পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (অষ্টম পর্ব )

Image

“শৈবলিনী যত বৎসর সই শব্দ শুনে নাই, শৈবলিনীর সেই এক মন্বন্তরএখন শুনিয়া শৈবলিনী সেই অনন্ত জলরাশি মধ্যে চক্ষু মুদিল
‘চন্দ্রশেখর’ শ্রী বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

 

 

 

গান যে কতরকম ছিল তখন…পূর্ণলক্ষ্মীর  পছন্দ ছিল কমলা ঝরিয়া। ‘রজনী প্রভাতে মাতা যশোমতী’, ‘তোমারি গরবে গরবিনী হাম’, ‘মাধব বহুত মিনতি করি তোয়’, ‘গোকুল ছাড়ি যবহু’, ‘না হ দরশ সুখ’, ‘সজনী অব কি করকি’, ‘কানু পরিবাদ মনে ছিল সাধ’, ‘সখি না বলা বচন আন্’, ‘কাতরা রাধিকা দেখিয়া অধিকা’, ‘কহিও কানুরে সই’, ‘ধিক্ ধিক্ তোরে নিঠুর’, ‘সই কে বলে পীরিতি ভাল’,…সে বলে আর শেষ করা যায়না…তবে  যতই লোকে যাই বলুক, তার ছিল কীর্তন। গ্রামোফোন কোম্পানির কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি!

শ্রীমতী কমলার গান আজকাল কোন বিশেষণের অপেক্ষা রাখে নাচাঁদের আলো যে সুন্দর, বনের কোকিলের কুহুধ্বনি যে মনোহারী কথা  বলে বোঝাবার দরকার হয় নাগতবার শ্রীমতী কমলার দুটি ভাটিয়ালী গান আমাদের চোখে অশ্র“ হয়ে দুলেছে, এবারে তাঁর দুটি কীর্ত্তন শোনাচ্ছি

কীর্ত্তন বাঙ্লার প্রাণের গানবাঙ্লার জলে স্থলে, গগনে পবনে, রাঙা পথের ধূলিতে যে প্রেমের চন্দনরেণু ছড়িয়ে রয়েছে, কীর্ত্তন গান সেই অবিনশ্বর প্রেমের মধুর মন্ত্রতাই কীর্ত্তন আজও পুরাণো হয় নিশ্রীমতী কমলা  প্রাচীন বৈষ্ণবকবির পদাবলী গেয়েছেনদু’টি গান যেন প্রেম-বিহ্বলা রাধিকার অশ্র“-সজল দু’টি আঁখি।… (‘হিজ  মাস্টার্স  ভয়েস  নূতন বাংলা রেকর্ড’, নভেম্বর ১৯৩৪)

 

এ একেবারে খুব সত্যি কথা। সংসারর পয়সা পাই পাই করে জমিয়ে ঐ নেশার খোরাক যোগাড় করতেন পূর্ণলক্ষ্মী। এইসব কেলেংকারির সাথী ছিলো ছোট্ ঠাকুরপো।

_  “তারও ঐ একই সর্বনেশে নেশা ছিল কিনা। নতুন গান বেরোলেই একবার উঁকি দিয়ে দেখে নেবে সেজদাদা আছেন কিনা। তারপর বারান্দায় দাঁড়িয়ে উদাস গলায় বলবে: ‘শুনে এলাম..ওঃ এবারের খানা যা হয়েছে না… “চারু চরণ চারণ চিত্ত চোর বনোয়ারী’ আর ‘ব্রজ বধূগণ দুকূল হরণ রাস রসবিহারী’ …”

ব্যস্ আমিও ওমনি ধরে পড়লুম। যতক্ষণ না সে রেকর্ডখানা হস্তগত হচ্ছে আমার মনে শান্তি নেই। যেদিন কিনে আনবে সেদিন তাকে ভালো করে চা খাওয়াতে হবে। পেতলের গেলাসে দুধ চিনি দেওয়া চা নয়। দস্তুর মত English Tea!  (ছি, My Lady, তোমার বাবা না সায়েব? ) আলমারি থেকে কাপ প্লেট টি-পট বার করে পট গরম জলে ধুয়ে তাতে দার্জিলিং এর চা ভিজিয়ে বসে থাকো। অল্প একটু তেল ওপরে ভাসবে, তখন বুঝবে লিকরটি হয়েছে। তারপর তাতে উষ্ণ দুধ দাও অল্প। বেশী গরম দুধে চায়ের গন্ধ উড়ে কবিরাজী ক্বাথ হয়ে যায়”।

