পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (পঞ্চম পর্ব)

Image

 

ও পারেতে কালো রঙ।

বৃষ্টি পড়ে ঝম্‌ ঝম্‌॥

এ পারেতে লঙ্কা গাছটি রাঙা টুক্‌টুক্‌ করে।

গুণবতী ভাই আমার মন কেমন করে॥

“এ মাসটা থাক্‌ দিদি কেঁদে ককিয়ে।

ও মাসেতে নিয়ে যাব পাল্‌কি সাজিয়ে।’

হাড় হল ভাজা-ভাজা, মাস হল দড়ি।

আয় রে আয় নদীর জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ি॥

 
মণি চলে গিয়েছিলো বাড়ি খালি করে। মাঝে মাঝেই পূর্ণলক্ষ্মীর মনে পড়তো তার কথা : “বুঝলে সেজঠাকরুন, কবিতা হবে এমন যে রক্ত টগবগ করে ফুটবে”:

 

 

দিল্লি প্রাসাদকূটে
হোথা বারবার বাদশাজাদার তন্দ্রা যেতেছে ছুটে।
কাদের কণ্ঠে গগন মন্থে, নিবিড় নিশীথ টুটে-
কাদের মশালে আকাশের ভালে আগুন উঠেছে ফুটে?

 

ওইটুকু ছেলের ভেতর এত আগুন কোথায় লুকোনো ছিল কে জানে! কেন তিনি একটুও আঁচ পাননি?মণির নাম লাহিড়ী বাড়িতে আর কেউ করেনা। ছোট ছেলেমেয়েরাও বুঝে গেছে মণিকা’র নাম নেওয়া বারণ। মণি-কা সাহেব মেরে স্বর্গে গেছে।
কিন্তু ভুলতে চাইলেই ভোলা যায় কই? মাঝে মাঝে মনে হত পালাতে পারলে বাঁচা যেতো। মেয়েদের একটা জুড়োনোর ঠাঁই লাগে। যেখানে কেউ তাকে নজরে রাখছে না, নিক্তিতে মাপছে না। বলছেনা: “সব দোষ তোমার”। পূর্ণলক্ষ্মীর বাপের বাড়ি ছিলো বৈকি। একটা নয়। দু দুটো। কলকাতা যখন স্বদেশীদের দাপটে কাঁপছে তখন জুড়োনোর জায়গা কলকাতাতেও ছিল একটা। জ্যেঠামশাই ততদিনে তাঁর ঢাকার ব্যবসা গুটিয়ে চলে এসেছেন কলকাতার কালিঘাট অঞ্চলে। নকুলেশ্বর ভটচায্যি লেনে। সেবাড়িতে আছেন জ্যেঠিমা আর ছোটবেলার ডাংগুলি খেলার সাথী ভাইয়ের বাড়া জ্যাঠতুতো ভাইরা। উমাপদ, দূর্গাপদ, কালিপদ, শ্যামাপদ, । তাদের সব বিয়ে থাওয়া হয়েছে ততদিনে ।শ্যামাপদ ছাড়া। সে বড় অদ্ভূত মানুষ। তার কথা পরে হবে…কিন্তু সেই বাড়িতেও যেতে কোথায় পান পূর্ণলক্ষ্মী?
— “সে আমলে অত হুটহাট বাপের বাড়ি যাওয়ার চল ছিলনা। লোকে মন্দ বলতো। কালিঘাট যেতুম যখন জ্যেঠিমা ভাইদের দিয়ে নেমন্তন্ন পাঠাতেন ওনার কাছে। আগে নেমন্তন্ন হবে জামাইয়ের, নাহলে মেয়ের বাপের বাড়ি যাওয়া অলক্ষণ। শিবহীন যজ্ঞ?! ওরে বাবা!”
বীরেন্দ্রনাথ যেতেন না , কিন্তু শ্যালকদের সঙ্গে দুটো একট ঠাট্টা করে বলে দিতেন, “আমি তো পারবো না, তোমাদের দিদি যাবেন”। জামাইরাও সে আমলে শ্বশুরবাড়ি কমই যেতেন। একবার বিজয়ায়। একবার জামাইষষ্ঠীতে। তবে ছলেপুলেরা যেতো বৈকি। মামাবাড়িতে যেতে আবার নেমন্তন্ন লাগে নাকি। একটায় কুলোতো না, দু দুটো ছ্যাকরাগাড়ি ভাড়া করে খুড়তুো জ্যাঠতুতো সবাই মিলে যৌথ মামার বাড়ি যাওয়া। সে ভারি মজা! পূর্ণলক্ষ্মীর ছেলেমেয়েদের যদি কেউ জিগেস করতো, তোমরা কয় ভাই বোন, একসময়ে উত্তর ছিলো: “বিয়াল্লিশ” ! কিন্তু সে বহু পরের ঘটনা, তখনও বীরেন্দ্দ্রনাথের ছোট ভাইয়ের বিয়ে হয়নি। পূর্ণলক্ষ্মী এগারো ছেলেমেয়ের মা হ’ননি।
কিন্তু মণি চলে যাওয়ার পর না যাওয়ার কারণটি ছিল ভিন্ন। বীরেন্দ্রনাথ একদন রাত্রে শুতে এসে (ঐটুকু সময়ই যা কথা হতো ওঁর সঙ্গে) বলেছিলেন:
— “এখন বোধহয় আত্মীয় কুটুম্বদের বাড়ী না যাওয়াটাই মঙ্গল।
— “কেন?”
— “কিছু লোক আমাদের বাড়ীর আশেপাশে সবসময় ঘোরে। এদের দুই একজনকে কোর্ট চত্তরেও দেখেছি আমি। সবাই ছেলেপুলে নিয়ে ঘর করে বিপদে ফেলে লাভ নেই।”

