গোলাপবউ

Image

এ গল্পে নানা নিধি : মৈমনসিংহ, নেত্রকোণা, দালাইন্যা বাড়ি, পূবের বাড়ি, মইধ্যের বাড়ি, নয়াবাড়ি, আর  পত্রনবীশদের তিনশো বছরের দূর্গাপূজো।

কিন্তু আসল নিধি গোলাপবউ।

কোনকালে কোনো ঠাকরুণ ঠিক করেছিলেন চার শরিকের সবথেকে সুন্দরী বউটির নাম হবে ‘গোলাপ ’। সেই নিয়ম চলেছিলো বহুদিন … পূবের বাড়ির বড়জ্যেঠিমা আমাদের বাড়ির শেষ গোলাপ বউ।

ঠিক বোধনের আগে এসে পৌঁছোতেন গোলাপজ্যেঠিমা; আসা নয়তো, আগমন। হীরের ফুল আর হাসির ঝলক। ঠোঁট পানের রসে লাল।  তার আগে জ্যাঠামশাইদের অস্থির ঘোরাঘুরি: “তোমরা সামলাইতে পারবানা, বৌঠানরে আইতে দাও।”

বিল্ব বৃক্ষমূলে পাতিয়ে বোধন

গণেশের কল্যাণে গৌরী আগমন

ঘরে আনব চণ্ডী কর্ণে শুনব চণ্ডী

আসবে কত দণ্ডী জটাজুটোধারী …

নিচু গলায় গুনগুন করে গান করতেন গোলাপজ্যেঠিমা, আর ছড়িয়ে বসে ছোটজাদের দিয়ে বরণডালা সাজাতেন আর হৈ হৈ করতেন। গোলাপ জ্যেঠিমা পুজো বাড়ির লাল রং।

“সোনাঠাকুর, আপনে খড়ম খটখটাইয়া ঘুইরেননা, আমরা আমরার কাম ঠিকই করতে আসি…আপনে অহন আসেন”।

বাড়ির সবচেয়ে রাগী কর্তাটি হাসিমুখে বকুনি খেয়ে ‘খড়ম খটখটাইয়া’ চলে যেতেন।

কোথাও একটা অদ্ভূত মন ছিলো জ্যেঠিমার। অন্যরকম।রসে টইটুম্বুর মানুষটা যেন বড় বেশী হাসত, বড় বেশী ছটফট করতো বড় বেশী সুন্দর হয়ে থাকতো। শাড়ীর পাড় কি একটু বেশী ঝলমল করতো জ্যেঠিমার? সোনার চুড়িগুলো একটু বেশী ঝনঝন? জীবনে একচিলতে মেঘ ছিল কোথাও…গানে গল্পের ফাঁকে লুকোনো থাকতো, ঠিক ধরা যেতোনা।

আমাদের বাড়ীর প্রতিমা ছিল  পূর্বপুরুষের স্বপ্নে পাওয়া: কার্তিক আর গণেশ কেন যে জায়গাবদল করেছিলেন কে জানে। কলাবউ-এর ঠাঁই হতো ভাসুরের পাশে। শাড়ী পরানোর ফাঁকে ফাঁকে চলতো গুনগুন: “যেমন বংশ, তেমনই পূর্বপুরুষ, বউরে বসাইসে ভাসুরের লগে। মরণ আমার।”

একটা পুরোনো পরিবারের অনেক গল্প থাকে। অনেক আলোআঁধারি। কেউ সেসব নিয়ে বেশী ভাবেনা।সম্পর্কগুলো লতানে গাছের মত জড়িয়ে থাকে, কেউ সে জট ছাড়াতে চায়না। পূবের বাড়ীর এই বউটি হয়ত সেটা মেনে নিতে পারেনি। দশমীর বরণের সময় ভারী অদ্ভূত একটা কাজ করতেন মানুষটা। প্রতিবছর। দুর্গা আর লক্ষ্মীকে যত্ন করে সিঁদুর পরাতেন। সরস্বতীর বরাদ্দ ছিল শুধু প্রণাম আর পান সন্দেশ।
-“ও দিদি, সরস্বতীকে সিঁদুর দেবেন না?”
– “নারায়ণের লগে বিয়া হইসিলো? তরা দে গা যা…আমি দিয়াম না!”

বরণের সময় মুখ ভাসিয়ে কাঁদতেন জ্যেঠিমা। চোখমুখ ফুলে যেত।
– “এত কাঁদেন কেন দিদি ?”
-“আমারও তো তিন মাইয়া । কোনডা কুন মুখপোড়ার হাতে পড়ব কে জানে? ”

তিন মেয়ের একজনও মায়ের রূপ পায়নি। মিতাদিদি কালো, চোখে চশমা ছোটবেলা থেকেই। মুক্তাদিদির রং টুকটুকে । টুলটুলি লাবণ্যময়ী। একজন পুণে। একজন হাওড়া। টুলটুলি কোথায় কে জানে…

ছোটবেলায় সবকথা ভালো বোঝা যায়না, আবার যায়-ও। একটা কথা নয়বছুরে আমি খুব বুঝেছিলাম: পত্রনবীশদের পুজোদালানে দাঁড়িয়ে শিবকে ‘মুখপোড়া’ বলার সাহস একমাত্র গোলাপ বউ-এরই ছিলো।

Advertisements

About purnachowdhury

I am a person of and for ideas. They let me breathe.
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

5 Responses to গোলাপবউ

  1. Pingback: গোলাপবউ | Methinks…

  2. Sudeshna says:

    Bhishon shundor lekha ! “আমারও তো তিন মাইয়া। কোন মুখপোড়ার হাতে পড়ব কে জানে?” Er pechhone je koto chokher jol, koto-shoto deergo shwash, ashonKa lukiye achhe – Ta keBol Golap-bou ra-i bujhbe!!!
    Amar Mamabari-te o KarTik-Ganesh position exchange kore… Akhon-o Puja hoy at their Jadavpur home which had started in undivided Bengal close to 200 years ago.

  3. এই টুকু ছোট্ট লেখার মধ্যে সত্যি অনেক আলো আঁধারি আছে – তোমার এত ছোট বেলাকার কথা মনে আছে ?

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s