পূর্ণলক্ষ্মীর একটু চায়ের নেশা কলকাতা আসার পর থেকেই। ভাইরা যখন কলকাতায় আসতো , মা জামাইয়ের জন্যে একটি বড় কৌটো কাপড়ে সেলাই করে পাঠাতেন। সে চা এজমালি চা নয়। আত্মীয় কুটুম্বদের জন্যে।  আর খুব কালে ভদ্রে নিজের জন্যে। শুধু নিজের জন্যে।

 Image

 

— “বাড়ির আটপৌরে চা ছিলো সাদামাটা আসাম টী। সে চা দেওয়া হত ছোট ছোট কাঁসার গেলাসে। তবে আমি খেতুম বড়, মোটা কাঁচের গেলাসে। মা যখন শীতকালে কলকাতায় থাকতেন তখন পেয়ালা পিরিচ লাগতো। মা কে গেলাসে চা দেবো কি? তাঁর আবার গলা উঁচু হত না। তাঁর “এক কথা মরণ সমান”।

 

শ্রীযুক্তা ষোড়শীবালা দেবী। পূর্ণলক্ষ্মীর গর্ভধারিনী। তাঁর কথা এখন নয়।  এখন শুধু ধীরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী । বীরেন্দ্রনাথের সবচেয়ে ছোট ভাই। । পূর্ণলক্ষ্মীর সব বায়নাক্কা বয়সে বছর দুয়েকের ছোট এই দেওরটির কাছে। বীরেন্দ্রনাথ ব্যস্ত থেকে ব্যস্ততর। তাঁর অত ছেলেমানুষির সময় কোথায়?  তাছাড়া বীরেন্দ্রনাথের আরও একটি কাজ ছিল যা তিনি গোপনে করতেন। পূর্ণলক্ষ্মী তা জেনেছিলেন বেশ কিছু পরে।

–“আঙুলের পাঁচটা আঙুল সমান হয়না রে… আর ভাই বোনদের রকম-ফের হয় সবথেকে বেশী। উনি ছিলেন যেমন গম্ভীর, ছোট্ ঠাকুরপো ছিল তেমন ছেলেমানুষ। চেহারাতেও কোনও মিল ছিল না দুজনের। আর তার ছিল গান আর থিয়েটারের নেশা। কবে কোন নাটক নামছে সব তার আঙুলের ডগায়। বলা নেই কওয়া নেই দুম করে এক হার্মোনিয়াম কিনে বসে রইলো! খুব ভালো হার্মোনিয়াম বাজাতো সে। আমার হাতেখড়ি তারই কাছে।  ভেবে চিন্তে কাজ করা তার পোষাতো না। হঠাৎ একটা প্রভাত ফেরির দল খুলে ফেললো!  ওনাকে সবাই ভয় পেতো কিন্তু ছোট্ ঠাকুরপো কে উনি পেরে উঠতেন না।  খুব রেগে গেলে বলতেন. “তোমার এই দেওরটি আমার মৃত্যুর জন্যে দায়ী হবে”। যখন বোঝাতে যেতুম, বলতো, “এসব কথা তোমার, না His Majesty’s version?, ভালো করে ভেবে দেখো, একটা কথাও বাদ পড়েনি তো? ”

