পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (চতুর্থ পর্ব)

Image

বন্দেমাতরম্

“[…] the nauseating and humiliating spectacle of this one-time Inner Temple lawyer, now seditious fakir, striding half-naked up the steps of the Viceroy’s palace, there to negotiate and parley on equal terms with the representative of the King Emperor.”

                                                  Churchill on Gandhi and the Gandhi-Irwin Pact, 1930.

 

“সে এক সময় ছিল বটে। সব যেন ঘোরের মধ্যে । অপেক্ষা করতুম কখন তোর দাদু কোর্টে বেরোবেন তারপর বাড়ীর ছোট একটাকে পাঠাবো খবরের কাগজখানা নিয়ে আসার জন্যে।  সব তো ভালো বুঝতুম না, তবে একটু একটু আভাস পেতুম । গান্ধীজির সঙ্গে বড়লাট আরউইনের সাজস হবে।তোর দাদুর মুখে শোনা, গান্ধী-আরউইন প্যাক্ট। ডোমিনিয়ন স্টেটাস। …আমাদের সময়টা তোমাদের মত ‘কালো হাত ভেঙ্গে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ যুগ ছিলোনা। আমরা মান্যি করতে জানতুম। গান্ধী বৃহৎস্বার্থের কথা ভাবছিলেন। তোর দাদু আমায় বুঝিয়েছিলেন ভগবদ্ গীতাতেই তো আছে : ক্ষুদ্রম্ হৃদয়দৌর্বল্যম্ ত্যক্তোত্তিষ্ঠো পরন্তপঃ। তবুও …”

Image

সব মেয়েই বিমলা নয়। স্বদেশীদের মক্ষীরাণীরা ছিলেন বৈকি। কিন্তু আমাদের কথা তাদের নিয়ে নয়।  দেশে যখন ডামাডোল, ভেতরবাড়ির জীবন চলেছে তার নিজের ঝোঁকে। মাঘমাসের ইতুপূজো, ইতুলক্ষ্মীর ব্রতকথা এসব কি থেমে থাকার জিনিস। মটরডাল নতুন চাল শীতের সবজি সৈন্ধব নুন দিয়ে মেটে হাঁড়িতে বসিয়ে দেওয়া হবে। সেই একফুটের চালডালে গরম ঘি ঢেলে খাবে মেয়েবউরা। তারপর ক্ষীরের মত চোষির পায়েস নতুন গুড় দিয়ে। তার আগে বাড়ীর বৌ মেয়েরা ঘিরে বসে শুনবে ইতুর কথা:

এলফুল বেলফুল তুলতে গেলাম

ইতুর ছয় কথা শুনে এলাম:

একথা শুনলে কি হয়?

অন্ধের চক্ষু হয়

নির্ধনের ধন হয়

অবিদ্যার বিদ্যে হয়

অপুত্রের পুত্র হয়

বন্দী থাকলে খালাস হয়

অব্যিয়েতের বিয়ে হয়।।

 

ঐ ছয়টা ‘হয়’ এ লেখা আছে ছা-পোষা মেয়েদের আশা আকাঙ্ক্ষার কথা। কিই বা আর করার ছিলো…মাঝেমাঝে ভরদুপুরে আসতো নাপিতনী বউ। ভিতরের উঠোনে পা ঝুলিয়ে বসতো মেয়ে বউরা। একগলা ঘোমটা দিয়ে নাপিতনী বউ মেয়েদের পায়ে ঝামা ঘ’ষে নখ কেটে আলতা পরিয়ে যেতো । তবে নখ সবাই সবদিন কাটতে পারতোনা…ছেলেপিলের জন্মবারে ওটি বারণ

মেয়েদের কথা হ’ল ধান ভানতে শিবের গীতহচ্ছিলো মণি ঠাকুরপো আর চুটকির কথা, কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলেন ভুবনমোহিনীতবে কিনা সব কিছুরই একটা মানে মর্য্যাদা আছে…ভুবনমোহিনী না থাকলে মণি ঠাকুরপো আসে কি করে?

