পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (নবম পর্ব )

Image

 

 

এ গল্পের আগা-মুড়ো নেই। কখনো পেছোয় কখনো এগোয়। ধীরেন্দ্রনাথের দিন শেষ হ’ল।  তাঁর আট বছরের বড় ছেলে বাবার দাহ সেরে এসে অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে জ্যাঠামশাই-এর সামনে দাঁড়িয়ে সেই সময়ের বর্ণনা করতে যায়। বীরেন্দ্রনাথ হাহাকার করে বলে ওঠেন: “এ বাড়িতে কি এমন একটা মানুষ নেই যে এই ছেলেটাকে আমার সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে?” হারুকে কে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো মনে নেই পূর্ণলক্ষ্মীর।  মেয়েমানুষদের ভগবান আর কিছু দিন আর নাই দিন, ভুলে যাওয়ার ঐশ্বরিক ক্ষমতা দিয়েছেন সর্বকালে সর্বযুগে।। নাহলে সংসার বুঝি অচল হ’ত।

কত আব্দার বীরেন্দ্রনাথের। ছোটবউমা যেন থান না পরেন ।হাত যেন খালি না রাখেন। একাদশী অম্বুবাচী শব্দ দুটো না উচ্চারণ করেন। ভারী অবাক হয়েছিলো সবাই। ওমা, সে আবার কি! বামুনের ঘরের বিধবা বলে কথা। হলোই বা কোলে দুধের মেয়ে!

 

ছোট বউমা

 

তুমি কেমন বড়মানুষের ঝি

তা কাঁচকলাটা কুটতে দেখে খোসায় বুঝেছি

 

রান্নাঘরের দুই ভাগ । মস্তবড় রান্নাঘরের ঠিক মাঝখানে পাঁচিল । একদিকে নিরামিষ হেঁশেল অন্যদিকে আমিষের ছোঁয়া ন্যাপা। সেই নিরমিষ রান্নাঘর হ’ল বাসন্তীর রাজত্ব। সেও ভাশুরঠাকুরের বিধান। এখন থেকে এবাড়ীর খাওয়া দাওয়ার ব্যাপার উনিই দেখবেন। মেয়েদের ঐ এক রোগ। বড় পুতুল খেলতে ভালোবসে। একটি পুতুল ভাঙলে খুব খানিক পা ছড়িয়ে কাঁদো। কোনও এক দিদির মায়া হবে নিশ্চয়ই। তখন সে তার সবচেয়ে পুরোনো রঙচটা পুতুলখানা তোমায় দেবে। তুমি তাকে সাজাবে গোজাবে। ভুলেই যাবে সে পুতুল ধারের। তোমার নয়।

তিনতলার রান্নাঘরের সামনে টানা বারান্দা। দেওয়াল ঠেসান দেওয়া সারি সরি পিঁড়ি। তার কতগুলোতে হাল্কা আল্পনার দাগ। বিয়ের পিঁড়ি সব। পরে সেগুলো কাজে লাগে খাবার বারান্দায় রোজকার পংক্তিভোজনে। তারই একটা টেনে নিয়ে কাজে লাগে ছোটবউ। ঝিরি ঝিরি লাউ। ডুমো ডুমো কুমড়ো। আলুর খোসা ছাড়িয়ে আলাদা আলাদা কাঁসার জলভরা গামলায় আলাদা করে ভিজিয়ে রাখা ঝোলের, ডালনার ভাজার আলু।  এছাড়া আছে খোসা। সেগুলো সরু কুচি করে তাতে পোস্ত মাখিয়ে কালো জিরে শুকনো লংকা ফোড়ন দিয়ে মুচমুচে করে ভাজা। শেষ দুপুরে গিন্নীদের পাতে অমৃত। এছাড়া আছে ডাল বাছা ঝাড়া। একটু বেলার দিকে আসেন পূর্ণলক্ষ্মী। তিনি আবার খুব বলিয়ে কইয়ে মানুষ। দুই জায়ের হাত চলে মশর মশর। তাতে গল্পের ফোড়ন। মাঝে মাঝে হাত থামে বাসন্তীর । আঁচলে হাত মুছে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসি। পূর্ণলক্ষ্মীর ঠোঁটের কোণে হাসি আর পানের রস।