বেলা বাড়ে সম্পর্ক বদলায়। একদিন বীরেন্দ্রনাথ বাড়ি ফিরে বললেন “ ধীরেনের তো এবার একটা বিয়ে দিতে হয়। তাঁকে আজকাল প্রায়ই থিয়েটার পাড়ায় দেখা যাচ্ছে। এবার একটু বাঁধনের সময় হয়েছে বোধহয়”।
–“আমাদের যুগ শিশির ভাদুড়ীর যুগ। যেমন নাট্যকার তেমন এ্যাকট্রেস সব। প্রভা, কৃষ্ণভামিনী…দাপুটে অভিনেত্রী সব। শিশির ভাদুড়ির বই মানেই প্রভা ছিল একসময়ে। ‘শাহজাহান’ ‘বলিদান’ ‘প্রফুল্ল’। কি সব পার্ট: ‘সরমা’য় সীতা, ‘দশের দাবী’তে নন্দিনী, ‘শ্যামা’তে শ্যামা , ‘রীতিমত নাটক’এ সান্ত্ত্বনা,  হৈ হৈ কাণ্ড, রৈ রৈ ব্যাপার!  ‘শেষ রক্ষা’য় প্রভা ইন্দুমতী তো কৃষ্ণভামিনী কমলমুখী। এ বলে আমায় দ্যাখ্ তো ও বলে না,  না আমায় দ্যাখ্! বড় দুঃখী মেয়ে ছিল রে এরা। প্রভা দেবী তো শিশির ভাদুড়ি কে ‘বাবা’ ডাকতেন…তাও  কত কথা…দানীবাবু তারাসুন্দরীর কথা তো ছেড়েই দিলাম!”

পূর্ণলক্ষ্মী একটা কথা বীরেন্দ্রনাথকে বলেননি। যদি বীরেন্দ্রনাথ জানতে পারতেন যে তাঁর ছোটভাই ১৫৮/সি রাসবিহারী এভিনিউয়ের একটি বেশ বড়োসড়ো তিনতলা বাড়ির সামনেও মাঝেমাঝে ঘোরাঘুরি করে তাহলে আর রক্ষে থাকতো না।  সে বাড়িতে থাকতেন কমলা ঝরিয়া।  যদি বাইরে থেকে একটু রেওয়াজ শোনা যায়! সেই আশাতেই মাঝে মাঝে পৌঁছে যেতেন ধীরেন্দ্রনাথ। সুরের টান মানুষকে কেমন পাগল করে কি করে জানবেন তাঁর সেজদাদা!

— “তাকে সবাই বলতো খারাপ মেয়ে। যার গলায় সরস্বতীর ভর সে কি করে খারাপ মেয়ে হয়, শুনি! তাছাড়া সারাটা জীবন একটা মানুষকেই তো ভালোবেসে ম’রে রইলো। কত গঞ্জনা কত অপমান…সে হ’লো খারাপ মেয়ে !”

‘শ্রীমতী’ কমলা আর তুলসী লাহিড়ীর সম্পর্ক ছিল আলোর মত সহজ। সর্বজনবিদিত। কষ্ট পেয়েছেন দুজনেই। ১৯৩৬ সালের দিকে কলকাতার চিৎপুরে হিজ মাস্টার্স ভয়েসের যে রিহার্সেল-বাড়ি বিষ্ণু-ভবন – তার সামনেই ভাড়াটে গুণ্ডাদের হাতে তুলসী লাহিড়ীকে লাঞ্ছিত পর্যন্ত হতে হয়। এই ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী, ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা । ১৯৫৯-এর ২২ জুন তুলসী লাহিড়ীর মৃত্যু কমলা ঝরিয়ার রাসবিহারী এভিনিউয়ের বাড়িতেই। কাছের মানুষ ইন্দুবালা তাঁর ২৩ জুন তারিখের ডায়েরিতে লিখেছেন : ‘আজকের পত্রিকায় তুলসী লাহিড়ী মহাশয়ের মৃত্যুসংবাদে বড়ই ব্যথা পেলাম, …(ঝরিয়া) কমলার আজ বড় মনকষ্ট।’

 

মেয়েদের ব্যথা মেয়েরাই বোঝে। অথবা বোঝেনা।

     খুব তাড়তাড়ি বিয়ে ঠিক হয়েছিলো ধীরেন্দ্রনাথের। পাত্রী পূরণলক্ষ্মীর মা’র গ্রামসম্পর্কে ভাইঝি। সরল, লাজুক, শ্যামলা দোহারা গড়ন। সামনের দুটো দাঁত একটু উঁচু।  কিন্তু কপালের গড়নটি আর চোখদুটি বড় সুন্দর। চোখ নিচু করলে চোখের পাতার ছায়া গালে পড়ে। নাম বাসন্তী। বরণ করে ঘরে তোলার পর স্বভাবসিদ্ধ হাসি হেসে ধীরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন , “যাক্, সেজঠাকরুণের রূপের দেমাক ঘুচলো না তাহলে!” বাসন্তী বড় ভালো মেয়ে। বীরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “বাপের বাড়ি থেকে বেশী কিছু আনেননি বলে ছোটবউমার যেন কোনো অপমান না হয়”। হয়নি। শুধু ভুবনমোহিনী পূর্ণলক্ষ্মীকে আড়ালে ডেকে বলেছিলেন. “আ-লো,  তোর কি ভীমরতি ধরিছে? ঐ সোনার গৌরাঙ্গের পাশে…”।

