গড়গড়ার মা’লো অন্তিম পরিচ্ছেদ: নব্য সতী

sati II

সতী বিধান

পাঠক, আগের পরিচ্ছেদে বলেছি, বুক ফাটে তবু মুখ ফোটেনা, এই কথাটির মর্ম বোঝাই হলো সতীত্বর প্রথম ধাপ। এবং এই আমার শেষ কথা।  সারদাসুন্দরীর পর গোলাপসুন্দরী।  কথা শুরু হোক ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্রর  দুটি উদ্ধৃতি দিয়ে এবং তাঁর বিবাহ বিষয়ক চিন্তা দিয়ে। কারণ আমার অন্তিম পরিচ্ছেদের নায়িকা কেশব জায়া জগন্মোহিনী। নামটি নানা সম্ভাবনায় পূর্ণ তা জানিয়ে রাখলাম।

 

 

শ্রীমৎ আচার্য ব্রহ্মানন্দ কেশব চন্দ্র নিজের প্রার্থনায় বলেছেন: “(মা)  সেই বিবাহ দিয়েছিলে বালির ঘাটে। আর আজ বিবাহ দিলে বিধানের ঘাটে । মা, এত শীঘ্র যে এ আশা পূর্ণ করিবে জানিতাম না।[…] নব বিবাহে যে পাতি পত্নীর মিলন হয় এইটা কেহ মানিত না । কিন্তু তুমি দেখিয়ে দিলে প্রমান করিলে  এইটা হয়। একটা স্ত্রীলোক একটা পুরুষ এক হইল। একজন আমার কাছে বসিল , সে ইহকাল পরকালের জন্য আমার হইল। অমারাত্মা দুইটির যোগ হইল। আমার স্ত্রী আর মেয়েমানুষ নয়, আমার বন্ধু হইলেন । উভয়ে উভয়ের বন্ধু হইলাম । আমরা দুজনে একজন হইলাম, তোমার হইলাম ।“

আবার দৈনিক প্রার্থনা  চতুর্থ ভাগে দেখা যাচ্ছে: “আমি সচ্চিদানন্দের শিষ্য , আমার পরিবার আমার ক্রোড়ে। আমি যেন মহাদেবের শিষ্য হইয়া পত্নী ক্রোড়ে গভীর যোগে মগ্ন হইয়া চিদাকাশে উত্থিত হই।
কথাটি পড়ে তাবৎ চমৎকৃত হয়েছিলাম। এমন উপমা! পাঠক, একখানি পুরোনো গান শোনাই:

মহাকালের কোলে এসে
গৌরী হ’ল মহাকালী,
শ্মশান-চিতার ভস্ম মেখে
ম্লান হ’ল মার রূপের ডালি।।
তবু মায়ের রূপ কি হারায়
সে যে ছড়িয়ে আছে চন্দ্র তারায়,
মায়ের রূপের আরতি হয়
নিত্য সূর্য্য-প্রদীপ জ্বালি’।।
উমা হ’ল ভৈরবী হায়
বরণ ক’রে ভৈরবেরে,

হেরি’ শিবের শিরে জাহ্নবী
শ্মশানে মশানে ফেরে।
অন্ন দিয়ে ত্রি-জগতে
অন্নদা মোর বেড়ায় পথে,
ভিক্ষু শিবের অনুরাগে
ভিক্ষা মাগে রাজদুলালী।।

“শ্মশান চিতার  ভস্ম মেখে ম্লান হলো মা’র রূপের ডালি”; ভেবে দেখলাম ঐটি ই হলো মূল সূত্র। পাঠক,  ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাস নিয়ে টানা হেঁচড়া করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়;  কিন্তু দুই চার কথা না বললে পাঠ টি  স্বচ্ছ হয় না। পাঠটিও  বড় সহজ নহে ।  প্রথম ঊদ্ধৃতি তে ‘মা’,যিনি নাকি কেশব চন্দ্রের বালির ঘাটে বিবাহ দিয়েছেন, শিব গৌরীর গূঢ় উপমাটি এবং তারই সঙ্গে ‘সচ্চিদানন্দ’এর  প্রতি আনুগত্য প্রকাশ, এইসব এ বড় গোল বাধে।.  ব্রহ্মানন্দ প্রবর্তিত নব বিধান  সম্পর্কে তাই দুই একটি কথা বলি। একদল পন্ডিতের মতে দক্ষিনেশ্বরের পরমহংসের  কুপ্রভাবের কারণে  তাঁর  এই নব ধর্ম মতে বহু হিন্দু কুসংস্কার ঢুকে পড়ে; তার একটি হলো ঈশ্বর কে  ‘মা ভগবতী’ রূপে কল্পনা। এই চোরা গলি দিয়েই যে হর গৌরীর উপমাটি এসেছে তা আর বলে দিতে হয় না। এ সকল জটিল  তত্ত্বকথা তে আমাদের কাজ নেই.। প্রাচীন গীতি টি আর একবার পড়ে দেখুন, ওটির শিগগিরই প্রয়োজন হবে। প্রথম উদ্ধৃতিতে শেষকালে ফিরবো।

তাঁর ‘জীবন বেদ” গ্রন্থখানি তে ব্রহ্মানন্দ বিবাহ বিষয়ে তাঁর অল্প বয়সের ভাবনার কথা বলছেন:

“যখন বিবাহ করিয়া সংসারে প্রবেশ করিব, সংসারের বাড়ি যেখানে করিব, দেখি এই জায়গাইতো শ্মশান। স্ত্রী আসিতেছেন সংসার আরম্ভ করিতে হইবে । […] আমি ভাবিলাম উচ্চ পদার্থ জীবাত্মা, তাকে আমি স্ত্রীর অধীন করিব? প্রতিজ্ঞা করিলাম এ জীবনে স্ত্রৈণ হইব না ; কেননা স্ত্রীর অধীন হইয়াই অনেক কে মরিতে দেখিয়াছি”। এই  রূপে জীবনের মূলে বৈরাগ্য হইল। তখন সংসার কাছে আসিতে পারিল না । আত্ম পীড়ন ও ভার্যা পীড়ন দ্বারা ধর্ম জীবন আরম্ভ হইল । অবশেষে যাহারা ভয়ের কারণ তাহারাই বন্ধু হইল।”
কেশব চন্দ্রের  বিবাহ পরবর্তী  এই ভাবটি কিন্তু তার মা সারদাসুন্দরীর আত্মকথাতেও পাই। তিনি বলেছেন: কিন্তু কেশব ছোটবেলা থেকেই বৈরাগ্য ভাবে পূর্ণ ছিলেন। সেই জন্যে তাঁহার এই বিবাহে কোনো অনিষ্ট  না হইয়া বরং ভালোই হইল।”
ভালো কিসে হইল তাহা বিশদ বোঝা গেল না । সারদাসুন্দরী গুছিয়ে সে কথা বলে যান নি, কিন্তু আমরা হর গৌরীর একটি নব্য ভাবানুবাদ পেয়ে আনন্দিত হলেম। স্বভাব বৈরাগী শিব যখন সংসার রূপী শ্মশানে থাকাই মনস্থ করলেন তখন গৌরীর অধিষ্ঠান যে সেই স্থানেই হবে তাতে আর সন্দেহ কি? তবে বালির চন্দ্র মজুমদারের মেয়ে কিনা “উচ্চ পদার্থ জীবাত্মা” গোড়াতেই ছিলেন না, শিবের ক্রোড় পেতে তাঁর সময় লেগেছিল এবং তাঁর শ্মশানের অভিজ্ঞতাটি গোড়ায় তেমন উচ্চকোটির ছিল না। তাঁর জীবনীকার ই তো বলেছেন: “আমরা পূর্বেই বলিয়াছি , ব্রহ্মানন্দ মুক্ত কন্ঠে স্বীকার করিয়াছেন “ভার্যা পীড়নেই” তাঁহার জীবন আরম্ভ ।  নয় বৎসরের বালিকা তাঁর এই বৈরাগ্য তত্ত্ব আর কি বুঝিবেন?”

 

গোলাপসুন্দরী বৃত্তান্ত

এ এক গল্পই বটে।

সারদাসুন্দরীর কথায়  পাই:

হাঁড়েলার এক সুন্দরী কুলীন কন্যার সহিত কেশবের বিবাহের প্রস্তাব হয় । আমার ভাসুর সেই মেয়ে সুন্দরী বলিয়া আপনার সেজো ছেলের সঙ্গে  তাহার বিবাহ ঠিক করিলেন।

এই সম্বন্ধটি ভাঙিয়া গেলে বালির চন্দ্র মজুমদারের মেয়ে গোলাপসুন্দরীর সঙ্গে কেশবের সম্বন্ধে ও বিবাহ হয়। এই মেয়ের সঙ্গে বিবাহ হওয়া আমার বেশ ইচ্ছা ছিল কিন্তু যখন শুনিতে পাইলাম মেয়ে তত সুন্দরী নয়  এবং অতি ছোট তখন আমার একটু অনিচ্ছা হইতে লাগিল।(…) সে যাহা হউক বিবাহ ঠিক হইল । বৌ ঘরে আসিল। বৌয়ের মুখ দেখিবার পূর্বে আমার মন আরও খারাপ হইল, এমনকি কাঁদিয়া ফেলিলাম। আমার ভাসুর ও  অপ্রস্তুত হইয়া গেলেন; তাড়াতাড়ি নিজে বাতি লইয়া ধরিলেন এবং আমাকে বেশ করিয়া মুখ দেখিতে বলিলেন। মুখ দেখিয়া আমার মন ভালো হইল। মনে করিলাম মুখ খানি বেশ, পরে ভালো হইবে। বিবাহের সময় বৌ অতি ছোট রোগা ও কালো ছিলেন, মাথার চুল আদপেই ছিলনা। কেশব পরে ঠাট্টা করিয়া আমার মেয়েদের বলিতেন, ‘তোমরা আর কাহারো মেয়ে দেখিতে যাইও না’।

এই গেল বিবাহ বৃত্তান্ত। রূপ কম, রুপো আরও কম। চন্দ্র মজুমদারের আঠেরোটি সন্তানের মধ্যে সর্ব জ্যেষ্ঠা। মেয়ের বাপের না আছে ধন না আছে মান। এই বৌ পেয়ে  ছেলের মায়ের প্রাণ যে নেচে উঠবে না সে কি আর বলে দিতে হয়? মেয়ের ভাগ্য, জ্যাঠশ্বশুর নিজের মান বাঁচাতে বাপ মরা ভাইপোর জন্যে তড়ি  ঘড়ি মেয়ে খুঁজতে বেরিয়ে এই মেয়ের সন্ধানই প্রথম পেয়েছিলেন, নাহলে এ মেয়ে কি আর সেন বাড়ির বৌ হওয়ার যোগ্য? নয় বছরের রোগা কালো মেয়েটি  এই কথাটি কত বুঝেছিল জানা নেই, কিন্তু শাশুড়ি যে তাকে বরণ করতে রাজি হচ্ছেন না সেটুকু সে বুঝেছিল নিশ্চয়ই?

এই হলো গৌরীর শ্মশানে প্রবেশ। তারপরে গল্পের চলনটি এইরকম। তাঁর জীবনীকার বলছেন:

এরপর শুনা যায় যে বিবাহের  পর প্রায়   চারি পাঁচ বৎসর  কাল (এইরূপে) ব্রহ্মানন্দ স্ত্রীর সাথে প্রায় কোনো সম্পর্কই রাখেন নাই। ইহা অবশ্যই তিনি ধর্ম জীবনের বৈরাগ্যের উত্তেজনায় করিয়াছিলেন।

লেখক বলছেন তাতে নাকি তিনি বাল্য বিবাহ করলেও, নীতিগত ভাবে বাল্য বিবাহ জনিত পাপ হতে মুক্ত রইলেন। এটি ঈশ্বরের দয়া। কিন্তু আমাদের ছোট মন  , ছোট ছোট কথা চোখ টানে।   বিশেষ সে মন যদি মেয়েমানুষের হয়, তো সে মেয়েমানুষের কথাই বোঝে বেশি।

“তাঁহাদের একান্নভুক্ত সংসার। এখানে সতীর যা (জা) ননদ ইত্যাদি বয়স্ক আত্মীয়া অনেকেই ছিলেন। সকলেই সর্বদা একত্রে থাকিতেন । একসঙ্গে সকলে আহার বিহার করিতেন। নিজ নিজ স্বামীর নিকট হইতে প্রায় সকলেই নানারূপ সুন্দর সুন্দর উপহার পাইতেন। কেবল দেবী জগন্মোহিনী পতির নিকট কোনো উপহার পাইতেন না । ইহাতে আত্মীয় মহিলারা সর্বদাই বিদ্রুপ করিতেন ও বলিতেন যে পত্নীকে তাঁর পছন্দ হয় নাই বলিয়াই দেবীকে কখন দেখিতে অন্তঃপুরে আসেন নাই এবং কোনো উপহারাদিও দেন নাই”।

এই অনাদর সহ্য করে থাকাই বোধ করি সতীত্ব। তাতে গোলাপসুন্দরী (তখনও তিনি ‘সতী  জগন্মোহিনী’ হয়ে উঠতে পারেন নি)  সসম্মানে উত্তীর্ণ যে হয়েছিলেন, সেটিও আমরা জানলাম; চোখের জল ফেলতে হলে যে দোর বন্ধ করতে হয়, সে জ্ঞানটি তাঁর ছিল সেই বালিকা দশাতেও।

দিন ফিরেছিল যখন তাঁর স্বামী দেবতাটি  ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে  দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশ্রয়  পান। তা সেই হলো ‘জগন্মোহিনীর জন্ম বৃত্তান্ত। নামটিও দেবেন ঠাকুরের ই দেওয়া। এ কথাটি তেমন জরুরি নয় জানি কিন্তু কলুটোলার মেজো ছেলেকে ‘ব্রহ্মানন্দ’ খেতাবটিও তিনিই দিযেছিলেন।

১৮৬২ সালের ১১ই এপ্রিল  গোলাপসুন্দরীর জীবনের একটি মস্ত দিন। সেই দিন দেবেন্দ্রনাথ তাঁর স্বামী ‘ব্রহ্মানন্দ’ কেশব চন্দ্রকে ব্রাহ্ম সমাজের ‘আচার্য’ পদে অভিষিক্ত করেন এবং ব্রহ্মানন্দ তাঁর উপেক্ষিতা স্ত্রীটিরে সমাজে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পান। তখন  গোলাপসুন্দরীর বয়স তেরো কি  চোদ্দ। ঘটনাটির একটি নাটকীয় বর্ণনা তাঁর জীবনীকার দিয়েছেন, সে বৃত্তান্ত এ যাত্রা তোলা রইলো। তবে এটুকু বলি, সকল বাধা বিপত্তি তুচ্ছ করে তিনি পালকিতে উঠলেন, জ্যাঠশ্বশুর দেওয়ান হরিমোহন সেনও তাঁকে আটকাতে পারলেন না। এরপর কেশবচন্দ্রের জন্যে সেনবাড়ির সদর দরজা বন্ধ হয়ে যায়। বোধকরি গোলাপ বুঝেছিলেন এই তাঁর অগ্নিপরীক্ষা । ঠিকই বুঝেছিলেন তিনি, কারণ এর পরেই তাঁর কপাল ফেরে। পতি আর মুখ ফিরিয়ে নেন না এবং সতীকে গ্রহণ করেন। হয়তো বা হরগৌরীর মিলন হবে যথাস্থানে এই ছিল জগৎপিতার বাসনা, সে কারণেই কলুটোলার সেনবাড়ি শেষমেষ পিরিলী বামুনদের পাল্লায় পড়ে বয়ে যাওয়া ছেলেকে অসুস্থ অবস্থায়  ঘরে ফিরিয়ে আনে। পরবর্তী ঘটনা জগন্মোহিনীর বিনিদ্র স্বামী সেবা। অগ্নি পরীক্ষা সাঙ্গ হ’ল। স্বামী সুস্থ হলেন এবং ধর্ম জীবনের বৈরাগ্যের কথা বিস্মরণ হলেন। শিবের ধ্যানও ভঙ্গ হ’ল।

Gargara Sati III

 

সতী জগন্মোহিনী

 

“পরীক্ষার অবসানে সৌভাগ্যের উদয় হইল। সতী জগন্মোহিনী দেবী অতি অচিরেই নবকুমার প্রসব করিলেন এবং মহা ঘটে করিয়া ব্রহ্মানন্দ নিজ বাসভবনেই আপন ধর্মবিশ্বাস অনুসারে ১৭৮৪ শকের ২৮শে পৌষ জাতকর্ম সম্পন্ন করিলেন”।

পাঠক,  এই নব কুমার হলেন করুণা প্রাসাদ ।এরপর  জগন্মোহিনী আরও নয়টি পুত্র কন্যার জননী হয়েছিলেন:  নির্মল , প্রফুল্ল , সরল , সুব্রত , সুনীতি , সাবিত্রী , সুচারু , মণিকা এবং  সুজাতা ।

দশ সন্তান পরিবৃতা সতীর আখ্যানটি এইখানেই শেষ হলে নেহাত  মন্দ হতো তা বলা যায়না। কুমার সম্ভবের মত মিলনান্তক মহাকাব্য সেই ধারাতেই রচিত হয়েছিল;। কিন্তু জগন্মোহিনী বৃত্তান্ত মহাকাব্য নয়। সতীত্বের পরীক্ষা তাঁর আরও কিছু বাকি ছিল।

পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে শ্রী দীনেশ চন্দ্র সেনের নাটকের পরিপ্রেক্ষিতে ‘খাম খেয়ালি শিব’ এর কথা বলেছিলাম।  সংসার শ্মশানে   বিচরণকারী  শ্রী কেশব চন্দ্র তাঁরই শিষ্য সে কথা তিনি স্বয়ং গোড়াতেই বলেছেন। জগন্মোহিনী চরিতে পাই, তিনি যখন তাঁর স্ত্রী সন্তান সহ নৈনিতাল ভ্রমণে যান (১৮৮০র আশপাশে বলেই অনুমান হয়। বইয়ে সময়ের উল্লেখ নেই), তখন ‘যুগল সাধন’ নামক ক্রিয়ার  ছবি যা তুলেছিলেন, তাতে দেখা যায়  ব্রহ্মানন্দের পরনে গেরুয়া,  সঙ্গে কমণ্ডলু, বাঘছাল ও একতারা। দেবীর পরিধানে একটি বারাণসী কাপড়, সঙ্গে একটি কমণ্ডলু ও ফুল  । এ হলো, আচার্য ব্রহ্মানন্দেরই বর্ণিত ‘হর গৌরী’ ভাব। আগের কথা পরে, ও পরের কথা আগে বলা হয়ে যাচ্ছে জানি  কিন্তু হর গৌরীর যে উপমাটি শুরু থেকেই ব্যবহার করা হয়েছে তা যে  নেহাত ই গাল গল্প নয় সেটি বোঝানোর প্রয়োজন ছিল। ‘হর গৌরী এই পরিচ্ছেদের প্রধান উপমা। সতীত্বের পরীক্ষার শেষ ধাপ এই যুগল সাধন। এটি এক দুরূহ ব্যাপর। এইবার সেইটি বর্ণনার সময় হয়েছে।

 

নব্য সতী

 

She rose to His Requirement—dropt

The Playthings of Her Life

To take the honorable Work

Of Woman, and of Wife—


                                   Emily Dickinson

 

১৮৮০  তে ব্রহ্মানন্দের পরিবার দশ সন্তান সম্বলিত। এই সময়ে তাঁর আধ্যাত্মিক চিন্তায় কিছু  যোগ বিয়োগ ঘটে।  তার এক ফল হ’ল যুগল মিলন ও নব্য সতী তত্ত্ব। এই সতী হলেন শ্মশানবাসিনী শিবজায়া এবং আগুনখাকী সতীর এক তাত্ত্বিক মিশ্রণ। তত্ত্বটি যে আমি খুব ভালো বুঝেছি তা জোর দিয়ে বলতে পারিনা, তবে মেয়েমানুষের মোটা মাথায় বেশি তত্ত্ব যে ঢোকে না সে তো জানা কথা। আশা করি পাঠক নিজ গুণে ক্ষমা করবেন ; তার ওপর ব্রহ্মানন্দের কথা যে একেবারে জলবত্তরলম্, তাঁর অনেক সমসাময়িকও তা মনে করতেননা । ছোট মুখে বড় কথা শোভা পায়না , আমি তত্ত্বটি তুলে ধরার চেষ্টা দেখি।

জগন্মোহিনী জীবনীর লেখক বলছেন:

“পূর্বে স্বামী দেহত্যাগ করিলে যিনি তাঁহার সহিত দেহত্যাগ করিতেন তিনি ই সতী হইতেন। স্বামী ব্রহ্মানন্দ সদেহেই যখন দেহত্যাগী  বৈরাগী ও আত্মস্থ আত্মক্রীত অধ্যাত্ম জীবনধারী হইলেন , সতী জগন্মোহিনী দেবীও তাঁহার অনুগামিনী হইতে স্বীকৃত হইয়া  উভয়েই যে আধ্যাত্মিক  উদ্বাহু ব্রত বা যুগল সাধন ব্রত গ্রহণ করেন  ইহাতেই নবযুগে নব যুগে নব সতী প্রথা  প্রবর্তিত হইল এবং জগন্মোহিনী দেবীই  এ যুগে সতী জীবনের আদর্শ দেখাইলেন।“

সোজা কথায় বলতে গেলে এ হলো শরীরহীন বিবাহ যাতে ‘শরীরের  বিবাহ’ কেবল সূচনা মাত্র। ওই যে গোড়ায় যে ঊদ্ধৃতি টি দিয়েছি, সেট হলো সেই যুগল ব্রতের মন্ত্র। “আমার স্ত্রী আর মেয়েমানুষ নয়, আমার বন্ধু হইলেন । উভয়ে উভয়ের বন্ধু হইলাম”।

এই  উত্তরণটি আবার হতে হবে সংসারের সকল কর্ম সাধন হওয়ার পর।  সবিনয়ে স্বীকার করি,   এই  মন্ত্রের প্রচার যে গ্রন্থটিতে হয়েছিল, সেই ‘নব সংহিতা’ আমার এ যাবৎ পড়া হয়ে ওঠেনি, তাই জানতে পারিনি এই স্বর্গীয় উত্তরণ টি স্বামী স্ত্রীর  জীবনের কোন মাহেন্দ্রক্ষণে ঘটবে , ঠিক কোন জৈবিক পর্যায়ে। কুকথায় কাজ নেই, আসল কথায় আসি।

সংসার শ্মশান থেকে বৈরাগ্য শ্মশান । গোলাপসুন্দরী হতে জগন্মোহিনী এবং যুগলমিলন পরবর্তী সময়ে ব্রহ্মনন্দিনী (ব্রহ্মানন্দ-পত্নী ন’ন)।  এই হলো নব্য সতীর  কণ্টকাকীর্ণ পথ। স্বামী শরীর চাইলেন আমি ধন্য হলাম।  স্বামী অদৈহিক তো আমিও অদৈহিক। স্বামী আধ্যাত্মিক তো আমিও । শ্মশান চিতার ভস্মটি  হ’ল সারাৎসার। সর্বাবস্থায় সেটি যেন সর্বাঙ্গে মাখা থাক। সেই সহজীবন, সেই সহমরণ, সে আমি শিব জায়া হই বা আগুনখাকী সতীর নব্য সংস্করণ: ‘আছি’ হয়েও ‘নেই’ হয়ে থাকা।  এই হলো সতীত্বের সংজ্ঞা ।  কেশব সেন সংহিতা লিখে সত্যকে তত্ত্বের রূপ দিলেন। তাঁর ‘নব্য সতী’ বারাণসী জড়িয়ে ঘটি আর ফুল নিয়ে বাঘছাল পড়া স্বামীর পাশে বসে তাঁর ইচ্ছার অনুগামিনী হলেন। তত্ত্ব না আকাশকুসুম, না দুই-ই?