কথা কইতে জানলে হয়।

কথা শতধারে বয়।

দুপুরবেলাটা ফাঁকা বাসন্তীর। সেজদির নানা নেশা। গল্পগাছা, গানশোনা, কুরুশকাঠি নিয়ে লেস বোনা নাটক নভেল পত্রিকা পড়া। বাসন্তীর ওসবে তেমন মতি নেই। তিনতলার ছাতে মন দিয়ে মশলা বড়ি, হিঙের বড়ি, আমসি, আচার…আমাদা কিশমিশ দিয়ে আমের জেলি, তেঁতুলের আচার, সময়ের কৎবেল চিনি কাঁচালংকা আর সরষের তেল দিয়ে মাখা। পিঠ রোদে পুড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু পোড়েনা। একঢাল চুল বাসন্তীর। বটঠকুরের কড়া হুকুম। মাথা মোড়ানো হয়নি । বড় ভাগ্য বাসন্তীর । একাদশীর দিন তাকে চুরি করে জল খেতে হয়নি। অম্বুবাচী তো বারণই ছিল। অসময়ে খিদে পেলে একবাটি মুড়ি খেলে কেউ কখনো বলেনি , “অসময়ে অন্নস্পর্শ করছিস যে বড়?” তবে হ্যাঁ, নিজের মন বড় বাধা। মুসুর ডাল আর পুঁইশাকটি সে খেতো না। রাত্রে খই দুধ। বাড়িতে সন্দেশ থাকলে দুখানি তাই। গরমের দিনে দুটুকরো আম। তাই বলে আমিষ রান্না কি সে ভুলেছিলো? ভাসুরঝিদের রান্নার হাতেখড়ি তাঁরই কাছে। বটঠকুর আবার নিয়ম করেছিলেন ছুটিছাটার দিন মেয়েরা দুই এক পদ পোশাকি রান্না করে বাড়ির লোকেদের তাক লাগিয়ে দেবে। সে খরচ দেবেন বটঠাকুর নিজে। তা শোভনা করুণা যখন রেষারেষি করে রান্না করতো তাদের গতি ছোটমা। আমিষ হেঁশেলের চৌকাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে নাকে চাপা দিয়ে কত কোর্মা কালিয়া শিখিয়েছে সে। পরে অবিশি্য গিয়ে স্নান করেছে, তবে সে নিজের তাগিদে, কারো চোখ রাঙানিতে নয়।

বিকেল গড়ালে ছোট একটা চৌকি টেনে বামুন ঠাকুরকে দিয়ে জলখাবারের পরোটা আর কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে সাদা আলুর তরকরি বানানো। রোজকার পরোটা যেমন তেমন। কিন্তু আত্মীয় কুটুম আসার কথা থাকলে পরোটা মাখা হবে ঘি আর দই দিয়ে। ময়দায় থাকবে কালোজিরে নুন আর একছিটে শুকনো লংকা। বাসন্তী বাঙালবাড়ির মেয়ে নয়। এসবে সে খুব দড়। সন্ধ্যেবেলা বটঠাকুরের লুচির ভার বাসন্তীর। ছোট,গোল ছাঁকা ঘিয়ে ভাজা।

কোথায় চল্লিশের দশক আর কোথায় লুচি!  তবে কিনা রসে বশে বাঙালী। সায়েব ঠ্যাঙানো চলছে চলুক, লুচিটি ছাড়া চলবেনা।

সাহেব মেরেছি, বঙ্গবাসীর কলঙ্ক গেছে ঘুচি

মেজবৌ কোথা ডেকে দাও তারে কোথা ছোকা কোথা লুচি?

এখনো আমার তপ্ত রক্ত উঠিতেছে উচ্ছাসি

তাড়াতাড়ি আজ লুচি না পাইলে কী জানি কী করে বসি

স্বামী যবে এল যুদ্ধ সারিয়া, ঘরে নাই লুচিভাজা!

