পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (ষষ্ঠ পর্ব)

babu bibi

পূর্ণলক্ষ্মীর জ্যেঠামশাই কেন ঢাকার ব্যবসাপত্র গুটিয়ে বাড়ি বেচে কলকাতায় থিতু হয়েছিলেন দেশভাগের বছর পনেরো আগে সে কথাটি পরিস্কার নয়। বড় টান ছিল ঐ বাড়ির পূর্ণলক্ষ্মীর শেষজীবন পর্যন্ত। ৭২-এ শোভনা যখন বাংলাদেশ যান, পূর্ণলক্ষ্মী পই পই করে বলে দিয়েছিলেন যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাল ইঁটের বাড়ি গুলো আর পুরোনো ঢাকার রামবাবুর গলিটা একবার ঘুরে আসে। শ্রী রামচন্দ্র ভট্টাচার্য্য পূর্ণলক্ষ্মীর জ্যেঠামশাই । তখনকার আমলের বড় কন্ট্রাকটর ছিলেন।পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর বানানো। গলিও তাঁরই নামে। গিয়েছিলেন শোভনা। ফিরে এসে জানিয়েছিলেন: “সে গলির নাম বদলায়নি। তবে, বড়দাদুর বাড়ি এখন এতিমখানা, মা!”। খুব খুশী হয়েছিলেন পুর্ণলক্ষ্মী। গরিব দুঃখীর ভোগে লাগছে জ্যেঠামশাই আকাশ থেকে দেখছেন।
কিন্তু সেবাড়ি আর নকুলেশ্বর ভটচাযি্য লেনের বাড়ির আকাশ পাতাল তফাৎ। বাইরের বাড়িতে মাত্র একখানা বৈঠকখানা ঘর । তাতে আধখানা ঘর জুড়ে এক তক্তপোষ, তার ওপরে সাদা চাদর মোড়া গদি আর ক’খানা তাকিয়া। আশেপাশে ক’খানা সিংহের পা কেদারা আর দেওয়াল জুড়ে সারি সারি মনীষিরা। বিদ্যাসাগর, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র, আরও নানা মুনিঋষি। তবে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন না।
“ ও দিদা, জ্যেঠামশাই রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলেন কেন?” অপরাধীর মত মুখ করে পূর্ণলক্ষ্মী জবাব দিয়েছিলেন: “নাটক নবেল লেখা মনিষ্যি উনি পছন্দ করতেন না। বলতেন ওসব পুরুষমানুষ গেরস্থবাড়ির বউ ঝিদের ক্ষেপিয়ে তোলে”। মুখে কাপড়চাপা দিয়ে হাসি: “বঙ্কিম-এর কথা আলাদা তিনি আমাদের মন্ত্র দিয়েছেন”। তা ঠিক। ঠাকুর বাড়ির ছোট ছেলেটি যখন একটা সদ্যজাত দেশকে জাতীয়তাবাদের বীজমন্ত্র দিয়েছিলেন, রামবাবু তার বহু আগে গত হয়েছেন।
যাই হোক্, সেই বৈঠকখানার সামনে রোয়াক আর সেই রোয়াক থেকে বৈঠকখানার পাশ দিয়ে সোজা অন্দর মহলে ওঠার সিঁড়ি। সিঁড়ির পেছন দিকে উঠোনে যাওয়ার রাস্তা। সেদিক দিয়ে যাতায়াত শুধু বাড়ির পুরুষদের আর কাজের লোকদের। মেয়েদের কল তলায়, স্নানের ঘরে যাওয়ার সিঁড়ি অন্দরমহলের ছাদের সিঁড়ি দিয়ে। দোতলায় মেয়েদের রাজত্ব। খানপাঁচেক ঘর ।সবচেয়ে বড় ঘরটি জ্যেঠিমার। সেঘরে তিনি থাকেন তাঁর নাতি পুতিদের নিয়ে। দুপুরে সেঘরেই বসে পাড়ার গিন্নীদের আড্ডা। বউরা মাটিতে। তাও শাশুড়ি চোখের ইশারা করলে উঠে যেতে হবে। বৌ-মানুষদের অত কৌতূহল ভালো না! সেই পাঁচখানা ঘর বেড় দিয়ে ছাদ। আলসেতে বড় বড় কলস। সেই ছাদ দিয়ে মেয়েদের উঠোনে নামার সিঁড়ি। পূবদিকে তুলসী মঞ্চ আর বাকি সমস্তটাই মহিলামহল। আচার, বড়ি, মশলা কুল শুকোনো। লেপ তোষক রোদে দেবার জায়গা। মাঝে মাঝে চোখের জল মুছতেও তো আড়াল লাগে!