বীরেন্দ্র নাথের দিনের কোথায় শুরু কোথায় শেষ বলা খুব শক্ত ছিলো। বাড়ি ফিরতে সন্ধে। তারপর জলখাবার খেয়েই আবার চেম্বারে। একদিন ফিরলেন বিকেল গড়াতেই। মধুর হেসে পূর্ণলক্ষ্মীকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবু মণীন্দ্রনাথ লাহিড়ী কি ফিরেছেন?” ‘বাবু মণীন্দ্রনাথ লাহিড়ী’ ভুবনমোহিনীর পড়ন্তবেলার ছেলে, বছর সতেরো বয়েস। মায়ের মত বৌদির কাছেই সে থাকে বেশীরভাগ সময়।

–“সংসারে এক একটা মানুষ থাকে জানিস, খাপে খাপে বসেনা, সে তুমি মারো ধরো কাটো। কোথায় একটু ত্যাড়া ব্যাঁকা হয়ে থাকে।  মণি ছিলো সেইরকম। পড়াশোনায় মন নেই একেবারেই। খুব ভালো আবৃত্তি করতো সে। কতদিন সে আমাকে কাজী সাহেবের কবিতা শুনিয়েছে। কিন্তু পড়ার বই দেখলেই তার গায়ে জ্বর আসতো। তাই ওনার অমনধারা কথা শুনেই বুঝেছিলুম মণির কপালে আজ খড়ম পেটা আছে। জিগেস করলাম ‘কি করেছে সে?’ ব্যাস !!!! আগুনে ঘি পড়লো যেন। দুপুর বেলা মিত্র ইনস্টিটিউশানের পিওন কোর্টে এসে একখানা চিঠি ধরিয়েছে। হেডমাস্টার মশাই লিখেছেন মণি নাকি বহুদিন স্কুল যায়না। ওর নাম এবার খাতা থেকে কাটা যাবে!”
— “Expelled” …নাতনীর প্রাজ্ঞ ফোড়ন।
–“হ্যাঁ। আমার মাথায় তো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো”। আর খুড়িমা’র কানে ওঠার পর যা শুরু হ’ল তা আর কহতব্য নয়”।

সময় বড় বেসামাল। বাইরে যখন আগুন জ্বলছে তখন তার হল্কা ভিতর বাড়ীতে লাগবেনা!
খড়ম পর্বটি ঘটেনি। মণি আবার স্কুলে যাওয় শুরু করেছিলো। বীরেন্দ্রনাথ কি কলকাঠি নেড়েছিলেন এতদিন পরে আর মনে করতে পারেননা পূর্ণলক্ষ্মী। কতকিছুই তো ভুলে গেছেন তিনি। যেমন মনে নেই সেই ভয়ংকর দিনটা কি বার ছিল। কোন সাল? ১৯৩২  না ১৯৩৩?? মেঘ না রোদ্দুর! শুধু মনে আছে খুড়িমার রাগারাগি শুনতে পেয়েছিলেন সকালবেলা। বারান্দা থেকে দেখেছিলেন মণি বইখাতা নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বিকেলের দিকে বরেন ছুটতে ছুটতে ছাদ থেকে নেমে এসে বলেছিলো: “মা, লাল পাগড়ি আমাদের বাড়ি ঘিরে ফেলেছে!” বীরেন্দ্রনাথ কি সেদিন কোর্টে জাননি? নাকি তাড়াতাড়ি ফিরেছিলেন?  শুধু মনে আছে বীরেন্দ্রনাথ সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছেন, মুখে কে যেন কালি মাখিয়ে দিয়েছে। কি বলছেন উনি?


–“আমাকে একবার সার্জেন্টের সঙ্গে লালবাজার যেতে হচ্ছে। মণি আজ দুপুরবেলা স্টেট্সম্যানের এডিটার মিঃ এ্যালফ্রেড ওয়াটসনকে গুলি করে মারতে গিয়েছিলো। একেবারে খবরের কাগজের আপিসের সামনে। গুলি ফসকেছে। ওয়াটসন প্রেসিডেন্সি জেনেরাল-এ ভর্তি আছেন।


–“আর মণি?!”