আর্য নারীর এ কেমন প্রথা সমুচিত দিব সাজা।

                                        শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

                                                                                *****

আপাততঃ নটে গাছটি লতিয়ে লতিয়ে পিছু হটছে। ১৯৪১-৪২। ক্রান্তিকাল।

 

 ১৯৪১সালের ১৪এপ্রিল শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের জীবনের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক ভাষণ।শরীর দুর্বল বলে তিনি নিজে ভাষণটি পাঠ করতে পারেননি।তাঁরউপস্থিতিতেই সেটি পাঠ করে শোনান ক্ষিতিমোহনসেন।ভাষণের শিরোনাম ছিল সভ্যতার সংকট

এই বিদেশীয় সভ্যতা , যদি একে সভ্যতা বলো , আমাদের কী অপহরণ করেছে তা জানি ; সে তার পরিবর্তে দণ্ড হাতে স্থাপন করেছে যাকে নাম দিয়েছে Law and Order, বিধি এবং ব্যবস্থা , যা সম্পূর্ণ বাইরের জিনিস , যা দারোয়ানি মাত্র। পাশ্চাত্য জাতির সভ্যতা অভিমানের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা অসাধ্য হয়েছে । সে তার শক্তিরূপ আমাদের দেখিয়েছে , মুক্তিরূপ দেখাতে পারে নি । অর্থাৎ, মানুষে মানুষে যে সম্বন্ধ সবচেয়ে মূল্যবান এবং যাকে যথার্থ সভ্যতা বলা যেতে পারে তার কৃপণতা এই ভারতীয়দের উন্নতির পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দিয়েছে ।(…)

 

৭ই আগস্ট,  ১৯৪১আনন্দবাজারের প্রথমপাতার শিরোনাম হবে “রবি অস্তমিত”।

 

—“অনেক বাড়িতে সেদিন অরন্ধন। আমার মাথার মধ্যে শুধু খেলা করছিলো:

 

“চারি দিকে তার কত আসা-যাওয়া ,

কত গীত , কত কথা —

মাঝখানে শুধু ধ্যানের মতন নিশ্চল নীরবতা ।

দূরে গেলে তবু ,একা

সে শিখর যায় দেখা —

চিত্তগগনে আঁকা থাকে তার

নিত্যনীহাররেখা ।’ “

 

রবীন্দ্রনাথের কথা উঠলেই পূর্ণলক্ষ্মী যে কেন বারবার ‘সোনার তরী’তে ফিরতেন, তা জানতেন শুধু তিনি ।

আর পরে জেনেছিলো তাঁর নাতনী, সোনা।

                                                                              *****

 

 Image

 

“I have pledged the Congress and the Congress will do or die.”

                                         M.K Gandhi ‘Quit India Resolution’

 

 

আর একটি সূর্যও সেই সময়ে ডুবছিলো। বড় গর্ব ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের। তাদের সূর্য নাকি ডোবেনা।১৯৪২-এর মার্চ: ক্রিপ্স্ মিশন।

–“বলি যুদ্ধ শুরু হয়েছে যে…ভারতকে সামিল না করে উপায় আছে ব্রিটিশের? ওদিকে যে জাপানিরা ধেয়ে আসছে! তাই না সব দল বেঁধে ভারতে আসা? মুখপোড়ারা বলে কিনা পূর্ণ স্বরাজ নয়, ‘ডোমিনিয়ন স্টেটাস’।তবে কার সঙ্গে লড়ছে সে বোঝার ক্ষমতা সাহেবদের ছিলো না। ছোট্টখাট্টো মানুষ, মুখে হাসি লেগেই আছে, তাও …সেই শ্লোক আছেনা, “বজ্রাদপি কঠোরাণি কুসুমাদ্ কোমলানি চ” ,গান্ধিজী ছিলেন তেমন মানুষ। না তো না-ই। হয়তো তাঁর সব সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারিনি আমরা,  কিন্তু তিনি না থাকলেও যে কার্যসিদ্ধি হত একথা আমি মনে করিনে!। বলি রবীন্দ্রনাথও কি ওনার সবকথা মেনে নিতে পেরেছিলেন? তাও গান্ধিকে ‘মহাত্মা’ ডাকতে তো তাঁর বাধেনি?”