সংসারে কত মেয়েমানুষ না জেনে না বুঝে এই সতীত্বের হাড়িকাঠে মাথা রাখলেন সে খবর নেওয়ার জো নেই। হেঁজি পেঁজি মেয়েমানুষের খোঁজ রাখে কে? যাঁদের খোঁজ রাখা হয়, আমরা তাঁদের নিয়ে লেখা বই পড়ি , তাতে লেখা থাকে:
(তাই) ব্রহ্মানন্দ যেমন মানব ভ্রাতৃত্বের প্রতিনিধি  দেবী জগন্মোহিনীও তেমন মানব ভগ্নীত্বেরও প্রতিনিধি হইয়া জন্মগ্রহণ করেন। আত্মত্যাগিনী হইয়া স্বামীর ধর্মসঙ্গিনী হওয়া , স্বামীর অনুগমনের জন্য সমস্ত নিপীড়ন অক্লেশে  সহ্য করা, অপৌত্তলিক, কুসংস্কার  বর্জিত আদর্শ সমাজ ও সুখী পরিবার সংগঠনে স্বামীর সহকারিণী হওয়া যে তাঁর জীবনের বিশেষ লক্ষণ, ইহা কেহই অস্বীকার করিতে পারিবেন না । পরিশেষে স্বামী স্ত্রী  এক না হইলে যে নব বিধান সাধনই হয় না , তাহারি দৃষ্টান্ত দেখাইবার জন্য  ভগবান  এই সতী জীবন আমাদের মধ্যে প্রেরণ করিয়াছেন”।

আর মাথা নেড়ে বলি,  ‘হ্যাঁ, সতী বটে!’ জগন্মোহিনী নাম সার্থক!
অনেক কথা বাকি পড়লো। কলুটোলার সেন বাড়ি, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, ব্রহ্মানন্দের কমল কুটির। আনন্দ অপমান অভিমান ভয়।   যে তথ্যটি বাদ দেওয়া গেল না, তা হ’ল ব্রহ্মানন্দের মৃত্যুর (১৮৮৪) পর ব্রহ্মনন্দিনী বাঁচেন আরও চোদ্দ বছর। স্বামীর মৃত্যুর কিছু পরেই, শুধু শেমিজ খানি পরে তিনি ছাদের আলসের ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। একটি ভয়ানক পরিণতির থেকে তাঁকে বাঁচিয়েছিলেন তাঁর মেয়ে সুনীতির স্বামী, নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুর। ঘটনাটি ঘটলে সম্ভবতঃ এই দিব্যজীবনীটি লেখা হ’ত না। সতী তত্ত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
ঈশ্বর পরম করূণাময়। তিনি তা হতে দেননি।

কথাটি কেন বললাম পাঠক বিবেচনা করুন। আমি বলে মুক্ত হলাম। আমার প্রলাপেও দাঁড়ি পড়লো ।

 

গড়গড়ার মালো উপসংহার

GARGARA EDUCATED BIBI

 

নেশার ঘোর  কাটলে সত্য দর্শন হয় । কমলাকান্ত আর গড়গড়া সাক্ষী ।

 

ভীষ্মদেব খাসনবিশ বলেছিলেন:

কমলাকান্তের কাছে ছেঁড়া কাগজ পড়িতে পাইত না; দেখিলেই তাহাতে কি মাথা মুণ্ড লিখিত, কিছু বুঝিতে পারা যাইত না। কখন কখন আমাকে পড়িয়া শুনাইত – শুনিলে আমার নিদ্রা আসিত। কাগজগুলি একখানি মসীচিত্রিত, পুরাতন, জীর্ণ বস্ত্রখণ্ডে বাঁধা থাকিত। গমনকালে, কমলাকান্ত আমাকে সেই দপ্তরটি দিয়া গেল। বলিয়া গেল, তোমাকে ইহা বখ্‌শিশ করিলাম।

 

এ অমূল্য রত্ন লইয়া আমি কি করিব? প্রথমে মনে করিলাম, অগ্নিদেবকে উপহার দিই। পরে লোকহিতৈষিতা আমার চিত্তে বড় প্রবল হইল। মনে করিলাম যে, যে লোকের উপকার না করে, তাহার বৃথায় জন্ম। এই দপ্তরটিতে অনিদ্রার অত্যুৎকৃষ্ট ঔষধ আছে – যিনি পড়িবেন, তাঁহারই নিদ্রা আসিবে। যাঁহারা অনিদ্রারোগে পীড়িত, তাঁহাদিগের উপকারার্থে আমি কমলাকান্তের রচনাগুলি প্রচারে প্রবৃত্ত হইলাম।

 

আমিও আমার ছেঁড়া খোঁড়া কাগজের দপ্তর  পাঠকদের হাতে তুলে দিলাম।  নিদ্রা আসিবে না নিদ্রাহরণ হইবে সে বিচার পাঠকের। আমি  বিদায় নিলাম ।

                                                                  সমাপ্ত

                                         


আলোচ্য গ্রন্থ: ব্রহ্মনন্দিনী সতী জগন্মোহিনী দেবী

লেখক: অজ্ঞাত
প্রকাশকাল: ১৯১৪

Featured Image: ‘সতী’ নন্দলাল বোস।

Posted in বাংলা, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, History, Uncategorized, Women | Leave a comment

গড়গড়ার মা’লো পঞ্চদশ পর্ব: সতী সমাচার

aban

গড়গড়ার মালো পঞ্চদশ পর্ব: সতী সমাচার

 

কথা গুটিয়ে নেওয়ার সময় এলো । পঞ্চসতী কে দিয়ে শুরু করেছিলাম তারপর ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় তাঁরা কোথায় যেন উধাও হয়েছিলেন. এইবার তাঁদের আখ্যানেই ফেরা মনস্থ হলো। শ্রী দীনেশ চন্দ্র সেন এর সতী উপাখ্যান থেকে দুই একটি কথা বলার ইচ্ছে হলো  ভূমিকায় লেখক বলছেন:

“প্রাচীনকালে স্বামীর প্রেম ও রমণীর পাতিব্রত্যের যে আদর্শ বঙ্গীয়সমাজের সম্মুখে ছিল, এই গল্পে যদি তাহার আভাস দিতে সমর্থ হইয়া থাকি, তবেই শ্রম সার্থক জ্ঞান করিব। আমাদের সর্ব্ববিষয়ে প্রাচীন আদর্শ কি ছিল, তৎসঙ্গে শিক্ষিতসম্প্রদায়ের পরিচয় স্থাপন করা উচিত—তাহা হইলেই আমরা বর্ত্তমানের উপযোগী সমাজ গঠনের সদৃঢ় ভিত্তিভূমি পাইব, নতুবা পাদ্রীর বক্তৃতা শুনিয়া কাফ্রি বা সাঁওতালের ন্যায় একবারে নিজস্ব হারাইয়া—নব্য-সভ্যতার গ্রাসে পতিত হওয়া শ্লাঘার বিষয় নহে। সেই পরিচয়স্থাপনের চেষ্টা কি সাহিত্য, কি সমাজ, কি শিল্প, সকল দিক দিয়াই প্রত্যেক স্বদেশভক্তের প্রযত্নের বিষয় হওয়া উচিত। সাহিত্যক্ষেত্রে এই লক্ষ্যই আমার সামান্য লেখনীকে প্রেরণা দান করিয়াছে”।
লেখাটি ১৯০৬ এ প্রকাশিত। কোনো ‘নব্য’ ভাবে  যাতে সতী লক্ষ্মীরা ভেসে না যান এই সৎ উদ্দেশে  লেখা গল্প. গল্পের শিবজায়া বঙ্গনারীর রূপক। তিনি এক খামখেয়ালী স্বামীর অধীন। সেই স্বামীই তার ধ্যানজ্ঞান, যদিও তিনি সতীর ভরণপোষণে অসমর্থ। এবং এই অতি হতভাগ্য স্বামীর অপমানেই তাঁর দেহত্যাগ। দক্ষযজ্ঞের এই নব্য সংস্করণে যে অমৃতবাণীর আভাস পাই তা হলো নির্মোক সহনশীলতার পাঠ। বুক ফাটে তবু মুখ ফোটেনা, এই কথাটির মর্ম বোঝাই হলো সতীত্বর প্রথম ধাপ। আগুনে পোড়া পোড়া হলে তিনি হন দেবী। পতিতাদের কথা শোনা হয়েছে, আর কাজ নেই । তেমনভাবে সতীলক্ষ্মীদের বয়ান কিছু বলা হয়নি এ যাবৎ। দুইএক সভা উজ্জ্বল সতীলক্ষ্মীর বয়ান পাঠ করে এবেলা নিজের পাপ  স্খালন করি।

 

গোড়াতেই নিবেদন করে রাখি, যা বলব তা গল্পচ্ছলে শুনতে হবে ।

 

এক : অষ্টবর্ষা ভবেৎ গৌরী নববর্ষা তু রোহিনী…

 

আমার নয় বৎসর বয়সে বিবাহ হয়। হিন্দু নিয়ম মতো এক বৎসর বাপের বাড়ি ছিলাম । তারপর দশ বৎসর বয়সে শ্বশুর  বাড়ি আসি । শ্বশুর বাড়ি আসার পূর্বে আমার বড় ভয় হইত। ভাবতাম যেন আমায় কোয়েড করিবে বা ফাঁসি দিবে । এই ভাবিয়া এক মাস পর্যন্ত কাঁদিয়াছিলাম। শেষে আমার বাবা জোর করিয়া যখন শ্বশুর বাড়ি রাখিয়া গেলেন তখন মনে হইলো যেন আমায় জলে ফেলিয়া গেলেন।

আমাদের অনেক দাসদাসী ছিল কিন্তু আমার শাশুড়ি দাসীকে ঘরে আসিতে দিতেন না . সেই বড় বড় ঘরগুলি আমাদের ধুইতে হয়তো । কোনোরকমে কষ্টে সৃষ্টে  যদি ধুইতাম  কিন্তু ন্যাকড়া দিয়া মুছিতে পারিতাম না  অত বড় ঘর মুছিবার ন্যাকড়া হাতে ধরিতে পারিতাম না । সমস্ত দিন এইরূপ কাজ করিতে করিতে এক একবার খেলা করিতে ইচ্ছা হয়তো কিন্তু খেলা করিতে দেখিলেই শাশুড়ি বিরক্ত হইতেন।

[…] এগারো বৎসর বয়সে আমার দীক্ষা হয়, দীক্ষার পরই আমি পূজা করিতে শিক্ষা করি। আমি যতদূর সাধ্য শাশুড়ির সেবা করিয়াছি কিন্তু স্বামীর সেবা এবং শ্বশুরের সেবা করিতে পারিতাম না কারণ, সেই সময়ে এইসব কাজ মহৎ হইলেও করিতে দেখিলে লোকের নিকট নিন্দনীয় হইতে হইত।
দুই : সুখ্যাত
‘তিনি’ (আমার স্বামী) সবসময় আমায় উপদেশ দিতেন। বলিতেন, যাতে ভালো হও, সর্বদা তাহার চেষ্টা করিবে। কখনো খুব চেঁচিয়ে হাসিও না, কাহারো সঙ্গে চেঁচিয়ে কথা কহিয়ো না,  ইত্যাদি। তিনি বেআব্রু ভালবাসিতেন না , এবং যাহাতে সর্বদা আব্রুতে থাকি  সেই জন্য চেষ্টা করিতে উপদেশ দিতেন। তিনি বলিতেন, ‘যখন কোথাও যাই, তাহারা যখন তোমার সুখ্যাত করে শুনিয়া বড় আহ্লাদ হয়।’

 

তিন: প্রসূতি সদন

 

আমার সতেরো বৎসরে কেশবের জন্ম হয়। নবীনের ছোট আমার মেয়ে ব্রজেশ্বরী , তার ছোট কেশব । অগ্রহায়ণ মাসে শুক্ল পক্ষে  দ্বিতীয়া তিথিতে সোমবার ভোরে সাতটার সময় , ওই নীচের, যে ঘরটি তোমায় দেখাইয়া দিয়াছি…সেই স্থানে তাঁর জন্ম হয় । সেই ঘরটি স্বেতখানার পথেই ছিল  নবীনের বোরো ব্যামো বলে আঁতুর ঘর প্রস্তুত হয় নাই। তাই তাড়াতাড়িতে সেই ঘরেই কেশবের জন্ম হয়। ঘরটি এত খারাপ ছিল যে জন্মাবার একটু পরেই তাঁর পেট ফেঁপে উঠেছিল ।

 

 চার : আমার বিধবাবস্থা বা দুঃখের কথা


স্বামীর মৃত্যুর দিন পনেরো পরেই  আমার সেজো দেবর প্রথম আমার ওপর অত্যাচার শুরু করেন। তেতলার যে ঘরে বড় খাটে আমার স্বামী শুইতেন, ঘরের কপাট ভাঙিয়া আমার সেজো দেওর সে খাটখানি লইয়া গেলেন, আমি কাঁদিলাম। জিনিসের লোভে যে আমি কাঁদিলাম তাহা নয়, কাঁদিলাম এইজন্যে যে তিনি যাইতে না যাইতেই  ইঁহারা আমার সঙ্গে এইরূপ ব্যবহার আরম্ভ  করিলেন।[…] মনকে বলিলাম তাঁহাদের ভাইয়ের জিনিস তাঁহারা লইবেন , আমি কোনো দুঃখ করিব?[…] এইসব দেখিয়া শুনিয়া আমার ক্রমে ক্রমে এক ভয় হইলো । আমি সবসময় আমার ছেলে মেয়েদের লইয়া এক ঘরে দরজা দিয়া পড়িয়া থাকিতাম । ভয়ে ভয়ে ভাবতাম ইঁহারা যদি আমাকে ছেলেমেয়ে শুদ্ধ তাড়াইয়া দেন তাহা হইলে আমি কোথায় যাইব? এইরূপে আমাদের দিন কাটিতে লাগিল।
স্বামীর শোক সামলাইতে না সামলাইতে আমার প্রিয়তমা কন্যাটি যায় আমি একেবারে অধৈর্য হইয়া গেলাম । ঘরে প্রবেশ করিতাম না বারান্দায় পড়িয়া থাকিতাম […] স্বামী ও কন্যার ভীষণ শোকের পর শাশুড়ি আমার বড় ছেলে নবীনের বিবাহ স্থির করিলেন। আমার ছেলে নবীনের, আমার ভাসুরের ছেলে যদুনাথের এবং ছোট দেওর মুরলীধারের  বিবাহ একই সঙ্গে হয় । আমি বলিলাম, “আমি এখন উঠিতে পর্যন্ত অক্ষম , আমার ছেলের বিবাহ এখন থাক।” আমার কথা কিন্তু শুনিলেন না, বিবাহ দিলেন। […] আমার ছেলে যখন বিয়ে করিয়া বৌ লইয়া ঘরে আসিলেন , তখন শাশুড়ি বৌ আমার কোলে দিয়া বলিলেন, ” তুমি যে মেয়ের জন্যে শোক করিতেছ, এই সেই মেয়ে । ইহাকে সেই মেয়ের মতো দেখিয়া সব দুঃখ ভুলিয়া যাও। আমি কোলে লইলাম কিন্তু কাঁদিয়া বলিলাম, ” কই ব্রজেশ্বরীর শোক তো ভুলিতে পারিলাম না?”

 

উপসংহার

 

আমার এখনকার অবস্থা জানিতে চাহিতেছ। […] এই বৃহৎ পরিবারে প্রতিদিন কোনো স্থানে শোক দুঃখ, কোনো স্থানে বা আনন্দোৎসব হইতেছে । এই সমস্ত শোক দুঃখ আনন্দোৎসবের খবর প্রায় রোজি আমার নিকট আসিতেছে । ভগবান আমাকে একেবারে আনন্দে কিংবা একেবারে দুঃখে থাকিতে দিতেছেন না । সুখে এবং দুঃখে পোড়াইতে পোড়াইতে সুখ দুঃখের বাহিরে লইয়া যাইতেছেন । আমার এক অংশ যেমন রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর এক অংশ গৃহশূন্য, অর্থহীন, প্রায় পথের ভিখারি, সুতরাং সুখ সংবাদেও আমি উতলা হইনা এবং দুঃখের সংবাদেও আমাকে কাতর করিতে পারেনা।

MOTHER CHILD

 

***

ছেঁড়া পুরোনো বেনারসির তিন চার টুকরো দিয়ে এক খানি নকশা  তোলা  বড় সহজ কাজ নয়। তাও একেবারে যে পারা যায় না  তাও নয়। বেনারসি শব্দটি ব্যবহার করলাম তার কারণ একটি আছে বই কি। মানুষটি নিজেই বলেছেন তিন  রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী  আর পথের ভিখারি দুই ই । পাঠক,  যাঁর কথা দিয়ে এই  এই নকশি কাঁথা তৈরী হলো, তিনি সারদা সুন্দরী দেবী (১৮১৯-১৯০৭), দেওয়ান রামকমল সেনের পুত্রবধূ, শ্রী প্যারীমোহন সেনের ধর্মপত্নী এবং সর্বোপরি, ব্রহ্মানন্দ কেশব চন্দ্র সেনের  জননী। এঁর প্রসঙ্গ আগেও একবার এসেছে. রামকৃষ্ণ এনারই রত্নগর্ভ নিয়ে এনাকে সাধুবাদ দিয়েছিলেন। ‘পুত্রোৎপাদিকা বনাম নভেল নায়িকা’ পরিচ্ছেদ এ কথাটি  বলেছি, আবারও মনে করিয়ে দিই : তিনি সারদাসুন্দরী   দেবীকে বলেছিলেন: “দ্যাখ্ মা, তোর নাড়িভুঁড়ি নিয়ে  পৃথিবীর লোক এর পরে নাচবে। তোর ওই ভান্ড থেকে ওই ছেলে বেরিয়েছে।”

তাঁর মৃত্যুর পরে নববিধান প্রচারক শ্রী গিরিশ চন্দ্র সেন লিখেছিলেন: ” শ্রী ইশার দেবজীবনের মূলে টান জননী মেরি দেবী বিদ্যমান । ইশার নামের সঙ্গে মেরির নাম সংযুক্ত।[…] আচার্য কেশব চন্দ্রের উন্নত জীবনের মূলে তাঁর সাধ্বী জননী সারদা দেবী বিদ্যমান।

 

 

শ্রী চন্ডীচরণ সেন লিখেছিলেন: ” সারদা দেবীর জীবনটা যেন ক্রুশময়  এবং সেই সকল ক্রুশ তিনি যেমন অসাধারণ  ভাবে বহন করিয়া গিয়াছেন তাহা জগতের রমণীমাত্রের আদর্শ হইয়া যাবচ্চন্দ্রদিবাকর বিরাজ করিবে”।
দুইটি লেখাতেই ঈশা  মেরি এবং ক্রুশের অনুষঙ্গ দেখে মনে মনে হাসি এলো। তারপর মনে হলো ক্রুশ ও যা, কাঁটাও তা।  ইশার ক্রুশ আর চড়কের কাঁটা সন্ন্যাসীর  ব্যঞ্জনায় কোনো তফাৎ  তো দেখি না!  আর ছেলেটি মারা যাওয়ার পর মা মেরির  তারই মাঝে কাঁটায় গেঁথে বেঁচে থাকার ইশারাটিও মন্দ নয় বলেই বোধ হলো। খুব সত্যি কথাই বটে।   মেয়েমানুষ  মাত্রেই কাঁটা সন্ন্যাসি  যেন। সে তিনি মেরিই হোন, বা সারদাসন্দরীই হোন, বৃত্তান্ত টি একই। কাঁটা লোহারই হোক বা খেজুর-বেল-শিয়ালকুল ইত্যাদি গাছের কাঁটাই হোক, দেশের রাজার আদেশ হোক বা ধর্মের আচারবিধি,  সারা জীবন কাঁটার ওপর গড়াতে হবে, রক্ত ঝরা চলবে না, ঝরলেও তা নিয়ে গোল করা চলবে না; পরম ভক্তি ভরে ‘শিব শিব’ উচ্চারণে ,বা পরম পিতার  স্মরণে সেই কাঁটা সহ্য করতে হবে, তবেই না জয়জয়কার হবে সতী সাধ্বীর ? গোড়াতেই বলে রেখেছি বুক ফাটে তো মুখ ফোটেনা সতীত্বের সনাতন সংজ্ঞা।
যে সাধ্বীটিকে  দেবীর মহিমা দেওয়া হলো, তাঁর জীবনের দুই চারটি অংশ মাত্র বলেছি। বাকি পড়েছে অনেক কথা: স্বামীর মৃত্যুর পর  সেজো দেওর অত্যাচারের চেয়েও বেশি বুকে বাজা বড় ভাসুরের প্রবঞ্চনা ও শ্বশুরের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি নিয়ে বিসম্বাদ, মেজো ছেলে কেশবের  জন্যে মেয়ে দেখতে গিয়ে নিজের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া । এসব কথা  এই সারদা সুন্দরী দেবী বলে গেলেন। কারো কানে জল গেল কিনা বোঝা গেল না। তিনি কিনা কেশব সেনের মা, তাই তাঁর ক্রুশ বিদ্ধ মোহিমোজ্জ্বল ছবিটি ই জ্ঞানী গুণীরা ধরে রাখলেন । আমি আগেই বলেছি আমার মন উল্টো বাগে চলে, আমি দেখলাম  একটি ভয়ে গুটিয়ে থাকা  পঁচিশ বছরে সাত ছেলেমেয়ে নিয়ে বিধবার জীবন। বড় ঘরের মেয়ে নয়, বড় ঘরের বৌ। সব মেনে নিয়ে শ্বশুর কুলের মানমর্যাদা রক্ষা করে  কাঁটার ওপর গড়াতে গড়াতে বেঁচে থাকা। পাওনার মধ্যে ব্রহ্মানন্দের মা হওয়ার গৌরব। সে গৌরবই বা কম কিসে? নোংরা আঁতুড় ঘরে সূতিকার সঙ্গে লড়াই করে অনেক সাধ্বীই তো বছর বছর ছেলে বিইয়েছে। সেই সুবাদে দেবীর আসন পেয়েছে ক’জন হতভাগী ?

 

পরিশিষ্ট

 

ধরা যাক, সারদাসুন্দরীর বৃত্তান্ত একটি  মেয়েলী রূপক। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে এইসব সামাজিক রূপকের মানে করতে গিয়ে মুড়ি মিছরি একদর করলে চলবে না। হাজার হোক, কলুটোলার  সেনবাড়ি  উনিশ শতকের একটি বিশেষ জায়গা জুড়ে। মতি শীল  দেওয়ান নবীন চন্দ্র সেনের ( কেশব সেনের বড় ভাই) বন্ধু। ইন্দোরের মহারাজা টিকাজী রাও হোলকার সে বাড়িরই মেজো বৌয়ের হাতের রান্না খেতে চান,  স্বয়ং লেডি Dufferin সে বাড়ির মেয়েদের কদর করেন, এবং  রামকৃষ্ণ, দেবেন ঠাকুরের সঙ্গে এবাড়ির কর্তাদের অম্ল মধুর সম্পর্ক। কুচবিহারের  আর ময়ূরভঞ্জের মহারাজারা এবাড়ির  নাতজামাই। এছাড়াও কর্তারা দুই পুরুষের সরকারি দেওয়ান । ট্যাঁকশাল থেকে নতুন টাকা আধুলি এনে স্ত্রীর হাতে তুলে দেন গরিব দুঃখীদের বিলি বন্টন করার জন্য। ঘরের দোরে হাজার দুর্দিনেও লক্ষ্মী  বাঁধা। এ বাড়ির মেয়েদের  জীবন খানিক ভিন্ন তো হবেই। দেওয়ান প্যারীমোহন সেনের   স্ত্রী সারদা সুন্দরী  যদি হন মেরি মাতার  এবং আলেক্সান্ডার হানিবল ও সিজারের  মায়েদের সমগোত্রীয়, (তার মৃত্যুর পর  শ্রী চন্ডীচরণ সেনের বাখান তাই বলছে), তাঁর মেজো বৌটিও কম যান না। তিনিও ঊনিশ শতকের এক রূপক। শাশুড়ি  যদি হ’ন দেবী, বউটি হলেন সমসাময়িক কালের সতীত্বের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।  তবে এই সতী সনাতন হিন্দু ধর্মের আগুন খাকি সতী ন’ন, ব্রাহ্ম নববিধান সমাজের নব্য সতী। এর ব্যাখ্যা ভিন্ন, প্রকার প্রকরণ ভিন্ন। হর গৌরীর কিঞ্চিৎ অনুষঙ্গ আছে বটে , কিন্তু সে খালি সিকি পরিমাণ।তারসঙ্গে আছে গোলাপসুুন্দরী নামের এক অতি সাদামাটা মেয়ের ‘ব্রহ্মনন্দিনী’ হয়ে ওঠার বৃত্তান্ত।  সে কথাটি দিয়েই এই পাঁচালিতে দাঁড়ি টানব সাব্যস্ত করলাম । তাতেই মঙ্গল।

 

গড়গড়ার মা’লো’  আগামী সংখ্যায় সমাপ্য।

 

 

 আলোচিত গ্রন্থ: কেশব জননী দেবী সারদা সুন্দরীর আত্মকথা
অনুলেখক: শ্রী যোগেন্দ্রলাল খাস্তগীর

Featured Images:

Abanindranath Tagore
Jamini Roy

Posted in Uncategorized | Leave a comment

গড়গড়ার মা’লো চতুর্দশ পরিচ্ছেদ: ধেড়ে মেয়ের লেখালেখি অথবা Indelicate নবীনকালী দেবী

ধেড়ে মেয়ে

পাঠক, দুটি উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করি। প্রথমটি  শ্রী  ললিত  চন্দ্র মিত্রর   ১৯০৯এ লেখা    ‘দীনবন্ধুর   জীবনী’ থেকে, যাতে তিনি বঙ্কিম চন্দ্রর দীনবন্ধু মিত্রর নায়িকা চরিত্রের কিছু সমালোচনা উদ্ধৃত করেছেন বং খণ্ডন করেছেন। দ্বিতীয়টি বঙ্কিম চন্দ্রের ‘ইন্দিরা’ উপন্যাসে ইন্দিরার কথা।