— “সে আর নেই। ওয়েলিঙটন স্ট্রীট দিয়ে পালাচ্ছিলো। ধরা পড়বে বুঝতে পেরে সায়ানাইড খেয়েছে। যাই ছেলেটাকে বাড়ি নিয়ে আসি”।

Image

“আর বেশি কিছু শুনতে পাইনি, বুঝলি? শুধু আবছা মনে হ’ল শুনতে পেলুম উনি বলছেন আমাকে খুড়িমার কাছে গিয়ে বসতে”। সেই প্রথম পূর্ণলক্ষ্মী ‘সেবাড়ি’তে পা দিলেন সংসার ভিন্ন হওয়ার পর। ভুবনমোহিনী শোবার ঘরে পা ছড়িয়ে শুকনো চোখে বসেছিলেন। পূর্ণলক্ষ্মীর পায়ের আওয়াজে ফিরে তাকিয়ে বললেন: “আ-লো, সে মুখপোড়া যে ভাত খাতি চায়েছিল। আমি ক্যান তারে ছাই বাড়ি দিলাম!”

–“কখন সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হয়েছিলো কে জানে…পাড়াপড়শিরা বাড়ির ছোটগুলোকে নিয়ে গিয়ে দুটো দুটো খাইয়ে দিয়েছিল। উনি ফিরেছিলেন বহুরাতে একা। খুড়িমার উঠোনে দাঁড়িয়ে ভাঙা গলায় বলেছিলেন, ‘ওরা বাড়ি আনতে দিলনা। Sedition এর charge…লালবাজার থেকে পুলিশের গাড়িতেই…আমি মণির মুখাগ্নি করে এলাম খুড়িমা!’ শক্ত মানুষ বরাবরই…ওই একবারই তাঁর গলা কাঁপতে শুনেছিলাম।
Sedition কথাটা সেই প্রথম শিখলাম। রাজদ্রোহ ”।

অত যে মানুষের খবরের কাগজের নেশা, সে মানুষ তারপর একসপ্তাহ কাগজ খোলেনি। পূর্ণলক্ষ্মীর বড় ভয় ছিল মনে, যদি ওরা মণির শেষ সময়ের ছবি ছাপে?!

সময় থেমে থাকেনা। সংসার বড় বেয়াড়া। উঠে বসতে হয়। চলতে থাকতে হয়। ক’দিন পরে বড় ঘরে সেলাই মেশিনে বসতে গিয়ে পূর্ণলক্ষ্মীর নজরে পড়ল সিন্দুক আধখোলা। “আর সব ঠিক ছিল, ওনার দলিল দস্তাবেজ, ছেলেপুলেদের অন্নপ্রাশনের গয়নার পুঁটলি। শুধু খোলা পড়েছিলো আমার গয়নার বাক্সখানা। তার মধ্যে একখানা চিঠি: ‘সেজবৌদি, তোমার গয়নাগুলো  আমরা নিলাম। দেশের কাজে লাগবে। রাগ কোরোনা ।তুমি বড়লোকের বউ, তোমার আরো অনেক হবে। বন্দেমাতরম্ “। আমি মনে মনে বলেছিলুম, “ঠাকুরপো, আমি তোমার মায়ের মত। তুমি যেখানেই থাকো, তুমি আমার প্রণাম নিও”।

উনি শুনেছিলেন বেশ কিছুদিন পরে। শুধু একটু হেসেছিলেন।
(ক্রমশঃ)

 Black and White Photo credit: http://www.rarenewspapers.com

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

5 Responses to পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (চতুর্থ পর্ব)

  1. Pingback: পূর্ণলক্ষ্মীর একাল সেকাল (চতুর্থ পর্ব) | Methinks…

  2. Kalyan says:

    Ami jeno sei dingulote beche uthechi! Bharatmatar chchobita khub sundor.
    Ar kodin khobor kagaj na kholata khub bhalo laglo.

  3. সুন্দর লেখা – খুব যত্ন করে ছবি গুলো যোগ করেছ, গান্ধি-আরউইন প্যাক্ট গুগল করে আবার দেখলাম – ভাল লাগলো ।

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s