়ে দেরী করে আসাটিই তাঁর মেয়েলী চোখে ধরা পড়েছিলো । একবার তার নাতনীকে জিগেস করেছিলেন, “বল দেখি রবিঠাকুরের নভেলে কে কার চোখের বালি?” … ‘চোখেরবালি’ বৃত্তান্তটি সভার মাঝে পড়েপাওয়া কথা নয়।মহেন্দ্রর মা রাজলক্ষ্মীর আশালতাকে পছন্দ না হওয়ার কারণটি বড় বিষম: “তাহার তিনকূলে কেহ নাই, তাহর সহিত বিবাহ দিয়া আমার কুটুম্বের সুখ কি হইবে?” এই কুটুম্বের সুখের আটআনা তত্ত্বতাবাসের, লোক দেখানোর আনন্দ…পূর্ণলক্ষ্মীর সংসারী  জ্ঞান তাকেবলেছিলো আশালতা রাজলক্ষ্মীরও চোখের বালি।সাধে কি পূর্ণলক্ষ্মী ‘ভাগ্যিমানী’?  তাঁর বাপের বাড়িতো হাত ঝাড়লেই পর্বত ! কাঁচের খেলনা পুতুল তাই এক আলমারি বোঝাই! সে যাইহোক্…

 একখানি বাক্স ছিল ষোড়শীবালার।তিব্বতী, গিল্টি করা রংচংএ।তাতে একটা তালা দিয়ে রাখতেন সবসময়।দুই বউমার ভারি কৌতূহল ছিল সেই বাক্স নিয়ে।তাঁর মৃত্যুর পর সেই বাক্স ভাঙা হয়েছিলো ঠাকুরঝিকে ‘সাক্ষী’ রেখে।তার থেকে বেরিয়েছিলো একটি সোনার নিবের শেফার্স কলম, একখানি ইংরাজী হাতের লেখা মক্শো করার মরক্কো চামড়ায় বাঁধানো ডায়রি আর দু খানি ন্যাকড়ার মেয়েপুতুল। রং-চটা, পুঁতির গয়না পরা। হয়ত মেয়ের বাক্সে মা ভরে দিয়েছিলেন…ঠিক যেমনটি পূর্ণলক্ষ্মীর সঙ্গে গিয়েছিলো এক বাক্স, বিলিতি কাঁচের।

 

অন্নপূর্ণা দুধের সর।

কাল যাব লো পরের ঘর॥

 

বাপের বাড়ি যাওয়াটি কি চাট্টিখানি ব্যাপার! যেন একটি যুদ্ধ জয়।পূর্ণলক্ষ্মী কেন যেতে পারতেন না দার্জিলিং ? নকুলেশ্বর ভটচায্যি লেন তো বলতে গেলে পাশের পাড়া। ওমনি মাকে দর্শন করেও আসা যায়!

–“তখন অত হুট বলতে বাপের বাড় যাওয়ার চল ছিলো না রে।লোকে মন্দ বলত।বউয়ের বাড়িতে মন নেই!  সংসারের উনকোটি ছত্রিশটি জিনিস গুছিয়ে বুঝিয়ে তবে যাওয়া।তাও আমি যেতুম কালিঘাটে একাদশী অম্বুবাচীতে দুধ, ফল সন্দেশ নিয়ে।আমার বাড়িতে তো আর মুখ আঁধার করা শাশুড়ী ছিলোনা? আমরা তো সাধারন বাড়ির মেয়ে সব…অমন যে ডাকসাইটে ঠাকুরবাড়ি, তাদের বউরা আসত সেই যশোর থেকে…তাদের ধূলো পা টুকু পর্যন্ত হতে পেতো না ! বড় ঘরের বড় বড় ব্যাপার সব ।”

এক্কেবারে খাঁটি কথা পূর্ণলক্ষ্মীর। ঠাকুর বাড়ির বউকুলের শিরোমণি জ্ঞানদানন্দিনী, তাঁকেও বাবামশাইের কাছে কেঁদেকেটে বাপের বাড়ি যাওয়ার ছাড় নিতে হয়েছিলো। তাও আবার জ্ঞানদানন্দিনীর বাবা ভাড়াবাড়িতে উঠে যাওয়াতে সারদা দেবী পষ্ট বলে দিয়েছিলেন তিনি ‘ভাড়াবাড়িতে’  বউ পাঠাবেন না।