১) “লীলাবতী বা কামিনীর শ্রেণীর নায়িকার সম্বন্ধে তাঁহার ( দীনবন্ধুর ) কোন অভিজ্ঞতা ছিল না।  হিন্দু ঘরে ধেড়ে মেয়ে, কোর্টসিপের পাত্ৰী হইয়া, যিনি কোর্ট করিতেছেন, তাহাকে প্ৰাণ মন সমৰ্পণ করিয়া বসিয়া আছে, এমন মেয়ে বাঙ্গালী সমাজে ছিল না কেবল আজ কাল নাকি দুই একটা হইতেছে শুনিতেছি। …..দীনবন্ধু ইংরেজি ও সংস্কৃত নাটক পড়িয়া এই ভ্ৰমে পড়িয়াছিলেন যে, বাঙ্গালা কাব্যের নায়ক নায়িকাকেও সেই ছাঁচে ঢালা চাই ।“ দীনবন্ধু প্ৰাচীন সংস্কৃত ছাঁচে কিংবা হালের ইংরাজী ছাঁচে লীলাবতী ঢালিয়াছিলেন কি না, বিচার করিয়া দেখিব । যাহা “আজকাল না কি দু একটা হইতেছে” বলিয়া বঙ্কিম বাবু কেবল দুর হইতে শুনিয়াছিলেন, তাহা যে ঠিক বঙ্কিম বাবুর নিকট ঐ অস্বাভাবিক জনশ্রুতি পহুছিবার দিন কি তৎপূর্ব দিন ঘটিয়াছিল, তাহা নয়। এ দেশের অনেক লোক যে স্ত্রীশিক্ষা ও একটু বেশী বয়সে মেয়ের বিবাহ দিবার জন্য অনেক পূৰ্ব্ব হইতেই উদ্যোগ ও সংস্কল্প করিয়া আসিতেছিলেন, দীনবন্ধুর পূৰ্ব্ববৰ্ত্তী “পুরাণ দলের শেষ কবি” ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তও তাহা জানিতেন। গুপ্ত কবি তঁহার অবজ্ঞার জিনিসটা একটা দূরে শোনা কথা বলিয়া উড়াইয়া দেন। নাই ; তিনি তাহার বিরুদ্ধে কলম ধরিয়া পরিহাস কয়িয়া লিখিয়াছিলেন,- “আগে মেয়েগুলো ছিল ভাল ব্ৰত ধৰ্ম্ম করত সবে ; একা বেথুন এসে শেষ করেছে, আর কি তাদের তেমন পাবে ? যত ছুড়িগুলো তুড়ি মেরে কেতাব হাতে নিচ্চে যবে, তখন এ, বি, শিখে বিবি সেজে বিলাতী বোল কবেই কবে।
২) অতএব ইন্দিরা বলে – তা,তোমরা পাঁচ রকমের পাঁচ জন মেয়ে আছ , পুরুষ পাঠকদিগের কথা আমি ধরি না – তাহারা এ শাস্ত্রের কথা কি বুঝিবে – তোমাদের আসল কথাটা বুঝাইয়া বলি । ইনি আমার স্বামী – পতিসেবাতেই আমার আনন্দ – তাই , কৃত্রিম নহে- সমস্ত অন্তঃকরণের সহিত , আমি তাহা করিতেছিলাম। …যে বুদ্ধি কেবল কালেজের পরীক্ষা দিলেই সীমাপ্রান্তে পৌঁছে , ওকালতিতে দশ টাকা আনিতে পারিলেই বিশ্ব-বিজয়িনী প্রতিভা বলিয়া স্বীকৃত হয় , যাহার অভাবই রাজদ্বারে সম্মানিত , সে বুদ্ধির ভিতর পতিভক্তিতত্ত্ব প্রবেশ করান যাইতে পারে না । যাহারা বলে বিধবার বিবাহ দাও , ধেড়ে মেয়ে নইলে বিবাহ দিও না , মেয়েকে পুরুষ মানুষের মত নানা শাস্ত্রে পণ্ডিত কর , তাহারা পতিভক্তিতত্ত্ব বুঝিবে কি ? … আমাদিগের পতিভক্তি আমাদের গুণ; আমাদিগকে যে হাসি চাহনির কদয্য কলঙ্কে কলঙ্কিত হইতে হয়, সে তোমাদের দোষ ।

ধেড়ে মেয়েদের যে পেরে ওঠা ভার এই বিবেচনাটি স্ত্রী শিক্ষার লেজ ধরে বঙ্গসমাজে ঢুকে পড়লো. ধেড়ে মেয়েদের যে লাজ লজ্জার বালাই নেই সে কথা খুব পরিষ্কার করে দেখা গেল বঙ্কিমী বুলিতে . এনারা পুরুষ জাতি দেখলে লতার মতো গুটিয়ে যান না, এবং মেয়ে ইস্কুল  আর নব্য বাবুদের যন্ত্রনায় দেখা গেল তাঁদের মধ্যে দুটি একটি কলম  বাগিয়ে দু তিন কথা লিখেও ফেলতে পারেন । সর্বনাশের শেষ ধাপ হলো ছাপার অক্ষরে প্রকাশ হওয়া.  এই  সকল প্রকাশবিনষ্ট মেয়েদের যে খুব ভালো চোখে দেখা হতো না সে  বোঝা যায় তাঁদের নিজেদের কথাতেই.মানকুমারী বসু  ১৮৮৪ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর প্রিয়প্রসঙ্গ বা হারানো প্রণয় বইটি ছাপান.  নিজের নাম টি পর্যন্ত তিনি দেনি. আখ্যানপাত্রে তিনি ‘কোনো বঙ্গবালা’।   মানকুমারী বসু তাঁর আত্মজীবনী “আমার  অতীত জীবনে’ লিখলেন:

 

পুস্তকে আমার নাম  এবং পরিচয় দিতে নিষেধ করি. এই কাজ খুব গোপনে করিয়াছিলাম  এখন আমার মনে হয় , তখন আমার যে রকম লজ্জা সংকোচদি ছিল, তাহাতে যদি আমার মন সেরূপ অপ্রকৃতিস্থ না হইতো, তবে আমি প্রিয় প্রসঙ্গ ছাপাইতে পারিতাম না . যাহা হউক, প্রিয় প্রসঙ্গ  মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইলে , আমার আত্মগোপনের  বহু চেষ্টা সত্ত্বেও  অনেকে বুঝিতে পারিলেন আমি ই উহার রচয়িত্রী . তখন অনেক হিংসা , দ্বেষ  লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা  আমাকে সহিতে হইয়াছিল।

পাঠক! মেয়েমানুষের প্রকাশদোষের লজ্জা বড় বালাই। বড় বড় মেমসায়েব সে অস্ত্রে ঘায়েল হয়েছিলেন, বঙ্গবালা তো কোন ছার! ১৮৩১ এ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন এর Preface এ যখন মেরি শেলি আত্মপ্রকাশ করেন, তখন তিনি লিখছেন:

The Publishers of the Standard Novels, in selecting “Frankenstein” for one of their series, expressed a wish that I should furnish them with some account of the origin of the story. I am the more willing to comply, because I shall thus give a general answer to the question, so frequently asked me—”How I, then a young girl, came to think of, and to dilate upon, so very hideous an idea?” It is true that I am very averse to bringing myself forward in print; but as my account will only appear as an appendage to a former production, and as it will be confined to such topics as have connection with my authorship alone, I can scarcely accuse myself of a personal intrusion.

অমন বাঘিনী যদি প্রকাশবিনষ্ট হতে ভয় পান তাহলে বঙ্গবালার আর দোষ কি?  তবে বঙ্গবালাদের ক্ষেত্রে এই ভয়টি সাগর পার থেকে ইংরিজি প্রিন্ট কালচার বাহিত হয়ে তাঁদের ভর করেছিল, না এ মনুসংহিতার সহস্র বছরের ছোঁয়াচ, এ বিষয় নিয়ে অনেক ভেবেছি, কোনো কূলকিনারা পাইনি।

ধেড়ে মেয়েদের আস্পদ্দার  একটি নমুনা কোনো এক বঙ্গবালার ‘আমি কে ‘ কবিতাটি:

 

স্বামীর কর্ণমূল তক বাক্যসীমা যার

কার্য প্রসংশা (প্রশংসা) সীমা যাহার রন্ধনে

বুদ্ধি সীমা যার গৃহ রলে পরিষ্কার ,

ভ্রমণের সীমা যার গৃহের প্রাঙ্গনে ,

 

সভ্যতার সীমা  যার পরি অলংকার

চিত্রবিদ্যা  সীমা পিঁড়া চিত্রি আলিপনে,

ধর্মসীমা যাহার ব্রতের অনাহার,

বিদ্যাশিক্ষা  সীমা শুদ্ধ গ্রন্থ অধ্যয়নে,

 

সেই অভাগিনী আজি  বঙ্গ কুলনারী

বিশেষিয়া পরিচয় আর দিতে নারি ।

 

‘কোনো এক বঙ্গবালা’র কপালে লেখার দৌলতে কি পুরস্কার জুটেছিল বলতে পারিনা কিন্তু ঠাকুরবাবুদের বাড়ির মেয়ে স্বর্ণকুমারী দেবীও যে তাঁর দীপ নির্বাণ  বইয়ে ‘প্রকাশ’ হ’ন নি ,সে তথ্য যেমন আমরা জানি, তেমন এও জানি  যে তাঁর সহোদর বাবু সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর তস্য ভ্রাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখক সন্দেহ করে তাঁর লিখেছিলেন: ” জ্যোতির জ্যোতি কি প্রচ্ছন্ন থাকিতে পারে?” বস্তুতঃ মেয়েমানুষের যাহা  কোনওমতেই   প্রচ্ছন্ন থাকিতে পারে না, তাহা পুরুষের কল্পনা শক্তি এবং লেখনীর বিক্রমে প্রতিভাত হয় ; আমরা হাঁ করিয়া অবলোকন করি এবং সমৃদ্ধ হই। ১৮৭২ সনে কোনো এক হরিশ চন্দ্র মিত্র এক খানি নাটক লেখেন ‘ধেড়ে মেয়ে’ বিষয়ক। নাটকটির নাম ছিল: অনূঢ়া যুবতী। এই আশ্চর্য বিষয়টি নিয়ে লেখার কালে বাবু  একটি ছদ্ম নাম নিয়েছিলেন; সেটি হলো: ‘নিতম্বিনী দেবী’।

 

babu bibi

 

বিনয়াবনতা নবীনকালী দেবী

মোর তনুময় উছলে হৃদয় বাঁধনহারা,
অধীরতা তারি মিলনে তোমারি হোক-না সারা।

ধেড়ে মেয়ে বিষয়ে বঙ্কিম বাবু, বা তাঁর বকলমে ইন্দিরা যা বললেন, তাতে দুরাচারের বিষয়টির আভাস থাকলেও, যা বলা হলো না সেটি হলো, সকল দোষের মধ্যে বড় দোষ, ধেড়ে মেয়েদের , শরীরে সাড় হুঁশ আছে এবং তাঁদের  দেহ বল্লরীর ভাষাটি তাঁরা বিলক্ষণ বোঝেন। সর্বোপরি   তিনি যদি অনূঢ়া হন, এবং শিক্ষিত হইয়া পুরুষ সমাজে গতায়াত করেন,তাহা হইলে পুরুষকুলের বিপদ সুনিশ্চিত। ‘অনূঢ়া যুবতী’ প্রহসনে সেটি মোটা মোটা করে বলা হলো।  যে শিক্ষিত পতিতার আত্মচরিত  নিয়ে আগে আলোচনা হয়েছে, তাতেও  বলা হয়েছে  “প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে  চতুর্দশের সঙ্গে সঙ্গেই  মেয়েদের প্রবৃত্তি জাগরিত হয়”।

কিন্তু এই সর্বজনগ্রাহ্য সত্যটি  পুরুষরা যে ভাবে প্রকাশ করলেন, তা সে রবি বাবুই  হন বা রমেশ  বাবুই হ’ন, ধেড়ে মেয়েরা তেমন পারলেন না । কারণটি বোঝা শক্ত নয়। সতী লক্ষ্মীদের লিখিত কাব্য কবিতায় নারী জন্ম নিয়ে হা হুতাশ আছে, কিছু কিছু লেখায় হালকা কটুভাষ ও পাওয়া যায়, কিন্তু, ওই রবি বাবু যাকে বললেন   নারী তনুর অধীরতা, সে সকল অনাছিষ্টি বিষয়ে লেখার জন্যে পুরুষরা রইলেন, এবং যা লেখার লিখলেন।

১৮৭০এ কামিনী কলঙ্ক  নামক একখানি ‘গদ্য পদ্যে বিরচিত করুনাদি রসাত্মক কাব্য’ প্রকাশিত হয়। পাঠক , এই কাব্যটি মূলতঃ আদিরসাত্মক । লেখিকা : নবীনকালী দেবী।  এটি পতিতা লিখিত প্রথম কথা সাহিত্য, যাতে লেখিকার ‘আমি’ সংক্রান্ত কলঙ্ক কথা  নায়িকার তনু হিল্লোল বৃত্তান্তের সঙ্গে মিশে গেছে। মূল গল্পটি খুব সাদা মাটা গতে বাঁধা: এক ব্রাহ্মণের ঘরে বিনোদ নামক এক মাকাল ফল জন্মায় এবং কালক্রমে সে দেশভ্রমণে বেরিয়ে একটি নগরে উপনীত হয়।  সে নগরের স্বর্গতঃ অধিপতির একমাত্র জীবিত কন্যা সর্বসুন্দরী বিনোদিনীর সঙ্গে তাঁর  সাক্ষাত  হয় এবং উভয়েই ভেসে যান এবং এ বাবদ তাঁদের পরবর্তীকালে কোনও পরিতাপ রিলক্ষিত হয়ন।  এই কাহিনী তে বৃন্দে দূতী চরিত্রে আছেন বিনোদিনীর সাক্ষী জ্ঞানোদিনী। কাহিনী বিবাহ বর্জিত এবং একটি অবৈধ কন্যার জন্ম সম্বলিত। কিন্তু এতে কিছুই বলা হলো না , কারণ বঙ্গীয় ব্রাহ্মণের বয়ে যাওয়া মেয়ে নবীনকালী দেবী কাব্য পারদর্শিনী । পয়ার ছন্দে তাঁর রীতিমতো দখল , এবং বৈষ্ণব পদাবলী তিনি গুলে খেয়েছেন।  একথা বলার কারণ এই যে,এই কাব্যটিতে চন্ডিদাস আদি পদকর্তাদের প্রভাব স্পষ্ট । তবে কিনা, লেখায় পদাবলীর কায়াটি আছে আত্মাটি নেই।  ওই যে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী  বলেছিলেন, “আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে কই কাম, কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম’, নবীনকালীর কাব্যে  আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছাই সদম্ভে নিজেকে জাহির করছে:

 

এই কামে তত্বহীণ মত্ত ত্রিলোচন ।

কত কান্ড করেছেন, কে করে বর্ণন।।

যে ভাব ধরেন তিনি মোহিনীর তরে।

কহিতে লাজের কথা বাণী নাহ সরে।।

এই কামে শচীপতি দেব পুরন্দর ।

দিবসে কাটিলো সিঁধ গৌতমের ঘর ।।

দুর্দশার শেষ করে তাঁরে তপোধন ।

ক্ষিতিতে রহিল খ্যাতি সহস্র লোচন ।।

কি বলিব কাম তোরে বলিহারি যাই ।

অনন্ত মহিমা তবে অন্ত নাহি পাই।।

 

এই হলো নায়কা বিনোদিনীর গাথা।  ‘প্রেম’ শব্দটি  যখন উচ্চারিত হলো, তখন সেও কামের ই নামান্তর, তাতে কোনো দিব্যভাব বা কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা আমার  চোখে ধরা পড়লো না। প্রথম থেকে চতুর্থ সর্গ চললো সর্বনাশের প্রস্তুতি। সর্বনাশের যেহেতু শেষ রাখতে নেই,  ইন্দ্রিয় বর্ণনাটি  যখন চরমে উঠলো এবং পরিণতি পেলো, তখন পরিষ্কার দেখা গেল, বিনোদিনীর বিনয়ের তরে হাহাকার  শুধুমাত্র প্রাণনাথ সন্দর্শনের তরে নয়কো; কামিনী  কলঙ্কে এই আত্মেন্দ্রিয় প্রীতিটি কিছু উগ্র  এবং বিলাতি মতে বেশ গ্রাফিক :

 

আবেশে অবশ ধনী, পড়িল শয়নে

স্খলিত হইল বাস ঘন আলিঙ্গনে।।

বুক ফাটে তবু লাজে বদন না ফুটে ।

কই করো বলিয়া নাথে শিহরিয়া উঠে ।।

না জানি রস ষোড়শী কিবা রূপ হয়।

কামনা হইবে পার, মনে লাগে ভয়।।

শুনেছি তরুণী নাকি তুফান ধমকে ।

তরঙ্গবাড়ীতে  পুড়ে ঝলক ঝলকে।।

সেই ভয়ে রসনা নিরস রসময় ।

দুরু দুরু কাঁপে উরু দ্যাখো মহাশয়।।

শুনিয়া নাগর মনে করিল সিদ্ধান্ত ।

আবেশে জড়িত ধনী হয়েছে নিতান্ত।।

 

সে আবেশ যে কোনো দিব্যভাবের নয় , নবীনকালী সেকথা নানাভাবে বুঝিয়ে দিলেন:

 

রতিরঙ্গ হলে শেষ , যুবতী পরয়ে বেশ ,

শ্লেষছলে নাগরেরে কয় ।

বুঝিলাম গুণমণি, তুমি নটচূড়ামনি

এ কর্ম উচিত তবে নয়।।

নাহি করো ভয় লাজ , সাধিতে আপন কাজ ,

শোভে সব পুরুষ বলিয়ে ।

না বলা না কয়ে আগে , মাতিলে মদনজাগে

অবলারে বিরলে পাইয়ে ।।

কেন প্রাণে দাগা দিলে, অনুরাগ বাড়াইলে ,

ছি ছি নাথ ছাড়ো রসরঙ্গ।

না বুঝিয়ে প্রেমতত্ত্ব , আবেশে হইয়ে মত্ত ,

মিছে কেন জ্বালাইলে অঙ্গ ।।

 

পাঠক, “শোভে সব পুরুষ বলিয়ে ” কথাটি খেয়াল করবেন । এ সকল আবেগপ্রকাশ যে  স্ত্রীলোকের সাজে না , সে জ্ঞান যে তাঁর আছে এ তিনি অকপটে পঞ্চম সর্গেই জানিয়েছেন:

 

বলিছে নবীনকালী করিলি লো হাড়কালী

ছি! ছি! জ্ঞানে অবাক হোইনু।

ভালো লোক ঢালাইলি, নারীকুল লজ্জা দিলি ,

বিপরীত তোর যে হেরিনু।।

 

ষষ্ঠ সর্গের মূল ঘটনা আগেই বলেছি, সুতরাং, বিবেকের দংশনে লেখিকা যে পিছিয়ে গেলেন, এমন বোধ হওয়ার কোনো কারণ নেই, বরং সন্দেহ হলো পুরুষের যে সকল কাজ শোভে, সে সকল ঢলাঢলি সাহিত্য লিখে তিনি তাবৎ আনন্দ   উপভোগ করছেন এবং পুরুষ লেখকদেরই  ‘হাড়কালী’ করার প্রয়াস পাচ্ছেন ।
কথাটি যে বললাম তার কারণ আছে । এই জাতীয় আদিরসাত্মক কাব্য  ধর্মসভার প্রবর্তক , ‘সংবাদ কৌমুদী’ এবং ‘সমাচার’ পত্রিকার সম্পাদক বাবু ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক পূর্ববর্তী যুগেই  সমাজ সংস্কার ইচ্ছায় লিখেছিলেন। তার মধ্যে ‘দূতী বিলাস’ (১৮২৫)  কাব্যটির পড়ার অনুরোধ জানিয়ে রাখলাম। নবীনকালী এইসব লিখিয়ে বাবুদের টেক্কা দিলেন মেয়েদের শরীরের নিষিদ্ধ আনন্দটিকে পুরুষ লেখকের চত্তর থেকে টেনে বের করে, তার শরীর থেকে শস্তার চটকদারি গয়না খুলে নিয়ে তাকে সাহিত্যিক অলংকার পরিয়ে।। ফল কি হ’ল একটু পরে বলছি।  ‘লজ্জা ঘেন্না ভয় তিন থাকতে নয়’, এই বচনটির যথার্থ প্রয়োগ দেখলাম এই কাব্যে। নায়িকার অনুতাপ যদিও বা থাকে, তার আট আনাই ধুয়ে যায় রতি সম্ভোগের আনন্দে:

 

নাগরের হৃদাকাশে করি আরোহণ।

অধরের সুধা পানে জুড়ায় জীবন ।।

কখনো শয্যায় শুয়ে নাগরের সনে।

রতিরঙ্গে ভুঞ্জে নিশি আনন্দিত মনে ।।

কখন তাম্বুল ধনী দিয়ে কান্ত মুখে ।

কৌতুক করিয়ে দোঁহে অতি মনসুখে ।।

শীতার্ত হইয়ে ধনী উষ্ণের কারণে ।

তড়িতের প্রায় ধরে রমণী রঞ্জনে।।

এইসব ছাই পাঁশ থাকা সত্ত্বেও  এই বইখানি মহিলা রচিত  প্রথম যৌনসাহিত্য বলতে বাধা আছে। যা আগে বলেছি তা ছাড়াও, ‘কামিনী কলঙ্ক’ যে শুধু ধ্রুপদী গনেশ এবং সরস্বতী বন্দনা দিয়ে শুরু হয় তাই নয় , পরিষ্কার বোঝা গেল এই বিবির বিলিতি কেতাব পড়ার, বোঝার ক্ষমতা আছে। দেখলাম বিবি ইংরিজি সাহিত্যের acrostic  নামক অলংকারটি বোঝেন; নবীনকালী এবং তস্য নায়িকা বিনোদিনী দুজনেই নাম স্বাক্ষর করেন  কবিতার পংক্তির আদ্যক্ষর দিয়ে:

বিনোদিনী

বি -ন্দু মাত্রাধর  সুধা দিয়ে হর জ্বালা ।

নো-পস্থিত থাকিলে হে মরিবেক বালা।।

দি-ন দিন  তনু ক্ষীণ বিরহে তোমার ।

নী-র হীন হয়ে মীনে  প্রাণে বাঁচা ভার।।

নবীনকালী

শ্রী কালী যুগল পদ করি আরাধনা

ম হৃদি  পদ্মে আসি পুরো বাসনা ।।

তী ক্ষ্ণ রুপা ক্ষরধারা , নীরদবরণী!

করে নলিনী শোভে, কটিতে কিঙ্কিণী।।

বী ভি হীনে গতি দেহি ত্বম হয় কাত্যায়নী !

গেন্দ্র নন্দিনী গিরিসুতা ত্রিনয়নী !

কা ল ভয় বিনাশিনী করাল বদনি !

লী ন হতে তবে পদে , বাসনা জননী!

আত্মা এবং আত্মজার এই গূঢ় সম্পর্ক এমন দাপটের সঙ্গে লেখার এমন উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে দুটি পাইনি। বিনোদিনী আর নবীনকালীর  আত্মপরিচয় দানের মধ্যে তফাৎ একটি ই। প্রথম পরিচয়টি একটি প্রেমপত্রের মাঝে লুক্কায়িত, দ্বিতীয়টি নবীনকালী ‘দাসীর’ কালী স্তব।

1850_acrostic_Dearborn

The Devil’s Disciple

 

আসল চমকটি অপেক্ষা করে থাকে অন্তিম (দ্বাদশ)  সর্গে। দেখলাম ছাই পাঁশ কাব্য অলংকার পরিত্যাগে করে রতিসুখ  প্রসঙ্গে পাপ পুণ্য আদি দার্শনিক প্রশ্ন করছেন জ্ঞানোদিনীকে ।ন্যৈয়ায়িক  কুট তর্ক, শিক্ষিত চার্বাকের দর্শন এবং, এটির প্রমাণ নেই, তবুও বলি, প্লেটোর ডায়ালগের একটি ছায়া যেন পড়লো এই বিনোদিনী জ্ঞানোদিনী আলাপে :

বিনোদিনী বললেন:

যাহা হউক প্রিয় সহচরী! তুমি মদীয় প্রশ্নটির  প্রকৃতরূপ মীমাংসা  করিয়া আমার সংশয় দূরীকরণ করো । অর্থাৎ আমাদিগের  যাবতীয় কার্যের  আমরা আপনাপন  করতে অথবা  পরম করুনাময় বিশ্বপতি  পরমপিতা  আমাদিগের এই সমস্ত  কার্য্যানুষ্ঠানে  প্রবৃত্তি জন্মাইয়া দিতেছেন . কিংবা কুমতি প্রদা বিধাতা কেহ স্বতন্ত্র আছেন?

নবীনকালী দেবী শয়তানের অনুগামিনী ছিলেন কিনা এই বিবেচনা পাঠকের দায়, তবে দেখলাম ত্রয়োদশ সর্গে reformed বিনোদিনী যখন শিবের স্তব করছেন, তখনও সেই প্রথম পুরুষকে তিনি জিজ্ঞাসা করছেন “কুলত্যাগিনী, পরপুরুষগামিনী” ‘আমি’ র কিয়দংশ  শিবাংশি কিনা। ।

কি আস্পদ্দা !

১৮৭৩ সালে এ বই নিয়ে বিস্তর জল ঘোলা হয়। ওই বছরই ২০শে সেপ্টেম্বর টাউন হল A Society for The Suppression of Public Obscenity নামে এক প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধন হয়। ফলতঃ,  বটতলার কিছু প্রকাশক ‘বিদ্যাসুন্দর’ ছাপার অপরাধে গ্রেপ্তার হন। এবং ‘কামিনী কলঙ্ক’ নিয়ে লড়াই বেঁধে যায়  ব্রাহ্মদের পত্রিকা ইন্ডিয়ান মিররের সঙ্গে হিন্দু পেট্রিয়টের। ইন্ডিয়ান মিররের বক্তব্য যে ওই রচনা যাতে কিনা এক বেশ্যা তার ‘বিদঘুটে ভঙ্গিতে’  তার জীবনের কথা বলছে তা নিয়ে একটি বিশিষ্ট সংবাদ পত্র  কেন মাতামাতি করছে?