উত্তর দুয়ারি ঘরের রাজা
দক্ষিণ দুয়ারি তাহার প্রজা।
পূর্ব দুয়ারির খাজনা নাই
পশ্চিম দুয়ারির মুখে ছাই।

এ ছড়াটি কাদের কথা মনে করে লেখা হয়েছিলো কে জানে। যাদের জীবনটা বেড়ি দিয়ে রেখেছে একটা মোটা ইঁটের গাঁথুনির ছাদ, তাদের আবার উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম। একখানা বারান্দা পর্যন্ত ছিলোনা সে বাড়িতে!

এবাড়ির দুই বউ: চিন্ময়ী আর পারুলবালা। পূর্ণলক্ষ্মীর দুই জ্যাঠতুতো ভাজ। উন্মুখ হয়ে বসে থাকত কবে ঠাকুরঝি আসবেন, তাঁর মুখে দুটো বাইরের কথা শুনবেন। ঠাকুর জামাই অন্যধাতের মানুষ।ঠাকুরঝিকে কত কিছু বোঝান। ঠাকুরঝির বাড়িতে দু দুটো বারান্দা। একটা উত্তর আর একটা দক্ষিণ। চিন্ময়ী আর পারুলবালা। দুটি দুই ধরণের। চিন্ময়ী সর্বাঙ্গসুন্দরী । চোখদুটো নীল। পুরোনো কালিঘাটের গরীব ব্রাহ্মণের মেয়ে। মায়র সঙ্গে মায়ের মন্দির গিয়েছিলেন। রামবাবুর চোখে পড়েছিলো। তিনিও রোজ যেতেন কিনা?
পারুলবালা উত্তর কলকাতার ধনীর দুলালী। গোলগাল সোনার বরন পটের বিবি, টিয়েপাখি নাক। মাথার খোঁপা থেকে কোমরের বেড় পর্যন্ত সোনায় মুড়ে দিয়েছিলেন বড়লোক বাপ। হাজার হোক জামাই সে আমলের রুরকীর ইন্জিনিয়র!
চিন্ময়ীর কপালে জুটেছিলো কালিপদ, পৈত্রিক ব্যবসা তিনিই রেখেছিলেন। আরও অনেক সৎ গুণাবলী ছিলো তাঁর। প্রথম স্ত্রী গলায় দড়ি দেবার পর দ্বিতীয় পক্ষ চিন্ময়ী। সে গরীব বাড়ির মেয়ে, তার চাহিদা, অভিমান সবই কম কম। চোখ তুলে চাওয়ার আগে দুবার ভাবে।
–“বিলিব্যবস্থা ভালোই করেছিলেন জ্যাঠামশাই। তাও কেন যে বড়দা মাঝরাতে ছাদ থেকে ঝাঁপ দিলেন কে জানে!”
চিন্ময়ী এই কর্তব্যপরায়ণ স্বামীটিকে পেয়েছিলেন দুই বছর। কালিপদ চিন্ময়ীকে দিয়ে যান তাঁর প্রথম পক্ষের দুই ছেলে, আর তার নিজের আটমাসের ছেলে সোম। এবং ‘অপয়া’ বৌ হওয়ার অপরিসীম গৌরব।
তুলনায় পারুলবালা তো রাজরানী! স্বামী সায়েবদের সঙ্গে ওঠেন বসেন, স্যুট পরে আপিস যান, এমনকি মাঝেমাঝে সন্ধ্যেবেলা মায়ের নাকের ডগা দিয়ে ‘পারুল’কে নিয়ে রাসবিহারী রোড ধরে হাঁটতে বেরোন পাকানো ছড়ি হাতে। পারুল একগলা ঘোমটা দিয়ে পাশে পাশে হাঁটেন আর লজ্জায় মরেন। কিন্তু রাত বাড়লে কি যেন ভর করতো দুর্গাপদকে। ভারি দরজার ফাঁক দিয়ে প্রায়ই শোনা যেত পারুলবালার চাপা ফোঁপানির আওয়াজ। যে রাতে সে আওয়াজ আর ফোঁপানি থাকতো না, সেই রাতে সিঁড়িতে শোনা যেত চাপা খড়মের শব্দ।
–“মেজদা, আর না”।
ছোটভাই শ্যামাপদ। কোনো কারণে এই দলছুট মানুষটিকে সমীহ করতো সবাই। বিশাল বটবৃক্ষের মত এই স্বল্পবাক, অকৃতদার মানুষটি দুই অনাথাকে ছায়া দিয়েছিলেন যতদন বেঁচেছিলেন।
কিছু এমন নতুন গল্প নয়। ভট্টাচার্য্য বাড়ির বউদের তো নয়ই। বিয়ের দিন থেকেই তারা জানে এ বংশের পুরুষরা অন্যরকম। পরিবারের রীতিকানুন অন্যধারা। এবাড়ির ছেলেরা বিয়ের দিনেও কন্যাগৃহে রাত্রিবাস করেনা। সম্প্রদান হয় গভীর রাতে। শাঁখ বাজবেনা, উলু পড়বেনা। সম্প্রদানের পরেই কন্যার পতিগৃহে যাত্রা, ঊষাকালের আগে। সেখানেই কুশণ্ডিকা, সিঁদুর দান। নারায়ণ সাক্ষী, কিন্তু বিবাহ দেন রক্তবস্ত্রধারী তান্ত্রিক। তাঁর পাশে স্থাপিত নরকরোটি আর খড়্গ। সাধারন সুখদুঃখ এবাড়ির বউদের জন্যে নয়। শ্যামাপদও কি খুব আলাদা ? যত্ন করেন, মান্য করেন, বড়বউয়ের অম্বুবাচীর খেয়াল তিনিই রাখেন মা যাওয়ার পর, তাও এই সমবয়সী বা অল্প ছোট দেওরটিকে কোনওকালেই তেমন আপন মনে হয়নি। না চিন্ময়ীর, না পারুলবালার।
পূর্ণলক্ষ্মীও যে খুব বুঝতেন এই ভাইটিকে তা নয়। তবে বিপদে আপদে “ছুট্টে গিয়ে ছোটমামাকে খবর দিতে হবে” একথা তাঁর ছেলেপিলেরা জানতো। ওই যে, “গুণবতী ভাই আমার মন কেমন করে” ? সেই বৃত্তান্ত।