কত ছড়া যে কাটতেন পূর্ণলক্ষ্মী…হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অল্প নাচের ছাঁদে দুলে দুলে:

                                মায়ে দিল সরু শাঁখা

                       বাপে দিল শাড়ি।

                       ঝপ্‌ করে মা বিদেয় কর্‌–

                       রথ আসছে বাড়ি॥

                       আগে আয় রে চৌপল–

                       পিছে যায় রে ডুলি।

                       দাঁড়া রে কাহার মিন্‌সে

                       মাকে স্থির করি॥

                       মা বড়ো নির্‌বুদ্ধি কেঁদে কেন মর।

                       আপুনি ভাবিয়ে দেখো কার ঘর কর॥

 

মা মেয়ের গল্পে সময়ে সময়ে গাঁটছড়া।দুটি জীবন ভিন্ন স্বাদের কিন্তু কোথায় যেন কেউ কাঁথার ফোঁড় দিয়ে জুড়ে দিয়েছে ।

আর আমাদের গল্পর গাড়ি এগিয়ে চলেছে ।

 

চল্লিশের দশকটি বড় গোলমেলে।চুলটানা বিবিয়ানার যুগ প্রায় শেষ।  মেয়েরা আর দুপরবেলা দোর দিয়ে শাশুড়ীর চোখ এড়িয়ে বই পড়েনা।রোদ পড়লেই কাঁটা চিরুণি,ফুলেল তেল নিয়ে ঘন্টাভোর মা জ্যেঠিমার কোলের কাছে বসে চুল বাঁধেনা। বিনোদ বেণীর কাল শেষ। মোচা খোঁপা, সতীন-কাঁটা খোঁপা, ওসবের সময় কই?  ইস্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে মেয়েরা গুটি গুটি চলেছে কলেজের দিকে।বেথুন।স্কটিশ চার্চ। বাড়ির মোটরগাড়ি তাদের কলেজের দোরগোড়ায় নামিয়ে দেয়।বেথুন হলে স্বস্তি।ওটি মহিলা মহল।স্কটিশ চার্চ্ বড় যণ্ত্রনা।আঁচলটি যথাসম্ভব বর্মর মত ব্যবহার করে মাথা নিচু করে দলবেঁধে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকো।প্রফেসর এর পেছন পেছন ক্লাসে ঢোকো আবার ঘন্টা পড়লে তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে এসো।তারপর সোজা চলে যাও মেয়েদের কমন রুমে। যতই না কেন তুমি পাশ্চাত্য দর্শন পড়ো, আর পদার্থবিদ্যায় ইউনিভার্সিটির মেডেল পাও, মেয়েমানুষ বই তো নও?

শুরু হয়েছিলো উত্তর কলকাতার পরিবারগুলো দিয়ে। গ্রে স্ট্রীট, রামমোহন রায় রোড, বিডন স্ট্রীট,শ্যামবাজার…এইসব বাড়ির সিংদরজা আগে খুলেছিলো মেয়েদের জন্যে। তবে আস্তে আস্তে পূর্ববঙ্গের কিছু মেয়েও ঢুকছে কলেজে। কলকাতার মেয়েরা তাদের আড়ালে ডাকে ‘বাঙাল মেয়ে’। তারা  ভারী রোখা। লজ্জা শরম কম। ব্যাটাছেলেদের সঙ্গে ট্রামে বাসে চড়ে কলেজে আসে। মাথা খুব পরিস্কার।

–“ইলা মিত্রের নাম শুনেছিস? সে-ই ছিল বেথুনের এক বাঙাল মেয়ে। স্পোর্ট্স করতো কোমরে আঁচল জড়িয়ে। বাস্কেটবল খেলতো। তাজ্জব ব্যাপার!  তখনকার কালে ‘লব্ ম্যারেজ’ করেছিলো।বাপের বাড়ি বদ্যি। বিয়ে করেছিলো নাচোলের জমিদার বাড়িতে। স্বামীর নাম ছিল রমেন মিত্তির। জমিদার হলে কি হয়, ছিলেন ঘোর কম্যুনিস্ট! তার পাল্লায় পড়ে সে মেয়েও পার্টিতে ঢুকেছিলো মাত্র আঠেরো বছর বয়েসে।। তা বাপু ওরকম কম্যুনিস্ট জমিদার আরও ছিল সে সময়ে।”। ইলা সেনের কথা বলতে বলতে পূর্ণলক্ষ্মীর আশি বছরের পুরোনো মুখটি ঝলমলিয়ে উঠেছিলো পড়ন্ত দুপুরে।