এর উত্তরে  হিন্দু প্যাট্রিয়টের প্রতিবেদক  এই জবাবটি দেন:

 

” আশা করি (ইন্ডিয়ান মিররের) সমালোচক মহোদয় অবগত আছেন, অশ্লীলতা (obscenity) ও অশোভনতা (Indecency), এই দুইয়ের পার্থক্য সম্বন্ধে। একটি বই অশোভন হতে পারে, কিন্তু অশ্লীল নাও হতে পারে। উল্লেখিত বইটিতে (…) যে সব অশিষ্ট (Indelicate) বর্ণনা আছে, আমরা কোনোমতেই তাকে সমর্থন করছি না । কিন্তু সেসব বর্ণনা কোনো অংশেই পোপের ‘জানুয়ারী এন্ড মে’, বা শেকস্পিয়ারের ‘রোমিও এন্ড জুলিয়েট’, বা বাইরনের ‘ডন জুয়ানে’ বর্ণিত অনুরূপ বিবরণী থেকে খারাপ নয়। কোন নীতিবাদীর মানদন্ডে বিচার করলে  ‘কামিনী কলঙ্ক’ কখনোই এইসব সাহিত্য কর্মের সঙ্গে তুলনায় হীন বিবেচিত হবে না । অথচ, কেউই বিচারপতির সামনে পেশ করে এই সব ইংরেজি গ্রন্থগুলির প্রকাশ ও প্রচার বন্ধ করার কথা চিন্তা করেন নি”।
সকল সময়েই মুক্ত চিন্তার মানুষ থাকেন। কিন্তু ঐ এক আঁজলা। তার বেশি নয়।
এরপর কামিনী কলঙ্ক হারিয়ে যায় রহস্যজনক ভাবে । এক সমসাময়িক সাহিত্য বিশেষজ্ঞা দেখলাম এই বই বিষয়ে বলছেন যে এটি স্ত্রী ছদ্মনাম ধারী কোনো লেখকের লেখা হওয়া সম্ভব। তিনি কারণ দর্শাচ্ছেন যে নবীনকালীর লিখনশৈলী একেবারেই ‘পুরুষালি’ । ইঙ্গিত টি যৌনতা বিষয়ক। আশ্চর্য হলাম এই দেখে যে  ‘কামিনী কলঙ্ক’র সাহিত্য শৈলী অথবা দর্শন বিচার এ সকল প্রসঙ্গ বিশেষজ্ঞার বিশ্লেষণের মধ্যে উহ্য রয়ে গেল।  বিবেচনা করলাম কারণটি হ’লো, মেয়েমানুষ-এর indelicacy, obscenity এইসকল লক্ষণ আমাদের চোখে যত পড়ে, তার ভেতরের আগুন, সাহিত্যিক নৈপুণ্য তত নয়।  মহৎ সাহিত্য নির্মান  তো বটেই, অশ্লীলতাকেও অমর সাহিত্যে রূপ দেবেন পুরুষ লেখকরা, ও কাজ মেয়ে মানুষের কস্মিনকালেও নয়। স্পর্ধা বা সাহস যে পৌরুষ লক্ষণ, সে পাঠ আমরা মেয়েরা আজও মনে ধরে রেখেছি।

 

পরিশিষ্ট

এরপর আর সামান্যই বলার রইলো।

 

নবীনকালী ১৮৭৮ এ আর একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। নাম ‘কিরণমালা’। সে বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। নায়িকা কিরণমালা  বিনোদিনীর মতো মাতঙ্গিনী নয়। বিনোদিনীর মতো স্বেচ্ছায় নয়, সে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয় পুরুষের অত্যাচারে।

 

Indelicate নবীনকালী কি লক্ষণ বুঝে সুর বদলেছিলেন? নাকি একই অঙ্গে দুই রূপ?  এ বিষয়টি আমাকে ভাবাচ্ছে।

 

 

 

 

 

Featured Image: https://www.cherrytin.com/music-lesson-kalighat-painting.html

Posted in বাংলা, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, Fiction, Women | Leave a comment

গড়গড়ার মা’লো ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ: পুত্রোৎপাদিকা বনাম নভেল নায়িকা।

কি বর্ত করালি সই, কাঁদতে জন্ম গেল…
বঙ্গীয় পুরাতন গাথা

অন্দরমহলে উঁকি দেই । সতীলক্ষীদের কথা শুনেছি, কিন্তু তাঁদের দিনাতিপাত  কিভাবে হয় তা তো দেখা হয়নি?  বামাবোধিনী পত্রিকার জৈষ্ঠ্য  ১২৮২ (১৮৭৫)  সংখ্যায় পেলাম ‘গার্হস্থ্য দর্পণ’ প্রবন্ধ :

গৃহিনী অতি প্রত্যুষে  উঠিয়া শয্যা নিয়মিত স্থানে  রাখিয়া যথোচিতরূপে  বাতির সমস্ত স্থান পরিষ্কার করা প্রথম কর্তব্য. পরে বাহ্য শৌচ  ক্রিয়া সমাপন করিলে  শিশুদিগেরও  বাহ্য  শৌচ  স্নানাদির তত্ত্বাবধান করা উচিত , পরে আহ্নিক পূজা সমাপন অন্তর  আহারের আয়োজনাদি করিতে হয়।  কিন্তু তৎকালে মধ্যেই শ্বশুরাদি কোনো গুরু লোক থাকিলে  তাঁহাদিগেরও অবশ্যকমতো  প্রাতঃক্রিয়াদি কার্যের উপকরণ  প্রদান করিতে  এবং শিশু সন্তানাদি থাকিলে  তাহাদিগের অগ্রে আহার দিতে হয়.   গৃহস্বামীর [কার্যানুসারে  এবং বালকদিগের বিদ্যালয় গমনোচিত  সময়ানুসারে  প্রায় আহারের সময় স্থির রাখিতে হয়. …]  এই সময়টিতে গৃহিণীরা  অতিশয় ব্যস্ত থাকেন , সুতরাং কোনো ২  স্থানে প্রাতঃকালে উঠিয়াই প্রথমতঃ  আহারাদির আয়োজনে প্রবৃত্ত হয়েন এবং প্রাতঃকালোচিত  অনেক কার্য  মধ্যাহ্ন কালে করার নিমিত্ত রাখিয়া দেন. লোকাভাবে ও কার্যবাহুল্য  সত্ত্বে তাহা করিলে ক্ষতি নাই , কিন্তু কিঞ্চিৎ পূর্বে উঠিলে  যদি সমস্ত কার্য্য যথোচিত কালে সম্পাদিত হয়  তাহা হইলে তাহা করে কর্তব্য. যাহা হউক, সকলের আহারাদি সমাপনান্তে  গৃহিনী সুস্থির হইয়া  অসম্পাদিত  কর্তব্য সমস্ত সম্পাদন করিবেন […] অবকাশ প্রাপ্ত হইলে গৃহিনী সকলের পরিধেয়  বস্ত্রাদি যথাস্থানে আছে  কিনা তাহা পর্যবেক্ষণ করিবেন , সূচীকার্য  বা কোনো প্রকার সাংসারিক প্রয়োজনীয় কার্য  থাকিলে তাহা করিবেন , অথবা স্বয়ং অধ্যয়ন করিবেন  কিংবা  শিক্ষা দিবার পাত্র বা পাত্রী  থাকিলে শিক্ষা প্রদান করিবেন। ক্রমশঃ  বালকদিগের বিদ্যালয় হইতে  অথবা গৃহস্বামীর কার্য হইতে  প্রত্যাগমন কাল উপস্থিত হইলে , তাহাদিগের পরিতৃপ্তির নিমিত্ত আয়োজন করিবেন  এবং শয্যাদি প্রস্তুত  ও আলোর আয়োজন করিয়া পুনরায় আহারাদির আয়োজন করিবেন  . আহারাদি সমাপনান্তে   যেরূপ পরিষ্কার করণাদি  কার্য্য আবশ্যক ­ তাহা অনেক স্থলে রাত্রে সম্পাদিত না হইয়া  প্রাতে সম্পাদিত হইয়া থাকে , কিন্তু সাধ্য  সত্ত্বে রাত্রিতেই  কার্য শেষ করিয়া রাখা কর্তব্য. সমস্ত কার্য শেষ হইলে  নীতিগর্ভ গল্প  দ্বারা শিশুদিগের  মনোরঞ্জন করিয়া  অথবা অধ্যয়নাদি করিয়া  যথাকালে নিদ্রাগত হইবেন।

লেখাটি বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ও ছাব্বিশ পর বামাবোধিনীতে প্রকাশিত হয়, লেখক অজ্ঞাত. গৃহিনী শুধু বালকগণের বিদ্যা শিক্ষা নিয়ে ব্যস্ত রাখার বিধান পেলেন দেখে তাবৎ আল্হাদ হলো। এছাড়াও দেখলেম, সুমঙ্গলী বধূদের  দিনপঞ্জিতে কোনোরকম ত্রুটি রইলো না, বস্তুতঃ, তাঁরা প্রত্যুষ হইতে রাত্রিকালে অবধি সংসার সন্তান প্রতিপালন এবং নীতি ধর্ম শিক্ষায় নিজেকে ব্যাপৃত রাখবেন এইটেই সাব্যস্ত হলো।
প্রস্তাবটি অযথা দীর্ঘ হয়ে পড়ছে জানি, কিন্তু এই বিষয়টি দুচার কথায় শেষ করা দুষ্কর,  এছাড়া ও দেখা গেল, যে বধূটি নিজের জন্য প্রায় কিছুই করার বিধান পান না..তাঁর নিজস্ব খড়খড়ি দেওয়া বারান্দা  বা ছাদের সময়টুকুও তাঁর থেকে কেড়ে নেওয়া   হলো। সর্বরূপ সৎকার্যে সতীলক্ষ্মী দিনতিপাত করলেন এবং যথাকালে নিদ্রা বক্ষে  ঢলে পড়লেন. অর্থাৎ, পন্ডিতজনেরা বলবেন, তাঁর মধ্যে ‘মদীয়. অর্থাৎ ‘আমি বোধ’ আদপেই নেই. তিনি ‘ত্বদীয়’, অর্থাৎ স্বামীর চরণে নিজেকে দান করে মোক্ষলাভ করেছেন। এই ত্বদীয় মদীয় উৎসটি আলোচনা না করে স্থানান্তরে যাওয়া গেলোনা। পাঠক নিজগুণে ক্ষমা করবেন।

শ্রীযুক্ত ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ‘লজ্জাশীলতা’ প্রবন্ধটি আমরা খানিকটা পড়েছি. সেই একই প্রবন্ধ সংগ্রহে ষষ্ঠ প্রবন্ধটির নাম ‘সৌভাগ্য পর্ব’ এটির বিষয় হলো সতীলক্ষ্মী (সুভগা)- রা  কিরূপে  তাঁদের সৌভাগ্যতে  মদীয় এবং ত্বদীয় ভাব negotiate  করেন। অর্থাৎ ‘ত্বমসি মম ভূষণং ত্বমসি মম জীবনং ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নম্’  বেদবাক্যটি র পাঠ নেন যাতে করে সতীলক্ষ্মীর ‘মদীয়’ টি  স্বামীর  ‘ত্বদীয়’তে গঁদের  আঠা-সাঁটা হয়ে থাকে ।মুখুজ্জে মশাই বলছেন: “ত্বদীয়তা এবং মদীয়তা ভাব কাপড়ের টানাপড়েনের ন্যায় এমন পরস্পরের অনুসৃত যে তাহাদিগকে পৃথক করিয়া লওয়া নিতান্ত অসাধ্য।“

পাঠক, আপনি বলতে পারেন এর দ্বারা এই বোঝায় যে স্বামী স্ত্রী অন্যের পরিপূরক, এতে দোষ কোথায়? এইবার প্রবন্ধকারের উদাহরণ টি দেখুন, তাহলেই  বিষয়টি পরিষ্কার হবে:

[…] স্ত্রী স্বামীকে বলিলেন — “আজি ঘাটে অমুকের মা কে দেখিলাম –তেমন যে রূপ একেবারে কালিমাড়া হইয়া গিয়াছে । কেন অমন হলে, জিজ্ঞাসা করিলে বলিল,” আর দিদি, একটু পায়ের ধুলা তো দিলে না?”

“ওকথা কেন বলিল– তাৎপর্য কি?”

“সেকথায় কাজ নাই –তার স্বামীর দোষ জন্মিয়াছে তাই ওকথা বলিল । ইহার তাৎপর্য এই , তোমার আদরেই আমার এত গৌরব”।

কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। ত্বদীয়-মদীয় বিষয়টি যে ঠিক আধাআধি আমে দুধে মিশে যাওয়ার ব্যাপার নয়, তা আশা করি বোঝাতে পারলাম। সৌভাগ্যটি স্ত্রীর, তিনি আদর পান, এবং সেই আদরটিই  হলো তাঁর   সৌভাগ্য। যিনি আদর করেন, এবার তাঁর কথায় আসি। ‘ত্বদীয় মদিয়’র মোটা কথা টি এইবার একটু  মোটা করে বলি। মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের  রূপক ধর্মী কথোপকথন টি  থেকে বোঝা গেল যে অহোরাত্র স্বামী শ্বশুরাদির মঙ্গল বিধান করার পরেও, স্ত্রীর একটি কর্তব্য থেকে যায় যেটি  ‘গার্হস্থ্য দর্পণ-এ প্রতিফলিত হয়নি; সেইটি হলো, যাতে স্বামীর ‘চরিত্র দোষ’  না ঘটে সে ব্যবস্থাটুকু সেরে ফেলাও একটি সাধ্বীসুলভ কর্তব্য। । ঐটুকু বামাবোধিনীর সম্ভ্রান্ত লেখক আর বলে উঠতে পারেন নি। এইবার সেই কথাটি বলার সময় এসেছে।

পুত্রোৎপাদিকাশক্তি  সংক্রান্ত প্রস্তাব

১২৯৯ বঙ্গাব্দে  জনৈক শ্রী রাধানাথ মৈত্র  একখানি বই প্রকাশ করেন। বইটির নাম: কন্যা এবং পুত্রোৎপাদিকা শক্তির মানবেচ্ছাধীনতা  অথবা  স্বেচ্ছায় কন্যা এবং পুত্রোৎপাদন তত্ত্ব.মুখবন্ধে তিনি বলছেন:

“যে সকল কথা কইতে সহবাস স্পৃহা প্রশ্রিত হয় […] তাহা ভদ্র সমাজে ঘৃণার্হ. কিন্তু পুত্রলাভরূপ  ধর্মাদদেশে বিবাহ অথবা সহবাস বিষয়ে কোনো কথা  পবিত্র বলিয়া সর্বতো ভাবে গ্রহণীয়.  এসকল বিষয় আলোচনায়  এবং পিত মাতার আনন্দ স্বরূপ  পুত্র জন্মপ্রদানোদ্দেশ্যে  তদ্বিষয়ক আলোচনায়  আত্মতৃপ্তি  বাসনা মনে আদৌ স্থান পায় না।“

বাবু রাধাকান্ত মৈত্রর সন্দর্ভটি বাস্তবিক ‘পষ্ট কথায় কষ্ট নেই’ ধর্মী। তাতে তিনি বলছেন:
স্ত্রীর পক্ষে অত্যন্ত অধিক বলশালী  স্বামীর প্রতি রাত্রির অথবা সপ্তাহে দুইবারের সহবাস  অনেক স্ত্রীলোকের  স্বাস্থ্য  চিরকালের জন্য ভগ্ন হইয়া  গিয়াছে। স্বামীর পরদারগমনের ভয়ে স্ত্রীর কোনো অনিচ্ছা প্রকাশ  না করতে তিনি (স্বামী) মনে করেন এরূপ কার্য তাঁহার স্ত্রীর পক্ষেও আনন্দদায়ক।

আর এক পাতায় সেই দেখা গেল:”প্রায়ই অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্ত্রীকে স্বামীর ইচ্ছার পরিতৃপ্তি করিতে হয়  ইহার বিপরীত কদাচিৎ কখনো ঘটে ।“

লেখকের দাবি, তিনি  বহু বিদেশী বিষ্যেশ করে মার্কিনি প্রবন্ধাদি পড়ে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে তিনি ঠিক যেমনটি ভেবেছেন ঠিক তেমনটিই সায়েবদের স্বর্গে সত্য বলে প্রতিভাত হয়েছে।  যে কয়জন মার্কিনি ডাক্তারের নাম করলেন তাঁদের একজন ডাক্তার ষ্টকটন হাউ ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি নাকি নিউ ইয়র্ক অবস্টেট্রিক্যাল জার্নাল এ  ‘পুত্র এবং কন্যাসন্তানের প্রসূতির উপর ক্ষমতা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন  ,অতএব, মহাজন যেন গত সো পন্থা। বইটি থেকে দুই একটি প্রস্তাব তুলে দিচ্ছি যাতে পাঠক বইটির যথার্থ পারমার্থিক  উদ্দেশ্য টি বুঝে নিতে পারেন:

১)  ক্রমাগত যাহাদের এক সন্তান হইবার অল্পকালের  মধ্যেই আবার গর্ভসঞ্চার  হইতে থাকে , তাহাদিগের কন্যাই অধিক হয়. মেজদি ওই মধ্যবর্তীকাল কিছু অধিক হয়  তাহা হইলে তাঁহাদের পুত্রসন্তান হইতে পারে। […] একটি কন্যাসন্তানের  জন্মের ছয়মাসের মধ্যেই যাঁহাদের আবার গর্ভসঞ্চার হইয়াছে , তাঁহাদিগের আবার কন্যাসন্তান হইয়াছে ; কিন্তু যখন আটমাস বা ততোধিক কাল  পার হইয়াছে , তখন পুত্র সন্তান হইয়াছে।

একটি কথা বলতে ভুলেছি সেটি এই ফাঁকে বলে রাখি. লেখক দাবি করছেন যে সায়েবদের এই সকল অনুমান তৈয়ের হয়েছে গাভী, মেষিনী এবংঅশ্বিনীদের প্রজননের উদাহরণ থেকে । যাই হোক, এইবার বাকী দুই একটি পড়ুন:

২)  নারীদেহে সন্তানোৎপাদন এবং লালন এই উভয় বিধির যন্ত্রের এরূপ সম্বন্ধ , যে প্রথমোক্ত  যন্ত্র  পুত্রজন্মদানে অনুপযুক্ত হয়, শেষোক্ত যন্ত্রটিও  পুত্রের লালনকার্যে  অনুপযুক্ত হইবে।

৩) প্রত্যূষকালে সহবাসের সময় বলিয়া অনেকে বিবেচনা না করিতে পারেন; পুত্রসন্তান লাভার্থ  ইহা উপেক্ষা  উৎকৃষ্ট এবং ধ্রুব উপায় আর নাই।

পাঠক, এই শেষোক্ত উপায়টির কারণ হিসাবে তিনি বলছেন, যে সারাদিনের কাজের পর হা-ক্লান্ত মেয়েমানুষএর  শরীর  দুর্বল হইয়া পড়ে, সুতরাং প্রজনন প্রক্রিয়াটি কিঞ্চিৎ ম্রিয়মান হওয়ার কারণে কন্যা ভ্রুণই  সঞ্চারিত হয়।

নারীর প্রজননযন্ত্রের এমন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার আমি আগে পড়িনি।  অনুভব হলো, এই হলো বাবু ভূদেব মুখোপাধ্যায় বর্ণিত ‘সৌভাগ্য পর্বের’ চুলচেরা বিশ্লেষণ। নারীদেহ টি বিশষতঃ প্রজনন ক্ষমতা যদি উৎকৃষ্ট হয় এবং উৎকৃষ্ট রূপে  ব্যবহৃত হয়, তাহলে শুধু যে স্বামীর চরিত্র দোষ ঘটে না,তাহাই নয়, উপর্যুপরি পুত্রসন্তান উৎপাদন পূর্বক তিনি শ্বশুর  কুলের নাম উজ্জ্বল করেন।

মনে পড়লো  বেশ কিছুদিন আগে এইরকম কিছু একটা পড়েছিলাম বটে। মনে পড়ে গেল ব্রহ্মানন্দ কেশব চন্দ্র সেনের মাতা সারদা সুন্দরী দেবীর আত্মচরিতের ভূমিকা (১৯১৩)। তিনটি উদ্ধৃতি আছে ভূমিকায় । তার একটি শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসের বাণী। তিনি সারদাসুন্দরী দেবীকে বলেছিলেন: “দ্যাখ্ মা, তোর নাড়িভুঁড়ি নিয়ে  পৃথিবীর লোক এর পরে নাচবে। তোর ওই ভান্ড থেকে ওই ছেলে বেরিয়েছে।”

keshub sen
ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন
১৯ নভেম্বের ১৮৩৮ – ৮ জানুয়ারী ১৮৮৪

‘শরীরম্ আদ্যং খলু ধর্মসাধনম্’: এ সকল আলোচনা এবং উদ্ধৃতি থেকে এই বেদবাক্যটির একটি নূতন অর্থ খুঁজে পেয়ে ধন্য হলাম। পাঠক, রবীন্দ্রনাথের ‘দৃষ্টিদান’ গল্পটি মনে পড়ে কি? সে গল্পে নিম্নোক্ত আলাপটি আছে :

হেমাঙ্গিনী: তোমার ছেলেপুলে নেই কেন?

কুমু: কেন তাহা কি করিয়া জানিব –ঈশ্বর দেন নাই ।

হেম: অবশ্য তোমার ভিতরে কিছু পাপ ছিল।

কুমু: তাহাও অন্তর্যামী জানেন ।

হেম: দ্যাখো না , কাকীর ভিতরে এত কুটিলতা যে উহার গর্ভে সন্তান জন্মিতে পায়না.
দৃষ্টিদান (রচনা : পৌষ ১৩০৫)

নারী ‘ভান্ড’র পুত্রোৎপাদিকাশক্তি টি বেশ কাজে লাগলো যখন ১৯শ শতকে আমরা দেশমাতৃকার মডেলটি খাড়া করলাম । শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবন্ধাংশ বিবেচনার জন্য পেশ করা হ’ল:

আমাদের দেশমাতাকে বহুপুত্রবতী হইতে হইবে। এই পুত্রদের কেহ বা দেশের জ্ঞানকে, কেহ বা দেশের ভাবকে, কেহ বা দেশের কর্মকে অনুবৃত্তি দান করিয়া তাহাকে উত্তরোত্তর পরিপূর্ণ করিয়া তুলিবে । তাহারা নানালোকের উদ্যমকে একস্থানে আকর্ষণ করিয়া লইবে, তাহারা নানাকালের চেষ্টাকে একত্রে বাধিয়া চলিবে । তাহারা দেশের চিত্তকে নানাব্যক্তির মধ্যে ব্যাপ্ত করিয়া দিবে এবং অনাগত কালের মধ্যে বহন করিয়া চলিবে । এমনি করিয়াই দেশের বন্ধ্যা অবস্থার সংকীর্ণত ঘুচিয়া যাইবে, সে জ্ঞানে প্রেমে কর্ষে সকল দিকেই পরিপূর্ণ হইয়া উঠিবে।

(“বাংলা জাতীয় সাহিত্য” প্রবন্ধ ১৩০১ সালের ২৫শে চৈত্র রবিবার বঙ্গীয়সাহিত্য-পরিষদের সাংবৎসরিক উৎসব-সভায় পঠিত হয় ।)

অলমিতি বিস্তারেণ।

 

চোরা না শোনে ধর্মের কথা

 

BIBAHA

নারীত্বের নিষ্কাম কর্ম অথবা ধর্মের প্রচারটি এমনি মোক্ষম দাওয়াই যে দেহ সম্পর্কিত চিন্তা পাপ কাজ এই বিবেচনাটি ভালোরকম শিকড় ছড়িয়েছিলো।  ১৩০৭ সনে সন্তোষের ছোট তরফের জমিদার শ্রী প্রমথনাথ রায়চৌধুরী  এক খানি প্রেমের গল্প লেখেন; গল্পটি প্রকাশিত হয় ‘প্রদীপ’ পত্রিকায়।  এই অংশে এক যুবক তাঁর বাল্য প্রেমিকা  সুধার  প্রেম বিচার বর্ণনা করছেন:

“একটা নুতন কবিতা লিখিলেই, খাতা লইয়া কাড়াকাড়ি পড়িয়া যাইতো । আমি লিখিতাম, –বিদুষী সুধা শুনিত, শুধু শুনিতই না, কখনও সংশোধন কোরিয়া দিত। একটা স্থান খুলিয়া দেখিলাম –হায়, সে আজ কতদিন! — আমি লিখিয়াছিলাম ‘দেহের মিলন’ , সুধা ‘দেহের’ কাটিয়া ‘আত্মার’ করিয়াছে ! তাহার সুন্দর হস্তাক্ষরটি তেমনই জ্বলন্ত মহিমায় শোভা পাইতেছিল। তখন বুঝি নাই, সুধার প্রেমের আদর্শে  কতটা উচ্চতা কতটা আন্তরিকতা ছিল।“

দেহের মিলন ইত্যাকার অশ্লীল প্রসঙ্গ সাধ্বীরা নাহয় নেপে পুঁছে  আত্মাকে পরিষ্কার ঝরিষ্কার করে ত্বদীয়তে সমাহিত হলেন, এবং গড়পড়তা বৎসরান্তে একটি করে পুত্রসন্তান উপহার দিতে থাকলেন, কিন্তু  কিছু আড়বুঝো স্ত্রীলোক নারীত্বের গৌরব টি বুঝতেই পারলেন না কারণ তাঁদের ভান্ডারীটি অন্যত্র ব্যস্ত আছেন,তাঁদের ‘দোষ’ হয়েছে, নয় কোনো মহৎচিন্তায় ব্যাপৃত আছেন সুতরাং ভান্ডটি অব্যবহৃত।

GARGARA IV BHASHA

দুই একটি কবিতা বলি:

আমি কুলবতী নারী,

পতি বই আর জানিনে,

এখন অধীনেই বলিয়ে ফিরে নাহি চাও ,

ঘরের ধোন ফেলে প্রাণ —

পরের ধন আগুলে বেড়াও।

নাহি চেনো ঘর বাসা , কি বসন্ত, কি বরষা।

সতীরে করে নিরাশা অসতীর  আশা পুরাও ।

অথবা:
আমার সমান নারী ত্রিজগতে নাহি হেরি

আমি নারী অতি অভাগিনী ।

ধনে মানে কূলে শীলে  বর দেখি বিয়ে দিলে

সমাদরে জনক জননী ।।

বিবাহের পর আসি  শ্বশুর ঘরেতে বসি

দিবানিশি থাকি একাকিনী ।

নবীন যৌবন ভরে, চিরকাল কামজ্বরে ,

পুড়ে মরি দিবসরজনী ।।
হরিদাসী বৈষ্ণবীরে যখন সূর্যমুখী বলেছিলেন,  “গৃহস্থ বাড়ির ভালো গান গাও”  , বৈষ্ণবী গেয়েছিল:

“স্মৃতিশাস্ত্র পড়ব আমি ভট্টাচার্যের পায়ে ধরে,

ধর্মাধর্ম শিখে নেবো কোন বেটি বা নিন্দে করে।”

গৃহস্থ বাড়ির ভালো গানে যে প্রবল হুলটি  আছে আমরা তার খোঁচা খেলাম।

সেই বিদ্যাসুন্দর হতে ১৮৩১ এর  সংবাদ প্রভাকর অবধি  নারীজাতির ‘মদন’ যে (অষ্টগুণ) প্রবল, সে আমরা শুনে এসেছি; এখন কথা হলো যে হতভাগীদের ভান্ডারী নিরুদ্দেশ, অথবা কৈবল্যপ্রাপ্ত, তাঁরা কি করেন? কিছু গেলেন শ্বশুরবাড়ির নিকটাত্মীয়, নায়েব এবং বামাহিতৈষী বাবু ইত্যাদির করপুটে । যাঁদের সে ছাইও জুটলো না, তাঁরা হলেন নবেল নায়িকা।

এই নবেল হলো ইংল্যান্ডের sentimental novel-এর বঙ্গীয় সংস্করণ।

এ বিষয়ে  বিবি Mary Wollstonecraft -এর  বক্তব্য:

Women, subjected by ignorance to their sensations, and only taught to look for happiness in love, refine on sensual feelings, and adopt metaphysical notions respecting that passion, which lead them shamefully to neglect the duties of life, and frequently in the midst of these sublime refinements they plunge into actual vice.