*****
তিরিশের দশকের কলকাতা যেন এক বায়োস্কোপ। টিনের বাক্সের চারদিকে গোলগোল ফুটো। তার পাশে দাঁড়িয়ে ডুগডুগি বাজিয়ে ছেলেপুলে বুড়ো ছুঁড়োদের লোভ দেখাচ্ছে বাক্সওয়ালা। আধ পয়সায় কত মজা! এক খোপে চিৎপুরের রেণুবালা, আর এক খোপে নকুলেশ্বর ভটচায্যি লেনের বিধবা চিন্ময়ী। আবার আর এক খোপে দেশের টাট্কা খবরঃ ১৯৩৫-এর গভর্নমেন্ট অফ্ ইন্ডিয়া এ্যাক্ট। লাটবাহাদুর লিনলিথগো বড়ই সদাশয়। তিনি কংগ্রেসকে বুঝিয়ে দিয়েছেন: “দেখো বাপু, রাজ্যশাসন করতে দিয়েছি বলেই সাপের পাঁচ পা দেখোনা। গোলমাল করেছো কি ফের গোলাম বানিয়ে ছেড়ে দেব”!
কত ছবি দেখায় বায়োস্কোপ:

ওপেনটি বায়োস্কোপ নাইনটেইন টেইস্কোপ
চুলটানা বিবিয়ানা লাটুবাবুর বৈঠকখানা
লাট বলেছে যেতে পানসুপারি খেতে
পানের ভেতর মরিচবাটা ইস্প্রিংএর চাবি আঁটা
যার নাম রেণুবালা গলায় দিলাম মু্ক্তার মালা
রাজরানী রেণুবালা তাকেই দিলাম মুক্তার মালা।

 

কলকাতায় দুপুর গড়ায়, সন্ধ্যে নামে। নকুলেশ্বর ভটচায্যি লেন, বালিগঞ্জ দু পাড়াতেই শাঁখ বাজে। দুই পাড়াতেই শোনা যায়ঃ “চা—-ই বেলফুল…মালা…ই কুলফি…”
টিনের বাক্সো আরও দৃশ্যান্তর তৈরী করে…কোনওটা বা রঙীন, কোনওটা বা সাদা কালো…
(ক্রমশঃ)

 

 

 

 

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

3 Responses to পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (ষষ্ঠ পর্ব)

  1. Pingback: পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (ষষ্ঠ পর্ব) | Methinks…

  2. Sanghamitra Sen says:

    Aeto sundor likhechho!Publish karo… 🙂

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s