কিছুদিন পরেই চাকরি বদলে ধীরেন্দ্রনাথ চলে গিয়েছিলেন জলপাইগুড়ি। সে সংসারে  কখনো যাননি পূর্ণলক্ষ্মী। তবে ছেলেমেয়েরা গরমের ছুটিতে দার্জিলিং যাওয়ার পথে ছোটকাকার বাড়ি গেছে। তারা ফিরলে গল্প শুনেছেন তিনি। তাঁর ন’মেয়ে শীলা ছোটমার ভারি ভক্ত।

–“জানো মা, ছোটমা খুব ভালো রান্না করে। এত্ত বড় ইলিশ এনেছিলো ছোটকাকা। ছোটমা পেটি গাদা আলাদা করেনা। আর যখন ভাত রান্না করে তখন তাতে একটু ঘি দেয়। আর ছোট মার একটা এইটুকুনি ছেলে হয়েছে। আমাকে কোলে নিতে দিয়েছে”।

ছোটকাকা ওখানেও একটা ছোট প্রভাত ফেরির দল খুলেছে মা। ভো—রবেলায় হার্মোনিয়ম গলায় ঝুলিয়ে বেরোয়। তারপর অফিস যায়”।

একে একে চার ছেলে আর দুই মেয়ে হয়েছিলো বাসন্তীর। ছোট মেয়ে তনিমা। তনু। তনু যখন তিনমাসের তখন পূর্ণলক্ষ্মী একটা চিঠি পান। বাসন্তীর অপটু হাতে লেখা। ধীরেন্দ্রনাথ অসুস্থ। রোজ জ্বর হয়। কাশলে মুখ দিয়ে রক্ত পড়ে।  বীরেন্দ্রনাথ নিজে গিয়েছিলেন জলপাইগুড়ি। ফিরেছিলেন সবাইকে নিয়ে। দোতলার তিন নম্বর ঘরখানাতে জায়গা হয়েছিল ধীরেন্দ্রনাথের। সে ঘরে ডাক্তার ছাড়া যেত শুধু দুইজন।  পূর্ণলক্ষ্মী আর বাসন্তী। বীরেন্দ্রনাথ যেতে পারতেন,  কিন্তু যেতেন না। ( ও হতভাগার মুখ দেখতে চাইনা। আমাকে মারার ষড়যণ্ত্র করেছে)।

তিনমাস বেঁচেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ। যাওয়ার আগের দিন পূর্ণলক্ষ্মীকে  একা ঘরে ডেকেছিলেন তিনি।

— “আমাকে বললে: ‘এদের রেখে গেলাম। দেখো তুমি’। আমি বললুম ‘যাওয়া অত সোজা নয়। কি করে যাও দেখবো’। শেষ সময়েও হাসিটি ঠিক একই রকম ছিল। আমায় বললে: ‘ভেবেছো আমি মরলে তুমি মুক্তি পাবে? দেওয়ালে ছায়া পড়লেই বুঝবে সে আমি’। ভোর রাতে চলে গেল। মনে হ’ল হাসছে। তনু তখন ছয়মাসের মেয়ে।”

রাতে কি দেওয়ালে ছায়া পড়তো?  ভয় পেতেন পূর্ণলক্ষ্মী?

নাতনীর প্রশ্ন।

–“একটুও না। নিজের ছায়াকে কেউ ভয় পায় ?!”

না।

(ক্রমশঃ)

 

কালিঘাটের পট: http://natsybydesign.com/Folk-Paintings?limit=50&page=2

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

One Response to পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (অষ্টম পর্ব )

  1. Pingback: পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (অষ্টম পর্ব ) | Methinks…

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s