These are the women who are amused by the reveries of the stupid novelists, who, knowing little of human nature, work up stale tales, and describe meretricious scenes, all retailed in a sentimental jargon, which equally tend to corrupt the taste, and draw the heart aside from its daily duties. I do not mention the understanding, because never having been exercised, its slumbering energies rest inactive, like the lurking particles of fire which are supposed universally to pervade matter.
(A Vindication of the Rights of Woman, 1798)

বিবি Wollstonecraft বর্ণিত  Sentimental novel এবং তার পাঠিকাকূলের ছাপ পড়েছে বটতলায় ছাপা ‘নবেল নায়িকা’ প্রহসনে।  এই প্রহসনের নায়িকা রুক্মিণী নাওয়া খাওয়া ছেড়ে খালি নবেল পড়ে আর প্রেম খোঁজে। নবেল তার ধ্যান জ্ঞান।  শেষকালে সে তার নিরীহ রেল বাবু স্বামীটির পরামর্শ দেয় নবেল লেখার। এই বটিকাটি সে যে গুলে খেয়েছে, সে বোঝা যায় যখন সে তার স্বামীকে বোঝায়:

“এক একখানা নভেলের মধ্যে চারিটি করিয়া গান আর ছয়খানি করিয়া হাফ টোন ছবি দেবে।  ছবিগুলির স্ত্রীমূর্তি গুলি  সযৌবনা  ও উন্মুক্তবক্ষা  ও অস্ত্রধারিনী হইবে । পুরুষ অমনি  তাহাকে স্থির করিবার জন্যে জড়াইয়া ধরিবে —কিন্তু স্তন দুইটির ওপর যেন হাতখানা না পড়ে।”

(লেখক ও প্রকাশকাল অজ্ঞাত)

পাঠকের কি হাস্যোদ্রেক হলো? হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ অশ্লীলতাটি হাস্যরস বিজড়িত। কিন্তু যে বার্তাটি প্রেরণ করা হলো তা উপাদেয় নহে। হাসির যে রোলটি উঠছেন তা একটি ‘অমিত ইন্দ্রিয় পরায়ণা’, অভব্য অথচ শিক্ষিত স্ত্রীলোক কে ঘিরে, যিনি ঘরে বসে নাটক নভেল পড়ে সময় নষ্ট করেন এবং পবিত্র স্ত্রীদেহ টি  কে বাজারের পণ্যসামগ্রী করতে স্বামীকে  মন্ত্রণা দেন ।

প্রহসনে অতিরঞ্জন অবশ্যই থাকে,  তবে এ জাতীয় বই যে মেয়ে মহলে প্রচলিত ছিল সে তো বঙ্কিম বাবু আমাদের জানিয়েছেন! এক পালিশ ষষ্ঠী বাবু যে তার ওপর দোর দিয়ে হামলে পড়েছিলেন সেও আমরা দেখেছি। বামাবোধিনী , স্ত্রীশিক্ষামূলক সাহিত্য এই অশ্লীল নভেল পড়া বিষয়ে উত্তাল।  এ কথা আগেও বলেছি। মহিলারা এই নর্দমায় কেন ডুব দিতেন সে কথা কোনো মনীষী ভেবে দেখেছিলেন কি? দেখে থাকলেও আমার তা চোখে পড়েনি। বোধকরি তাঁরা সাধ্বীদের মানসিক উন্নয়নে ব্যস্ত ছিলেন।

ঘরে বাইরের সন্দীপ বাবু কিন্তু বুঝেছিলেন, তাই তিনি  স্ত্রীপুরুষের মিলননীতির বইখানি বৈঠক খানায় ফেলে রেখে গেলেন  এবং  মক্ষীকে বললেন : “আমার খুব ইচ্ছে ছিল এ বইটা নিখিল পড়ে।”

আমার ধারণা কথাটি একেবারে মিথ্যে নয়। নিখিলেশ  তাঁর বন্ধু। তাকে তিনি চিনতেন।
যাই হোক, রুক্মিণী, বিমলা এইসব outlandish, অনাচারদুষ্ট  শূন্য ভান্ড হ’তে আমরা দূরে থাকি।  এনারা exceptions। এঁদের কথায় আমাদের কাজ নেই।

বরঞ্চ আসুন, আমরা সকলে মিলিয়া  পুত্রোৎপাদিকা শক্তির জয়গান গাই ।

বন্দে মাতরম্।

Featured Image: https://www.pinterest.com/pin/493425702894207881/

Posted in বাংলা, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, History, Women | Leave a comment

গড়গড়ার মা’লো দ্বাদশ পরিচ্ছেদ: শিক্ষিতা স্ত্রী অথবা পাস করা মাগ

 

স্ত্রী শিক্ষা বনাম স্ত্রীর শিক্ষা

তাত্ত্বিক যুক্তি deductive logic এবং আনুপাতিক অনুমান deductive  inference। ‘পতিতগণ যদি  বই লিখিতে বা পত্রিকা সম্পাদনা করিতে পারেন , তবে পতিতাগণ পারিবে না কেন?’ ‘পতিতারা যদি একত্র মিলিত হইয়া সমিতি গঠন করে  তবে দেশের চোর ডাকাতরাও সমিতি গঠন করিবে ।” মানদার তাত্ত্বিক যুক্তি এবং মহাত্মা গান্ধীর আনুপাতিক অনুমান থেকে আমরা একটি পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাই, বিশেষ এই সমিতি গঠনের বায়ুটি উনিশ শতকে  বঙ্গদেশ শিখেছিল  সায়েবদের অনুকরণে এবং শেলি বায়রন শেক্সপীয়র আদি বায়বীয় অসুখ অন্তঃপুরে ঢুকেছিলো  স্ত্রী শিক্ষার  হুজুগে।  আমরা এও জানি মানদা এই সকল পড়েছিলেন I এবং কুতর্কের শিক্ষা এবং আরও কিছু অসৎ প্রবৃত্তি যে  ইন্দ্রিয়পরায়ণা কলহপ্রিয়া স্ত্রীজাতি শিখেছিলেন দুই পাতা ইংরাজি পড়ে তাতে সন্দেহ নেই।

পাঠক, যদি জিজ্ঞাসা করি স্ত্রী শিক্ষা আর স্ত্রীর শিক্ষার মধ্যে পার্থক্য কি? সাদৃশ্যই বা কোথায়?  তবে এই হেঁয়ালিটির সঠিক উত্তর হবে , প্রথমটি হলো সায়েবদের দেওয়া কুমন্ত্রণায় বাঙালি বাবুদের ঘরের মেয়েদের দুই পাতা পড়ানোর ঐতিহাসিক অভিযান (এটি ঢাক ঢোল পিটিয়ে শুরু হয় ১৮৪৯ সালে) ।  দ্বিতীয়টি হলো সংসারে  খাল কেটে কুমির ডেকে আনার এক  নব্যবাবুসুলভ আহাম্মকি। প্রথম আর দ্বিতীয়টির মধ্যে একটি কার্য কারণ সম্পর্ক আছে বটে । স্ত্রী শিক্ষা নিয়ে দুচার কথা বলা হয়েছে মেয়েমানুষের বুদ্ধি পরিচ্ছেদে এবং নারী জাতির আত্মিক উন্নতি নিয়ে যে আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল, সেই বামা বোধিনী আন্দোলন আমরা খানিক খানিক নেড়ে চেড়ে দেখলাম ।  স্ত্রী শিক্ষা আর স্ত্রীর শিক্ষা বিপর্যয় নিয়ে যে ডামাডোল  শুরু হলো, সেটি এইবার দেখার সময় হয়েছে।
প্রথমেই  স্মরণ করি সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রাচীনা ও নবীনা’ প্রবন্ধটি। তিনি বলছেন:

“(…) দিনকতক ধূম পড়িল, স্ত্রীলোকদিগের অবস্থার সংস্কার কর, স্ত্রীশিক্ষা দাও, বিধবাবিবাহ দাও, স্ত্রীলোককে গৃহপিঞ্জর হইতে বাহির করিয়া উড়াইয়া দাও, বহুবিবাহ নিবারণ কর; এবং অন্যান্য প্রকারে পাঁচী রামী মাধীকে বিলাতি মেম করিয়া তুলা। ইহা করিতে পারিলে যে ভাল, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই; কিন্তু পাঁচী যদি কখন বিলাতি মেম হইতে পারে, তবে আমাদিগের শালতরুও একদিন ওক্‌বৃক্ষে পরিণত হইবে, এমন ভরসা করা যাইতে পারে। যে রীতিগুলির চলন, আপাততঃ অসম্ভব, সেগুলি চলিত হইল না; স্ত্রীশিক্ষা সম্ভব, এ জন্য তাহা এক প্রকার প্রচলিত হইয়া উঠিতেছে। পুস্তক হইতে এক্ষণে বাঙ্গালি স্ত্রীগণ যে শিক্ষা প্রাপ্ত হয়, তাহা অতি সামান্য; পরিবর্ত্তনশীল সমাজে অবস্থিতি জন্য অর্থাৎ শিক্ষিত এবং ইংরেজের অনুকরণকারী পিতা ভ্রাতা স্বামী প্রভৃতির সংসর্গে থাকায় তাহারা যে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়, তাহা প্রবলতর। এই দ্বিবিধ শিক্ষার ফল কিরূপ দাঁড়াইতেছে? বাঙ্গালি যুবকের চরিত্রে যেরূপ পরিবর্ত্তন দেখা যাইতেছে, বাঙ্গালি যুবতীগণের চরিত্রে সেরূপ লক্ষণ দেখা যাইতেছে কি না? যদি দেখা যাইতেছে, সেগুলি ভাল, না মন্দ?”

বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশ্নোবোধক অলঙ্কার সংযোন টি দ্যোতক।  অলঙ্কার শাস্ত্র বলে উত্তর হবে  নেতিবাচক ।যাই হোক, পাঁচী রামি, মাধিকে বিলাতি মেম করার প্রকল্পটি শুরু   হয় ১৮৪০ সালে।

 James Stuart Mill অথবা বাবু হেমেন্দ্রপ্রসাদের ক্ষেদোক্তি

জেমস স্টুয়ার্ট মিল এর হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া (১৮৪০) এক মহান গ্রন্থ। বাবু স্টুয়ার্ট মিল এতদ্বারাএই বুঝয়েছিলেন যে নেটিভ দের সার্বিক বোধোদয়ের অন্যতম উপায় হলো তাহাদের সম্ভাব্য সহধর্মিণীদের শিক্ষিত করে তোলা। এ বাবদ তিনি লিখছেন:

“The condition of women is one of the most remarkable circumstances in the manners of nation… As society refines upon its enjoyments, and advances into the state of civilization, …in which the qualities of the mind are ranked above the qualities of the body, the condition of the weaker sex is gradually improved, till they associate on equal terms with men and occupy the place of voluntary and useful conjugators.”

অর্থাৎ বাবুকুলের সর্বাঙ্গীন শ্রীবৃদ্ধির তরে তাঁদের  উপযুক্ত  শিক্ষিতা বিবি  সহধর্মিনী প্রয়োজন  যাতে তাঁরা ইংরেজ সরকারের স্বাস্থ্য সমৃদ্ধিতে আরও ইন্ধন জোগাতে পারেন. উনিশ শতকের বাংলা ভাষায় ‘বাবু’ শব্দটি বহুবর্ণ. একাধারে কর্তা, স্বামী, মনিব, আবার কেরানীও বটে. এই বহুমাত্রিক বাবুর  মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় স্ত্রী নামক সেবাদাসীর পরিবর্তে শিক্ষিত বিবি বিধেয় হলো ।  অতএব বেথুন  স্কুল । অতএব নারী জাগরণ।

১৮৯৩ সালে উনিশ বৎসর বয়স্ক বাবু হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ মনোরমা নাম্নী এক ত্রয়োদশ বর্ষীয়া  বালিকার সঙ্গে তাঁর বিবাহ উপলক্ষে লিখছেন:

“I must be either a fool or a rogue to sermonize on such a subject […] personally, I have very little faith in the sex –rightly termed the weaker sex. I have very little faith in their feelings and emotions in their brains, in their capacity for love and affection.”

এবং তাঁর  ঘাড়ে যাঁরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাঁকে  নবীনা করার গুরু দায়িত্ব সম্পর্কে বলছেন:

“I shudder as I look before me and probe into the stupendous task—the task of forming a character —the task of making another my own, the task of making another human being my partner in life… the stupendous task that lies before me.”

এই stupendous task  এই নব্য বাবুটি কিভাবে কার্যকরী করেছিলেন বা আদৌ করেছিলেন কিনা বলা যায় না তবে  প্রাচীনা কে নবীনা করার রঙ্গে যে নব্যবঙ্গদেশ মেতে উঠেছিল তা হিন্দুয়ানির ধ্বজাধারীরা ভালো চোখে দেখেন নি । পাঁচী রামী মাধীদের মন্দ কপাল : দেশি পুতুল হতে মেম পুতুল, নব্য বাবুদের গবেষণাগারের বিষয়বস্তু, আবার অন্যদিকে সনাতন পন্থীদের হাসির খোরাক, বটতলায় ছাপা শস্তা প্রহসনের সং।

GARGARA XII PREM

চুলটানা বিবিয়ানা ও বঙ্গীয় কর্মশালা

স্ত্রীজাতি এক নিষ্ক্রিয় উপাদান । কর্তৃপক্ষ যেমন সাজান  তেমনি সাজে, বাঁচালে বাঁচে, মারলে মরে। যখন তাকে বিবি সাজানো হলো, একদল বললে ‘বাহ্, বেড়ে  দেখাচ্ছে ‘ আর একদল বললে  নাঃ এ অচল।প্রথম দল Useful conjugator পন্থী, দ্বিতীয় দল সনাতনপন্থী হিঁদু ভাগ্যবিধাতা । দুই দলেরই সমান গোঁ।  ‘সমাজ দীপিকা’ পত্রিকায়, ১২৯২ ভাদ্র সংখ্যায়  ‘স্ত্রী শিক্ষা  ও স্ত্রী স্বাধীনতা’ প্রবন্ধে স্ত্রী শিক্ষায় উৎসাহীদের জিগেস করা হচ্ছে : “শিক্ষা দেওয়ার অর্থে  কি তাঁহারা বডি তে বডি ঢাকিয়া, মোজা জুতা পায় দিয়া, গাড়ি চড়িয়া, শিক্ষকের মুখে স্বরের অ স্বরের আ , হইতে সাইন্স এম.এ  পর্যন্ত এই বুঝেন?”

পাঠক, দেখুন  স্ত্রীরা কি বোঝেন তা জিগেস করা হচ্ছে না। মনোজ্ঞ বিষয় টি আলোচনা করছেন কর্তৃকারকেরা । স্ত্রীজাতি  কি ভাবছেন সে জানার প্রয়োজন কোথায়? বাস্তবিক, তাঁরা বোঝেন ই বা কি?  ‘বসন্তক’ পত্রিকায় ‘নসিরামের মেলা’ গল্পে পরীক্ষক ছাত্রীকে জিগেস করছেন , ” বিদ্যানুশীল কাকে বলে?” ছাত্রী উত্তর দিচ্ছে: “কেতাব পড়া, মাসিক পত্রিকা পড়া , কার্পেট বোনা”। এরপর শিক্ষক যখন জানতে চাইলেন “আহার করে কি করবে?” উত্তর পেলেন: “কার্পেট বুনবো”।

এসবের শোনার পর সাধারণ বুদ্ধি বলে এসকল অতি অচল পদার্থ, কার্পেট বোনা হতে পারে, মাসিক পত্রিকা পড়া হলেও হতে পারে কিন্তু শিক্ষা, বিশেষতঃ ইংরেজি শিক্ষা  নৈব নৈব চ. Useful conjugator পন্থীরা আশা বাদী… তারা গোঁ ধরে রইলেন এবং ক্রমেক্রমে দেখা গেল তাঁদের জয় হচ্ছে। স্ত্রীশিক্ষা বা স্ত্রীর শিক্ষা ধাপে ধাপে এগোচ্ছে এবং স্কুলের গাড়িতে কছু conjugtor রাও খাতাকলম নিয়ে সওয়ার হচ্ছেন। পাঠক, এমতাবস্থায় আমার একখানি গানের কলি মাথায় এলো; সেটি হলো:

জয় ক’রে তবু ভয় কেন তোর যায় না,…
আশার আলোয় তবুও ভরসা পায় না,

১৯১৫ সালে শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখছেন:
“বিধাতা একদিন পুরুষকে পুরুষ এবং মেয়েকে মেয়ে করিয়া সৃষ্টি করিলেন, এটা তাঁর একটা আশ্চর্য উদ্ভাবন, সে কথা কবি হইতে আরম্ভ করিয়া জীবতত্ত্ববিৎ সকলেই স্বীকার করেন। জীবলোকে এই যে একটা ভেদ ঘটিয়াছে এই ভেদের মুখ দিয়া একটা প্রবল শক্তি এবং পরম আানন্দের উৎস উৎসারিত হইয়া উঠিয়াছে। ইস্কুল-মাস্টার কিংবা টেক্‌স্‌বুক-কমিটি তাঁহাদের এক্সেসাইজের খাতা কিংবা পাঠ্য ও অপাঠ্য বইয়ের বোঝা দিয়া এই শক্তি এবং সৌন্দর্যপ্রবাহের মুখে বাঁধ বাঁধিয়া দিতে পারেন, এমন কথা আমি মানি না। মোটের উপর, বিধাতা এবং ইস্কুল-মাস্টার এই দুইয়ের মধ্যে আমি বিধাতাকে বেশি বিশ্বাস করি। সেইজন্য আমার ধারণা এই যে, মেয়েরা যদি বা কাণ্ট-হেগেল্‌ও পড়ে তবু শিশুদের স্নেহ করিবে এবং পুরুষদের নিতান্ত দূর-ছাই করিবে না।
কিন্তু তাই বলিয়া শিক্ষাপ্রণালীতে মেয়ে পুরুষ কোথাও কোনো ভেদ থাকিবে না, এ কথা বলিলে বিধাতাকে অমান্য করা হয়। বিদ্যার দুটো বিভাগ আছে। একটা বিশুদ্ধ জ্ঞানের, একটা ব্যবহারের। যেখানে বিশুদ্ধ জ্ঞান সেখানে মেয়ে-পুরুষের পার্থক্য নাই, কিন্তু যেখানে ব্যবহার সেখানে পার্থক্য আছেই। মেয়েদের মানুষ হইতে শিখাইবার জন্য বিশুদ্ধ জ্ঞানের শিক্ষা চাই, কিন্তু তার উপরে মেয়েদের মেয়ে হইতে শিখাইবার জন্য যে ব্যবহারিক শিক্ষা তার একটা বিশেষত্ব আছে, এ কথা মানিতে দোষ কী?”
(সংযোজন স্ত্রীশিক্ষা ভাদ্র-আশ্বিন, ১৩২২)

 

অর্থাৎ , হে স্ত্রীজাতি, ভুলিয়ো না, কামানের গোলা হেন জার্মান দর্শন  হজম করার পরও তোমার আসল কার্য সন্তান প্রতিপালন এবং আপনাপন পুরুষ গণের সমাদর ও সর্বসময় হিতসাধন । এবং, যতই বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ ডিঙ্গাও, তোমাদের  পাঠ্য এবং পুরুষদিগের পাঠ্য ভিন্ন হইবেক তাহা অনস্বীকার্য। Usefulness এর সংজ্ঞার বাকিটা পাঠকরা পড়ে বুঝে নেবেন এই আশায় রইলাম। স্ত্রীজাতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই  দ্বিধাজড়িত  অনুনয়ে বোঝা যায় “পুরুষদের নিতান্ত দূর-ছাই” সম্ভাবনাটি  যে আছে, সে কথা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায়না। ইতিহাস বাচনভঙ্গি বোঝায়। ১৮৮৭ তে বঙ্কিমবাবু আরো নির্দ্বিধায় আসল গান টি গেয়ে রেখেছিলেন। রবিবাবুর বাচন ভঙ্গিতে যা কৌশলে ঢাকা পড়লো, বঙ্কিমী বাংলায় তা সূর্যের ন্যায় আলোকিত:

 

“স্ত্রীলোকের প্রথম ধর্ম্ম পাতিব্রত্য। অদ্যাপি বঙ্গমহিলাগণ পৃথিবীতলে পাতিব্রত্য-ধর্ম্মে তুলনারহিতা। কিন্তু যাহা ছিল তাহা কি আর আছে? এ প্রশ্নের উত্তর শীঘ্র দেওয়া যায় না। প্রাচীনাগণের পাতিব্রত্য যেরূপ দৃঢ়গ্রন্থির দ্বারা হৃদয়ে নিবদ্ধ ছিল, পাতিব্রত্য যেরূপ তাহাদিগের অস্থি মজ্জা শোণিতে প্রবিষ্ট ছিল; নবীনাদিগেরও কি তাই? অনেকের বটে, কিন্তু অধিকাংশের কি তাই? নবীনাগণ পতিব্রতা বটে, কিন্তু যত লোকনিন্দাভয়ে, তত ধর্ম্মভয়ে নহে। ”   (‘প্রাচীনা ও নবীনা’)

 

বঙ্কিমবাবুর  প্রতিবেদনে প্রশ্নবোধক  অলংকারের ব্যবহার অর্থবহ। প্রশ্নটির যে প্রয়োজন নেই এবং উত্তর টি স্বতঃসিদ্ধ, তা বোঝানোর এর চেয়ে উৎকৃষ্ট  অলংকরণ পাওয়া ভার। সাহিত্যসম্রাট কে আমার প্রণাম।