Informer কথাটা নতুন শিখেছিলেন পূর্ণলক্ষ্মী। ব্রিটিশের গুপ্তচর। তারপর তাঁরও দৃষ্টি খুলে গেল। সত্যিই থাকে তারা। চাদর মুড়ি দেওয়া সিড়িঙ্গে মত। চোখে চোখ পড়লেই উধাও হয়ে যায়।
–“কাজ কি বাপু, সা-জোয়ান ভাইরা আমার। কালিঘাটে গিয়ে তাদের বিপদে ফেলি আরকি!” এমনকি কালীপূজোতেও যাননি তিনি তারপর বেশ কয় বছর। গুপ্তচরের শিক্ষাটি পূর্ণলক্ষ্মীর কাজে লেগেছিলো আবার। কিন্তু সেকথা এখন নয়।

 

****
কথা হচ্ছিলো বাপের বাড়ি নিয়ে। পূর্ণলক্ষ্মীর বাপের বাড়ি বড় অদ্ভূত। আদতে ব্রাহ্মণ ডাকাতের বংশ। কোনোও এক আদি পুরুষ ডাকাত ছিলেন। সে কোন সময়ে কে জানে! তারপর থেকে কিছু কিছু রীতি বংশে থেকে গিয়েছিলো। কালিঘাটের বাড়িতে কালীপূজো হতো ঘটা করে। শ্যামাপদ সে পূজো বজায় রেখেছিলেন ১৯৭৫ পর্যন্ত। কিন্তু তাতে মেয়ে-জামাইদের নেমন্তন্ন নেই! তারা আসবে পরেরদিন প্রসাদ পেতে। এমনকি প্রতিমা দেখারও অধিকার ছিলোনা তাদের। পোটোপাড়া থেকে প্রতিমা আসতো রাতেরবেলা। ভোর রাতেই সে প্রতিমা বিসর্জন হয়ে যেতো। দেবী কালো ন’ন, রক্তবর্ণা। কিন্তু চোখদুটো সোনাজল করা। ঠিক যেমন কালীস্তোত্রে বলা আছে।স্বর্ণনয়না।

 

নিকষা প্রস্তরা শ্যামাঙ্গ-শির্ষে -মুকুট-মণ্ডিতাম্
ললাটে নেত্র চিহ্নেন ত্রিনেত্রী-কৃত বিগ্রহাম্।।
অঘোরা পদ্মপত্রাভ-বিশাল-স্মিতলোচনাম্
সুকৃষ্ণা প্রজ্বলা-দ্রুপনেত্র-দ্বয়-কণীনিকাম্।।

 