৮ই অগাস্ট, ১৯৪২। ‘ভারত ছোড়ো’ আন্দোলন ঘোষণা । পরেরদিন ভোর সকালে কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতারা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। প্রায় ঘুম থেকে তুলে তাঁদের জেলে পোরা হয়েছিলো।
—“ওরে শুধু কি পুরুষ মানুষে রাস্তায় নেমেছিলো? মেয়েরাও তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লাঠির বাড়ি খেয়েছিলো। খবরের কাগজে তাদের ছবি দেখতুম আর গর্বে আমার চোখে জল আসতো। কি আগুনের টুকরো মেয়ে সব!”

হক্ কথা পূর্ণলক্ষ্মীর। আগুনের টুকরো মেয়ের অভাব ছিলোনা তার এক যুগ আগে থেকেই। মণীন্দ্রনাথ যখন  শহীদ হ’ন, তারই কিছু আগে পরে বীনা দাস গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে গুলি করেছিলেন। একবার নয়। পাঁচ পাঁচবার।অপটু হাতের গুলি লাগেনি। নয় বছর বন্দী থেকে ছাড়া পেয়েই কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। ‘ভারত ছোড়ো’ তে সামিল ছিলেন তিনিও। এইরকমই আরো অনেক। তাদের দেখলেই চেনা যেত। রোগা দোহারা গড়ণ। চুল টেনে বেণী বাঁধা। কারও বা মাথায় হাল্কা একটু ঘোমটা। কারো কারো কপালে ছোট্টো একটি টিপ। গাছকোমর জড়ানো খদ্দরের মোটা শাড়ি। এই সব মেয়েদের জন্যে ছিলো গৌরব আর ইতিহাসের পাতা।

                                                                                                      ****

বাসন্তী কবে যেন বুড়িয়ে গিয়েছিলেন। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। হারু আর শুনু চাকরিতে থিতু হয়েই অফিসের বাড়ি নিয়েছিলো মা’কে নিজের সংসার দেবে বলে। বাসন্তী খুব কেঁদেছিলেন। পূর্ণলক্ষ্মী তাঁকে বেঁধে রাখার একটুও চেষ্টা করেননি। বলেছিলেন: “ছি অমন কাঁদতে নেই। অনেক কষ্ট পেয়েছো; যাও, নিজের সংসারে রাণীর মত থাকো”।

চলে গিয়েছিলেন বাসন্তী। যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছেন পূর্ণলক্ষ্মী ছুটে গিয়ে বলেছিলেন: “ও বাসন্তী, ছোট্ ঠাকুরপো’র ছবিখানা তো নিলিনে!”

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বাসন্তী বলেছিলেন: “ও দিয়ে আর আমি কি করবো সেজদি। তোমার কাছেই থাকুক”।

(ক্রমশঃ)

 

 

 

পটচিত্র:http://sahapedia.org/wp-content/uploads/2013/10/Sringar-Water-Colour-on-Paper-National-Gallery-of-Modern-Art1.jpg n

 Gandhi: http://www.google.ca/imgres?imgurl=&imgrefurl=http%3A%2F%2Fwww.vividmagazine.in%2Fquit-india-movement-a-revolution%

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized and tagged , , . Bookmark the permalink.

4 Responses to পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (নবম পর্ব )

  1. Pingback: পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (নবম পর্ব ) | Methinks…

  2. Boudi Ami Soumendra Malysia theke………Hothat jogajog…youtube-e tomar channel theke….Bhalo theko…jogajog rakhbo-i…..

  3. একটা কমেন্ট উধাও হয়ে গেল মনে হচ্ছে…আবার লিখি :

    এ গল্প যে “কখনো পেছোয় কখনো এগোয়” তাতেই জমছে বেশি । লিনিয়ার ন্যারেটিভে এত বর্ণময় পার্শ্বচরিত্রকে যথাযোগ্য স্থান দেওয়া মুশকিল হত, কাহিনী কিছুটা আকর্ষণ হারাত ।

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s