এখন দেখা গেল রবিবাবু আর বঙ্কিম বাবুর বাগধারা দুই খাতে বইলেও, যে সত্যটি বেশ পরিষ্কার তা হলো স্ত্রী জাতির চরিত্র জনিত উদ্বেগ ।  শিথিলস্বভাবা বলে কিছু খ্যাতি আমরা মেয়েমানুষেরা সেই  আদি পিতার সময় থেকে বহন করে চলেছি , এ নিয়ে কিছু কথা আগেও বলেছি ; সতেরোশো শতকের ইংল্যান্ডেও এ জাতীয় নারীস্তুতি প্রচলিত হয়েছিল, যদি কখনো সুযোগ  পাই সে নিয়েও বলবো। তবে সায়েবরা এসে যে বঙ্গদেশের নিড়বিড়ে বাবুদের এই উৎকণ্ঠা আরও উস্কে দিলে সেটা পরিষ্কার ।তাঁরা যা নিয়ে এলেন তা হলো ব্যাটাছেলেদের সঙ্গে স্ত্রীজাতির মেলামেশা নামক কন্টামিনেশন। পাঠক, মীর মোশারফ হোসেনের উদাসীন পথিকের মনের কথায় (১৮৯০) একটি সহজ সরল ইঙ্গিত দেখুন। এই পর্বে ‘জকি’ নামক চরিত্র তার বৌ ‘মাখন’ কে বকা ঝকা করছে সে পরপুরুষদের সামনে বেরোত না বলে। এইবার কথোপকথনটি শুনুন:

 

আমি সাহেবের কুঠিতে থাকিয়া দেখিতেছি, নুতন কোন সাহেব আসিলে মেমসাহেব নিজে যাইয়া আগু বাড়াইয়া আনেন। দুইজনে চুমা খাওয়া হয়, গলায় গলায় মিশিয়া হাত ধরাধরি হয় । তোরা কোন কার্য্যের নহিস। কেবল ঘোমটা—তোদের কেবলই ঘোমটা ।”
“আমি গরিব, দুঃখী বাঙালীর মেয়ে। বাঙ্গালা আমাদের দেশ । আমার দেশের চাল-চলন যাহা আছে তাহাই করিব। সাহেব বড়লোক, দেশের রাজা । তাহরা যাহা করেন, আমার সে সকল দেখিয়া দরকার কি ? আমি গরিব মানুষ, মেমসাহেবের মত ব্যবহার করিতে আমার ক্ষমতা নাই। হইবেও না।”

 

এখন কথা হচ্ছে চুমা খাওয়া,গলায় গলায় মিশিয়া হাত ধরা, এ সকল সামাজিক সম্ভাষণ যদি useful conjugator রা রপ্ত করেন, তাহলে সর্বনাশ। কারণ, বিবিরা ‘ইংরেজি কেতাব যে পড়বেন, সে তো খালি পিঁপড়েরে সারি  ইংরেজি অক্ষর নয়? সে হলো  কথা বলার ঢং, আদব কায়দা, সামাজিক রীতি নীতি, এবংসর্বোপোরি পরপুরুষের সহিত গলাগলি ঢলাঢলির প্রথা, সায়েবরা যারে ক’ন etiquette। এই contamination-এর ভয়ে সকল বাবুই অল্পবিস্তর শিহরিত হচ্ছেন; কেউ জোরে কাশছেন, কেউ মুখে রুমাল চাপা দিয়ে।

 

bongo0001

১৮৮১ তে বান্ধব পত্রিকায় ‘ বিবিয়ানা চলন ‘:

“বাবুরা বুট পড়েন , বিবিরাও স্লিপার বা লেডিস সূজ পরেন । উভয়েই রং বিরঙ্গের মোজা পরেন । বাবুরা ধুতির ওপর গলা খোলা কোট পরেন, বিবিরাও শাড়ির ওপর জ্যাকেট পরেন …বাবুরা ব্র্যান্ডি খান বিবিরা পোর্ট সেবন করেন …মূল কথা এই, আমাদের দেশে বিকৃত ইংরেজি সভ্যতার অনুকরণ হইতেছে… আমাদের স্ত্রীলোকদিগকেও  তাহার অনুকরণ করিতে প্রবৃত্তি দিতেছি । তাহার ফল এই হইবে যে, ফিরিঙ্গি সমাজ যে সকল দোষে দুষ্ট , আমাদের সমাজেও  সেই সকল , বরং তাহার অপেক্ষা শোচনীয়  দোষ প্রবেশ করিবে , বাঙালি বধূ বিবি হউন তাহাতে আমরা আপত্তি করিনা ; চন্দ্রপুলি ত্যাগ করিয়া হট কেক দিয়া জলযোগ করুন , তাহাতে আমাদের আপত্তি নাই, …কিন্তু তাঁহারা যেন পৃথিবীর প্রধান কর্তব্য  না ভুলেন…এক্ষণে আমাদের বধূমহলে বিবিয়ানা চলনের দিকে  যে ঝোঁক পড়িয়াছে , সাবধান না হইলে বড় বিপদ ঘটিবে”।
জ্যাকেট এ আপত্তি নাই, হট কেক এ আপত্তি নাই, তাহা হইলে  আপত্তিটা কিসে?  বিপদই বা কোন পথে আসিবে? এই অংশটি বড় দীর্ঘ হয়ে পড়ছে কিন্তু আর দুই একটি কথা না বললে সত্য প্রতিভাত হইবে না । পন্ডিতপ্রবর ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ‘লজ্জাশীলতা’ ( ১৮৯২) প্রবন্ধটি শেষ হয়েছে এই ভাবে:

 

“আজিকার নিমন্ত্রনে যে স্ত্রীলোকেরা আসিয়াছিলেন তাহাদিগের মধ্যে একজনের শব্দ অনেক বার বাহির বাটি পর্যন্ত শোনা গিয়েছিলো… কে বলো দেখি।  “কেমন করিয়া জানিব”। ” ও সেই সুকুমারী, যে চলিলে পায়ের শব্দ হইত না –মুখ তুলিয়া কথা কইতো না –যাহার মুখের হাসি মুখেই মিলিয়ে থাকিত –আহা বাছার দোষ কি? স্বামী উহাকে ইংরাজদের সহিত কথা কহাইয়াছে–তাহাদের সামনে গান করাইয়াছে–আপনার সঙ্গে মদ পর্যন্ত খাওয়াইয়াছে –আর কি ওর লজ্জা রাখিয়াছে ? তাই অত গলা হইয়াছে , ধরণ ধারণ সব বদল হইয়া গিয়াছে ।”

 

অর্থাৎ কিনা সুকুমারীর ফিরিঙ্গি  সংসর্গে স্পর্শদোষ ঘটিয়াছে  এবং সে একটি বেহায়া মেয়েমানুষে পরিণত হইয়াছে ।

বাবুদের উভয় সংকট । প্রাচীন বাবু বলেন  “গৃহপিঞ্জরের বিহঙ্গিনী”দের  (শব্দটি বঙ্কিমী, আমার পছন্দ) শিকলি দিয়ে বাঁধো। ইংরেজি দোষ হতে দিয়ো না । কিন্তু এধারে পালিশ ষষ্ঠী বাবুটি পড়লেন আতান্তরে।অন্তরের প্রাচীন বাবু স্বীকার করলেন বিপদ আছে বটে, কিন্তু  বিবি যদি ইংরিজি না পড়লো আর পালিশ সংসর্গ না করলো তাহলে সে সহধর্মিনী হয় কি প্রকারে এবং বাবুরই বা মোক্ষপ্রাপ্তি হয় কিসে?

অতএব…

শিক্ষিতা স্ত্রী

১৮৮৫ থেকে ১৯০০র গোড়ার দিক পর্যন্ত পুরুষ জাতি ভয়ে ভয়ে রইলেন। শিক্ষিতা বিবি বিষয়ক প্রহসন ও নভেলে বটতলা জমজমাট। বলা বাহুল্য, লেখক সকলই পুুরুষ।  এই সকল জ্যাকেট এবং ইষ্টাকিন  (stocking)  পরিহিতা, পার্শি শাড়ি  বেষ্টিতা স্ত্রীকুলকে কি করে সৎ শিক্ষা দিতে হয় তার একটি  বার্নিং এক্সাম্পল সেট করা হলো ১৮৮৮ সালে লিখিত পাস করা মাগ  প্রহসনে। পাঠক, এটি একটি হাস্যরসসমৃদ্ধ  allegory ।  বর্ণনায় বলা হয়েছে:

স্ত্রী স্বাধীনের এই ফল
পতি হয় পায়ের তল ।।

এই প্রহসনের  নায়িকা কিরণ শশীর প্রথম অঙ্ক প্রথম দৃশ্যে  তাঁর ভগিনী চাতকিনীকে বলছেন:

“আমি কেয়ার করি না। ড্যাম ন্যাস্টি নেটিভগণ , মেয়েমানুষের অনার বোঝে না । ভাতার বলে যে একটা পদার্থ আছে –কি জানোয়ার আছে –তা আমার আইডিয়াতেই আসেনা;– তা আমি কি ইস্টুপিট  নেটিভ পুরুষের  অধীনতা স্বীকার করে –ব্রুট অসভ্য পরাধীন বাঙালির মতো থাকবো? তা কখনোই নয়! যদিও আমি বাঙালির মেয়ে –কিন্তু এখনকার বাঙালির মেয়ের মতো মূর্খ নই। আমি বেথুনে স্কুলে হাই প্রাইজ  পেয়েছি, যেদিন তোমার বিয়ে হয় সেদিন তোমার পতি আমার মুখে ইংলিশ স্পিচ শুনে থান্ডারস্টক হয়েছিল । তোমার বিবাহের আচার ব্যবহার দেখে  যদিও আমি দুঃখিত হয়েছিলাম , কিন্তু তোমার ব্রাইডগ্রুমকে শিক্ষিত নেটিভ এর ন্যায় সভ্য দেখে সে দুঃখ ডিশ্চার্য্য  করেছি।”
তৃতীয় দৃশ্যে তিনি গান গাইছেন:

ও প্রাণ ডিয়ার
ভ্রাতা সব কাম হিয়ার!
লেকচার দিব গার্ডেনে
হাত ধরে পুরুষ সনে
বেড়াইবো নির্জনে ,
দিবানিশি হৃদয় চিয়ার ।
হাজব্যান্ডে করে ডিসমিস , হয়েছি প্রাণ নিউ মিস ,
দিই আমি সুইট কিস,
ফ্রি লভ্ নেভার ফিয়ার ।
এই নায়িকাকে শেষ অংকে শেষ দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে  ইডেন গার্ডেন এ  ছিন্ন গাউন  ও ছিন্ন সাজে । তিনি তাঁর নেটিভ ভাতার কে বলছেন:

 

“তুমি আমার বুকে ছুরি মারো , তুমি আমাকে হত্যা করো । আমি এ পাপ প্রাণ তোমার হাতে নষ্ট করবো..আমার প্রাণে বড় যাতনা হয়েছে –আমি তোমাকে করতো কষ্ট দিয়েছি –তুমি আমার সোনার স্বামী–তুমি আমার হৃদয়ের ধন;আমার পেপার শাস্তি হয়েছে,– এখনো হৃদয় যাতনা নিবারণ হয় নাই। তুমি আমাকে বোধ করো।”

পাঠক, প্রহসনটি বিয়োগান্তক এরে কয় poetic justice. যবনিকা পতনের আগে বিজয়ী স্বামী শ্রী শশীভূষণ ঘোষ বলছেন:

“তুই আমার বড় আদরের স্ত্রী ছিলি। তুই এখন বেশ্যা হয়েছিস । না! আমি হত্যা করতে পারবো না । তোর এখনো অনেক যাতনা আছে , তুই আমার সেই আদরের কিরণশশী,– তুই আজ ভিখারিনী, ম্লেচ্ছ রমণী ! ওঃ! আমি বড় আশা করেছিলাম; আমার– পাসকরা মাগ।”

উপসংহার

এইরকম ইংরেজি জানা মাগে বটতলা এই পর্যায়ে সরগরম। প্রহসন, নভেল সবেতেই তাঁদের ব্যাভিচারিতার উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে তাঁদের বিদায় করা হচ্ছে। “পাশ করা পেত্নী” বই তো নয় ।

একটি আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সকল সাহিত্য চর্চায় ইংরেজি জানা বাবুর মদ খাওয়া এবংবেশ্যা বাজি নিয়ে খানিক রগড়  হলো বটে কিন্তু  কিরণশশীর মত যথোচিত সাজা তেমন কাউকে পেতে দেখলাম না ;  স্ত্রীজাতি স্বভাবতই শিথিলস্বভাবা কিনা, শাসন তর্জন তথা পোয়েটিক  জাস্টিস তাঁদেরই প্রাপ্য ।

একটি অন্য ভাবও খুঁজে পেলাম । সেই  উদ্ধৃিতিটি দিয়ে শেষ করি। শ্রীযুক্ত তারকনাথ বিশ্বাস  ‘বঙ্গীয় মহিলা অর্থাৎ নারীজাতির শিক্ষাবিষয়ক প্রস্তাবে’ (১৮৮৫) লিখছেন:

পুরুষ অধঃপাতে যাইতেছে বলিয়া কি রমনীগণকেও যাইতে হইবে? রমণী ভিন্ন এ সংসারে আমাদের আর কে আছে? তাঁহাদের কোমল সুন্দর প্রকৃতি  অবিকৃত না থাকিলে  পুরুষের তাপ দগ্ধ হৃদয়  কিসে জুড়াইব?

 

এ  আকুল প্রশ্নর যোগ্য জবাব একটি মনে এলো বটে, কিন্তু সে ভদ্রসমাজে মুখ ফুটে বলা অবিবেচনার কাজ হবে বোধে ক্ষ্যান্ত দিলেম।

 

Featured Image: http://www.sothebys.com/en/auctions/ecatalogue/2014/modern-and-contemporary-south-asian-art

Posted in বাংলা, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, History, Uncategorized, Women | 1 Comment

গড়গড়ার মা’লো একাদশ পরিচ্ছেদ: শিক্ষিতা পতিতা ও স্বদেশী বাবু বিচার

GARGARA WOMAN

১ রমেশদার কথা

“অধুনা নিন্দিতা পল্লীবাসিনী (তথাকথিত নিষিদ্ধ পল্লী বা বেশ্যা পাড়া) পাথুরিয়াঘাটা বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের কন্যা কমলা দেবী , ইতালির (এন্টালি ) মুখার্জী পরিবারের কন্যা জুনিয়র  কেমব্রিজ পরীক্ষোত্তীর্ণা অতুলনীয়া সুন্দরী সুকৃতি দেবী , খড়দহের গোস্বামী পরিবারের কন্যা সরযূ দেবী, বরিশা চৌধুরী পরিবারের বধূ  সরলা দেবী, বেহালার হালদার পরিবারের কন্যা দেববালা , অনিলা ও সুনীল দেবী , শ্যাম বাজারে সেনশর্মা পরিবারের কন্যা কুমারী গৌরী দেবী , বাগবাজারের সাহিত্যিক পন্ডিতের স্ত্রী মনোরমা ও কন্যা পরিমল , তারকেশ্বরের বালবিধবা কৃষ্ণভামিনী, ভবানীপুরের ব্যারিস্টার ঘোষ বর্মা পরিবারের কন্যা প্রভৃতি বহু সম্ভ্রান্ত মহিলাদের কুলের বাহির করিয়াও যাহারা অর্থের জোরে সম্মান আদায় করিতেছে তাহাদের পরিচয় গ্রহণ করিয়া পাষণ্ডদিগকে সমাজ হইতে তাড়াইয়া দিবার জন্য বদ্ধপরিকর হওয়া যে অবশ্য কর্তব্য , সমাজহিতৈষীগণকে তাহা হৃদয়ঙ্গম করাইবার জন্যই এই গ্রন্থ প্রকাশ করিতে সাহসী হইলাম ।

বইটিতে পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর  পরিবারের কন্যার একটি ছবি আছে.  চেয়ার উপবিষ্ট বাবু টির শ্রীমুখ সম্পর্কে পরিচিতি তে বলা আছে “পুরুষটির পরিচয় দিতে অসমর্থ বলিয়া মুখে চুন কালী লেপন করিয়া দেওয়া হইলো, ইনি কে তাহা পাঠক বুঝিতে পারিবেন।“

এই পূর্বাভাস দিয়ে যে লেখাটি শুরু, তার লেখক শ্রী রমেশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নাম: রমেশদার চাপান উতোর.বইটি প্রকাশিত হয় শিক্ষিত পতিতার আত্মচরিত (১৯২৯) প্রকাশের কিছু পরেই এবং পরবর্তী কালে দুটি বই একই সঙ্গে  একই বৃন্তে দুটি ফলের ন্যায় সম্পাদিত হয়ে প্রকাশিত হয় ; মূল্য একটাকা বারো আনা। আমি হাতে পেয়েছি পঞ্চম সংস্করণ , ফলে এই  বই যে সাতিশয় সমাদৃত হয়েছিল সে বলার অপেক্ষা রাখে না। আখ্যানর‘রমেশ দা’ এক candid ভদ্র বাবু, যিনি পরিষ্কার বলেই দিচ্ছেন যে তিনি মাস্টার অফ আর্টস ছাড়াও, মাস্টার অফ এডাল্টারী হিসেবেও বেশ কৃতকার্য। । রমেশ দা নামটি লেখক কে অনুপ্রাণিত করে মানদা দেবীর আত্মচরিত পড়ার পর, সেকথা উনি পরিষ্কার বলছেন।

উপরোক্ত যে সামাজিক ছবিখানি তিনি দিলেন তারই নানা নিধি ব্যাখ্যান তাঁর এই লেখা, যার কেন্দ্র চরিত্র রমেশ দা। কৈশোর কাল থেকে প্রতি পর্যায়েই  তিনি নান মেয়ের সর্বনাশ করতে প্রবৃত্ত হয়েছেন এবং রতি সুখ অনুভব করেছেন। যৌবনাবস্থায় লীলাময়ী নাম্নী কোনো অধ্যাপক কন্যা কে সিডিউস করার প্রয়াস পান। মাছ যখন চার খাবার জন্যে একেবারে  বঁড়শির নিকটে এসে পড়েছে তখন বাবুটি ভুলক্রমে তারে রবিবুর ‘মানসসুন্দরী’  থেকে দুই চার কলি আবৃত্তি কর প্রেম নিবেদন করেন এবং খ্যাদা খান। সপ্তদশী প্রেমিকাটি, যে কিনা তার পায়ে সর্বস্ব দিতে রাজি ছিল তিনি কবিতাটি শ্রবণ করে যারপরনাই ক্রোধ প্রকাশ করেন এবং রমেশদা কে শাসান যে তিনি বাবাকে বলে দেবেন।  যেহেতু রবিবাবুর কবিতা অসংখ্য , একটি নাম পাতে ফেললেই পাঠকরা তা ধরে ফেলবেন, সে আশা না করাই ভালো তাই যেটুকু রমেশ লীলাময়ীকে শুনিয়েছিলেন, সেটুকু তুলে দিলাম:

বীণা ফেলে দিয়ে এসো, মানসসুন্দরী–
দুটি রিক্ত হস্ত শুধু আলিঙ্গনে ভরি
কণ্ঠে জড়াইয়া দাও…
অয়ি প্রিয়া,
চুম্বন মাগিব যবে, ঈষৎ হাসিয়া
বাঁকায়ো না গ্রীবাখানি, ফিরায়ো না মুখ,
উজ্জ্বল রক্তিমবর্ণ সুধাপূর্ণ সুখ
রেখো ওষ্ঠাধরপুটে, ভক্ত ভৃঙ্গ তরে
সম্পূর্ণ চুম্বন এক(…)

এইরকম প্রকাশ্যে চুম্বন কামনা  ব্রাহ্ম বালাটি সর্প জ্ঞান করেন  এবং সকাল সকাল  এই চুম্বন লালায়িত আপদ বিদায় করে নিজের এবং পরিবারের  মুখে চুন-কালি লেপনের পথ টি বন্ধ করেন. দেখা যাচ্ছে এই প্রতিনায়কটি রবি বাবুর কবিতা ও গান এ সমান দক্ষ কারণ dishonorably dismissed হওয়ার কিছু আগে লীলাময়ীর জন্মদিনের পার্টিতে তাঁকে দেখা যাচ্ছে লীলাময়ীকে অর্গান বাজিয়ে এই গান টি শোনাতে:

“তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা
মম শূণ্য গগন বিহারী
আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা-
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম অসীমগগন বিহারী।।

এর  কিছু পরেই উষা দেবী নাম্নী লীলাময়ীর এক সখী ওই একই অনুষ্ঠানে অর্গান বাজিয়ে রবিবাবুর এই গানটি গাচ্ছেন:

তোমার প্রণয় যুগে যুগে মোর লাগিয়া
জগতে জগতে ফিরিতেছিল কি জাগিয়া,
এ কি সত্য?

আমার বচনে নয়নে অধরে অলকে
চির জনমের বিরাম লভিলে পলকে
এ কি সত্য?

মোর সুকুমার ললাটফলকে লেখা অসীমের তত্ত্ব
হে আমার চিরভক্ত
এ কি সত্য?

পতিত চরিতে রবীন্দ্র কাব্যের স্থান বিষয়ে  থীসিস রচনা আমাদের লক্ষ্য নয়, তবে একটি বিশেষ কারণে এই তিনখানি রাবীন্দ্রিক বাচন তুলে ধরা হ’লো। পাঠক, দুটি বিবেচ্য বিষয় আছে: রুচি ও কাল দুইই  বদলাচ্ছে এবং খেমটা টপ্পার বদলে রবিবাবুর গান  বিনোদনের উপায় হিসেবে নির্ধারিত হচ্ছে ; বাবুরা উচ্চাশিক্ষিত, ইংরেজি ও বাংলায় সমান পারদর্শী এবং সবচেয়ে বড় কথা  সাতিশয় আলোকপ্রাপ্ত যেহেতু রবিবাবুকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা যোগ্যতর মনে করেন। আর একটি বিবেচ্য বিষয় হলো, তাঁরা ‘থেটার’ বা হাড়কাটা গলির প্রতি নজর না দিয়ে  সচ্ছল ভদ্রমহলে  শিক্ষিতা রমণীর খোঁজে আসেন এবং অর্গান বাজিয়ে  মনোরঞ্জন পর্ব সারা হলে যা বিধেয়  তাই করেন। লীলাময়ীরা বিপদ বুঝে নিজেদের সংবরণ করেন, উষা দেবীরা ব’য়ে যান। এই উষা দেবীদের সামাজিক পরিচয় রমেশ বাবু দিয়েছেন, বস্তুতঃ তাঁদের ছবিও আছেই এই বইয়ে । এই হতভাগিনীরা ছিলেন আলোকপ্রাপ্তা শিক্ষিতা বেশ্যা ।

২ সন্দীপের কথা

rabindranath_tagore

“আমি কিছুদিন আগে আজকালকার দিনের একখানি ইংরেজি বই পড়ছিলুম, তাতে স্ত্রীপুরুষের মিলননীতি সম্বন্ধে খুব স্পষ্ট-স্পষ্ট বাস্তব কথা আছে। সেইটে আমি ওদের বৈঠকখানায় ফেলে গিয়েছিলুম। একদিন দুপুরবেলায় আমি কী জন্যে সেই ঘরে ঢুকেই দেখি মক্ষীরানী সেই বইটা হাতে করে নিয়ে পড়ছে, পায়ের শব্দ পেয়েই তাড়াতাড়ি সেটার উপর আর-একটা বই চাপা দিয়ে উঠে পড়ল। যে বইটা চাপা দিল সেটা লংফেলোর কবিতা।

আমি বললুম, দেখুন আপনারা কবিতার বই পড়তে লজ্জা পান কেন আমি কিছুই বুঝতে পারি নে। লজ্জা পাবার কথা পুরুষের; কেননা, আমরা কেউ বা অ্যাটর্নি, কেউ বা এঞ্জিনিয়ার। আমাদের যদি কবিতা পড়তেই হয় তা হলে অর্ধেকরাত্রে দরজা বন্ধ করে পড়া উচিত। কবিতার সঙ্গেই তো আপনাদের আগাগোড়া মিল। যে বিধাতা আপনাদের সৃষ্টি করেছেন তিনি যে গীতিকবি, জয়দেব তাঁরই পায়ের কাছে বসে “ললিতলবঙ্গলতা’য় হাত পাকিয়েছেন।

মক্ষীরানী কোনো জবাব না দিয়ে হেসে লাল হয়ে চলে যাবার উদ্‌যোগ করতেই আমি বললুম, না, সে হবে না, আপনি বসে বসে পড়ুন। আমি একখানা বই ফেলে গিয়েছিলুম, সেটা নিয়েই দৌড় দিচ্ছি।

আমার বইখানা টেবিল থেকে তুলে নিলুম। বললুম, ভাগ্যে এ বই আপনার হাতে পড়ে নি, তা হলে আপনি হয়তো আমাকে মারতে আসতেন।

মক্ষী বললে, কেন?