‘ঠাকুর ডাকাত’ এর গল্প পূর্ণলক্ষ্মী বলেছিলেন তাঁর নাতনীকে। সেই আকবর বাদশার আমলে এক কুলীন ব্রাহ্মণ ছিলেন বগুড়ায়। নাম বেণীমাধব রায়। তাঁর স্ত্রীকে এক পাঠান দস্যু অপহরণ করে। রাগে দুঃখে বেণীমাধব কুলকর্ম ভিটেবাড়ি ত্যাগ করে ডাকাতের দল তৈরী করেন । আশেপাশের আর তাঁর গ্রামের বহু ব্রাহ্মণ আর কায়স্থ যোগ দেয় সেই দলে। তাদের কাজ ছিলো যবন নিধন।
—“সেই বেণী রায়ের ছিল ‘যবনমর্দিনী’ কালী মন্দির। আশেপাশের গাঁয়ের লোকরা সে জায়গার নাম দিয়েছিল চলন বিলের ‘পণ্ডিত ডাকাতের ভিটে’। কি জানি বাপু, আমাদের পূর্বপুরুষ সেই দলেই ছিলেন হয়তো! বেণীমাধবও তো বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ ছিলেন! তবে ওরকম ব্রাহ্মণ ডাকাত বাংলাদেশে অনেক ছিলো। ‘দেবী চৌধুরানী’ পড়িসনি?!”
পড়েছে নাতনী। কিন্তু তার মনে পড়েছিলো ‘সীতারাম’ এর কথা। একটা গাছে উঠে শ্রী তলোয়ার ঘোরাচ্ছে আর বলছে: “মার্ মার্ যবন মার্, যবন মার্। দেশের শত্রু দশের শত্রু মার্!”

*****

দুপুর গড়িয়ে বিকল হয়ে আসছে। ফাগুনমাস।খুব গরম পড়েনি এখনও। মুখোমুখি দুইজন: খাটের ওপর পূর্ণলক্ষ্মী, কোলে তাঁর তাকিয়াখানি। তার ওপরে তাঁর শিরা ওঠা খালি দুটি হাত। পূর্ণলক্ষ্মীর শোবার খাটের পাশেই দুটো বড় জানলা দিয়ে দুটো সুপুরী গাছ দেখ যাচ্ছে। খুড়িমার ছাদে পোযা পায়রার বকম্ বকম্।একটু আড়াআড়ি বসে তাঁর নাতনী। মেয়ের ঘরের প্রথম মেয়ে। খুব এলোমেলো, খামখেয়ালী। দুজন দুই স্রোতে ভাসছে। নাতনীর মাথার মধ্যে ঘুরছে ‘আনন্দমঠ’, ‘সীতারাম’ বেণীমাধব রায়, ‘বাবু মণীন্দ্রনাথ লাহিড়ী’। সে ভাবছে কি আশ্চর্য, একথাটা সে এতদিন বোঝেনি কেন… যবন মানে বিধর্মী শত্রু…দেশকাল ভেদে সে শব্দের মানে বদলে যায়…
পূর্ণলক্ষ্মীর চোখে আর সেই জ্যোতি নেই। তবুও তিনি দেখতে পাচ্ছেন সেই ফিতের মত সরু নকুলেশ্বর ভট্চাজ্জি লেনের শেষ বাড়িখানা। বাইরের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছেন শ্যামাপদ। কপালে রক্তবর্ণ টীকা, উর্ধাঙ্গে সাদা উত্তরীয়. গরদের ধুতি। উঠোন পেরিয়ে ভেতরবাড়ির সিঁড়ি..সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছেন পূর্ণলক্ষ্মী…সিঁড়ির ঠিক মাথায় জ্যেঠিমার ঘর। উঁচু তক্তপোষে বসা গলায় রুদ্রাক্ষের মালা পরা জ্যেঠিমা, সাদা থানে কপাল পর্যন্ত ঢাকা, তার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে ছোট করে ছাঁটা চুল। পূর্ণলক্ষ্মীকে দেখে একগাল হেসে বলছেন: “বড়বৌমা, আমাদের বুড়ি এসেছে ওকে দুটি আম আর ঘোলের সরবত দাও…..”

(ক্রমশঃ)

 

ছবি

http://www.columbia.edu/itc/mealac/pritchett/00routesdata/1600_1699/tantra/bengalkali/bengalkali.html

 

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

One Response to পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (পঞ্চম পর্ব)

  1. Pingback: পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (পঞ্চম পর্ব) | Methinks…

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s