 

শুনেছে সোনা। তেভাগা আন্দোলনের ‘রাণী-মা’। জেলখানায় পুলিশ জরায়ূর মধ্যে গরম সেদ্ধ ডিম ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। দেড় বছরের ছেলে শাশুড়ীর কোলে ফেলে দিয়ে জেলে গিয়েছিলেন।আর মা হওয়া হয়নি ইলার। জরায়ূটি ঝলসে গিয়েছিলো। তিনমাস হাসপাতালে। অন্ত্রটিও গিয়েছিলো । বহুদিন কমলা লেবুর রস অল্প অল্প করে খেতে পারতেন শুধু। শরীর আর কোনওদিনই ঠিকমত সারেনি।সোনার জ্যেঠিমাসির বাড়ি ছিল বড়িশায়। বীরেন রায় রোড ইস্টে। একটু ঘুরপথে গেলেই বুগেনভিলিয়ার ঝোপ দেওয়া ইলা মিত্রের ছোট সুন্দর বাড়ি। সেই পথেই ইচ্ছে করে যেত সোনা। মনে মনে বলত “এটা ইলা মিত্রর বাড়ি”। (বাপ্ রে কি ডানপিটে মেয়ে …)

Image

কিন্তু তেভাগা তো ১৯৪৮। সে সময় আসতে এখনো ঢের দেরী। আপাতত ১৯৪৪ এ পূর্ণলক্ষ্মী দশ ছেলে মেয়ের মা। শেষবারের মত গর্ভবতী। বেয়াল্লিশ বছর বয়সে। শরীরও ভাল যাচ্ছেনা তাঁর। কত আর বইতে পারে মেয়েমানুষের শরীর।

অনেক কথা,অনেক মানুষের মুখ। কত জল গড়িয়েছে এর মধ্যে। শোভনা করুনা বিয়ের যুগ্যি।১৯৪৪-এ বিশ্ব যুদ্ধ প্রায় শেয। জাপানী বোমার ভয়ে যারা কলকাতা ছেড়েছিলো, তারা ফিরে আসছে তালাবন্ধ বাড়িতে।আজাদ হিন্দ ফৌজের অধ্যায় শেষ। দক্ষিণের মাঠে মার্কিনী ‘টমি’দের ছাউনি পড়েছিলো তাগুটিয়ে নেওয়া হ’লো রাতারাতি।

–“সেদিন বাড়িতে কি আনন্দ, কি আনন্দ! শুধু তোর ন’মাসি খুব কেঁদেছিলো হাপুস নয়নে। সে তো দ্যাখ না দ্যাখ চলে যেতো ছাউনিতে। আর বাড়ি ফিরতো গুচ্ছের চকোলেট বিস্কুট নিয়ে। একবার মেয়ে জ্বরে পড়েছিলো ।দুইদিন যেতে পারেনি। ছাউনি থেকে কাজের লোকেদের দিয়ে তারা ‘বেবি’র জন্যে এক কৌটো কোকো পাঠিয়েছিলো।মায়ার বয়েস তখন সাত।”।

দেশের আকাশে তখন অনেক তারা। অনেক নক্ষত্রপাত।সূর্য পশ্চিমে ঢলছে।আকাশে কালো মেঘ।

সবাই জেনে গেছে “এক রাজা যাবে পুনঃ অন্য রাজা হবে”। পৃথিবীর সেটাই নিয়ম।

(ক্রমশঃ)

 

ছবি: http://www.gurusadaymuseum.org/images/dolls_toys/dolls_wooden.jpg

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

One Response to পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (একাদশ পর্ব )

  1. Pingback: পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (একাদশ পর্ব ) | Methinks…

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s