আমি বললুম, কেননা এ কবিতার বই নয়। এতে যা আছে সে একেবারে মানুষের মোটা কথা, খুব মোটা করেই বলা, কোনোরকম চাতুরী নেই।”

রমেশ বাবুর পরে ঘরে বাইরের সন্দীপ বাবু ।  দুজনেই “মাস্টার ইন এডাল্টারী”।  দুই বাবুই  সদ্বংশজাত  এবং  উচ্চশিক্ষিত মেয়ে ভোলানোর শিল্পী। বিভিন্ন পর্যায়ে এই শিল্পকলার অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়: যথার্থ অভিসন্ধিতে আসার আগে পূর্বরাগের আবহ সৃষ্টি , কিছু উচ্চমার্গর আলোচনা ( শিকার যে আলোকপ্রাপ্তা সেকথা ভুললে চলবে না), কিছু মধুর বাক্যর সংমিশ্রন, কিছু সঙ্গীতাদি পরিবেশন এব শ্রবণ। কিছু অর্ধব্যক্ত ভীরু প্রণয় সম্ভাষণের সুফলও এই পর্যায়ে দৃষ্ট হয়।  নায়িকারা আধচোখে অস্ফুট ওষ্ঠে পেশাদারি প্রণয়ীর সঙ্গ উপভোগ করেন, তাঁদের হাত পা খুলে খুলে আসে। এরপর সম্ভাষণে কিছু আদর্শ ভিত্তিক বাণী যদি গুঁজে দেওয়া যায় তাহলে শিক্ষিতা নারী পপাত চ মমার চ। এ সকল অধ্যায় শেষ হলে শিকারী বেড়াল ধীরে ধীরে অগ্রসর হ’ন এবং শিকারকে অধিকার করেন। পাঠক,সন্দীপবাবুর  আর্টটি  উপরোক্ত কথোপকথনে ভালো করে লক্ষ্য করুন। বলাই বাহুল্য, এই হলো শিকার ধরার সেই পরম ক্ষণ।

মক্ষী লংফেলোর আড়ালে যা পড়ছেন তা একটি স্ত্রীপুরুষের যৌন বিধি প্রাইমার ,এবং সেটি সন্দীপ বাবু ইচ্ছাকৃত ভাবেই বৈঠক খানায় ফেলে রেখে গেছেন কারণ বারুদে আগুন লাগার লগ্ন এসেছে তা তিনি বিলক্ষণ বুঝেছেন;  আগুনের পূর্বাভাস উপন্যাসেই আছে । যৌন প্রসঙ্গের বই ফেলে যাওয়া সুতরাং  প্রাক্ অন্তিম পর্যায়।  এরপর আর কোনো রাখ ঢাক ছলাকলার প্রয়োজন নেই, সকলই জলবত্তরলম। যেটুকু  বাকি রইলো সেটুকু সন্দীপ বাবু গীত গোবিন্দর আভাস দিয়ে সারলেন

“ললিতলবঙ্গলতায় হাত পাকানো” কথাটি খুবই অর্থবহ, কারণ মক্ষী তা শুনে লজ্জায় লাল হ’ন।

এটি জয়দেবের গীতগোবিন্দর প্রথম সর্গর শ্লোকের অন্তর্গত।এ স্তবকটির বাংলা সংস্করণ:

আজ শ্ৰীরাধিকে বনে বনে কত প্রকারেই না শ্ৰীমাধবের অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইতেছেন। কন্দৰ্প-জ্বর-জনিত চিন্তা অত্যন্ত আকুল করিয়া তুলিয়াছে আর মিলন পিপাসা অতিশয় প্ৰবল হইয়াছে। এই অবস্থায় শ্ৰীরাধিকাকে তাহার  কোন সখী সরস বাক্যে বলিতে লাগিলেন, সখি! দেখ দেখ মৃদু মন্দ মলয় সমীরণ ললিত লবঙ্গলতা সংসর্গে কতই সৌগন্ধ বিস্তার করিতেছে। ফুলে ফুলে কুঞ্জ কুটীর ভরিয়া উঠিয়াছে। গুঞ্জন্মত্ত মধুৱতের ঝঙ্কার ধ্বনির সহিত মিলিত হইয়া কোকিল কাকলী চারিদিক মুখরিত করিয়া তুলিয়াছে। বিরহীর পক্ষে অতি দুরন্ত এই সরস বসন্তে হরি বুঝি কোন যুবতী জনের সঙ্গে বিহার করিতেছেন।

এ হলো গীতগোবিন্দর প্রথম সর্গের অন্তর্গত একটি  চার্জড্ এরোটিক মোমেন্ট বা রসঘন মূহুর্ত, যার মধ্যে ‘ললিত লবঙ্গলতা’র গন্ধ রাধার কামোত্তেজনার এক অনুষঙ্গ মাত্র। মক্ষী লাল হবেন বৈকি। যিনি ললিত লবঙ্গলতায়  ‘হাত পাকিয়েছেন’, তিনিও জানেন বিমলা ইঙ্গিতটি ভালোই বুঝেছেন, শিক্ষিতা কিনা। জয়দেব পড়েছেন। এবং তাঁরও সেই একই রাধা ভাব। সুতরাং নিরীহ ‘লবঙ্গলতা’ শব্দটি লক্ষ্য ভেদ করলো। আমরা একে বলি the art of seduction । এ স্তরটি সাফল্যমণ্ডিত হলে ‘মোটা কথা মোটা করে’  বললে কোনো ক্ষতি নেই। রমেশ বাবুর কপাল মন্দ, মোটা কথায় পৌঁছনোর আগেই ‘চুম্বন’ শব্দটি রবিবাবুর বকলমে বলে ফেললেন এবং তাঁর মানস সুন্দরী তাঁরে ঘাড় ধাক্কা দিলেন। তবে তাতে তাঁর যে পরবর্তীকালে কিছু এলো গেল তা বলা যাবে না।সন্দীপ বাবুও ঘাড় ধাক্কার উপান্তে পৌঁছেছিলেন এবং সে জোগাড়টি করেছিলেন মেজো বৌঠান। ‘হাতবিধবা’ পরিচ্ছেদে এনাকে নিয়ে দুই একটি কথা বলেছিলাম, পাঠক সে কথা স্মরণ করুন। রাইয়ের যে ‘চিটে চিনি জ্ঞান নেই’ সে কথা বুঝেই তিনি নানকু বেহারাকে দিয়ে সন্দীপ বাবুর অন্দরে আসা ঠেকানোর ব্যবস্থা করেছিলেন ; তাঁর অতি আলাভোলা দেওরের কারণে সে বন্দোবস্ত কার্যকরী হয়নি।

একটি  ক্লাসিক, বাংলা সাহিত্যের আকরগ্রন্থ, অন্যটি  অতি অখদ্যে অবদ্যে সামাজিক খেউড়, কিন্তু দুটিতেই দুই বাবুর মধ্যে আমরা কিছু সামঞ্জস্য খুঁজে পেলাম। তার মধ্যে যে সামঞ্জস্যটি আলোচনা হয়নি, সেটি হ’লো দুজনেই স্বদেশী আন্দোলনে সামিল ছিলেন।

৩ মানদার কথা

Chittaranjan-Das-Lawyer-a (2)

মানদার উদ্ধারাশ্রম পর্বের কথা বলেছি । সেই পর্বে রাজবালার কথাও উঠেছিল । এইবার তাঁর গল্পটি মানদার বয়ানে শোনাই:

“রাজবালা সোনার বেনের মেয়ে.  বাপের বাড়ি কলকাতায়, অল্পবয়সে তার বিবাহ হইয়াছিল । পিতা ও শ্বশুর উভয়েই সংগতিপন্ন  কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ  বিবাহের এক বৎসর পরেই হতভাগিনী  বিধবা হয় ।  তৎপরে পিতার প্রতিবেশী  এক পূর্ববঙ্গবাসী কায়স্থ যুবকের সহিত তাহার গুপ্ত প্রণয়  জন্মে। রাজবালার এক জ্যেষ্ঠা ভ্রাতৃবধূ  এই ব্যাপারে তাহাকে গোপনে সাহায্য করিত।  যুবকটি স্বদেশী আন্দোলনের সময় খুব ‘বন্দেমাতরম’ করিয়া বেড়াইত ।তিন বৎসর ধরিয়া এই গুপ্ত প্রেমলীলা চলিতে থাকে। অবশেষে  রাজবালার সন্তান সম্ভাবনা  হওয়ায় প্রেমিক যুবক পলায়ন করে । রাজবালা  ঝিয়ের সহিত  গঙ্গাস্নানের  অছিলায় বাড়ির বাহির হইয়া আসে , আর সে ফিরিয়া যায় নাই । তারপর নানা দুর্দশার আবর্তে ঘুরপাক খাইতে খাইতে  এই উদ্ধার আশ্রমে উপস্থিত হইয়াছে”।

পাঠক কে কি মনে করিয়ে দিতে হবে যে রবিবাবুর ঘরে বাইরে (১৯১৬) স্বদেশী আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক দলিল ? মানদার বইয়ে এই  বন্দেমাতরম বাবু প্রজাতির ছড়াছড়ি। কাব্য দর্শন সাহিত্য ছাড়াও এঁদের তূনীরে আছে ‘দেশাত্মবোধ’ নামক শব্দভেদী বাণ।  গৃহস্থ অন্দরমহলে তাঁদের জন্য অবারিত দ্বার, গরানহাটা সোনাগাছিতে তাঁরা ঈশ্বরের নামান্তর।  অন্য ইতিহাসে এঁদের ঘোরাফেরা দেখি ১৯০৫ থেকে ১৯২০র  আশ পাশ পর্যন্ত:

“আমি জানি কয়েকটি ভদ্র গৃহস্থের বধূ অসহযোগ আন্দোলনে প্রচারের কার্য করতে আসিয়াছিলেন, তাঁহারা আর তাঁহাদের স্বামীদের নিকট ফিরিয়া যান নাই । কেহ কোনো কার্য আরম্ভ করিয়াছেন, কেহ বা কোনো দেশকর্মীর সহিত অবৈধ প্রণয়ে আসক্ত হইয়াছেন , কেহ কেহ বা স্বামী স্ত্রী  ভাবে বাস করিতেছেন।  এইসকল দেশকর্মীর আচরণ সকলেই জানে , অথচ তাহারা ভোট দিয়া  এইপ্রকার সাধুবেশী  লম্পটস্বভাব  ব্যক্তিদিগেই  কর্পোরেশন, কাউন্সিল এ  প্রেরণ করে । সমাজের অন্ধতা এতদূর গভীর”।

রমেশদা’র চাপান উতোরে  যারে বলা হয়েছে  “ছাইকোলোজি”, পতিতা মেয়েদের ক্ষেত্রে সে বড় অদ্ভুত, তা এই আত্মচরিত পরে বুঝলাম । দেখলাম কি নিপুণ ভাবে বাবু দের ‘কন্টামিনেশন তত্ত্ব’ টি তাঁরা আপন করে নেন।  এই যে দেশপ্রেমী যুবকদের কথা তিনি বললেন,তাঁদের অধঃপতনের  জন্যে যে পতিতারা, সে শিক্ষিতাই হোক বা অশিক্ষিতাই হোক, দায়ী ,সে বিষয়ে তাঁর কোনও সন্দেহ দেখলাম না :

“যে সকল কর্মী যুবকের চরিত্রবল এমন ছিল যে একটা সিগারেট পর্যন্ত কখনো খায় নাই ,তাহারা  কেহ কেহ এই অসহযোগ আন্দোলনের  কর্মক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে মিশিয়া  মদ্যপান পর্যন্ত শিখিয়াছে । যে সকল যুবক এমন পবিত্র চিত্ত ছিল  যে স্ত্রীলোকের সহিত কথা কহিবার সময় মাথা তুলিত না –তাহারা আমাদের সংসর্গে আসিয়া  এখন বেশ্যা দূরে থাক, কুলবধূর সহিত  নির্লজ্জের মতো কুৎসিত হাস্য পরিহাস  করতে অনেকে লজ্জিত হয় না । পতিতা নারীদের  একটা প্রধান স্বভাব এই যে  তাহারা সচ্চরিত্র ও সংযমী পুরুষ দেখিলে  তাহাকে হস্তগত  করিতে বিশেষ চেষ্টা করে  এবং তাহার সংযম ও পবিত্রতাকে  বিনষ্ট করা  একটা বীরত্বের কার্য বলিয়া মনে করে”।

পবিত্র পতনশীল খোকাবাবুদের কথা থাক, আমরা পতিতায় ফিরি । পবিত্রতার নেশা বড় ভয়ানক। যে বস্তুটি চিরতরে গেছে, তারই কুহকে মেতে তাঁরা নাটকের  সতী সাবিত্রী দময়ন্তী সেজে ধন্য হয়েছেন আর সেই একই নেশায় মেতে জাতীয়তাবাদের প্রথম ধাপে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন: রামবাগান, সোনাগাছি, চাঁপাতলা ,আহিরীটোলা জোড়াসাঁকো, সিমলা, কেরানিবাগান,ফুলবাগানের এনারা যাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, তিনি জনৈক মিঃ সি আর দাস। যে টাকা তোলার অভিযান টি এরপর বর্ণিত হবে  তা  ঘটে ১৯২০ তে পূর্ববঙ্গ এবং উত্তরবঙ্গে ঝড় এবং বন্যার সময়ে ।এ হ’লো ইস্ট বেঙ্গল সাইক্লোন ফান্ডের  বিবরণ। মানদা লিখছেন:

“জনসাধারণের কাজে এই আমার প্রথম যোগদান। এই সুযোগে আমি মিঃ সি আর দাশকে প্রথম স্পর্শ করিয়াছিলাম. আমরা যখন প্রণাম করিয়া তাঁহার পায়ে টাকার তোড়া রাখিলাম, তখন আনন্দাশ্রুতে  তাঁহার বক্ষ প্লাবিত হইলো। তিনি আমাদের মস্তক স্পর্শ করিয়া আশীর্বাদ করিলেন। বুঝিলাম তিনি সত্যিই  দেশবন্ধু।“

পাঠক: আগের পরিচ্ছেদে  বলেছি এই  সিগারেট খাওয়া ইংরিজি জানা বেশ্যাটি আমাদের ‘অন্য’ ইতিহাসের বায়োস্কোপ আসুন, তাঁর চোখ দিয়ে সেই চাঁদা তোলার একটি দৃশ্য দেখি:

“সে এক অপূর্ব দৃশ্য! কলিকাতার অধিবাসীগণ স্তম্ভিত হইয়া গেল  এক এক দলে প্রায়  ৫০-৬০ জন পতিতা নারী –তাহাদের পরিধানে গেরুয়া রঙের লালপাড় শাড়ি –এলোচুল পিঠের ওপর ছড়ানো, কপালে সিঁদুরের ফোঁটা , কণ্ঠে মধুর সংগীত , মনোহর চলনভঙ্গি   […] অগ্রে অগ্রে দুইটি নারী একখানি কাপড় ধরিয়াছে  তাহাতে দাতাগণ  টাকা পয়সা নোট প্রভৃতি ফেলিয়া দিতেছে  আর দুইজন স্ত্রীলোক পুরাতন বস্ত্র সংগ্রহ করিতেছে ।”

দৃশ্যটি প্রতীকধর্মী । গেরুয়া শাড়ি লাল পাড়  জাতীয়তাবাদের মূলস্রোতে মিশে যাওয়ার খেয়ালি পোলাও  কি? কোনো কারণে  অবনীন্দ্রনাথের ভারত মাতার  ছবিটি চোখে ভেসে উঠলো। যদিও,  অবনীন্দ্রনাথের সে ছবিতে  শাড়ির লাল পাড় নেই । আর সিঁথির সিঁদুরের বদলে কপালের সিঁদুরের টিপ  শুধুই মাঙ্গলিক না অন্য কিছুর প্রতীক এই প্রশ্ন সেদিন যাঁরা দৃশ্যটি দেখেছিলেন তাঁদের মনে জেগেছিলো কিনা কে বলবে। মানদা শুধু জানিয়েছেন পথে লোকের ভীড় ছিল।

আর অল্পই বলা বাকি রইলো । অসহযোগ আন্দোলনের যিনি হোতা এবং অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ আদি মহান কর্মকান্ডে যিনি ব্যাপৃত ছিলেন, তাঁর অস্পৃশ্যতা-শ্রেণীবিন্যাসে  মুচি মেথর চণ্ডাল দুলে বাগদি সকলেরই জায়গা হয়েছিল, হয়নি শুধু এই অস্পৃশ্য  মেয়েগুলোর ।  ১৯২০ থেকে ১৯২৫ এর মধ্যে মহাত্মা গান্ধী (তিনি ততদিনে  ওই উপাধিটি পেয়ে গেছেন)  যখন বরিশালে  যান তখন   সেখানকার পতিতা নারী সমিতি তাঁর দর্শন প্রার্থী হয়েছিল। বাকিটুকু মানদার বয়ানে:

“মহাত্মা গান্ধী যখন বঙ্গদেশ পরিভ্রমণ করেন , তখন বরিশাল গমন করিলে  সেখানকার পতিতা -নারী-সমিতি  তাঁহাকে নিমন্ত্রণ করে. কিন্তু মহাত্মা গান্ধী সেই সভাতে যান নাই। তিনি বলেন, ‘পতিতারা যদি একত্র মিলিত হইয়া সমিতি গঠন করে  তবে দেশের চোর ডাকাতরাও সমিতি গঠন করিবে ।”

এবং যে দার্শনিক দেশকর্মী এই নিমন্ত্রণটি বয়ে নিয়ে গেছিলেন, জাতির জনক তাঁকেও সমুচিত তিরস্কার করেন বলে মানদা জানিয়েছেন।
এতে বঙ্গীয় তথা দেশীয় পতিতারা যে নীতিশিক্ষাটি পেলেন, তা হ’লো: যতই, দেশসেবা করো আর অসহযোগ আন্দোলনে গা ঢেলে  দাও, বেশ্যা পাড়ার বাইরে তোমাদের আবাহন নৈব নৈব চ।

বটেই তো। যেকালে দেশকে মা জ্ঞানে পুজো করা শুরু হয়েছে, এবং দেশমাতৃকার মডেল হচ্ছেন সতী সাবিত্রীরা,  সেকালে  যাদের গর্ভাধান নিষিদ্ধ, তাদের জায়গা কোথায়?

Abanindranath-Tagore-Bharat-Mata

পরিশিষ্ট:

পতিতার আত্মচরিতের  নানা সমালোচনা হওয়া সত্ত্বেও, রমেশদার চাপান উতোর’এর মতো এই বইটিরও গুটিকতক সংস্করণ হয়।  বইয়ের পরবর্তী একটি সংস্করণে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্মিলনীর সভাপতি  প্রভুপাদ শ্রীযুক্ত অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী  লিখেছিলেন, ” পতিতার আত্মচরিত পাঠ করিলাম […] এই আত্মচরিত হইতেও  নিতে পারিলে  লইবার মতো অনেক জিনিস আছে ; কিন্তু তাহা কি সকলে পারিবে?

গোস্বামী মহাশয়ের দ্বিধাজড়িত প্রশ্নটি যথার্থ । অন্য ইতিহাসের ঝাঁঝটি  একটু বেশি । উহা সকলের পরিপাক নাও হইতে পারে।

(মানদা পর্ব সমাপ্ত)

Featured Image: B engali Women Google.
Chittaranjan Das: http://www.phila-art.com/product/india-1965-deshbandhu-chittaranjan-das-c-r-das-1v-stamps/

Bharatmata: Abanindranath Tagore, coutesy Oilpainting Factory.com

Posted in বাংলা, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, History, Uncategorized, Women | Leave a comment

গড়গড়ার মা’লো দশম পরিচ্ছেদ: অন্য ইতিহাস অথবা শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত।

Desh-Patrika-February-2012

১  আভাস

অনেক তত্ত্বকথা হলো. এইবার একটি গল্প শোনাই । পাঠক, যদি কোনো গল্প এইভাবে শুরু হয় তাহলে গল্পের চরিত্রটি কি হবে ?

“আইন কলেজে পরিবার সময় আমার পিতার বিবাহ হইয়াছিল । তখন আমার পিতামহ  জীবিত।আমার মাতুল পরিবার কলিকাতায় বাস করিতেন .তাঁহারা বিশেষ অর্থশালী ছিলেন না কিন্তু  বংশ মর্যাদায় উচ্চ এবং রূপে অতুলনীয় সুন্দরী  বলিয়া আমার মাতাকে পুত্রবধূ করিবার জন্য পিতামহ  বিশেষ আগ্রহান্বিত হইয়াছিলেন । আমার জন্মের দুই বৎসর পর  আমার পিতামহের মৃত্যু হয়। ঠাকুরদাদার কোলে যে সুখ লাভ আমার ভাগ্যে ঘটিয়াছিল –কেবলমাত্র কল্পনাতেই সেই স্মৃতি জাগিয়া আছে।

কন্যা বলিয়া শিশুকালে অনাদৃত হয় নাই. পিতার বন্ধুগণ কেহ কেহ বলিলেন , ‘প্রথম কন্যাসন্তান সৌভাগ্যের লক্ষণ’। কথাটা হাস্য পরিহাসের সহিত বলা হইলেও, তাহার মধ্যে সত্য রহিয়াছে বোধ হইলো। আমার জন্মের কয়েক মাস পূর্বে পিতা আইন ব্যবসায় আরম্ভ করিয়াছিলেন। দিন দিন তাঁহার উন্নতি দেখা গেল। কিছুকালমধ্যেই আমার পিতা কোনো সুযোগে  বার্ষিক দশ হাজার টাকা আয়ের একটা ছোট জমিদারি নীলামে ক্রয় করিলেন।”

যেহেতু আমরা সাহিত্য প্রেমী বাঙালি এবং বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ , শরৎচন্দ্রের শাঁসে জলে এতো বড়টি হয়েছি, আমরা নাক কুঁচকে বলবো এ তো বোঝাই যাচ্ছে এটা হলো গে Exposition । এর থেকে দুইটি সম্ভাবনা আশু দেখিতে পাওয়া যাইতেছে : ইহা একটি রোম্যান্স বা রোমান্টিক ট্রাজেডি তে পর্যবসিত হইবে, কারণ উপরোক্ত বাবুরা আমাদের তাই শিখিয়েছেন। এরপর আমরা ভুরি ভুরি  উদাহরণ দিতে থাকবো এবং আমাদের ইনফারেন্স টি প্রমাণ করে ছাড়বো।

আদতে এটি একটি বেথুনে স্কুলে পড়া শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত ।নাম মানদা। পদবী অজ্ঞাত। সম্ভ্রান্ত বংশীয়া ব্রাহ্মণকন্যা। এবং সেই কারণেই “পাপী কলঙ্কিনী” হওয়া সত্ত্বেও ‘দেবী’ । ১৯০০ সালে এনার জন্ম। কবে গতাসু হয়েছিলেন জানা নেই, তবে এই জীবন টি দিয়ে বেশ মনের মতন একটু রোমান্টিক ট্রাজেডি যে লেখা হতে পারতো সে বেশ বোঝা যায়, বিশেষ করে একটি প্রভূত সম্ভাবনাময় নায়ক চরিত্র যখন ছিল:

“প্রথম যেদিন তিনি পড়াইতে আসিলেন , সেইদিনই তাঁহার আকৃতি প্রকৃতি এবং পরিচ্ছদে আমি একটু আকৃষ্ট হইলাম । তাঁহার লম্বা লম্বা চুল  কপাল হিতে উল্টা  দিকে আঁচড়ানো  ও ঘাড়ের কাছেই ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া বাবরি পাকানো — তাঁহার বয়স আন্দাজ বাইশ তেইশ –দাড়ি গোঁফ উঠে নাই, না পরিষ্কার কামানো, তাহা বুঝিতে পারিলাম না। কাপড় ঢিলা মালকোঁচা দিয়া পরিয়েছেন, মনে হয় কাবুলিদের পাজামা । গায়ে একটা পরিষ্কার ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি জামা –তখন খদ্দরের চলন হয় নাই । তাঁহার সূক্ষ্মাগ্র  উন্নত নাসিকা , চোখ দুটি  সুন্দর কিন্তু একজোড়া সোনার ফ্রেমে বাঁধানো চশমা সেই সৌন্দর্যকে অন্য রূপ দিয়াছে। পায়ে নকল জরির কাজ করা নাগরা জুতা। তাঁহার বর্ণ উজ্জ্বল শ্যাম , দেহ অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ , তাঁহার কথায় জানি বাঁশি বাজে । তিনি সম্প্রতি  বি.এ  পাশ করিয়া কোনো স্কুলে শিক্ষকের কার্য করিতেছেন ।মাস্টার মশায় অবিবাহিত ।”

এই ‘মুকুল দাদা’ কে দেখে বোধ হয় যেন রবি বাবুর কোনও  নভেলের পাতা থেকে উঠে আসা এক ধীর ললিত নায়ক। মানদার কপাল। মুকুল দাদা তাঁকে  কাব্য শেখালেন, শেলি, বায়রন,  শেক্সপীয়ার, বিদ্যাপতি ভারতচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র ,বঙ্কিম, দীনবন্ধু,  গিরিশচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ  সব পড়ালেন, কিন্তু নায়ক হয়ে উঠতে পারলেন না। সে তাঁর   সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য বলতে পারবো না ।  পতিতার আত্মচরিতে তিনি এক পার্শ্ব চরিত্রই হয়ে রইলেন , কারণ মানদার জীবনের নায়ক বা খলনায়ক হয়ে পড়লো এক ‘রমেশ-দা’  যিনি নাকি আবার, ঘটনা চক্রে বেরিয়ে পড়লো, কলেজে মুকুল দাদার সহপাঠীও  ছিলেন ।

এই রমেশ দাদা যে কোনো   সৎ সাহিত্যে  খলনায়কের ভূমিকাটি বিনা চেষ্টায় পেতে পারেন । কারণ  ইনি বিবাহিত হইয়াও পঞ্চদশ বর্ষীয়া বালিকা প্রণয়িনীকে গর্ভিণী করেন এবং গর্ভসঞ্চারের আভাস পেয়েই তাকে গৃহ ছাড়া করেন।  এরপর কি কি ঘটতে পারে সে না বোঝার কোনো কারণ নেই, তাও একটু বলে রাখা ভালো। ইনি  তাঁর অফিসের তহবিল তছরুপ করে তিন হাজার টাকা, একটি নাবালিকা প্রেমিকা কে নিয়ে তিনি দিল্লি,  লাহোর,  শ্রীনগর,  বোম্বাই  এই সকল শহরে খানিক বিচরণ করে শেষ মেশ কাশি ধামে এসে উপস্থিত হ’ন। পাঠক, কাশীধামে বেশ্যাগমন শুনে হাসবেন না । রমেশদা মানদা কে বোঝাচ্ছেন:

“জানিস এই কাশীতে যত বাঙালি আছে তার অধিকাংশই তোর রমেশদার দলের,কেহ বা কারো ঘরের বৌ বের করে এনেছেন , কেউবা বিধবা পোয়াতি খালাস করতে এসেছেন , কেহ আপন রক্ষিতা নারীর হাওয়া বদলাচ্ছেন — আবার এমন কেহ আছেন যাঁহারা নিজের আত্মীয়া দ্বারা  পাপ ব্যবসায় করাচ্ছেন। বাঙালির কলঙ্কের এই তিনটি স্থান: নবদ্বীপ, কাশী বৃন্দাবন. ভয় দেখাচ্ছিস কাকে?”

বস্তুতঃ ‘সৎসঙ্গে কাশীবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’-এর এই বিপরীত ধর্মী ভাষণ দেখে তাবৎ আশ্চর্য হওয়ার কোনো কারণ নেই । নির্ভীক রমেশদার কাশীবাসের এই প্রাঞ্জল বর্ণনাটি সুকুমারী দত্তর ‘অপূর্ব সতী’ নাটকেও দেখা গেছে। বাবু চন্দ্রকেতু ঘোষ নলিনীকে নিয়ে কাশী ধামেই পৌঁছেছিলেন এবং সেই পবিত্র স্থান হতেই তাঁর  পিতা গোরা পুলিশের সাহায্যে তাঁকে উদ্ধার করে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। নলিনী কাশীধামেই মরে বাঁচে। সুতরাং আলোচ্য লেখায় রমেশদার কথায় অতিরঞ্জন  থাকতে পারে, কিন্তু অসত্য নেই বলেই বোধ হয়।  যাহা হউক এক্ষণে ‘অপূর্ব সতী’ অথবা কাশীধামের মাহাত্ম্য  কোনটিই আমাদিগের বিবেচ্য বিষয় নহে।

আত্মচরিতে ফেরা যাক।বলাই বাহুল্য, রমেশদা  যথাসময়ে উধাও হলেন এবং চরিতের গতি কিছু শ্লথ হলেও প্রভূত সম্ভাবনাময় হয়ে পড়লো।  কাশির ঘাট থেকে মোহান্তর মঠ; তথায় মৃত সন্তান প্রসব ; তৎপর কলকাতার উদ্ধারাশ্রম, হাড়কাটার গলি , রামবাগান এবং তৎপরবর্তী কালে ডাবল প্রমোশন পেয়ে ভবানীপুর।  মানি  বা মানু থেকে ফিরোজা বিবি এবং শেষ পর্যায়ে মিস মুখার্জি । এই কাহিনির মাঝে নানা বাবু , প্রফেসর, সমাজসেবী, ডাক্তার, মোক্তার, ব্যারিস্টার ছড়িয়ে আছেন দাঁড়ি,কমা, সেমি কোলনের মতো।

এইবার আসল কথায় এসে পড়া যাক।

তার আগে একটি কথা সবিনয়ে মনে করিয়ে দিই । লেখাটি একটি বেশ্যার এবং ইঁহাদিগের লজ্জা বোধ সচরাচর কিছু কম হইয়া থাকে । এরপর যদি তাঁহারা হ’ন শিক্ষিতা বেশ্যা, তাহা হইলে সমাজের সমূহ বিপদ, কারণ এঁদের স্পষ্ট বিবৃতিতে ইতিহাসের  নির্মল উদার ভাবমূর্তি কিছু কলঙ্কিত হইয়া পড়ে।

Ramananda-Chatterjee-thumb-320x327
শ্রী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়

২ পতিতোদ্ধারিণী প্রকল্প এবং মানদা সংবাদ

মহারানীর আমলটি ইংলন্ড এর ‘Woman Question’ এর যুগ। নারীদের কি রূপে আমরা দেখতে চাই অথবা চাইনা সে নিয়ে তত্ত্বের ঘনঘটা এবং তৎপ্রসূত সমাজ সংস্কার এবং সমাজ উন্নয়ন প্রচেষ্টা । এই সৎ প্রচেষ্টা উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা করজোড়ে গ্রহণ করি । এই গুরুদায়িত্ব চিন্তায় অনেক বড় বড় মাথা ঘুরে গেছিলো সে আমরা জানি। তবে সমস্ত তত্ত্বই  গৃহস্থ অবলা প্রসঙ্গে। বেশ্যা কল্যাণ প্রকল্পটি  খুব সোচ্চারে জাহির হয়নি। তাতে সমাজপ্রেমী ভদ্রলোকদের কিছু নৈতিক অসুবিধা ছিল। অবশ্য কিছু সদাশয় মানুষ পতিতাদের নিয়ে যে একেবারে ভাবেন নি তা নয়। মানদা দেবীর আত্মচরিতে উদ্ধারাশ্রমের উল্লেখ আছে, সেরকম  কিছু নারী উদ্ধার সঙ্ঘর কর্মকাণ্ড ১৯০০ সালের বছর তিন চার আগেই শুরু হয়েছে। তবে তার অন্দরের আসল কথা টি যে কি ছিল তা সঠিক জানা যায় না। তদ্রুপ আশ্রমের যে বর্ণনা পাওয়া গেল এই বইয়ে তা যে সম্পূর্ণ চিত্র নয় তা আমরা তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম, তবে মানদা যে তাঁর আর দুই সই রাজবালা আর হরিদাসীর অথবা কালিদাসীর সঙ্গে সে স্বর্গ থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলেন সে কথা তিনি বিশদ বলেছেন। পালিয়ে কোথায় গেছিলেন সে কথায় পরে  আসছি ।
কাগজপত্র বলছে ১৮৯২ সালে ব্র্রাহ্ম সমাজের  কিছু মানুষ ‘দাসাশ্রম’ বলে একটি অনাথালয় শুরু করেন। দাসাশ্রম ছিল গরীব মানুষের আশ্রয়, খাওয়া থাকার জায়গা। ঠিকানা ছিল ১৬৭/২/৩ নম্বর কর্নওয়ালিশ স্ট্রীট। ১৮৯১ সালে বসিরহাট মহকুমায় জালালপুর গ্রামের মৃগাঙ্কধর চৌধুরী ও ক্ষীরোদচন্দ্র দাস দাসাশ্রম স্থাপন করেছিলেন এবং পরে এটি কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। এই আশ্রমের  মুখপত্র ‘দাসী’ পত্রিকা কলকাতায় প্রকাশিত হতে থাকে ১৮৯২ সালের জুলাই মাস থেকে । ব্রাহ্ম সমাজের যে মানুষটি এই কাজের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন, তিনি শ্রী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। তিনি কে আমরা জানি তাই অধিক পরিচয় দিয়ে সময় নষ্ট না করাই স্থির করলাম। এই দাসী’ পত্রিকার পাতা ওল্টালে নানা আশ্চর্য  খবর চোখে পড়ে। একটি বলি। আশ্বিন ১২৯৯ সংখ্যায় আছে :

‘আমরা প্রথম সংখ্যা ‘দাসী’তে প্রকাশ করিয়াছি যে আমরা খুলনা হইতে একজন বিপথগামিনী অল্পবয়স্কা রমণীকে ফিরাইয়া সৎপথাবলম্বন করাইবার জন্য চেষ্টা করিতেছি। এই সংবাদ প্রকাশ হওয়াতে দেখা যাইতেছে যে বহু সংখ্যক হতভাগিনী রমণী আমাদের আশ্রয় পাইবার জন্য আমাদের নিকট সংবাদ পাঠাইতেছে।’

এইরকম আটটি রমণীর সংবাদ আছে এই সংখ্যায়। হতভাগিনী রমণীগণ সংবাদ পাঠাইতেছে ঠিকই, কিন্তু এই সকল বিপদ ঘাড়ে নেবে কে? তাই লেখকের আহ্বান:

‘হায় হায়, এই সকল হতভাগিনীদের উত্তপ্ত অশ্রুবিন্দু বঙ্গদেশকে পুড়াইয়া ছারখার করিবে। বঙ্গ মাতার কি কোনও উদারপ্রাণা, প্রেমময়ী কন্যা নাই, যে আপনার প্রেম পক্ষপুটের আচ্ছাদনের নিম্নে রাখিয়া এই হতভাগিনীগণকে পাপের হস্ত হইতে, অপার যন্ত্রণার হস্ত হইতে রক্ষা করেন? কেহ যদি থাক মা এস। অগ্রসর হও।’

উদারপ্রাণা, প্রেমময়ী কন্যা  কেউ এগিয়ে এসেছিলেন কিনা বলতে পারবো না তবে  উদারপ্রাণ, প্রেমময় পুরুষ যে বহু সাতিশয় উৎসাহিত হয়েছিলেন সে এই বইখানিতেই প্রমাণ।

রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের দুঃসাহসটি কিছু বেশি মাত্রায় ছিল, একথা স্বীকার করতেই হবে। অনিচ্ছাকৃত ভাবে যারা বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে তাদের উদ্ধারের জন্য রামানন্দ অনেক আইনের বই পড়াশুনা করে প্রবন্ধ লিখে পাঠক সমাজকে সচেতন করার চেষ্টায় ব্রতী হন– মাঘ ১২৯৯ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘স্ত্রী জাতির দুঃখ বিমোচন’ প্রবন্ধে তিনি লিখছেন:

‘এই কলিকাতা শহরে, বেশ্যাদের নিজের বাড়ী আর কয়টা আছে? সমুদয় বেশ্যাগৃহই কোন না কোন ‘ভদ্র’ বাড়ীওয়ালার সম্পত্তি। কি ঘৃণার কথা। জঘন্য পাপে হতভাগিনীগণ শরীর ও আত্মা কলুষিত করিতেছে। আর তাহাদের পাপার্জিত অর্থে এই ভদ্রলোকেরা স্ত্রী পুত্র কন্যার ভরণপোষণ করিতেছে? আমাদের বোধ হয়, এই কলিকাতা শহরের বেশ্যাগৃহ সকলের একটা তালিকা করিয়া কোন বাড়ীটা কোন্‌ ভদ্রলোকের তাহা স্থির করিতে পারিলে খুব ভাল হয়। তাহা হইলে ঐ সকল নীতিজ্ঞানশূন্য লোকদের নাম সহিত ঐ তালিকাটি সাধারণের গোচরার্থে প্রকাশ করা যাইতে পারে।’

রামানন্দ বাবুর দোষ ধরবো এ স্পর্ধা আমার নেই. তাঁর চরিত্র বা অভিসন্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলবো, তেমন কদর্য রুচিও আমার নয় ; ভাদ্র, ১২৯৯ সংখ্যায় ‘দাসী’ পত্রিকায় তাঁর ‘পতিত পুরুষগণের উদ্ধার’ প্রবন্ধটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:

‘সকল দেশেই দেখা যায় যে ব্যভিচার দোষে দোষী পুরুষগণের সামাজিক দণ্ড অতি লঘু, কিন্তু ব্যভিচারিণী রমণীর দণ্ড অতি কঠোর। পুরুষ রমণী উভয়েই সমাজ অপরাধী হইলেও রমণী কলঙ্কিতা নামে অভিহিতা এবং সমাজ কর্তৃক পরিত্যক্তা হন। তাহাতে ফল এই দাঁড়ায়, যে নারীর একবার অধঃপতন হইয়াছে, তিনি ক্রমেই গভীরতর পাপপঙ্কে নিমগ্ন হইতে থাকেন। অপরদিকে পুরুষ শত অপরাধে অপরাধী হইয়াও ভদ্রলোকের বেশে সমাজে সর্বত্র অবাধে গতিবিধি করিয়া থাকেন এবং সেই সুযোগে, আরও কত রমণীর সর্বনাশ করেন।’

সবই অত্যন্ত খাঁটি কথা । কিন্তু আদর্শ এবং বাস্তবের মধ্যে যে একটি মস্ত ব্যবধান আছে তা তাঁর মতো আদর্শবাদী মানুষরা দেখতে পান না। আমরাও পেতাম কিনা সন্দেহ যদি না একজন শিক্ষিত পতিতা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে না দিতেন। রামানন্দ বাবু যে বাবুদের  বেশ্যাদিগের বাড়ি ভাড়া দেওয়া নিয়ে একটি মরালিস্ট অ্যাঙ্গেল খাড়া করলেন, সেই প্রসঙ্গে বলি, বাড়িওলারা ভাড়া না দিলে  “প্রেম পক্ষপুটের আচ্ছাদনের নিম্নে”  এই সকল অনাথদের আশ্রয় দিতো কে, সেকথা উনি ভেবে দেখেছিলেন কি? উদ্ধার আশ্রমের পরম নিশ্চয়তার  চেয়ে  মানদা দেবী যে  হাড়কাটা গলির খোলার ঘর শ্রেয় মনে করেছিলেন, এই  কথা জানতে পারলে সম্ভবত এইসব উদার হৃদয় সমাজে বান্ধব  যারপরনাই আহত হতেন…

ভাবের ঘরে থাকার নানা সুবিধে । তাতে বাস্তবটিকে নস্যাৎ করে  একটি ভাবগম্ভীর বাতাবরণের মধ্যে নিশ্বাস প্রশ্বাস নেওয়া যায়।

খানিক আগেই বলেছি মানদা পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন। কোথায় এবং কিভাবে,  এইবার সেই আখ্যানটি শুরু করা গেল। গোড়াতেই বলে রাখি, লেখিকার ভাষা খুবই প্রাঞ্জল এবং চাঁচা ছোলা, ফলে কি বলার চেষ্টা করছেন সে বুঝতে অযথা সময় নষ্ট করতে হয় না। পাঠক এইবার এটি পড়ুন:

“একদিন আমি রাজবালা আর কালিদাসী  ও আর একটি মেয়ে  ( তাহার নাম এখন আমার মনে নাই– বোধয় খেঁদি বা এমন কিছু হইবে) এই  চারিজন একখানি ঘোড়া গাড়ি ভাড়া করিয়া টালিগঞ্জে আসিলাম. সেখান হইতে ট্রামে আমরা কর্নওয়ালিস   স্ট্রিট এ  সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা মন্দিরে  উপস্থিত হইলাম. […] আমাদের ব্রাহ্ম মহিলাদের মতো কাপড় পড়া ছিল! পায়ে জুতাও ছিল, আমরা অগ্রসর হইয়া গেলাম।

ব্রাহ্মসমাজে  আসিবার ষড়যন্ত্র  আমরা অনেকদিন হইতেই করিতেছিলাম . রাজবালাই ইহার মূল  কারণ. সে বলিয়াছিল ব্রাহ্ম সমাজ সকলকেই গ্রহণ করে , ব্রাহ্মধর্ম অবলম্বন করিলে  বিবাহ করা সহজ  হইবে, কিন্তু দেখিলাম  সেখানেও বাধা আছে।”

পাঠক কি খাবি খাচ্ছেন? ঘটনার বাকিটুকু শুনুন তাহলে:

“সম্মুখে একজন পক্ককেশশ্মশ্রুবিশিষ্ট দীর্ঘাকৃতি বলিষ্ঠ দেহ বৃদ্ধকে দেখিয়া  রাজবালা আমার কানে কানে বলিল,’এই বুঝি  কৃষ্ণকুমার মিত্র– প্রণাম করো.’.. আমরা চারিজন পাদস্পর্শ করিয়া প্রণাম করিলাম। তিনি স্নেহপূর্ণ স্বরে  আমাদের আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে  আমরা তাঁকে একপাশে ডাকিয়া নিয়া সকল কথা বলিলাম, এবং আমাদের রক্ষার উপায় করিতে অনুরোধ করিলাম.  উদ্ধার  আশ্রমের কর্তৃপক্ষদের দুর্ব্যবহার  ও আমাদের  ব্রাহ্ম ধর্ম  গ্রহণের অভিলাষ তাঁহাকে জানাইলাম।

তিনি বলিলেন, ‘আপনাদের রক্ষার উপায় একাকী আমার দ্বারা সম্ভবপর হয়না । সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিগণকে জিজ্ঞাসা করাও প্রয়োজন । তৎপরে তিনি একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক কে  নিকটে ডাকিলেন. তাঁহার নিকট সমস্ত ঘটনা বলা হইলে  তিনি বিশেষ ঘৃণার সহিত আপত্তি জানাইয়া কহিলেন,  “না, তাহা কিরূপে হয়? ইহাদের পূর্ব জীবন কলুষিত . ব্রাহ্মসমাজে কি পাপ প্রবেশ করিবে?”

পূর্ববর্তী পর্বে  গিরিশ চন্দ্রের স্মৃতিসভায় সুধাকন্ঠী সুশীলাবালার একটি প্রশ্ন দিয়ে শেষ করেছিলাম. আশা করছি  সেইটি কেউ বিস্মরণ হন নি ; পরবর্তী কোনো এক সন্ধিক্ষণে  ‘কলুষিত পূর্ব জীবন’ নিয়া দুই চার কথা বলা জরুরি হয়ে পড়বে  সেটিও আগে থেকেই জানিয়ে রাখা হলো।

‘চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে’ রোগটি নারীজাতির ক্রনিক এইলমেন্ট , সে শিক্ষিতই হোক, বা পতিতাই হোক। ফলে যা হবার তাই হলো :

” আমরা নিরাশ হইয়া চলিয়া আসিলাম. বিদায় লইবার সময়  পুনঃপ্রণাম করিতে গেলে শ্রীযুক্ত কৃষ্ণ কুমার মিত্র মহাশয় আমাদের প্রণাম গ্রহণ করিলেন ; কিন্তু অপর লোকটি ,পরে শুনিয়াছিলাম তাঁহার নাম হেরম্ব বাবু — ‘না–না–‘ করিয়া সরিয়া গেলেন ।”

রামানন্দ বাবুর মতো হেরম্ব চন্দ্র মৈত্রও  এক প্রাতঃস্মরণীয় মানুষ। তাঁর অধিক পরিচয় আর কি দেব।অধিকাংশ বাবুদের বড় কন্টামিনেশন -এর ভয় ।এ কথা আগেও বলেছি, এখনো বলছি। এই ব্যাপারটি  নাটুকে বাবুদের ক্ষেত্রে আমরা আগেই দেখেছি, এইবার দেখলাম সমাজসংস্কারক বাবুদের মধ্যে। এঁরা জ্ঞান ও আদর্শের জগতের লোক।  নারীর সঠিক কর্তব্য কি এবং কোথায়, কিভাবে এঁদের স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করা যায় এই নিয়ে নীতি গর্ভ বক্তৃতা দিতে পারেন, কিন্তু পতিতার ছোঁয়ায় বড়োই মর্মাহত হন এবং সেই  ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেই ‘না–না..’ বলে আর্তনাদ করতে থাকেন। তবে দুই একটি নিকষ সোনার কথাও উদ্ধ্বার হলো  শিক্ষিত পতিতার আত্মচরিত থেকে । তাঁদের একজন পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী। মানদা আমাদের একটি কাহিনী শোনান এই ছুঁৎ মার্গ প্রসঙ্গে। কাহিনীর নায়িকা বেশ্যাটি ছুতোরের মেয়ে, সাত বছুরে বিধবা।  বিদ্যাসাগর এবং শিবনাথ শাস্ত্রী তার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে ব্যাপার কোনও কারণে ঘটে ওঠেনি;  মেয়েটি শিবনাথ শাস্ত্রীর পূর্বপরিচিত এবং শিবনাথ শাস্ত্রীকে সে বালবিধবা ছোটবেলায় ‘দাদা’ ডাকতো।  অবশেষে  নানা  কার্যকারণে সে মেয়ে যখন খাতায় নাম লেখায়, শাস্ত্রী মশাই স্বয়ং যান তার বাড়ি তাকে সৎ পথে ফেরাতে…  সে হতভাগী ফিরতে পারেনি বটে কিন্তু ঘরে  শিবনাথ শাস্ত্রীর একটি ছবি বাঁধিয়ে রেখেছিলো। প্রতিদিন সে ছবিকে  সে ফুল  দিয়ে সাজাতো । মরবার সময় এলে আর এক কচি বেশ্যাকে ছবিখানা দিয়ে সে বলে যায় সে যতদিন বাঁচে ততদিন যেন ছবিখানি সে অমনি ফুল  দিয়ে সাজায়। মানদা এই গল্পটি শোনে সেই অল্পবয়েসী বেশ্যটির নিজের বয়ানে, তার  প্রৌঢ় কালে। এ কাহিনী থেকে এও জানলাম যে ঢাকার এক পতিতার কন্যা লক্ষীমণিকে উদ্ধার  করে এই অদভূত মানুষটি এক ব্রাহ্ম যুবকের সঙ্গে বিবাহ দিয়েছিলেন।  মানদার বৃত্তান্তে এইরকম দুই একটি  কন্টামিনেশন প্রুফ বাবুর দেখা পেলাম, কিন্তু তাঁরা লাখে এক। তাঁদের প্রণাম করি।

৩ বাবু বিচার

ফিরি মানদা ইতিবৃত্তে ।

সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের জুতোর ঠোকর খেয়ে তিনি নিজের পাকাপাকি বন্দোবস্ত করলেন । দেখলাম এই পর্যায় থেকে পোশাকি বাঙলা ছেড়ে তিনি  এক পরিভাষা ব্যবহার ঘোষণা করলেন এবং পাঠক কে তার জন্যে প্রস্তুত ও করলেন। বিদ্বানরা বলতে পারেন এ হলো এক ধরণের ভাষাগত সাবল্টার্ন বদমাইশি , ভদ্রজনের ভাষা কে ইতর করে তোলার এক ষড়যন্ত্র। সে হতে পারে। আমরা তার প্রতিবাদ করবো না।  কারণ কুসঙ্গে যে অধঃপতন হয় তা তিনি আগেই স্বীকার করে নিয়েছেন. গোড়াতেই বলেছি তিনি এক চাঁচা ছোলা ‘মেয়েমানুষ’ । সংজ্ঞা এবং উদাহরণ সহ তাঁর সামাজিক এবং মানসিক অবস্থানটি তিনি পাঠকদের পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন :

“লম্পট প্রণয়ীকে পতিতা সমাজে ‘বাবু’ বলা হয় । এখন হইতে এই শব্দটি আমি মাঝে মাঝে ব্যবহার করিব। এই ‘বাবু’ লইয়া খুব গোলযোগ হইতো । কোনো পতিতার প্রণয়ী অন্য নারীরই ঘরে প্রবেশ করিলে  তাহা লইয়া তুমুল ঝগড়া বিবাদ  বাধিয়া উঠিত ।  সকলেই তাহাতে যোগ দিতো  । আমি বাদ যাইতাম না। আর যতরকমের  অশ্লীল অশ্রাব্য কথা, শুনিতে শুনিতে  আমার  সহিয়া গিয়েছিলো। বুঝিলাম  স্কুলের  পড়া হইতে যে অল্পবিদ্যা পাইয়াছি  তাহা আমার অহংকার বাড়াইয়া সর্বনাশ করিয়াছে , কিন্তু আমাকে  পাপের আক্রমণ হইতে বাঁচাইতে পারে নাই।”

মান্নাদা প্রবাসীভারতী  নিয়মিত পড়তেন। শিবনাথ শাস্ত্রীর  কথা যখন প্রথম শোনেন  তখন তাঁর লেখা ‘নিমাই সন্ন্যাস’ কবিতাটি  মনে পড়েছিল:

আজ শচীমাতা কেনো চমকিলে,
ঘুমাতে ঘুমাতে উঠিয়া বসিলে?
লুন্ঠিত অঞ্চলে ‘নিমু’ ‘নিমু’ বলে
দ্বার খুলে মাতা কেনো বাহিরিলে?

অশ্রাব্য ভাষায় সাবলীল, যৌন প্রসঙ্গে মুখে কিছু বাধে না  আবার  ‘প্রবাসী’ ও ‘ভারতী’ পড়েন, কবিতা মনে রাখতে পারেন, এ কেমন পতিতা?  পাঠক, আমি বলবো, এই কলঙ্কিনী আমাদের ওপেন টি বায়োস্কোপ নানটেইন টেলিস্কোপ। ইনি আমাদের অন্য ইতিহাসের পাতা।

পরবর্তী পরিচ্ছেদ এ বিষয়ে আরো কিছু বলার আশা রাখলাম।

এখন শুধু এইটুকু বলি, প্রথম সংস্করণটি প্রকাশের পর, কিছু  সাহিত্য সমালোচক বাবু সাব্যস্ত করেছিলেন এ লেখা কোনো মহিলার লেখা হতে পারে না। তার জবাবে লেখিকা বলেছিলেন: ‘পতিতগণ যদি  বই লিখিতে বা পত্রিকা সম্পাদনা করিতে পারেন , তবে পতিতাগণ পারিবে না কেন?’

(ক্রমশঃ)

আলোচ্য বই: শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত ( Memoirs of Manada Devi)
প্রথম প্রকাশ: ১৯২৯

 

Featured Image: Courtesy Google

Posted in Uncategorized | Leave a comment